‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটান নিরুপায় জাতিসংঘ’
বিশ্বশান্তির স্বপ্ন নিয়ে গঠিত জাতিসংঘ আজ যুদ্ধ ও সংঘাতে কেবল উদ্বেগ প্রকাশের সংস্থায় পরিণত হয়েছে কেন?
মানবতার এই চরম সংকটে সংঘাত থামানোর বদলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া যেন আর কিছু করার নেই জাতিসংঘের। অথচ বিশ্বশান্তির স্বপ্ন নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এই সংস্থা।
১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে হোয়াইট হাউসে রুজভেল্ট ও চার্চিলের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ—যাকে আমরা ‘আর্কেডিয়া সম্মেলন’ নামে চিনি—তা স্রেফ দুটি বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের যৌথ বৈঠক ছিল না; এই সম্মেলনেই রুজভেল্ট প্রথমবারের মতো মিত্রশক্তিগুলোর ঐক্যকে রূপক থেকে বাস্তবতায় এনে ‘জাতিসংঘ’ নামটির রূপরেখা দেন, যা চার্চিলও সানন্দে গ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর রুজভেল্ট, চার্চিল ও হ্যারি হপকিন্স যখন জাতিসংঘের ঘোষণার খসড়া তৈরিতে হাত দেন, তখন বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌক্তিক প্রস্তাবগুলোকে ঠাঁই দেওয়া হলেও, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা ফ্রান্সকে কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয়নি—যা সেই সময়ের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকেই নির্দেশ করে।
তবে এই ঘোষণার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল এর মানবিক প্রসার। আগের আটলান্টিক সনদের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এতে সংযোজিত হয় ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’র অগ্রাধিকার। রুজভেল্টের অনুরোধে স্টালিন এতে সম্মতি দেন।
এর আগের একটি ঘটনা না বললেই নয়। গল্প হলেও এর ঐতিহাসিক মূল্য আছে। ইংল্যান্ড মোটামুটি ধরে নিয়েছিল যে, তার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বারবার চেষ্টা করেও হিটলার বাহিনীকে থামাতে পারেনি তারা। দেশের পর দেশ জয় করা ‘বিলেত’ দেশটি তখন ভয়ে কাঁপছে। নিজেদের মান-সম্মান তো বটেই, স্বাধীনতাও বুঝি যাওয়ার পথে। তখন আটলান্টিক পারের সদ্য গজিয়ে ওঠা ‘আমেরিকা’ আনকোরা এক দেশ। যার নাম শুনলেও তেমন কেউ চেনে না। কিন্তু ততদিনে এটা বোঝা হয়ে গিয়েছিল, ওই নতুন দেশটি তৈরি হয়ে আছে। তার শক্তি ও সহযোগিতা ছাড়া হিটলারকে দমন অসম্ভব। একদিকে রাশিয়া, অন্যদিকে আমেরিকা—তারাই পারবে শত্রু দমন করতে।
কথিত আছে, রুজভেল্ট-চার্চিল বৈঠকে রুজভেল্ট চার্চিলকে প্রস্তাব দেন—তারা সহযোগিতা করবেন একই শর্তে, ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে গুটিয়ে নিতে হবে, পরাধীন দেশগুলোকে দিতে হবে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা। এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, কী দূরদর্শী ছিলেন আমেরিকার এই প্রেসিডেন্ট। ৮০ বছর আগে বুঝেছিলেন তারাই হতে যাচ্ছেন বিশ্বের আসল পরাশক্তি। চার্চিলের কাছে এ প্রস্তাব মানার বাইরে আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি তা মেনে নেন এবং তার দেশের পরবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে ১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। এর প্রেক্ষাপটে উড্রো উইলসন তার বিখ্যাত ১৪ দফা পেশ করেন। উইলসন তার ১৪ দফা শর্তের ১৪ নম্বর দফায় বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ জুন ১৯১৯ সালে স্বাক্ষরিত ‘ভার্সাই চুক্তি’র মাধ্যমে ১০ জানুয়ারি ১৯২০ সালে লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জের জন্ম হয়। সংস্থাটির প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৬ জানুয়ারি ১৯২০ সালে। সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় এর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। জাতিপুঞ্জের তিনটি অঙ্গসংস্থা ছিল—পরিষদ, কাউন্সিল এবং সচিবালয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০ এপ্রিল, ১৯৪৬ সালে সংস্থাটি বিলুপ্ত হয়। সংস্থাটির উত্তরসূরি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর ১৯১৯ সালে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়েছিল, তার ব্যর্থতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বিশ্বের তৎকালীন নেতারা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই জাতিসংঘ দ্রুতই হয়ে ওঠে একটি স্বীকৃত বিশ্বসংস্থা।
এ পর্যন্ত ঠিক আছে। এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও তার ভূমিকার কথা বলতে হবে। সে ইতিহাস অম্লমধুর। ভারত, রাশিয়া আর বাংলাদেশসহ কিছু দেশ এককাট্টা হয়ে মরিয়া চেষ্টা চালালেও পাকিস্তান পাচ্ছিল আমেরিকা আর চীনের পূর্ণ সমর্থন। তাদের ভেটো পাওয়ারের কারণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়া। কিন্তু একসময় সবাই হার মানলে ভুট্টো সাহেব সবার সামনে কাগজপত্র ছিঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। অবশেষে জাতিসংঘ মেনে নিয়েছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
আজকের জাতিসংঘ অনেকটাই একমুখী। তার অভিভাবক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পা ফেলতে পারে না সে। উন্নয়ন বা জাতিগঠনসহ নানা বিষয়ে সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও যুদ্ধ বা সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ এখন প্রায় অকেজো। সেই অতীতের বাঘা জাতিসংঘ অনেকটাই যেন বিড়ালে পরিণত হয়ে গেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, ইউক্রেইনের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নৈতিক সমর্থনও দিতে পারে না। কারণ, তার চাবিকাঠি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে আছে ইউরোপও। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই এখানে চূড়ান্ত।
ইরানের ব্যাপারে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ভেনেজুয়েলা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, তাদের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পরও জাতিসংঘের তেমন কোনো উচ্চবাচ্য দেখা যায়নি। আবার ইরানের কথায় আসি। কোন দেশে সরকার পতন হবে বা কারা দেশ চালাবে, সেটা সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু সবার আগে মানুষের জীবন ও সম্পদ। সম্পদের কথা তো বাদই দিলাম, পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারার পরও জাতিসংঘের ভূমিকা দেখি না। একটি সংস্থা, যার জন্ম হয়েছিল যুদ্ধ বন্ধ আর শান্তির জন্য, তার এ দুর্দশা মানা কষ্টকর।
যদি মানবিকতার কথা বলি, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার কথা আসবে। মানবিক ত্রাণ আর সাহায্যের বাইরে সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ কি সফল? মোটেও না। জাতিসংঘের মহাসচিবের আগমন ঘটানো হলেও সমস্যা মেটেনি। মেটানো যায় না। ফলে আমাদের এ কথা মানতেই হবে—হয়তো এই সংস্থা তার সবলতা হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো তার কাঠামো আর দর্শন আগের মতো কাজ করছে না। ফলে নতুনভাবে চিন্তা করার সময় উপস্থিত হয়েছে।
জাতিসংঘ ব্যর্থ হলে সারা বিশ্বের মানুষের লোকসান। তাদের ভরসার জায়গা নড়ে গেলে এসব হানাহানি কমবে না, উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, এককালে জাতিসংঘের আগমন ও ভূমিকা মানেই যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত ছিল। সে ভরসা এখন অস্তমিত। যার মূল কারণ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বেচ্ছাচারী মনোভাব। অথচ জাতিসংঘের মূল কাজ ছিল এমন একক আধিপত্যের হাত থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখা।
বর্তমান অবস্থা দেশেশুনে ছড়াকার ফারুক হোসেনের ছড়াটির কথা মনে পড়ছে—“যুদ্ধে যুদ্ধে মলিন বিশ্ব/ ভাঙচুর সারা অঙ্গ/ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটান/ নিরুপায় জাতিসংঘ।”
আমরা এমন একটি জাতিসংঘ চাই, যার ডাকে শান্তি নামবে, যুদ্ধ থামবে। যার প্রতি বিশ্বাস আর সম্মান থাকবে সবার। কারও অঙ্গুলি হেলনে চলবে না এই সংস্থা। আজকের বিশ্ববাস্তবতায় এটি অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে মানুষ ভরসা হারাবে। মানুষের জন্যই রাষ্ট্র, আর মানুষের ভালোর জন্যই জাতিসংঘ।
অজয় দাশগুপ্ত: ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: dasguptaajoy@hotmail.com
