১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আলোর পথযাত্রী শেখর রঞ্জন সাহা: জ্ঞানের বেলাভূমিতে এক নিরলস পরিব্রাজক

শৈশবে পোলিও আক্রান্ত হয়ে দুই পায়ের শক্তি হারিয়েছিলেন, কিন্তু মেধার জোরে কোনো পরীক্ষায় কখনো দ্বিতীয় হননি। জীবনের মানে খুঁজেছিলেন বিজ্ঞানের পাতায়, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায়।

আলোর পথযাত্রী শেখর রঞ্জন সাহা: জ্ঞানের বেলাভূমিতে এক নিরলস পরিব্রাজক
শেখর রঞ্জন সাহা–জ্ঞানের বেলাভূমিতে আজীবন নুড়ি কুড়িয়ে চলা এক নিরলস পথিক; যিনি আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও তার ছড়িয়ে দেওয়া মানবিক আলো রয়ে গেছে উত্তর প্রজন্মের মাঝে।

নবনীতা তপু নবনীতা তপু

Published : 01 Jun 2026, 06:41 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:19 PM

“আমি ইহলোক ও পরলোক (যদি থাকে) কোনো কিছুর প্রত্যাশী নই। যখন সময় হবে চলে যাব। তবে যাওয়ার আগে এই অপরূপা পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ যতটা পারি উপভোগ করে যেতে চাই। জ্ঞানের বেলাভূমিতে যতটা পারি নুড়ি কুড়িয়ে যাব। আমি বিশ্বাস করি প্রসারণই জীবন, সংকোচনই মৃত্যু।” (‘উজান গাঙের নাইয়া’, শেখর রঞ্জন সাহা, পৃষ্ঠা-১০)

শেখর রঞ্জন সাহা। একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী, একজন শিক্ষক, একজন অধ্যাপক, একজন অভিভাবক এবং একজন আজন্ম বিজ্ঞানপিপাসু মানুষ। শ্রদ্ধাঞ্জলির শুরুতেই উল্লেখিত লাইন কয়টি তার জীবনস্মৃতি-নির্ভর রচনা ‘উজান গাঙের নাইয়া’ গ্রন্থের ‘নিজের কথা’ অংশ থেকে নেওয়া। এই কয়েকটি বাক্যেই যেন আপাদমস্তক চেনা যায় অধ্যাপক শেখর রঞ্জন সাহাকে। এসব বাক্যকে ঘিরেই আবর্তিত তার সমগ্র জীবনদর্শন। পৃথিবীকে জানার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা, জ্ঞানের প্রতি সীমাহীন অনুরাগ, জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধির তৃষ্ণা এবং মানবিক বোধের এক অসাধারণ সমন্বয় ছিল তার মধ্যে। তিনি ছিলেন শিক্ষক, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানলেখক, সাহিত্যিক, চিন্তক এবং সর্বোপরি একজন জ্ঞানসাধক। কিন্তু এসব পরিচয়েরও ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন নিরলস পরিব্রাজক—বিজ্ঞানের, মানবতার এবং জ্ঞানের অভিযাত্রী।

প্রত্যন্ত গ্রামে যার বেড়ে ওঠা

১৯৪৩ সালে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার একটি দুর্গমার ভাটি এলাকা মহারাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শেখর রঞ্জন সাহা। ছয় বোন ও তিন ভাইয়ের পরিবারে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘উজান গাঙের নাইয়া’তে মৃদু গর্বিত ভঙ্গিতেই তিনি জানান দিয়ে গেছেন তার জন্মসালের কথা—“আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়েছে ১৯৪২ সালে, অর্থাৎ আমার জন্মের এক বছর আগে।”

গ্রামীণ নদী-বিল-খালঘেরা প্রকৃতির মধ্যে তার শৈশব কেটেছে। মধুমতী নদী আর কুমার নদ, বর্ষার জলমগ্ন জনপদ—এ ভূগোল শুধু তার শৈশবকেই সমৃদ্ধ করেনি, তার কল্পনাশক্তিকেও করেছিল প্রসারিত। খুব অল্প বয়সেই পোলিও আক্রান্ত হয়ে দুই পায়ের স্বাভাবিক শক্তি হারান তিনি। চিকিৎসকদের পরামর্শে দুটি সমান্তরাল দড়ি ধরে ধরে তিনি নতুন করে হাঁটা শিখেছিলেন। তবে আমৃত্যু বয়ে চলা শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার জীবনকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি; বরং এই সংগ্রামই তার চরিত্রকে দৃঢ়, অধ্যবসায়ী এবং আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করেছিল।

শৈশবে তিনি ছিলেন কৌতূহলী আর পড়াশোনায় ভীষণ অমনোযোগী এক ও দুরন্ত কিশোর। নদীতে সাঁতার, নৌকাভ্রমণ, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা—এসবই ছিল তার জগৎ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ও দুরন্ত কিশোরই হয়ে ওঠেন এক অসাধারণ মেধাবী ছাত্র।

শিক্ষাজীবনের বিস্ময়কর উত্থান

পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বারবার। গোপালগঞ্জের এক খ্রিস্টান দিদিমণির কাছে হাতেখড়ির পর, পিতার আর্থিক অপারগতায় সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত একাধিকবার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শেষপর্যন্ত ছোটকাকিমার স্নেহধন্য হয়ে তার ঐকান্তিক চেষ্টায় যশোরের ঐতিহ্যবাহী সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ১৯৫৬ সালে। অমনোযোগী, দুরন্ত খোকন (শেখর রঞ্জন সাহার ডাকনাম) হঠাৎ করেই হয়ে ওঠেন মনোযোগী ও পড়ুয়া। এরপর থেকে স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়—কোনো পরীক্ষাতেই তিনি দ্বিতীয় হননি।

শেখর রঞ্জন সাহা।

শেখর রঞ্জন সাহা।

যশোরের মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে বিএসসি সম্পন্ন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। সেখানেও তিনি তার অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৯ সালে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৭০ সালে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।

পরিবারকে দরিদ্র অবস্থা থেকে মুক্ত করতে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকতা করতেন ভাঙ্গা মাল্টিল্যাটারাল হাইস্কুলে (বর্তমান ভাঙ্গা পাইলট স্কুল)। এমএসসিতে তার অভাবনীয় সাফল্যে গর্বিত হয়ে ভাঙ্গা মাল্টিল্যাটারাল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ফল প্রকাশের পর স্কুলে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিলেন—এ ঘটনা তার মেধার সামাজিক স্বীকৃতির এক অনন্য স্মারক।

শিক্ষকতা জীবন: জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবার ব্রত

১৯৭০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। মুক্তিসংগ্রাম তখন সমাগত প্রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়ে দেশত্যাগ করেছেন পরিবারসহ। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নয় মাস শারীরিক অক্ষমতার কারণে সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দিতে না পারলেও পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করেছেন কলকাতার বুকে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের অব্যবহিত পরেই খোদ কলকাতার বুকে শিক্ষকতা করার সুযোগ গ্রহণ না করে, স্বাধীন দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এসে শিক্ষকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

নোয়াখালী সরকারি কলেজে স্বল্পমেয়াদে দায়িত্ব পালন ছাড়া তার শিক্ষকতা জীবনের সবটুকুই কেটেছে কুমিল্লায়। ভিক্টোরিয়া কলেজের পর ১৯৮১ সালে পদোন্নতি পেয়ে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে যোগদান করেন। সেখানেই বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক এবং পরবর্তীকালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

শিক্ষকতার এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি গড়ে তুলেছেন অগণিত বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার্থী, যারা আজ দেশে-বিদেশে কেউবা স্বনামখ্যাত ডাক্তার, কেউবা প্রকৌশলী, কেউ বিজ্ঞানী, গবেষক বা খ্যাতিমান লেখক।

তার ক্লাস ছিল তথ্যের চেয়ে বেশি অনুপ্রেরণার। তিনি শুধু পাঠদান করতেন না; শেখাতেন কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে বিজ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। শিক্ষাসফরে গিয়ে শত শত উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম অনর্গল বলে যেতে পারতেন; শিক্ষার্থীরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শুনত।

বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সাধনা

শেখর রঞ্জন সাহার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই। তিনি বুঝেছিলেন, বিজ্ঞান যদি সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে তা কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যেই আটকে থেকে যাবে। মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক না হলে সমাজ বদলাবে না, সভ্যতা এগোবে না।

শেখর রঞ্জন সাহার কয়েকটি প্রকাশনা।

শেখর রঞ্জন সাহার কয়েকটি প্রকাশনা।

তাই তিনি বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায়, গল্পের ভঙ্গিতে, কৌতূহল জাগানো উপস্থাপনায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তার রচিত ‘উচ্চতর ব্যবহারিক উদ্ভিদবিজ্ঞান,’ ‘উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা ও প্রাণরসায়ন’, ‘সরল ব্যবহারিক জীববিজ্ঞান’, ‘জীববিজ্ঞান অভিধান’ ও ‘উদ্ভিদবিজ্ঞান অভিধান’ প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য সহচর হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক রচনায় তার অবদান অনন্য। বিশেষত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য লেখা তার বইগুলো শুধু পাঠ্য নয়, গবেষণারও সহায়ক হয়ে উঠেছিল।

বিজ্ঞানলেখক থেকে সাহিত্যিক

তার জিজ্ঞাসার পরিধি কখনো একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল—তা কিন্তু নয়। বিজ্ঞান ছিল তার কেন্দ্র, আর তার চারপাশে আবর্তিত ছিল সাহিত্য, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, দর্শন, সমাজ ও সংস্কৃতির বিশাল পরিসর। তিনি লিখেছেন ‘জিন ও জৈবপ্রযুক্তির গল্প’, ‘বিবর্তনের গল্প’, ‘জীবনের গল্প’, ‘জীববিজ্ঞানের পাঁচ মহানায়ক’, ‘প্রকৃতি ও পরিবেশ’ বিষয়ক গ্রন্থ, বিজ্ঞানীদের জীবনী, মহাকাশ, ডাইনোসর, এলিয়েন, ভূত, বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি, শিশুতোষ রচনা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প।

‘বিবর্তনের গল্প’ বইটিতে বিবর্তনের মতো জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাকে তিনি এমন সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন যে তরুণ পাঠকের কাছেও বিষয়টি বোধগম্য হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করতেন, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিজ্ঞানমনস্কতা। প্রথমা, গ্রন্থকুটির ও বাতিঘর থেকে প্রকাশিত গ্রন্থগুলো তাকে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে পরিচিত করে তুলেছে দারুণভাবে।

তার আত্মজীবনী ‘উজান গাঙের নাইয়া’ শুধু একজন মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প নয়; এটি গ্রামীণ বাংলার সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধকালীন শরণার্থী জীবনের এক অনবদ্য দলিল। নদী, গ্রাম, পারিবারিক সংগ্রাম, পোলিও আক্রান্ত এক শিশুর উঠে দাঁড়ানোর গল্প, মুক্তিযুদ্ধের যাতনা এবং একজন শিক্ষকের আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস এতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

‘ফিরে দেখা’ গ্রন্থে তিনি সাহিত্যকে নতুন চোখে দেখার চেষ্টা করেছেন। শেক্সপিয়ার, জসীমউদ্‌দীনসহ বিভিন্ন সাহিত্যিক ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তার বিশ্লেষণ পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। তার বইগুলোর বৈশিষ্ট্যই মূলত সহজ ভাষা ও গভীর পাঠ, যা বিস্তৃত জ্ঞানের ভিত্তিস্বরূপ এবং পাঠকের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ আন্তরিক সংলাপ।

মানবতাবাদী শেখর রঞ্জন সাহা

“যে ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে, একত্রে বসে খেতে পর্যন্ত দেয় না, তেমন ধর্ম আমি পালন করি না।” এই বিশ্বাসই ছিল তার জীবনদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি নিজেকে কখনো কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করেননি। মানুষই ছিল তার কাছে সর্বোচ্চ পরিচয়। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানবিক পরিচয়কে তিনি বড় করে দেখতেন। মানুষ, যুক্তি এবং মানবকল্যাণ ছিল তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।

বই ছিল তার আজীবনের প্রেম

বই ছিল তার আজীবনের প্রেম। তার ঘর ছিল বইয়ের ঘর। বই কেনা, বই পড়া, বই উপহার দেওয়া—এসব ছিল তার নেশা। একুশে বইমেলায় নতুন বই প্রকাশের অপেক্ষায় তিনি থাকতেন শিশুর মতো বুকভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে। জীবনের শেষ সময়েও তিনি ই-বুক পড়তেন, নতুন বিষয় জানতেন, নতুন বইয়ের পরিকল্পনা করতেন। সহধর্মিণী গৌরী দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন বই পড়ে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন, ভেবেছেন, শিখেছেন। নিজের জ্ঞানপিপাসাকে কখনো নিবৃত্ত করেননি।

আমাদের অভিভাবক

শেখর রঞ্জন সাহা—আমার মামা। ব্যক্তিগতভাবে আমরা সব ভাইবোন তার স্নেহের পরশে ধন্য। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে সবসময় তার সান্নিধ্যে থাকতে পারিনি, কিন্তু তিনি কখনো আমাদের থেকে দূরে ছিলেন না। আমাদের উচ্চশিক্ষা, পেশাগত জীবন, লেখালেখি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুর খোঁজ রাখতেন আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে। সুযোগ পেলেই জানতে চাইতেন আমরা কে কী পড়ছি, কী লিখছি, কী ভাবছি, সামনে কী করতে চাই। শুধু উৎসাহই দিতেন না, নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোয় পথও দেখানোর চেষ্টা করতেন।

আমার জীবনের অপূর্ণতা, সংগ্রাম কিংবা হতাশার জায়গাগুলো তিনি জানতেন। অনেক সময় মনে হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তার আক্ষেপ আমার নিজের পরিবারের অনেকের চেয়েও বেশি ছিল। হয়তো সে কারণেই আমার প্রতি তার প্রত্যাশাও ছিল বেশি। আমার যেকোনো ছোট অর্জনেও তিনি আনন্দ পেতেন, আর ব্যর্থতায় সাহস জোগাতেন।

অসুস্থতার শেষ দিনগুলোতেও তার সেই স্নেহময় দৃষ্টি অপরিবর্তিত ছিল। গ্রিন লাইফ হাসপাতালে অসুস্থ এই মানুষটিকে দেখতে যাওয়ার আগে তাই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার এমফিলের সার্টিফিকেট। তা দেখে চরম অসুস্থতার মধ্যেও অপার্থিব একটু হাসি দেখলাম তার ঠোঁটের কোণে। কথা ছিল সুস্থ হয়ে আমার ছোট বোন শ্রাবণীর গান শুনবেন। আমার সঙ্গে তার শেষ কথাও ছিল—সুস্থ হয়ে কুমিল্লায় আমার গানের আসর বসাবেন। মামাকে শেষ গান আর শোনানো হয়নি। শ্রাবণী চেষ্টা করেছে গানের মধ্য দিয়ে তাকে বিদায় দিতে। সময় মতো পৌঁছাতে না পারায় সে যাত্রায় শরিক হতে পারিনি আমি। এ আক্ষেপ বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন। আজ তাই এই লেখার মধ্য দিয়ে মামাকে প্রিয় গানখানিই নিবেদন করলাম। যে গান শুনে মামা বলতেন, “শুধু একটি গানেই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বজগতের বিজ্ঞানকে আমাদের সামনে কীভাবে উন্মোচিত করেছেন দেখো তো–”

“আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ,

তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান—

বিস্ময়ে তাই জাগে জাগে আমার গান।”

সমুখে শান্তি পারাপার

আমৃত্যু অনুসন্ধিৎসু এই মানুষটি গেল ১২ মে নশ্বর দেহ ত্যাগ করে চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু মৃত্যু তাকে আমাদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— “মৃত্যু আলোকে নেভায় না, কেবল প্রদীপটিকে নিভিয়ে দেয়।”

শেখর রঞ্জন সাহার জীবন এই সত্যেরই উজ্জ্বল সাক্ষ্য। তিনি আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তার আলো রয়ে গেছে। তার বইয়ে, তার ছাত্রদের স্মৃতিতে, তার সহকর্মীদের শ্রদ্ধায়, তার পরিবারে, তার অনুপ্রাণিত পাঠকদের চিন্তাজগতে এবং তার ছড়িয়ে দেওয়া মানবিক মূল্যবোধে।

তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, যিনি জ্ঞান দিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী, যিনি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন লেখক, যিনি বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন মানবতাবাদী, যিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন।

সত্যি বলতে, তিনি ছিলেন তার বৃহত্তর পরিবারের এমন একজন অভিভাবক, যার ছায়াতলে পরিবারের প্রতিটি তরুণ প্রাণ হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানমনস্ক। ছাত্র-অছাত্র, পরিচিত-অপরিচিত, স্বল্পপরিচিত—সকলকেই তিনি অনুপ্রাণিত করতে কার্পণ্য করেননি। কেউ পড়াশোনা, কেউ কর্মজীবন, কেউ লেখালেখি কিংবা জীবনের কোনো সন্ধিক্ষণে তার কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি সাধ্যের অতীত হয়েও পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। অন্যদের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিলেও নিজের জ্ঞানপিপাসাকে কখনো থামতে দেননি। নতুন বই, নতুন ধারণা, নতুন জ্ঞান—সবকিছুর প্রতিই ছিল তার অদম্য আকর্ষণ। তার কাছে শেখা ছিল জীবনযাপনেরই আরেক নাম।

তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক বিজ্ঞানের অভিযাত্রী; জ্ঞানের বেলাভূমিতে নুড়ি কুড়িয়ে চলা এক নিরলস পথিক, যিনি তার সমগ্র জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন—প্রসারণই জীবন, সংকোচনই মৃত্যু।

আজ ১ জুন, তার জন্মদিন। এটি কেবল একজন মানুষের জন্মদিন নয়; একটি আদেশর উন্মেষ, একটি বিশ্বাসের নবজন্ম। যে বিশ্বাস আজও আমাদের শিখিয়ে যায় মানুষের মতো মানুষ হতে। তার বিশ্বাসের হাতে হাত রেখে আমরা, তার অনুসারীরা আজ বিশ্বাস করি—জ্ঞান, সততা ও নির্মলতার জয় একদিন হবেই। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন—আলোকের শুদ্ধতম মানচিত্র হয়ে।