সাহিত্যিকদের ছাড়াই যে সাহিত্য মেলা দেখলাম!

বরগুণার এই সাহিত্য মেলায় সাহিত্য বিষয়ক কর্মশালার নামে ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান শেখানো হয়েছে বলে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন লেখক ও কবি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

মর্তুজা হাসান সৈকতমর্তুজা হাসান সৈকত
Published : 13 Nov 2022, 01:15 PM
Updated : 13 Nov 2022, 01:15 PM

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা পর্যায়ে অবস্থানরত কবি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্ম জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় সাহিত্য মেলার আয়োজন করেছে সরকার। এ মেলার মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে সাহিত্যের প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি স্থানীয় সাহিত্যিকদের সাহিত্য কেন্দ্রীয় সাহিত্যে একীভূত করতে চেয়েছে সরকার। কারণ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় যেসব কবি-সাহিত্যিক ও লেখক ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছেন দেখা যায় তাদের সাহিত্যকর্ম সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, সংগ্রহ-সংরক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায়।

এ বিষয়টি মাথায় নিয়ে বছরের শুরুর দিকে একুশে বইমেলা উদ্বোধনের সময় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, “অতীতে দেশের প্রত্যেক জেলা বা মহকুমায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, সহিত্য চর্চা হতো, সাহিত্য সম্মেলন হতো, আলোচনা হতো। যে চর্চাটা অনেকটা কমে গেছে। এটাকে আবার একটু চালু করা দরকার।” মূলত সরকার প্রধানের সেই আগ্রহে তৃণমূল পর্যায়ে সাহিত্য মেলা আয়োজন করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বাংলা একাডেমির সমন্বয়ে জেলা প্রশাসনের উপর বর্তায় দুইদিন ব্যাপী সাহিত্য মেলা আয়োজনের দায়িত্ব। দেশে প্রতিবছর হরেক রকম মেলা আয়োজিত হলেও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্ভবত এবারই প্রথম সাহিত্য নিয়ে এরকম কোন মেলার আয়োজিত হলো। তাই এটি আয়োজনের দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের উচিত ছিল নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু তা না করে কবি-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ ছাড়াই দেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা বরগুনায় সাহিত্য মেলার নামে একটি অবিবেচনাপ্রসূত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।  

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ৩০ টি জেলায় সাহিত্য মেলা আয়োজনের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের 'অনুষ্ঠান/উৎসবাদি' খাত থেকে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। সে মোতাবেক বরগুনা জেলায় দুই দিনব্যাপী সাহিত্য মেলা আয়োজন করার জন্য বরাদ্দ ছিল ৫ লাখ টাকা। অন্যান্য জেলায় মেলা দুইদিন হলেও বরগুনায় একদিনের আধা বেলাতেই পুরো মেলা সম্পন্ন করা হয়েছে। সে মেলায় অংশগ্রহণকারীদের তালিকাটা আমার হাতে আছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে অংশগ্রহণকারী ৪৪ জনের ভেতরে সর্বোচ্চ হয়তো ৭-৮ জন সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ত আছেন। যে ৭-৮ জন আছেন তাদের ভেতরে ২-৩ জন ছাড়া বাকীরা সাহিত্যটা বলার মতো চর্চাই করেননি কখনও। তবে মেলা শেষ করার আগে আগে মেলা প্রস্তুতি কমিটির পক্ষ থেকে নাকি কাউকে কাউকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে এসে এবং অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত দর্শকদের রেজিস্ট্রেশন করিয়ে উপস্থিতির সংখ্যাটা ৬০ এর কাছাকাছি নেওয়া হয়েছিল। আর এই ভাড়াটে দর্শকদের দিয়েই মেলা সফল দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বরগুনা সদর উপজেলার। বাকী ৫টি উপজেলাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। 

কে কবে দু-একটি কবিতা লিখেছিলেন, কোন চাকুরীজীবী ফেইসবুকে কী লিখেছিলেন, কোন ব্যবসায়ী শখের বসে হয়তো একটি বই বের করেছিলেন- এসবকে বিবেচনায় নিয়ে মেলা প্রস্তুতি কমিটি তাদের পছন্দের গুটিকয়েক কবি-সাহিত্যিককে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে মেলার অগ্রভাগে রেখেছিলেন। এর বাইরে মেলা প্রস্তুতি কমিটি দু-তিনটি পেশাজীবী সম্প্রদায়ের বেশকিছু ব্যক্তিকে মেলায় রেজিস্ট্রেশন করায়। যাদের বেশিরভাগই জীবনে একটা ছড়া-কবিতাও লিখেন নি। 

আরেকটি জঘন্য কাজ আয়োজকরা করেছেন— জেলায় বসবাসরত কবি-সাহিত্যিক যারা প্রকৃতই সাহিত্যচর্চা করছেন তাদের কাছে ন্যূনতম দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন নি। এ কারণে জেলায় অবস্থান করা কবি-সাহিত্যিকদের ভেতরে বেশিরভাগই জানতেও পারেন নি যে, এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। আর যারা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ফিসফাস শুনেছে তারাও আগ্রহ হারিয়েছেন মেলা প্রস্তুতি কমিটির অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতার কারণে। তদুপরি, ছিল না কোনো প্রকার প্রচার-প্রচারণা। কী উদ্দেশ্যে তাহলে মেলার আয়োজন করা হয়েছিল সরকারি টাকা অপচয় করে? তাছাড়া, বরাদ্দকৃত টাকার কত টাকাই বা খরচ করা হয়েছে সঠিকভাবে— এ প্রশ্ন মেলায় যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের পাশাপাশি যারা অংশ নেন নি তাদেরও। 

মেলার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছে জেলা প্রশাসন। আর এর জন্য প্রশাসনের পছন্দনীয় লোকদের নিয়ে মেলা বাস্তবায়ন কমিটি করা হয়। আর এ কমিটির একটা বড় অংশ ছিল একটা নির্দিষ্ট পেশাজীবী সম্প্রদায়ের। এ পেশাজীবী সম্প্রদায়টি এখানে একটি সিন্ডিকেট করে রেখেছে। এ সিন্ডিকেটটি মূলত জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া বিভিন্ন প্রকাশনার সাথে সংযুক্ত থাকে। আমার মনে হয়, এই সিন্ডিকেটটিও চায়নি মেলায় জেলার গুণী সাহিত্যিকরা অংশ নিক। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিকরা অংশ না নিলেই তো সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে পরিগণিত হয়। 

অথচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ থেকে জানা যায়— বিভিন্ন জেলার সাহিত্য মেলা বাস্তবায়ন কমিটি জেলার বাইরে অবস্থানরত গুণী কবি-সাহিত্যিকদেরও আমন্ত্রণ জানিয়ে জেলায় নিয়ে গেছে। তারা এমনটা করেছেন কারণ তারা মেলাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে চেয়েছেন। সেরকম ইচ্ছে বরগুনায় মেলা বাস্তবায়ন কমিটির ছিল না, তাই তারা এতোটাই চুপিসারে কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে যে, জেলায় অবস্থানকারী সাহিত্যিকরাই জানতে পারেননি এমন আয়োজনের কথা। 

মেলা বাস্তবায়ন এই কমিটির ব্যবস্থাপনা এতই খারাপ ছিল যে, তারা জেলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য যে দুইজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছিল তাদের তাদের চেয়ে আরও অনেক যোগ্য ব্যক্তি জেলায় ছিলেন। এই দুইজনের ভেতরে একজন প্রবন্ধ লিখে জমা দিতে পারলেও আরেকজনের প্রবন্ধের মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। মেলার মাত্র দুই দিন আগে বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের উপপরিচালক এবং বাংলা একাডেমী পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. সাইমন জাকারিয়া আমাকে অনুরোধ করলে তথ্য দিয়ে ও বিভিন্নভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে সেই ব্যক্তিটিকে সহায়তা করেছিলাম। কিন্তু তারপরও সেই ব্যক্তিটির বাক্য গঠনের দুর্বলতা ও লেখার বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে ড. সাইমন জাকারিয়া প্রবন্ধটি বাতিল করতে বাধ্য হন।

এই সাহিত্য মেলার আরেকটি বড় অসঙ্গতি ছিল— এখানে যারাই আয়োজক ছিলেন, তারাই ছিলেন অনুষ্ঠানের অতিথি, আবার তারাই সাহিত্যিক। এসব কারণে রাগে-দুঃখে অনেকেই মেলায় অংশগ্রহণ করলেও নীরবে প্রস্থান করেছেন। দুঃখজনক আরেকটি ব্যাপার ছিল— সাহিত্য বিষয়ক কর্মশালার নামে ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান শেখানো হয়েছে। একজন প্রবীণ কবিকে নাকি আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেছে, বুড়ো বয়সে আমাদের কি এইসব শেখানোর জন্য ডেকে আনা হয়েছে! 

একটু স্পষ্ট করে বলি, সাহিত্যচর্চা করেন না এমন একজন ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, আইনজীবী, শিক্ষক বা সাংবাদিক যে কোন সম্মেলন বা অনুষ্ঠানে অংশ নিতেই পারেন তাতে কোন সমস্যা নেই। সমস্যাটা তখন হয় এরকম পেশাজীবী কোন ব্যক্তিকে যখন সাহিত্য উৎসবে একজন সাহিত্যিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এদেরকে যখন বাংলা সাহিত্যের প্রতিনিধি হিসেবে দেখি তখন খুব কষ্ট লাগে। তখন আশাবাদী হওয়ার কোন কারণ খুঁজে পাই না। অন্যদিকে, এই অসাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যখন প্রমোট করা চলতে থাকে তখন অনেকে সুসাহিত্যিকও তাদের প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টিতে বাধাপ্রাপ্ত হন।   

সাগর-নদী ঘেরা বরগুনার প্রকৃতি অনন্তকাল ধরে আমাদের গৌরবান্বিত করে আসছে। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন বহু কীর্তিমান যারা প্রেমে, দ্রোহে, কবিতায়, শিল্পে জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছেন। এখনকার সাহিত্যিকরা তাদেরই উত্তরসূরী। এ জেলা থেকেই উঠে এসেছেন দেশবরেণ্য কবি ও প্রাবন্ধিক মতিন বৈরাগী, ঢাকা ভার্সিটির উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, বহুমাত্রিক শব্দসৈনিক কবি মোশতাক আল মেহেদী, কবি ও কথাসাহিত্যিক জহিরুল হক, কবি ও প্রাবন্ধিক আখতারুজ্জামান আজাদ, কবি রাজু আহমেদ মামুন, কবি প্রান্তিক জসীম, কথাসাহিত্যিক আবুল কাশেম, কবি সুশান্ত পোদ্দার, কবি ও কথাসাহিত্যিক মাসুদ আলম, কবি তুহিন ওসমান, কবি ফরহাদ নাইয়া, প্রাবন্ধিক আবদুর রহমান সালেহ, কবি শাওন মুতাইত, কবি নাসরিন হক, কবি সুলতান মাহমুদ, কবি মিজান হাওলাদার, কবি শুক্লা দেবনাথ, কবি জাকিয়া সুলতানা শিরিন, কবি ও গল্পকার আরেফিন সায়ন্তী, কবি বিপ্লব কুমার শীল, কবি জাফর ইদ্রিস, কবি ও প্রচ্ছদ শিল্পী আল নোমান, কবি নুরুল ইসলাম মনির মতো সাহিত্যিকরা। এদের অনেকেই বরগুনায় অবস্থান করেই সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন অথচ এরকম একটা মেলা এ জেলায় আয়োজন করা হচ্ছে এটা কেউ জানেই না।

জেলা প্রশাসনের আয়োজিত এই মেলাটি যে কতটা হাস্যকর অনুষ্ঠান ছিল সেটি বোঝানোর জন্য আরেকটি ঘটনার অবতারণা করি— একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকা গতবছর দেশের প্রতিটি জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছিল। দৈনিকটি বরগুনা জেলার সাহিত্য নিয়ে তাদের বিশেষ আয়োজনে বরগুনায় অবস্থানরত ৯ জন কবির কবিতা একসাথে প্রকাশ করেছিল। ওই আয়োজনে ঠাঁই পাওয়া কবিদের ভেতরে একজনকেও জেলা প্রশাসনের এই সাহিত্য মেলায় দেখা যায় নি।   

এবার একটু অন্য একটা প্রসঙ্গ টেনে আনি। এই সাহিত্য মেলার সাথে এ প্রসঙ্গের যোগসূত্র থাকলেও হয়তো থাকতে পারে। মাত্রই আড়াই মাস আগে এই বরগুনাতেই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল দক্ষিণাঞ্চলে আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম প্রধান পুরুষ ও তারকা পার্লামেন্টারিয়ান অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সামনেই এবং তার নিষেধকে অমান্য করে। ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বরগুনায় তুচ্ছ ঘটনায় পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় সেই ঘটনার খলনায়ক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহররমের সাথে বিএনপি-জামায়াতের কানেকশন। ফলে সরকার ত্বরিৎ গতিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। বরখাস্ত করা হয় ১৫ জনের অধিক পুলিশ সদস্যকে। 

আমার কথা হচ্ছে, শুধু বরগুনার পুলিশ প্রশাসনে নয় জেলা প্রশাসনেও মহররম আলীর মতো বিএনপি-জামায়াতের কোন ‘প্রডাক্ট’ লুকিয়ে রয়েছে কিনা যারা শিল্প সাহিত্যের প্রসার পছন্দ করেন না— সরকারের উচিত সেটাকে গুরুত্ব সহকারে ভাবনায় নেওয়া। শেষ করার আগে জোর দিয়ে একটা কথাই বলতে চাই—যে দেশের শিল্পসাহিত্য বিকাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো একজন মনোযোগী ও তৎপর রাষ্ট্রনায়ক আছেন সে দেশের প্রশাসনে এরকম গণবিরোধী ও সাহিত্যবিমুখ আমলাতন্ত্র শোভা পায় না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক