Published : 14 Aug 2026, 11:36 AM
ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ ছেড়ে দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, এটা একরকম নিশ্চিত।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সরকারেও পদ শূন্য হবে। একই সঙ্গে তার নির্বাচনি আসনও শূন্য ঘোষণা করা হবে।
দল ও সরকারের শূন্য পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে যেমন আলোচনা আছে, তেমনি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনাও সামনে আসছে।
মির্জা ফখরুল বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এ পদে কে আসবেন, সে জল্পনা চলছে।
এছাড়া তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় রদবদলের যে আভাস মিলছে, তাতে অন্তত ছয়-সাতটি পদে পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়তে পারেন।
পাশাপাশি একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ক্ষেত্রে দায়িত্ব কমিয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন কাউকে যুক্ত করতে পারেন তার মন্ত্রিসভায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও মন্ত্রিসভার ছয়জন সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তাদের প্রত্যেকেই বলেছেন, মন্ত্রিসভায় রদবদলের বিষয়টি স্বাভাবিক।
কেউ কেউ বলছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে পদ যেটি শূন্য হবে, শুধু সেটিই পূরণ করা হবে।
গেল ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে তফসিল দিয়েছে, সেখানে ২০ অগাস্ট ভোটগ্রহণের দিন রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। সে বৈঠকেই তিনি দলের মহাসচিব ও স্থানীয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর দুপুরে নির্বাচন কমিশনে তার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।
মির্জা ফখরুল হতে যাচ্ছেন দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি।
শূন্য পদে কারা আসছেন?
ভারপ্রাপ্ত ও নির্বাচিত মহাসচিব হিসেবে টানা প্রায় দেড় দশক দায়িত্ব সামলেছেন মির্জা ফখরুল।
বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার পর ২০১৮ সাল থেকে দলের হাল ধরেন তিনি। তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকলেও দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সামনে থেকে দলের আন্দোলন পরিচালনা করেছেন মির্জা ফখরুল।
শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের মধ্যে দলকে দিশা দেখানো মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করায় মহাসচিব পদে কে আসছেন, সে আলোচনা চলছে।
ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে বিএনপির বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামই আলোচনায় আসছে বেশি, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পোড়খাওয়া নেতা।
দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দিয়েই চলবে বিএনপি। কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব পদে বসবেন কোনো নেতা।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে আলোচনায় যে নামটি বেশি আসছে, তিনি দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
বর্তমানে সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভার সামলাচ্ছেন। তাকে স্থানীয় সরকারে পাঠালে এ দায়িত্ব কে নেবেন?
দলের ভেতর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানিকে নিয়ে আলোচনা আছে। সাবেক এই ছাত্রদলনেতা এখন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।
কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফাঁসির দণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর পেতে পারেন এই দায়িত্ব।
বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মন্ত্রণালয়ে রদবদল সরকারের একটি স্বাভাবিক কার্যক্রম। এ নিয়ে মন্তব্যের সুযোগ নাই।”
এ বিষয়ে বুধবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি হিসেবে যিনি আসবেন, তিনি যদি পূর্ব কোনো পদে থাকেন, তাহলে তো পদত্যাগ করবেন। সেখানে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।”
সরকারে নতুন মুখ দেখা যাবে?
আওয়ামী লীগ সরকার টানা চার মেয়াদে প্রায় দুই দশক ক্ষমতায় ছিল; শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এ সরকারের পতন ঘটে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।
তারপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছর পেরিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরে।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন সরকার।
সেই সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে ১৭ অগাস্ট। এ সময়ের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভায় রদবদল আনা হতে পারে।
সরকারের দুজন মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এমন আভাস পেয়েছে।
অন্তত দুটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়তে পারেন; একই সঙ্গে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে মন্ত্রিসভায়, এমন ধারণা দিয়েছেন তারা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার মতে, এত দ্রুত সময়ে (ছয় মাসে) মূল্যায়ন করে কাউকে বাদ দেওয়ার কোনো মনোভাব এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দেখা যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে পুনর্গঠন হতে পারে, এটা বোঝা যাচ্ছে।
এর আগে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় রদবদল হয়নি, তবে পদত্যাগ করেছেন দীপেন দেওয়ান। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। সে মন্ত্রণালয়ের ভার সামলাচ্ছেন প্রতিন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বর্তমানে তার সরকারে আছেন ২৪ জন মন্ত্রী, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টা।
তাদের মধ্যে কোনো-কোনো মন্ত্রীর দপ্তর যেমন পরিবর্তন হতে পারে, তেমনি কোনো মন্ত্রী বাদও পড়তে পারেন।
দুদিন আগে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সরকারের কার্যক্রম সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, কর্মকাণ্ড ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে চলমান এই পর্যালোচনা শেষে জাতির সামনে সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের একজন মন্ত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, অন্তত সাত-আটটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম মন্থর। এসব মন্ত্রণালয়ে রদবদল আসতে পারে। যাদের হাতে দুই বা তিনটি করে মন্ত্রণালয় আছে, তাদের কারো-কারো দায়িত্ব কমতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন কাউকে দেখা যেতে পারে।
ওই মন্ত্রী বলেন, এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও কয়েকজন মন্ত্রীকে ডেকে নিজের হতাশার কথা প্রকাশ করেছেন। কোনো-কোনো মন্ত্রীকে লক্ষ্য পূরণের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছেন। এছাড়া মন্ত্রীদের আরো কয়েকজনের দপ্তর নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, কোনো কোনো সদস্য নিজের মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি জানিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অবহিত করেছেন।
এসব বিবেচনায় মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের বিষয়টি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন ওই নেতা।
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যে। ইতোমধ্যে মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী সবার সঙ্গে কথা বলছেন। রদবদল আসতে পারে, তবে এটা ছয় মাসেও হতে পারে, আবার এক বছরেও হতে পারে।
সেদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছেন।
একাধিক মন্ত্রী বলছেন, রদবদল নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তারা বলছেন, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে কেউ-কেউ পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যা আলোচনা চলছে মিডিয়াতে, কে পূর্ণ হবেন, কে আসবেন, যাবেন; এসব নিয়ে কোনো কিছু বলতে পারছি না।”
মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ দেখা যেতে পারে, এমন আলোচনায়ও আছে। এ ক্ষেত্রে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির শরিক দলগুলোর নেতাদের কারো-কারো নামও আসছে।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর ও গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি সরকারের আছেন।
আরেক শরিক জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন ববি হাজ্জাজ।
এখন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সরকারে যুক্ত হতে পারেন, এমন আলোচনা আছে। তারা দুই জনই নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন।
যদিও এ দুই নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা সরকারে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে কোনো আভাস-ইঙ্গিত পাননি।
বুধবার রাতে মাহমুদুর রহমান মান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলোচনা এখন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, সেটা নিয়ে। মন্ত্রিসভায় এখনই রদবদলের কোনো তথ্য তো পাইনি। আর আমার কথা তো মিডিয়াতেই শুনছি।”
সাইফুল হক বলেছেন, “গুঞ্জন নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।”