৪৯.২৭% ভোটার নারী, অথচ প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২.৩%: ইসি আনোয়ারুলের আক্ষেপ
“যেখানে ৫০ শতাংশ হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ২ শতাংশ; এটা না হওয়ারই শামিল।”
দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও নারী প্রতিনিধির সংখ্যা যে শতাংশের হারে একেবারেই নগণ্য, সেই বাস্তবতা তুলে ধরে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
তিনি বলেছেন, “দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও নারী প্রতিনিধির সংখ্যা ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ভোটারের সংখ্যাগত দিক থেকে নারীরা বেশ শক্তিশালী। কিন্তু প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এটা নেই বললেই চলে। এটি বাস্তবতা।”
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ন্যাশনাল মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন অন দ্য ডেভেলপমেন্ট অব অ্যা জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন’ শীর্ষক কর্মশালায় এ বিষয়ে কথা বলছিলেন এ নির্বাচন কমিশনার।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে সাতজন নারী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। ৩০০ সাধারণ আসনের হিসাবে তা প্রায় ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কম থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রবণতা এবং রাজনীতিকে ইতিবাচকভাবে না দেখার মানসিকতা এর অন্যতম কারণ।
“মূল সমস্যাটা হচ্ছে—আমরা সামাজিক জীব হিসেবে যত চেষ্টাই করছি না কেন, রাজনীতির বাইরে থাকতে পারছি না; আবার রাজনীতিটাকে ইতিবাচকভাবেও দেখছি না। নিজের সন্তান, বোন, আত্মীয়কে উৎসাহিত করি না—তুমি রাজনীতিতে যাও। বাস্তব দিকটি অপ্রিয় হলেও সত্য।”
রাজনীতির পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সংস্কৃতি ও মানসিকতার কারণে নারী-পুরুষ কাউকেই রাজনীতিতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট উৎসাহ দেওয়া হয় না বলে মনে করেন তিনি।
‘রাজনৈতিক কর্মী বাড়লে প্রার্থীও বাড়বে’
নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে রাজনৈতিক দলের ভেতরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন এই নির্বাচন কমিশনার।
তিনি বলেন, “ইনপুট থেকেই আউটপুট আসে। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নারী যদি সংখ্যায় বেশি থাকেন, তাহলে নারী প্রার্থীও বেশি আসবেন। এটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতিগত কারণে। আজকের মত রাজনৈতিক দলে যদি ৫০ শতাংশ নারী কর্মী থাকতেন, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোও নারীদের ৫০ শতাংশ মনোনয়ন না দিয়ে উপায় ছিল না।
“যেখানে ৫০ শতাংশ হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ২ শতাংশ; এটা না হওয়ারই শামিল।”
পরিবার ও সামাজিক জীবনে নারীদের নিয়ে মানসিকতার পরিবর্তন ধীরে ধীরে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন আনোয়ারুল ইসলাম।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
“প্রথমত, রাজনীতি খারাপ নয় এবং রাজনীতিতে ভালো মানুষের প্রবেশ জরুরি—এই বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলের ভেতরে নারীর অধিকার ও মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে। যত বেশি নারী সম্পৃক্ত হবে, যত বেশি ভয়েস রেইজ হবে—ততই প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।”
‘মা বলে রাজনীতির ধারে কাছেও যেও না’
রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আনোয়ারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সার্কেলের প্রথম গ্রুপ হচ্ছে সাধারণ জনগণ। ১৮ কোটি মানুষের দেশে সবচেয়ে বেশি স্লোগান দেয় যারা ভোটার নয়, যারা আঠারো বছরের নিচে।
“সে (১৮ বছরের নিচের কিশোর) নির্বাচনী প্রচারে বড় ধরনের ইনফ্লুয়েন্স সৃষ্টি করে। কিন্তু এ কিশোর যখন বাড়িতে আসে, তার মা তাকে বলে রাজনীতির ধারে কাছেও যেও না। তারপরও আমাদের এখন ৬০টি রাজনৈতিক দল।”
তবে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বলে মনে করেন এ নির্বাচন কমিশনার।
তিনি বলেন, “নারী রাজনৈতিক কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাজনৈতিক দলে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।”
নির্বাচন কমিশনে নারীর অংশগ্রহণ
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণের চিত্রও তুলে ধরেন আনোয়ারুল ইসলাম।
তিনি জানান, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে ১৮ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা নারী ছিলেন এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন নারী।
“বৈষম্যবিরোধী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল হিসেবে এ অবস্থান তৈরি হয়েছে। এর ফলে ২০২৬-এ ভালো নির্বাচন হয়েছে। তাই আবার যেন বৈষম্যের দিকে ফিরে যাওয়া না হয়,” বলেন এ নির্বাচন কমিশনার।
ইউএন উইমেন ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করে। এতে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পুরনো খবর
