Published : 03 Sep 2025, 06:12 PM
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ১৫০ করার পাশাপাশি সেসব আসনে সরাসরি ভোট চায় ৭১টি সামাজিক সংগঠনের মোর্চা সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।
বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সিডও দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল সভায় মোর্চার তরফে এ সুপারিশ এসেছে।
‘সংসদে নারীর কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রতিনিধিত্ব: সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন’ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও নারী অধিকারকর্মীরা অংশ নেন।
গত বছরের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার যখন রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দিল, তখন অনেকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন, এবার হয়ত সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ মিলবে।
কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দলের আপত্তিতে ‘ক্রমান্বয়ে ১০০ আসন সংরক্ষণের’ সিদ্ধান্ত এসেছে ঐকমত্য কমিশনে। বিদ্যমান জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়া হয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগের মধ্যে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন ছিল অন্যতম। কিন্তু এই কমিশনের সুপারিশ আমলে নেওয়া নিয়ে বিরোধিতার মুখে পড়ে সরকার।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জন্য একটি সাধারণ আসনের পাশাপাশি নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন রেখে সংসদে মোট ৬০০ আসন করার সুপারিশ করেছে।
উভয় ক্ষেত্রে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করার সুপারিশও এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত এ কমিশনের তরফে।
কমিশন মনে করছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে এ সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব।
সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির গোলটেবিল সভায় কমিটির পক্ষে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ‘নিজেরা করি’ এর সমন্বয়কারী খুশী কবির।
ধারণাপত্রে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। জাতীয় সংসদে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্যের উপস্থিতি নারীসমাজের স্বার্থ ও মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখবে এবং জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা তৈরি করতে সহায়ক হবে।
“স্থানীয় সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধানটি বহুদিন থেকে কার্যকর হয়ে আসছে। একইভাবে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করবে।”
ধারণাপত্রে তিনি সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সুপারিশগুলো তুলে ধরেন। সুপারিশগুলো হল-
সভা সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম।
সেখানে আলোচক হিসাবে অংশ নেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, ঐক্য ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম এ সবুর, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, “২০২৫ সালে এসেও নারীকে ভাবতে হয় সে মনোনয়ন পাবে কি-না, যা খুবই দুঃখজনক। আরপিও অনুসারে নারীর ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের জায়গায় রাজনৈতিক দল থেকে বাস্তবায়নের পরিবর্তে কেবল সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। নারী তার মর্যাদা চায়।
“সিডও সনদ এবং সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে, এর বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে তৎপর হতে হবে। নারীরা পুরুষের সাথে অন্যান্য সকল কাজ করতে পারলে রাজনীতিতেও তারা পাশাপাশি কাজ করতে পারবেন। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রচলিত রাজনৈতিক পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার।”
শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “সংবিধানে মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারীর সমতার কথা বলা হলেও সেটি এখনো নানামুখী কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। এ দাবিগুলো (সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সুপারিশ করা) বাস্তবায়নে অনেক দল একমত হবে না, এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর সংগ্রহ করে স্মারকলিপি আকারে জমা দিতে হবে।”
তিনি নারী জনপ্রতিনিধিদের সরকারি বরাদ্দ দেওয়া, বরাদ্দবৃদ্ধি ও সংসদের উচ্চকক্ষে ৫০ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে মত তুলে ধরেন সভায়।
রুহিন হোসেন প্রিন্স নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতে লড়াই চালিয়ে যেতে অধিকারকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে সচেতন করতে হবে; অনেক নারী ভোটার হতে চায় না বিশেষ করে গার্মেন্টসে যেসকল নারী কাজ করেন। এই বিষয়ে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
এস এম এ সবুর অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি নারীর সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “নারীর অধিকার নাই সম্পদে, নাই দেশ শাসনে। রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা প্রতিনিধিত্বমূলক নয়।”
সাইফুল হক বলেন, “নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রধান সংকট পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা। নারীরা পুরুষের সমান নয়- এই ভাবনা সমাজ এখনো বহন করে চলেছে।”
তিনি রাজনৈতিক দলগুলো প্রতি সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার এবং দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আরপিওর বিধান অনুসারে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বজলুর রশীদ বলেন, “আমাদের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। নারীর পদায়ন আর ক্ষমতায়ন এক নয়, সংরক্ষিত নারী আসনের দায়িত্ব কর্তব্য সুনির্দিষ্ট করতে হবে, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন করতে। এই মুহূর্তে নারী প্রার্থী একজন পুরুষ প্রার্থীর সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। ফলে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকা উচিত এবং এই আসনে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচন থাকা উচিত।”
সমাপনী বক্তব্যে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলেও তাদের নির্দিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। নারীদের নির্বাচনি এলাকার জন্য প্রস্তুত করা পর্যন্ত এই আসন বৃদ্ধির কোটাপদ্ধতি থাকতে হবে। সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন দিতে হবে।
“সিডও সনদ বাস্তবায়নের দায় সরকারের জন্য সবসময় থাকছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সব ক্ষেত্রে আমরা তার স্বাধীনতা দেখতে চাই, অগ্রগতি দেখতে চাই। নারী আন্দোলন শুধু নারীরা করলেও সমগ্র সমাজ এই আন্দোলনের ফল ভোগ করে। আমাদের যাবি যতই যৌক্তিক হোক তা বাস্তবায়নে নানা বাধা আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। নারীর মধ্যে পিতৃতান্ত্রিকতা বিরাজ করে, নারী আন্দোলনের সংকট আছে, নতুন সংকট হচ্ছে নারী-বিদ্বেষী মনোভাব, এটি নারীকে পশ্চাদমুখী করার জন্য হচ্ছে।”