সরিষায় ভূত থাকলে তাড়াবে কে: ফখরুল

বিশ্ব বাজারের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “সহনীয় পর্যায় কিছু হতে পারত। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 August 2022, 01:10 PM
Updated : 17 August 2022, 01:10 PM

সরকারের ‘চালিকাশক্তি’ দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী চক্রের কারণেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশ্ন রেখেছেন, সরিষায় ভূত থাকলে তাড়াবে কে?

বুধবার দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ভোগ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে ‘থাকতে পারত’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের কিছু সুবিধাভোগী দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী চক্রের হাতে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা জিম্মি হয়ে আছে।

“মূল্য বৃদ্ধির এই দুর্নীতিবাজ চক্রের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সরকারের চালিকা শক্তিরাই। সরিষায় ভূত থাকলে ভূত তাড়াবে কে? রক্ষক যখন ভক্ষক হয় তখণ যা হবার তাই হচ্ছে বাংলাদেশে।”

বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, “এখানকার যে মূল্যস্ফীতি, এখানে যে অর্থনৈতিক দূরাবস্থা এর সবকিছুর মূলে হচ্ছে সরকারের দুর্নীতি। এই দুর্নীতির কারণেই দ্রব্যমূল্য বাড়ছে।

“তাদের দুর্নীতির কারণেই আজকে সারাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার দাপটে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও হতদরিদ্ররা পিষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত।”

নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে দুর্নীতির পাশাপাশি অব্যস্থাপনাকে দায়ী করে তিনি বলেন, “সরকারের দুর্নীতি, টোটাল ফেইলিউর, অব্যবস্থাপনার কারণে আজকে এই অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “যেখানে সরকারের বিনিয়োগ করার প্রয়োজন নেই সরকার সেখানে টাকা দিচ্ছে। ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতু ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপরে নিয়ে গেল।

“কিছুদিন আগে দেখেছে যে, এয়ারপোর্টের রাস্তার সমস্যা- এখানে প্রতি কিলোমিটারে ২৩০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ কি অবস্থা? ১০ বছরে এখন পর্যন্ত এই অবস্থায়ই পড়ে আছে। অর্থাৎ এসবের মূল কারণটাই হচ্ছে দুর্নীতি।

“জ্বালানিতে দেখেছেন, তেলের বেলায় কি দুর্নীতি করেছে, বিপিসি একইভাবে দুর্নীতি করেছে, বিদ্যুতের বেলা দেখেছেন, তারা হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। সেই কারণে আজকে এই দুর্নীতি হচ্ছে।”

বিশ্ব বাজারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সহনীয় পর্যায় কিছু হতে পারত। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭৪ সালে তারা এভাবে দুর্নীতি করেছে, আজকেও একইভাবে তারা দুর্নীতি করছে।”

অবস্থার পরিবর্তনে আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “এই দুর্নীতিবাজ সরকারের জনগণের কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা জনগণের কল্যাণের তোয়াক্কা না করে নিদারুণভাবে নিষ্ঠুর ও নির্দয় হয়ে পড়েছে।

“আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে গণআন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারকে বিদায় করি।”

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ‍এবং মূল্যস্ফীতির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “সরকারি হিসাবেই গত জুন মাসের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ যা গত ৯ বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড।

“বর্তমানে মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও অনেক কমে গেছে। নিত্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ নানাভাবে ব্যয় কমিয়ে টিকিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন।

“নিজের আয় দিয়ে আর চলতে না পারায় স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে অনেকেই ফ্যামিলি বাসা ছেড়ে উঠেছেন মেসে। মানুষ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রীতিমত হিমশি খাচ্ছে।”

মির্জা ফখরুল জানান, একটি পরিবারে যা যা কিনতে হয়, তার প্রায় সব কিছুরই দাম আরেক দফা বেড়েছে। এই তালিকায় চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা আছে, তেমনি রয়েছে সবজি, ডিম, মুরগির দাম। পিছিয়ে নেই মাছ ব্যবসায়ীরাও।

“এই মূল্য বৃদ্ধি সেসব সীমিত আয়ের মানুষের ওপরে সরাসরি আঘাত, যারা ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিতে নাকাল।”

এসময় জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য আরেক দফা বাড়াতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর ইঙ্গিত এবং ওয়াসার পানির দাম আবারও বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব।

“মানুষ যখন চরম দুরাবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছে তখন সরকারের মন্ত্রীদের আবোল-তাবোল বক্তব্য কাটা ঘা’য় নুনের ছিটার মতোই মনে হয়। মানুষের দূরাবস্থা নিয়ে মন্ত্রীরা তামাশা করছেন।”

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের উল্লেখ করে তিনি জানান, অভাবের তাড়নায় এক মা তার প্রাণপ্রিয় সন্তানকে বিক্রি করতে খাগড়াছড়ির এক হাটে তুলেছেন। ছয় বছরের সন্তানের বিনিময়ে তিনি ১২ হাজার টাকা দাম চেয়েছেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, “কি নিদারুণ অভাব আর কষ্টে থাকলে একজন মা সন্তানকে বাজারে বিক্রির জন্য আনতে পারে, তাতেই স্পষ্ট বাংলাদেশ নামক ‘বেহেশতের’ বর্তমান হাল চিত্র। দেশের মানুষ এই দুঃশাসন থেকে মুক্তি চায়।

“লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থপাচার আর অপশাসন দেশটাকে সত্যিকার অর্থে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।”

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আমরা বলেছি যে, যে কোনো দলের যে কোনো ন্যায়সঙ্গত দাবির আন্দোলনে আমরা সমর্থন করি সব সময়।”

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বাম দলীয় জোট আগামী ২৫ মার্চ সারাদেশে আধাবেলা হরতাল ডেকেছে।

‘বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপরে নির্যাতন করা হবে না, আন্দোলন দমন করা হবে না’-প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, “আমরা কখনই ওনার কোনো কথায় বিশ্বাস করি না। এটা একটা কারণে যে, তারা যা বলে তা করে না। আমরা বলেছি যে, তাদের সমস্ত কথা-বার্তায় সমস্ত প্রতারকের ভুমিকা পালন করে ওরা।”

সংবাদ সম্মেলনে দুটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আয়না ঘরে বন্দি বলেন, নেত্র নিউজের প্রতিবেদন বলেন-এসব কথাগুলো আমরা বহু আগে থেকে বলছি।

“এই যে গুম করে নিয়ে যায়, তারপরে অনেককে গুম করে রাখে, অনেককে মেরে ফেলে, তারপরে অনেককে ছেড়ে দেয়, তারপরে তারা ভয়ে কোনো কথা বলে না-এই বিষয়গুলো আমরা বহুবার বলেছি আপনাদেরকে।”

মির্জা ফখরুল বলেন “আজকে নেত্র নিউজে প্রতিবেদনটা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে, এখন আমরা সবাই জানতে পারছি যে ধরনের ঘটনা একটা ঘটেছে।

“সেখানে নিঃসন্দেহে এভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে, ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষকে হত্যা করে, গুম করেই তো একটা ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টাটাই তারা করছে।”

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ছিলেন বিএনপি মিডিয়া সেলের শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, শায়রুল কবির খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রিয়াজ উদ্দিন নসু, আমিরুজ্জামান শিমুল, চেয়ারপারসন কার্যালয়ের এবিএম আবদুস সাত্তার ও শামসুদ্দিন দিদার।

আরও পড়ুন:

Also Read: তেল-সারের মূল্যবৃদ্ধি: ২৫ অগাস্ট বামদের আধা বেলা হরতাল

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক