১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১ কার্তিক ১৪৩৩

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: অপরাধের বিবরণ অস্পষ্ট, রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

শ্রমবাজার আর রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরতা যেন প্রবাসীদের অধিকার হরণের লাইসেন্স না হয়। প্রবাসে প্রান্তিক শ্রমিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি ও প্রমিত কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: অপরাধের বিবরণ অস্পষ্ট, রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এই কূটনৈতিক মিশনের আইনি নজরদারি এবং প্রবাসীদের কনস্যুলার অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে উঠেছে বড় ধরনের প্রশ্ন।

লুবনা ফেরদৌসী লুবনা ফেরদৌসী

Published : 16 Oct 2026, 01:07 PM

Updated : 16 Oct 2026, 01:07 PM

একটি রাষ্ট্র দুই বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে; অথচ তারা ঠিক কী করেছিলেন, জনসমক্ষে প্রকাশিত বিবরণ থেকে তা স্পষ্ট নয়। তাদের বিচার চলাকালে নিজ দেশের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল কি না, সেটিও অজানা। কিন্তু যে সিদ্ধান্তের আর কোনো সংশোধন সম্ভব নয়, সেটি ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে এই তথ্যগত অস্বচ্ছতাকে মামুলি প্রশাসনিক ঘাটতি বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরে মক্কা অঞ্চলে বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগ ছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তা'জিরের আওতায় দেওয়া সাজা আপিলের ধাপ পেরিয়ে কার্যকর হয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত বিবরণে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি, প্রমাণের বিস্তারিত কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিই এই অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে ঘোষণা করা দায়িত্বশীল আচরণ হবে না।

প্রথম প্রশ্নটি তাই সহজ: অপরাধটি আসলে কী? ‘অনৈতিক’ একটি মূল্যায়নমূলক শব্দ; মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা যাচাই করার জন্য এটি যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি বিবরণ নয়। কোনো আচরণ ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ, সামাজিকভাবে নিন্দনীয় এবং আইনত শাস্তিযোগ্য হতে পারে; কিন্তু এই তিনটি অবস্থান এক নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও মৃত্যুদণ্ড কেন প্রয়োজনীয় ও সমানুপাতিক শাস্তি, তার স্বাধীন ব্যাখ্যা চাইতে হবে। ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রীয় শাস্তির ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ পরস্পরবিরোধী নয়।

ফৌজদারি বিচারের তিনটি নীতি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক: অপরাধের সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি, শাস্তির সমানুপাতিকতা এবং ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া। অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন অভিযোগের মুখোমুখি, তা বুঝতে পারবেন; প্রমাণের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে পারবেন; প্রয়োজনীয় অনুবাদ ও আইনজীবীর সহায়তা পাবেন; এবং কার্যকর আপিলের সুযোগ থাকবে। শাস্তি যত কঠোর, এই নিশ্চয়তাগুলোর গুরুত্ব তত বেশি। কারাদণ্ডের ভুল কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধন করা যায়; মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা করা যায় না।

ইসলামী ফৌজদারি আইনশাস্ত্রে তা’জির বলতে এমন বিচারিক বিবেচনাধীন শাস্তিকে বোঝায়, যার ধরন বা মাত্রা কুরআন ও সুন্নাহতে হুদুদ বা কিসাসের মতো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রকৃতি, গুরুত্ব, পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য আইনগত নীতির ভিত্তিতে বিচারক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ শাস্তি নির্ধারণ করে। তবে এই বিবেচনামূলক ক্ষমতার পরিধি ও সীমা নিয়ে ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিভিন্ন ধারায় মতপার্থক্য রয়েছে। তাই এই মামলায় আদালতের যুক্তি না দেখে রায়ের যথার্থতা সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যায় না। তবে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে অন্য শাস্তি বিবেচিত হয়েছিল কি না, বিচারিক বিবেচনাকে কীভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং কেন মৃত্যুদণ্ডই অপরিহার্য মনে করা হয়েছে—এসব প্রশ্ন সম্পূর্ণ বৈধ।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও এখানে প্রাসঙ্গিক। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য ৩৬ অনুযায়ী, যেসব রাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে, সেখানেও ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি’র অধীনে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ বলতে চরম গুরুতর, ইচ্ছাকৃত হত্যাসংক্রান্ত অপরাধ বোঝানো হয়। সৌদি আরব ওই চুক্তির পক্ষরাষ্ট্র নয়; তাই চুক্তির নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা তার ওপর সরাসরি আরোপ করা যাবে না। কিন্তু প্রাণঘাতী নয় এমন আচরণের জন্য মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক, তা মূল্যায়নে এই মানদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ।

এবার বাংলাদেশের দায়িত্বের প্রশ্ন। সংবাদমাধ্যমে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বক্তব্য এসেছে যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের জানানো হয়নি; পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি উদ্বেগজনক; তবে আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য দরকার। ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আটক বিদেশি নাগরিককে বিলম্ব ছাড়াই তার কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার জানাতে হবে। তিনি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হবে। কনস্যুলার যোগাযোগ ও সাক্ষাতের অধিকারও সুরক্ষিত। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের আগে দূতাবাসকে জানানো হয়নি—শুধু এই তথ্য থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৩৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলা যায় না।

সুতরাং বাংলাদেশের প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রশ্নগুলো নথিভিত্তিকভাবে তোলা। দুজনকে কবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল? তাদের কনস্যুলার অধিকার জানানো হয়েছিল কি? তারা যোগাযোগের অনুরোধ করেছিলেন কি? বাংলাদেশ মিশন প্রথম কবে মামলা সম্পর্কে জেনেছে? আইনজীবী ও দোভাষীর ব্যবস্থা ছিল কি? রায়ের অনুলিপি, আপিলের বিবরণ এবং কনস্যুলার যোগাযোগের রেকর্ড কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কূটনৈতিক প্রতিবাদ যেমন দুর্বল থাকবে, তেমনি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও সন্দেহ দূর হবে না।

কনস্যুলার অধিকার যে নিছক সৌজন্য নয়, তার আন্তর্জাতিক নজির আছে। ২০০১ সালের লাগ্রঁ মামলা এবং ২০১৯ সালের যাদব মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ভিয়েনা কনভেনশনের অধীনে কনস্যুলার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় বিচার করেছে। তবে এ থেকে এমন সিদ্ধান্ত আসে না যে, বাংলাদেশ ইচ্ছা করলেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করতে পারবে। আদালতের এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি ও প্রযোজ্য আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কার্যকর কূটনীতি তাই উচ্চকণ্ঠ বক্তব্যের পাশাপাশি সঠিক আইনি ভিত্তি দাবি করে।

এই ঘটনার আরেকটি মাত্রা বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের অসম অর্থনৈতিক সম্পর্ক। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন; তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শ্রম গ্রহণকারী রাষ্ট্র ও শ্রম সরবরাহকারী রাষ্ট্রের ক্ষমতা সমান নয়। ফলে শ্রমবাজার ধরে রাখার প্রয়োজন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে অর্থনৈতিক নির্ভরতা কোনোভাবেই নাগরিকের অধিকার নিয়ে নীরব থাকার নৈতিক অনুমতি হতে পারে না।

এখানে শ্রেণি ও লিঙ্গের প্রশ্নও জরুরি। বিদেশে একজন ক্ষমতাবান বা সম্পদশালী বাংলাদেশি আইনি সংকটে পড়লে যে ধরনের প্রতিনিধিত্ব ও মনোযোগ পান, একজন স্বল্প আয়ের অভিবাসী কি তা পান? সিতি আক্তারের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের পর্যাপ্ত তথ্য নেই; তাই তার সম্পর্ক, আচরণ বা সম্ভাব্য অসহায়ত্ব নিয়ে অনুমান অনুচিত। কিন্তু অভিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে ভাষাগত বাধা, আর্থিক নির্ভরতা, সামাজিক কলঙ্ক এবং আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা যে বিচারপ্রাপ্তিকে প্রভাবিত করতে পারে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। সমান নাগরিকত্ব মানে সবার জন্য একই আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়; বাস্তবে অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা।

আরও একটি নীতি স্পষ্ট থাকা দরকার। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী হলেও তার মানবাধিকার বিলুপ্ত হয় না। অপরাধের বিচার এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের অধিকার—দুটি পৃথক বিষয়। আমরা যদি কেবল নির্দোষ বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলি, তাহলে মানবাধিকারের সর্বজনীন ভিত্তিই দুর্বল করি। রাষ্ট্রের ক্ষমতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রেই, যার পক্ষে জনমত সংগঠিত করা সহজ নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখন প্রয়োজন পূর্ণ বিচারিক নথি চাওয়া, কনস্যুলার যোগাযোগের সময়রেখা প্রকাশ করা, পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং সম্ভাব্য অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে যুক্তিসংগত কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ বিবেচনা করা। একই সঙ্গে বিদেশে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, বিশেষায়িত আইনি সহায়তা তহবিল, স্বাধীন দোভাষী ও নিয়মিত কনস্যুলার পর্যবেক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর একটি নোট পাঠানোর চেয়ে গ্রেপ্তারের শুরু থেকেই কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি আরবের নিজস্ব আইন আছে, কিন্তু সেই আইন আন্তর্জাতিক প্রশ্ন ও মানবাধিকার সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশও অন্য দেশের আদালতের রায় ইচ্ছামতো বদলাতে পারে না; কিন্তু নিজের নাগরিকের বিচারপ্রাপ্তি, কনস্যুলার অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে জবাবদিহি চাইতে পারে। সার্বভৌমত্বের অর্থ কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়; সীমান্তের বাইরে নাগরিকের অধিকার রক্ষায় বৈধ সব পথ ব্যবহারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর জনপরিসরে প্রথমেই তাদের সম্ভাব্য আচরণ নিয়ে অনুমান শুরু হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, তারা কী ধরনের বিচার পেয়েছিলেন। অভিযোগের নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে; কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর বিচারিক ভুল সংশোধনের আর সুযোগ থাকে না। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্ট বহন করার অর্থ অন্তত এটুকু হওয়া উচিত যে, সেই বিচারে তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না—তা জানতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তুলবে এবং উত্তর আদায় করার চেষ্টা করবে।

লুবনা ফেরদৌসী: যুক্তরাজ্য প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিশ্লেষক। ই-মেইল: lferdowsi@yahoo.com