গবেষণা ফলাফল: নারী ধর্ষণের কারণ

মো. আরিফুল ইসলাম এবং খুরশিদ আলম
Published : 23 Nov 2020, 01:58 PM
Updated : 23 Nov 2020, 01:58 PM

দেশে নারী ও শিশুকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেই চলছে। বিআইএসআর ট্রাস্টের এক গবেষণায় (২০১৮) বাংলাদেশে নারী ধর্ষণের নানাবিধ কারণ ওঠে এসেছে। গবেষণাটিতে ১১৯ জন ধর্ষণের ভিকটিম বা তার পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও মাঠ-পর্যায়ে অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার এবং ৭টি 'কেইস স্টাডি' করা হয়েছে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ পুলিশের নথিভুক্ত মোট ২ লাখ ১৩ হাজার ৫২৯টি ফৌজদারি মামলার মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯৯৫টি, যা মোট মামলার ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে নথিভুক্ত মোট ২ লাখ ২১ হাজার ৪১৯টি মামলার মধ্যে ধর্ষণের মামলা ৩ হাজার ৯৪৯টি ছিল, যা মোট মামলার ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যদিও বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে অ-নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা অনেক বেশি। জেলা-ভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ দুই বছরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, রংপুর, ও বরগুনা জেলায় বেশি সংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে, ধর্ষণের শিকার নারীর ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ শুধু ধর্ষণ এবং বাকী ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছিলেন। 

সম্প্রতি বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করায় ভবিষ্যতে 'ধর্ষণের পর হত্যার হার' বেড়ে যেতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। শহরাঞ্চলে আবাসিক এলাকার তুলনায় বস্তিতে ধর্ষণ বেশি ঘটে। অপরদিকে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা তুলনামূলক গ্রামাঞ্চলে বেশি।

ধর্ষণ সংঘটনকারীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল। এরপরে বেশি সংখ্যক ধর্ষণের ঘটনায় ৩১ থেকে ৪০ বছর (২১ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং ১৭ থেকে ২০ বছর (১৩ দশমিক ৫ শতাংশ) বয়সীরা জড়িত ছিল।

সবচেয়ে বেশি সংখ্যক (৩৭ শতাংশ) ধর্ষণের ঘটনায় বেকাররা জড়িত ছিল। এছাড়াও ধর্ষণে জড়িতদের মধ্যে শিক্ষার্থী (১৪ দশমিক ৩ শতাংশ), ব্যবসায়ী (১৪ দশমিক ৩ শতাংশ) ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী (১০ দশমিক ৯ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী মিলে যে পরিমাণ ধর্ষণের ঘটনার সাথে জড়িত তার পরিমাণ ১১ শতাংশের মতো। তার অর্থ হচ্ছে রাজনীতি করলে ধর্ষণ করার প্রবণতা নিঃশেষ হয়ে যায় না, যদিও তারা সংগঠিত শক্তি এবং নিদিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলার কথা। আবার দেখা যায় যে, অপরাধটি সংঘটনের পর অনেক ক্ষেত্রে দোষীরা প্রচলিত শাস্তি এড়াতে রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে।

এক-চতুর্থাংশ ধর্ষণের ঘটনা রাত ৯টা থেকে ১২টা এবং প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। মে (১০ দশমিক ৯ শতাংশ), জুন (১২ দশমিক ৬ শতাংশ) ও জুলাই (১৩ দশমিক ৪ শতাংশ) মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় ধর্ষণ বেশি সংঘটিত হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ ও উষ্ণ তাপমাত্রার প্রভাব বলে মনে করা যায়।

জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মোট ধর্ষণের ৭৯ শতাংশ এককভাবে এবং ২১ শতাংশ ঘটনা সংঘবদ্ধভাবে সংঘটিত হয়েছিল। গণধর্ষণের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনায় দুই জন, ২৪ শতাংশ ঘটনায় তিন জন, ১২ শতাংশ ঘটনায় চার জন এবং প্রায় ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ বা সহায়তা ছিল। পূর্বপরিকল্পিত ধর্ষণের অধিকাংশ ঘটনাই সংঘবদ্ধভাবে ঘটেছিল।

হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো সহিংস অপরাধের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে ভিকটিম ও অপরাধীর মাঝে পূর্বপরিচয় ছিল। পরিচিতদের মধ্যে ভিকটিমের প্রতিবেশী বা এলাকার পরিচিত ছাড়াও ধর্ষণ সংঘটনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কর্মক্ষেত্রের পরিচিত, শ্বশুর বাড়ির লোকজন, নিজ পরিবারের সদস্য, স্বামী, এবং নিকট আত্মীয়দের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। ভিকটিমের পরিস্থিতিগত দুর্বলতা জানাও এ ধরনের অপরাধ সংঘটনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখে।

অপরাধ সংঘটনকালীন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিকটিম বা ভিকটিমদেরকে সুরক্ষা দেওয়ায় সক্ষম অভিভাবকের অনুপস্থিতি কিংবা নিজেরা প্রতিরোধে দুর্বল ছিল অথবা অপরাধ সংঘটনের পর দোষীদের পালানোর সুযোগ বেশি ছিল। অনেক সময় অপরাধ সংঘটনের অপরিকল্পিত সুযোগ তৈরি হয়, যেমন- হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়া। পূর্বে অপরাধ করার রেকর্ড না থাকলেও কেউ কেউ সুযোগে প্রবৃত্তিজাত প্রেরণা থেকে অপরাধটি করে ফেলে। কিছু সময় ধর্ষণের অপরাধ গোপন করার জন্য দোষীরা ভিকটিমকে বিশেষত শিশু ভিকটিমকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ফেলে। নিম্ন-আয়ের কর্মজীবী মা-বাবা উভয়ে কর্মস্থলে এবং বড় ভাই-বোন স্কুলে থাকায় দিনের বেলায় কিছু শিশুকে বাসায় একাকী অবস্থান করতে হয়। সে সব ক্ষেত্রে পাশের বাসার টিনএজ ছেলে দ্বারা শিশুটি জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে।

ধর্ষণ সংঘটনের কৌশলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বাধিক এক-তৃতীয়াংশ ঘটনায় নারীদের প্রতারণামূলক উপায়ে প্রলুব্ধ বা জোরপূর্বক অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছিল। এছাড়া অপরাধীরা নির্জন এলাকায় বা বাড়িতে ভিকটিমের একাকী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, জোরপূর্বক বাসায় প্রবেশ করে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ, এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ধর্ষণ সংঘটন করেছিল। সংখ্যায় কম হলেও শিশুদের খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা মতে, ইদানিং অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের আশ্বাস থেকে প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। পরবর্তীতে বিয়ে করতে ছেলেটির অনীহা দেখানোর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রায় ৩৭ শতাংশ ধর্ষণ সংঘটনের সময় অপরাধী বা অপরাধীরা অস্ত্র বা অন্য কোনও বস্তু ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ঘটনায় ধারালো অস্ত্র এবং চার শতাংশ ক্ষেত্রে বন্দুক ব্যবহার করা ভিকটিমকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করেছিল।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ধর্ষণ সংঘটনের অভিনব কৌশলসমূহের মধ্যে- গোপন ভিডিও বা ব্যক্তিগত ছবি ধারন করে ব্ল্যাকমেইল; ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেখার ভয় দেখিয়ে একাধিক বার ধর্ষণ; বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখানো যেমন চাকরি প্রদান, অভিনেত্রী বানানো,পরীক্ষায় ভাল ফলাফল; চলন্ত গণপরিবহনে একাকী অবস্থায় আক্রমণ উল্লেখযোগ্য।

জরিপে অংশগ্রহণকারীরা ধর্ষণ সংঘটনের যেসকল কারণ চিহ্নিত করেছেন তা হলো- কথিত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বা ক্ষোভ থেকে অপরাধীর প্রতিশোধপরায়ণতা (৪০ দশমিক ৩ শতাংশ), অপরাধীর মাদকাসক্তি (৩০ দশমিক ৩ শতাংশ), অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা (২৮ দশমিক ৬ শতাংশ), ক্ষমতা প্রদর্শন (২১ শতাংশ), পরকীয়া (২০ দশমিক ২ শতাংশ), রাজনৈতিক কারণ (১৬ শতাংশ), পূর্ব-শত্রুতা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, এবং অন্যান্য।

ধর্ষণের ভিকটিম বা তার পরিবারের সদস্যদের জানা মতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অপরাধী বা অপরাধীরা ঘটনাকালীন নেশাগ্রস্ত ছিল। অনেক সময় মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা ভারসাম্য হারিয়ে পরিবারের নারী সদস্য এমনকি নিজ কিশোরী মেয়ে বা শিশুদের প্রতি যৌন দৃষ্টি দেয়। পারিবারিক পরিসরে কোনও শিশু বা কিশোরী ধর্ষণের শিকার হলে অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি চলতে থাকে।

সাপ্তাহিক ছুটিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাত্রার পরিবর্তনের সাথে সহিংস অপরাধ বিশেষত ধর্ষণ সংঘটনের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় নতুন দম্পতি বা পর্যটকেরা অন্য কোনও এলাকায় বা নতুন স্থানে ভ্রমণকালে বিভিন্ন ধরনের সহিংস অপরাধ এমনকি ধর্ষণের শিকার হয়। স্থানীয় বখাটে যুবকেরা ইচ্ছাকৃত বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে পর্যটকদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়। এরপর সাধারণত আরও একদল যুবক মোটরসাইকেল যোগে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এসে বড় ধরনের সহিংসতা ঘটায়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত আশে-পাশের লোকজন ভয়ে ঘটনাকালীন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর সাক্ষীও পাওয়া যায় না। এমনকি মামলা তুলে নেওয়া ও আপস-মীমাংসার জন্য নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। দোষীরা এসকল স্থানে রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল না হয়ে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব দেখায়। অনেক সময় তারা সংঘবদ্ধ বাহিনীর গঠন করে নিরীহ ও অসহায় মানুষের উপর দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতন চালাতে থাকে। পেশাদার কিছু সহিংস অপরাধী ও রাজনৈতিক দলীয় ক্যাডার তাদের আধিপত্য এলাকা বা পর্যটন জোনের ভেতর এমন আচরণ করে যে তারা রাষ্ট্রের ভেতর একটি মিনি (ছোট) রাষ্ট্র গঠন করেছে।

তাই উপর্যুক্ত তথ্যগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আর তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে লক্ষভিত্তিক কমর্সূচি গ্রহণ করতে হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক