১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ফিরে এসেছি মানুষের জন্য কাজ করতে: সংসদে মির্জা আব্বাস

অসুস্থতা ও বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় ত্রয়োদশ সংসদের গত অধিবেশনগুলোতেও যোগ দিতে পারেননি ঢাকা-৮ আসনের এই সংসদ সদস্য।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Sep 2026, 08:23 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ নিলেও অসুস্থতার কারণে সংসদের কোনো অধিবেশনে যোগ দিতে পারেননি মির্জা আব্বাস। সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসার পর দেশে ফিরে বৃহস্পতিবার প্রথমবার সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।

এ সময় সংসদে তিনি বলেন, “আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে, মানুষের জন্যে এবং বাংলাদেশের জন্যে কাজ করার জন্যে।”

এর আগে বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে হুইলচেয়ারে করে সংসদ কক্ষে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। তাকে স্বাগত জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “মির্জা আব্বাস পাঁচ মাস পর সংসদে যোগ দিয়েছেন।” 

এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিবাদন জানান।

তবে হুইলচেয়ারে থাকায় সামনের সারিতে তার জন্য বরাদ্দ আসনে বসতে পারেননি মির্জা আব্বাস। পাশের ফাঁকা জায়গায় তার হুইলচেয়ার রাখা হয়।

আছরের নামাজের বিরতির পর বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার মধ্যে মির্জা আব্বাসকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এ সময় সামনের সারিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমানের আসনের মাইক্রোফোনে বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস।

শুরুতে রাজনৈতিক সহকর্মীদের ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা হয়ত জানেন, আমি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস বিদেশে চিকিৎসাধীন আছি। ছিলাম বললে ভুল হবে, এখনো আছি। আমি রিহ্যাবে আছি। শুধুমাত্র আপনাদের ভালোবাসা, এই কারণে আমাকে আসতে হয়েছে। আমার চিকিৎসা এখনও শেষ হয় নাই।”

দীর্ঘ সময় পর সংসদে ফিরে আবেগাপ্লুত সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, “আজকের এই দিনটি আমার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন এবং চিরস্মরণীয় একটি দিন। ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পেরিয়ে আজ আবার মহান জাতীয় সংসদের এই পবিত্র কক্ষে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে। এর চেয়ে আনন্দের ও গর্বের মুহূর্ত আর কি হতে পারে?”

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ১৭ ফেব্রুয়ারি অন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শপথ নেন তিনি। ওই দিনই তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার। তবে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগের দিনই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। তবে অসুস্থতা ও বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় এর পরের সংসদ অধিবেশনগুলোতেও যোগ দিতে পারেননি মির্জা আব্বাস। গত ২০ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে ছয় সংসদ সদস্য ভোট দেননি, তাদেরও একজন ছিলেন তিনি।

তবে অসুস্থতার সময় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিয়মিত খোঁজ নেওয়ায় এ দিন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মির্জা আব্বাস।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সিঙ্গাপুরে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন স্মরণ করে তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার, আপনি নিজে সিঙ্গাপুরে গিয়ে আমাকে দেখে এসেছেন। যদিও আমি আপনাকে দেখিনি, আমি তখন অজ্ঞান ছিলাম। আমি পরে জেনেছি। এটি শুধুমাত্র একজন অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা নয়, এটি আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের মানবিক সৌন্দর্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।”

রাজনীতি ও সংসদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, “আজ মহান সংসদে ফিরে এসে আমার মনে হচ্ছে, জাতীয় রাজনীতি শুধু মতপার্থক্য নয়; রাজনীতি মানুষের জন্যে। সংসদ শুধু আমাদের জন্যে নয়, এটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।”

নিজের নির্বাচনী এলাকা ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছার কথা জানান তিনি। মির্জা আব্বাস বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাকে সুস্থতা ও শক্তি দান করেন যাতে আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য অবশিষ্ট সময়টুকু আরও নিষ্ঠা, সততার সাথে রাজনীতি ও জনসেবার কাজ করতে পারি।”

রাজধানীর শাহজাহানপুরে নিজের বাসায় গত ১১ মার্চ ইফতারের সময়ে হঠাৎ জ্ঞান হারালে মির্জা আব্বাসকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিনই সেখানে নিউরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম তার মতিষ্কে অস্ত্রোপচার করে।

এরপর ১৫ মার্চ তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালে। সেখানে টানা একমাসের চিকিৎসায় অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে গত ১৪ এপ্রিল চিকিৎসকদের পরামর্শে ফিজিও থেরাপির জন্য মির্জা আব্বাসকে মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে বুধবার রাতে দেশে ফেরেন মির্জা আব্বাস।

মির্জা আব্বাস এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন বিএনপির এই নেতা।

জিয়া দম্পতির কবর জিয়ারত

সংসদ অধিবেশন শেষে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেছেন মির্জা আব্বাস।

গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে করে তাদের সমাধিস্থলে যান তিনি। পরে নেতাকর্মীদের নিয়ে মির্জা আব্বাস প্রয়াত দুই নেতার কবরে পুস্পস্তবক অর্পন করেন। 

তিনি কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে ফাতেহা পাঠ করেন এবং প্রয়াত দুই নেতার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন।