১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি চাই না: আখতার

অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির অংশ হিসেবে আয়োজিত সমাবেশে এনসিপির ২৪ দফা ইশতিহার ঘোষণা করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি চাই না: আখতার
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রোববার জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশ বক্তব্য রাখেন দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Aug 2025, 12:42 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:30 PM

নতুন বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনোভাবে আর বিভাজনের রাজনীতি মেনে নেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন।

রোববার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতিহার’ ঘোষণার সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।

এক বছর আগে এই দিনে ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ কর্মসূচি দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল এই শহীদ মিনার থেকে।

ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ওই ঘোষণা দেন। তখন আখতার ছিলেন কারাগারে। 

সেই ঘোষণার বর্ষপূর্তিতে এদিন শহীদ মিনারে সমবেত হন তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতাকর্মীরা।

সমাবেশে ২৪ দফা ইশতিহার ঘোষণা করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ।

এর আগে তিনি বলেন, “এক বছর আগে জনগণকে সাথে নিয়ে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের ঐতিহাসিক এক দফার ঘোষণা দিয়েছিলাম এই শহীদ মিনার থেকে। এই এক দফা কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সংগঠনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়নি। সেই দিন এক দফা ঘোষণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে। ফলে এক দফার প্রকৃত ঘোষক বাংলাদেশের জনগণ।” 

তার অভিযোগ, “বিগত ১/১১ এর সময় থেকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল। ১৬ বছর বাংলাদেশে কোনো গণতন্ত্র ছিল না, ভোটাধিকার ছিল না। গুম-খুন, নির্যাতন, মানবাধিকার হরণ হয়েছে। সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফ্যাসিস্ট পুলিশ বাহিনী নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে আমাদের ভাই-বোনদের হত্যা করেছিল। ফলে বাংলাদেশের জনগণ দায়িত্ব নিয়েছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন বন্দোবস্তের।”

বিগত এক বছরে নিজেদের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদী সরকার বিদায় নিয়েছে, কিন্তু পুরনো বন্দোবস্তের বিলোপ ঘটাতে পারিনি। এক বছর পরে এসে আমরা আমাদের সেই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করছি।

”আমরা পুরনো সংবিধান বাতিল করে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে পারি নাই। দুর্নীতি পরায়ন লুটেরা অর্থনীতিকে ভেঙে দিতে পারি নাই। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সাংস্কৃতির ভিত্তি, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় স্বৈরাচারের দোসরদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে পারি নাই। সেনাবাহিনীসহ প্রশাসনকে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারি নাই।”

তার আগে দেওয়া বক্তব্যে দলের সদস্য সচিব আখতার রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক সংস্কারের জন্য এনসিপি কাজ করছে তুলে ধরে বলেন, “হিন্দু, বৌদ্ধ, বিহারী, চাকমা, মুসলিম, খ্রিস্টান কারও মধ্যে কোনো বিভাজনের রাজনীতি চাই না।

“বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে নতুন করে গড়ার জন্য গত বছর এই শহীদ মিনার থেকে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন আমাদের আহ্বায়ক। এনসিপি রাষ্ট্র কাঠামোতে মৌলিক সংস্কারের কথা বলেছে। আমরা এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা চাই, যেখানে প্রধানমন্ত্রী থেকে মেম্বার পর্যন্ত প্রতিটি জনপ্রতিনিধিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।

”বিগত সময়ে এক দলীয় কর্তৃত্ব দেখে সামনে আমরা আর তা দেখতে চাই না। মৌলিক সংষ্কারের প্রয়োজনেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। বিচার বিভাগকে কোনো দলের কর্তৃত্বের মধ্যে যেতে দেব না।”

জুলাই ঘোষণাপত্রকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে আবারও আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জুলাই সনদকেও আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার করে জুলাই সনদকে কার্যকর করতে হবে। জুলাই সনদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র যাতে বাস্তবায়ন হয়, সেজন্য প্রতিটি জনগণকে পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।”

জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্খা এখন পূরণ হয়নি তুলে ধরে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “দুই হাজারেরও বেশি শহীদের বিনিময়ে আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। আমরা সব মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।” 

সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্ত শারমিন বলেন, ”আওয়ামী লীগ শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত করতে হবে।”

মুখ্য সমন্বয়ক নাছির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, “ন্যায্যতা ও অধিকারের প্রশ্নে আপোষহীন বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে হাজির হতে চায়। বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষ ও দেশের সাথে বাংলাদেশের ঐক্য হবে।” 

মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, “শাপলা চত্বরে যাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে তাদের খুনের বিচার চাইতে আমরা এখানে হাজির হয়েছি। এই দেশে যেমন ইসলাম বিদ্বেষের জায়গা হবে না তেমন কোনো জঙ্গিবাদও হবে না। আবার জঙ্গিবাদের নামে কোনো নাটকও করতে দেবে না।”

আরেক মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “কেউ যদি ভয় দেখায়, কেউ যদি হুমকি দেয় আপনারা পিছু হটবেন না। এলাকায় এনসিপির কর্মীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা এসবকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবো।”

জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, “এক বছরে আমরা কী পেয়েছি। না পেয়েছি সঠিক স্বাধীনতা, না পেয়েছি ন্যায় বিচার, না পেয়েছি মানবিক অধিকার। 

”আজ আমরা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে। গুম হয়ে যাওয়া সহস্র মানুষের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। এই দেশের সব শ্রেণির মানুষের অধিকার ও মানবিক মর্যাদার জন্য এনসিপি লড়ে যাবে।” 

সমাবেশে এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা, নাহিদা সারওয়ার নিভা, নিজাম উদ্দিনসহ অন্যান্যরা বক্তব্য রাখেন।

‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’: এনসিপির রাজনৈতিক রূপকল্প ঘোষণা