করোনামুক্ত শহর থেকে খোলা চিঠি

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 27 April 2021, 02:20 PM
Updated : 27 April 2021, 02:20 PM

এক

সাবধানতা ছাড়া এখন কোন আশার বাণী নাই।  আপনি আর না মানেন সারা বিশ্বে এখন  ১৫ কোটির মতো মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত। ৩০ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ গিয়েছে। এসবই সরকারি হিসেব, কিন্তু আপনার মতো আমার মতো চুপা করোনাভাইরাস রোগী ঠিক কতজন এবং কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করা রোগীর সংখ্যা যে কত- কেউ জানে না।  এ হিসেবের পরও আপনি সতর্ক হবেন কি হবেন না সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনার কি কোনও অধিকার আছে প্রতিবেশী বা নিজের আত্মীয় পরিজনের জীবননাশের? অথচ জ্ঞানত অথবা অজানা কারণে আপনি সেটাই করে চলেছেন। 

আপনাকে কেউ একজন মুর্খ বা অতিপণ্ডিত বলেছে- 'এটি আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার রোগ। এ রোগে মারা যান সাদা বা শ্বেতাঙ্গ মানুষ। এটা কালোদের রোগ না। এ কথা জানার পর আপনি মুখ থেকে মাস্ক খুলে ফেলেছেন। মহানন্দে বাজারে হাটে ঘোরাঘুরি করছেন।  আপনি কি জানেন  কৃষ্ণাঙ্গদের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় এখন এক লাখ পাঁচ হাজারের মতো মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত? আপনার জানা নাই, ব্রাজিলে এখন কবর দেওয়ার মতো মানুষ বা জায়গার খোঁজে আছে সরকার। কিন্তু আপনাকে ধর্ম ব্যবসায়ীরা বুঝিয়েছেন- এ রোগ গোরা আদমীর। আপনি সে ট্যাবলেট খেয়ে বুঁদ আছেন জনাব আর আপনার সেই গুরু কিন্তু ঠিক ই সাবধানে আছেন। 

দুই

ধর্ম-অধর্ম দু ধরনের রাজনীতির নেতারাই মানুষের ব্যাপারে ভীষণ উদাসীন। পাশের দেশ ভারত বলতে আমরা বুঝলাম মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজী সুভাষের দেশ। সেসব মানুষেরা অস্ত যাওয়ার পর এক হিন্দুত্ববাদী নেতা মোদী এসে বসলেন সরকারে। পূজা-অর্চনা করে তিনি হিন্দুদের মন গলান বটে, অথচ তার দেশের ভয়াবহ করোনায়ও এখন ভোট হচ্ছে। এমন মশকরা মানুষের সাথে কেউ করতে পারে জানা ছিল না। আমি যখন এ লেখা লিখছি তখন মমতা বন্দোপ্যাধ্যায় সাংবাদিকদের বলছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে আতংকের কিছু নাই। অথচ তার রাজ্যে গত কয়েকদিনে হাজার হাজার মানুষ কোভিড আক্রান্ত হয়েছে। হয়তো শিগগিরই সেখানে অক্সিজেনের সংকট দেখা দেবে! মমতার নামে যতো মমতা তার এক ছিটেফোঁটাও নাই কাজ কর্মে। কারণ তারও জেতা দরকার। মানুষ মরুক আর করোনায় রাজ্য উচ্ছন্নে যাক- নির্বাচন আগে। চাই আমার গদি। 

তিন 

একটু পিছিয়ে আমাদের দেশে দেখুন। চাইলেই এ সংক্রমণ রোধ করা যেত না! অথবা সংক্রমণ কমানো? কিন্তু আমাদের উৎসব যে আগে। নববর্ষ ঈদের চাইতেও জরুরী রাজনৈতিক উৎসব। সে সময়কাল পেরিয়ে যাবার পর মনে হলো, তাইতো আমাদের তো লকডাউন দরকার।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যতীত কারো আন্তরিকতা বা উদ্যোগ দেখেন কখনো? অথচ আমাদের অচিরাই টিকা সংকটে ভুগতে হবে। 

এই যে টিকা সংকট নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আশাবাদ আর লম্বা কথা। তার কথা শুনলে মনে হয় চীনের আর কোনও কাজ নাই। তারা বাংলাদেশকে কোলে নিয়ে টিকা দেওয়ার জন্য বসে আছে। দুদিন আগেই টিভিতে ক্রিকেট কর্তা এবং একটি ফার্মাসিউটিক্যালস এর প্রধান ফাটালেন আরেক বোম। তার কথা হলো ভারতকে আমাদের প্রাপ্য টিকা দিতেই হবে। তার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু সমাধান নাই। বলছেন, সরকার যেন কঠোর বার্তা দেয়। এমন বার্তা আমরা কবে কাকে দিতে পেরেছি? আমরা কি হাজার হাজার শরণার্থী চাপিয়ে দেওয়া মিয়ানমারকে এখনও কোন বার্তা দিতে পেরেছি? তাহলে এবার যে ভারতের মতো বিশাল দেশকে বার্তা দিতে পারবো তার গ্যারান্টি দেবে কে? 

চার 

এসব কারণেই আপনাকে সাবধান হতে হবে। একটা বিষয় আমরা সবাই বুঝি পরিসংখ্যানের পারদ কখন যে ওঠানামা করে, কেন করে- তা আমজনতা সঠিক ঠাওর পায় না। তাই কখন ১০০ মানুষ মারা যান আর কখন তা নেমে আসে ৯০- তে, তা আপনার আমার জানার দরকার নাই। আমাদের বুঝতে হবে অক্সিজেন আছে কিনা, জানতে হবে আপনার কিছু হলে আপনাকে কেউ সাহায্য করতে পারবেন কিনা। আপনি হাসপাতালে জায়গা বা বেড পাবেন কিনা।  আপনার মামা-চাচার পাওয়ার থাকলেও এবার কোনও কাজ হবে না।

দিল্লীর এক হাসপাতালের পরিচালক হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, "শুক্রবার রাত ১০টার মধ্যে হাসপাতালের তরল অক্সিজেনের মজুদ শেষ হয়ে যায়। এরপর আমরা কেন্দ্রীয় গ্যাস পাইপ লাইনের সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংযোগ করে দিলেও, অক্সিজেনের চাপ কম থাকায় রোগীরা মারা যান।"

যাদের নিজেদের দেশে এ অবস্থা তারা আমাদেরকে কখন টিকা দেবে তার কোনও ঠিক-ঠিকানা আছে? 

পাঁচ

খবরে প্রকাশ নতুন টিকা আসতে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ লাগবে। তাহলে এখন আপনি কী করবেন? আমি যে শহরে থাকি, সে-ই সিডনিতে কোভিড রোগী নাই। নতুন কোনও সংক্রমণের খবর নাই। এটা কি কেবল জনসংখ্যা কম আর মানুষ লেখাপড়া জানে বলে হয়েছে? এটা যারা বলেন- তারা জ্ঞানপাপী। এর চাইতে ভালো শহরগুলোতে এখন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন। কানাডা-আমেরিকা-ইউরোপের শহরগুলো কোভিডে পর্যুদস্ত। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত শুরু থেকেই সরকারের সঠিক উদ্যোগ আর বলিষ্ঠতায়। যে মুহূর্তে সরকার টের পেয়েছে সীমান্ত বন্ধ করা দরকার, তখন থেকেই সীমান্ত ও আকাশ পথ সব বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি পাশের রাজ্যেও যাতায়াত ছিল বিদেশ যাত্রার মতো। মাস্ক যখন বাধ্যতামূলক ছিল, তখন না পরলেই জরিমানা হয়েছে। আমাদের দেশে শুধু কি আইন প্রয়োগকারীদের দোষ? এই সেদিন একজন ডাক্তার এবং পুলিশের ঝগড়ায় দেখলাম কেউ-কারও চেয়ে কম যান না। মৃত্যুর চাইতেও ইগো যেখানে শক্তিশালী সেখানে কে কাকে বাঁচাবেন? 

ছয়

কাজেই জীবন এখন আপনার নিজের হাতে। আয়ু আপনি সাথে করে নিয়ে এসেছেন এটা যেমন সত্য তেমনি নিজেকে মারার বিষয়টিও আপনার হাতে। জীবন দিতে না পারেন, মারতে তো পারেন। তাই আপনাকে মাস্ক পরতেই হবে। আপনাকে বাজারে যেতে হলে যাবেন কিন্তু মরার জন্য কাউকে মারার জন্য যাবেন না। আজ মানুষ সত্যি বড় অসহায়। এই মহামারীর সাথে বড়লোক ছোটলোক ধনী গরীবের কোন সম্পর্ক নাই। কোন সম্পর্ক নাই ধর্মের। রাগ বা অজ্ঞানতা বশত আমাদের নেতারা মুখে বললেও তারা জানেন- এটা আমেরিকা-ইউরোপ কেউ জানতো না। আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। 

সাত

বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। আমাদের সবার আত্মার মানুষেরা থাকেন সেখানে। এ মহামারীকে রাজনীতি ঠেকাতে পারবে না। পারবে কেবল আপনার আমার শুভবোধ আর সচেতনতা। ডাক্তার-নার্স-পুলিশ-সেবা কর্মী, যে যেখানে লড়ছেন, সবার সাথে আপনাকেও লড়তে হবে। এ যুদ্ধে জয়ী হলে আবার দুনিয়া হাতের মুঠোয় আসবে। ঘরে থাকা, সাবধানে থাকার মতো- সহজ কাজ কি করে দেখাতে পারবো না আমরা? জীবন কি এটুকু চাইতে পারেনা মানুষের কাছে? 

সিডনি

২৫.০৪.২১

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক