১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ব্যর্থতার’ দায় বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপাল এনসিপি

“বিএনপি বলে সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া, কিন্তু সংস্কারের সঙ্গে যে চলতে হবে সেই মানসিকতা বিএনপির নাই।”

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Nov 2025, 12:14 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:36 PM

পুরনো রাজনীতির ‘ব্যর্থতার’ কারণে বাংলাদেশে একের পর এক গণঅভ্যুত্থান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।

একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগকে সেই ব্যর্থতার দায় দিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা দল তিনটির তীব্র সমালোচনা করেছেন।

মঙ্গলবার ঢাকার বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসের আলোচনায় দলের নেতারা বক্তব্য রাখছিলেন।

এনসিপি জেলহত্যা প্রসঙ্গটি সরাসরি না টানলেও নভেম্বরের ঘটনা প্রবাহকে সামনে এনেছে।

আলোচনার শিরোনাম করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রগঠনের ব্যর্থতার অনিবার্য পরিণতি: নভেম্বর, ১৯৭৫’।

আলোচনা সভায় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের গত অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস ব্যর্থতার ইতিহাস। এই ব্যর্থতার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে দায় তার কেন্দ্রেই রয়েছে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থা। আমাদের ব্যবস্থা কখনই গণতান্ত্রিক ছিল না। পঁচাত্তরের পরে বাংলাদেশে পরিবর্তনের যে সুযোগটা ছিল সেটা আমরা অর্জন করতে পারি নাই। 

“নব্বই সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও বিএনপি যে কমিটমেন্ট দিয়েছিল সেখানেও তারা থাকে নাই। আমরা বাংলাদেশে নতুন করে আর ব্যর্থতা চাই না। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ক্ষণে ক্ষণে স্বৈরাচার উৎপাদন হবে এবং সেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আন্দোলন করে জীবন দিতে হবে, জীবন তো এতো সস্তা নয়।”

গণতান্ত্রিক ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণেই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং পরবর্তী ঘটনা প্রবাহগুলো সামনে এসেছে বলে ইঙ্গিত দেন আখতার।

“মুক্তিযুদ্ধের পর বাহাত্তর সালে শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা পাওয়ার পর যদি গণতান্ত্রিক মানসের মধ্যে থাকতেন তাহলে তো পঁচাত্তরের ঘটনা থেকে শুরু করে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের দিকে আমাদের যেতে হতো না। রক্তক্ষয়ী রাজনীতির বাইরে গিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি আমরা শুরু করতে পারতাম। এই দায়ভার আওয়ামী লীগের যেমন আছে, অন্য দলগুলোরও আছে।”

তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মানুষ যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখেছিল বাহাত্তরের সংবিধানে তার প্রতিফলন ছিল না। একজন ব্যক্তি শেখ মুজিবের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সেই সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল এবং গত ৫০ বছরে তাই হয়েছে।” 

বাহাত্তরের সংবিধান দিয়ে দেশ পরিচালনা করার কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাঙ্খিত মুক্তি অর্জিত হয়নি দাবি করে আখতার বলেন, “সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদের কারণে একজন সংসদ সদস্য জনগণের পক্ষ থেকে নিজের কথাটি বলতে পারেননি। দলের প্রধান যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটার সঙ্গেই তাকে একমত হতে হয়েছে। একমত হতে না পারলে ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে তার সংসদ সদস্য পদই বাতিল হয়ে গিয়েছে।”

গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থানকে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে তুলে ধরে তার সমালোচনা করেছেন আখতার।

তিনি বলেন, “যারা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না, সংস্কার-গণভোট দেখে তাদের আকাশ থেকে পড়া স্বাভাবিক। তারা মনে করেছে মানুষ রক্ত দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছে, এখন তারা ক্ষমতায় চলে আসবেন। কিন্তু বিষয়টি মোটেও এরকম নয়। 

“মানুষ কেবলমাত্র একটি সরকার পরিবর্তনের জন্য জীবন দেয়নি। বরং বাংলাদেশের সর্বপরি শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য তারা জীবন দিয়েছেন।” 

গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার আগে থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় আসার বিষয়টি তুলে ধরে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, “বিএনপি নিজেই ৩১ দফার কথা বলেছে। সেই আকাঙ্খাগুলো এখন কার্যকর করার সময় চলে এসেছে, তখনই বিএনপি বাগড়া দিচ্ছে। বিএনপি বলে সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া, কিন্তু সংস্কারের সঙ্গে যে চলতে হবে সেই মানসিকতা বিএনপির নাই।”

জেলহত্যার ঘটনা পটভূমি তুলে ধরে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “শেখ মুজিব যখন ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন, মানুষ তখন রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। ওই সময় একটি সেনা অভ্যুত্থান হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে জিয়াউর রহমান একজন ‘লাকি ম্যান’ ছিলেন। ক্ষমতা না চাইতেই পেয়ে গেছেন। ওনার কিছু ‘ক্যারিশমাটিক’ যোগ্যতা ছিল, যার মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জায়গায় বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন। 

“কিন্তু রাজনীতির জায়গায় জিয়াউর রহমান পুরোপুরি ব্যর্থ ছিলেন। ওই সময় আমাদের সুযোগ ছিল বাংলাদেশটাকে নতুন করে গড়ে তোলার।”

নাসীরুদ্দীনের মতে, জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে পুনর্গঠন না করে অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছেন। রাজনীতি পুনর্গঠনের কিছু চেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু ‘সফল হন নাই’। ওই সময় বাংলাদেশ একটা নতুন রূপ পেতে পারতো। জিয়াউর রহমান ঐতিহাসিক এই সুযোগ ‘হাতছাড়া’ করেছেন।

তিনি বলেন, “খুবই হতাশ হয়েছি। বিএনপির একজন প্রার্থী (মেজর হাফিজ) বলেছেন, তাদের অনেকে বলছেন, জুলাই সনদের প্রয়োজন নেই। ওনারা আসলে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায় বিচার মনে মগজে ধারণ করতে পারেন নাই। বিএনপির অধীনে কতটা সংস্কার বাস্তবায়ন হবে সেটা নিয়ে আমরা সন্দিহান।”

বার বার গণঅভ্যুত্থান পরিস্থিতির জন্য বিএনপির ‘ভুল রাজনীতি ও দুর্নীতিকে’ দায়ী করেন নাসীরুদ্দীন।

জামায়াতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াতের উচিত ছিল তাদের দলের নাম পরিবর্তন করে ফেলা। আপনার দলের নাম দিয়েছেন ইসলাম। ইসলামিক নাম দিয়ে এটার গায়ে যে কাদা লাগিয়েছেন এটা আর পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। 

“এখন তারা হয়তো বলবেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আপনি আমার দলের নাম পরিবর্তন করতে পারেন কিনা? আমিও বলতে চাই, গণতান্ত্রিক যাত্রায় আপনি আমার ইসলাম নিয়ে একটা দল বানিয়ে ফেলতে পারেন কিনা? আমরা জামায়াতে ইসলাম ও বিএনপিকে বলবো, সুযোগ এসেছে, সুযোগটা কাজে লাগান।”

তবে সমালোচনা করলেও আগামী নির্বাচনে বিএনপি অথবা জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনার কথাও শোন যায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কের বক্তব্যে।

“প্রশ্ন এসেছে যে, আমরা কার সাথে জোটে যাবো। যারা সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে থাকবে আমরা তাদের সাথে জোটে যাবো। সংস্কার বাস্তবায়নে যারা বাধা হবে, তাদেরকে আমরা ভোটের প্রক্রিয়ায় পরাজিত করবো। 

“জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে যদি বিএনপি এগিয়ে আসে তাহলে এই শর্তে আমরা তাদেরকে কিছুটা সুযোগ দিতে রাজি আছি। পুরো সুযোগ দিতে রাজি নাই। কারণ, তাদের অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি.. এগুলো ক্ষমার অযোগ্য।”

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে নাসীরুদ্দীন বলেন, “রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তারেক জিয়াকে ধরে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল। সেই সংস্থার যখন সংষ্কার চাচ্ছি, ওনারা এটাতে বাধা দিচ্ছে। তাহলে আপনি তো আবার আসলে আবার মাইর খাবেন। নিজেকে মাইর থেকে হেফাজতের জন্য আপনাকে সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে হবে।”

“গণঅভ্যুত্থানের পর ওনার (তারেক রহমান) সঙ্গে আমার একটা মিটিং হয়েছিল। আমি ওনাকে বলেছি- আমাদের যে সুযোগ এসেছে, এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা আপনার কল্যাণকামী, আমরা আপনার বিরোধী নই। উনি চুপ ছিলেন, কোনো কথা বলেননি,” বলেন তিনি।

আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এনসিপি নেতা সারওয়ার তুষার, এসএম শাহরিয়ার, নিজাম উদ্দিন, আবু সাঈদ লিওন, নয়ন আহম্মেদ।