Published : 13 Aug 2025, 02:03 AM
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সভায় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত না হওয়া ‘পুরুষতান্ত্রিক পশ্চাৎপদ চিন্তার প্রকাশ’ বলে মনে করছে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম।
এ মোর্চার কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শিপ্রা মণ্ডল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ইস্যুতে নারী সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এ রকম পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক।”
বর্তমানে সংসদে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত, যা দলীয় আসন সংখ্যার অনুপাতে নির্ধারিত হয়। সংরক্ষিত আসনের এই সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল নারী অধিকার সংগঠনগুলো।
কিন্তু অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অনাগ্রহের কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিদ্যমান ৫০টি আসন বহাল রেখে তা পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেয়। পাশাপাশি বাকি ৩০০ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের হার ৫ বছর অন্তর ৫ শতাংশ করে বাড়ানোর শর্ত দেয়।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ প্রতিবাদ সমাবেশে বলেন, “একটি দেশ ও জাতি নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও ভূমিকায় এগিয়ে যায়। আমাদের দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবারে নারীর ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য।
“এর বড় কারণ বাংলাদেশে এ যাবৎকালে যারা বা যে-সব দল রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তারা পুঁজিবাদী মানসিকতায় ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত। ফলে শাসকগোষ্ঠী নারীর সমান অধিকার স্বীকার করেনি।”
তিনি বলেন, “নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, জাতীয় সংসদে তার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য নারীর সামনে বাধাগুলোকে দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সংসদে নারী থেকে গেছেন অনেকটা ‘শোপিস’ বা ‘অলংকার’ হিসেবে।
“আমাদের দেশের নির্বাচনে কালো টাকা, পেশীশক্তি একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলো নারীদেরকে সরাসরি নির্বাচনে নমিনেশন দিতে চায় না। নারী নির্যাতন, সহিংসতা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে।”
ফিরোজ বলেন, “এমন একটি পরিস্থিতিতে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করতে পারত। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংরক্ষিত নারী আসনে পূর্বের ন্যায় ক্ষমতাসীন দলের দয়া দাক্ষিণ্য দ্বারা নারী সাংসদদের মনোনয়নের পদ্ধতিই বহাল রাখল।
“এই ক্ষেত্রে নারী এমপিদের কোনো নির্বাচনী এলাকা থাকবে না। ফলে নারীদের জনগণের মধ্য থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উঠে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।”
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, “ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ ও সাহসী বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘নতুন বন্দোবস্ত’র কথা বলে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দিয়ে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বকে ‘শোপিস’ করে রাখার সেই পুরোনো পদ্ধতি বহাল রেখে নারীদের প্রতি চরম অবিচার ও অপমান করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “অবিলম্বে পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত বাতিল করে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ১০০ তে উন্নীত করে সরাসরি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানাই। রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতি নির্ধারণে নারীর ন্যায্য হিস্যা ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।”
শম্পা বসু বলেন, নারী সংগঠন এবং নারী অধিকার কর্মীদের যুক্ত করে পুনরায় বৈঠক এবং প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
“সেইসঙ্গে কমিশনের অগণতান্ত্রিক পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ এবং সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি, সরাসরি নির্বাচনসহ নারীর সমানাধিকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক নারী পুরুষের প্রতি আহ্বান জানাই।”
অন্যদের মধ্যে সংগঠনের সদস্য ইসরাত জাহান লিপি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগরের সাধারণ সম্পাদক রুখশানা আফরোজ আশা।