১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অন্যের অপমান ‘মজা’ নয়: বুলিংয়ের মনস্তত্ত্ব ও সমাজের দায়বদ্ধতা

বুলিং কেবল ভুক্তভোগী ও অপরাধীর বিষয় নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ ও সামাজিক মানসিকতার বড় পরীক্ষা।

অন্যের অপমান ‘মজা’ নয়: বুলিংয়ের মনস্তত্ত্ব ও সমাজের দায়বদ্ধতা
অপমানিত হওয়ার দাগ সহজে মোছে না; প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ যেখানে সে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবে। প্রতীকী ছবি

এটিএম মহিবুল্লাহ এটিএম মহিবুল্লাহ

Published : 25 Aug 2026, 11:01 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে জোর করে চুল কাটিয়ে অপমান করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণ তদন্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—একটি শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব আসলে কার? আর এর পেছনে আরও বড় প্রশ্ন, ‘মজা’, ‘দুষ্টুমি’ বা ‘শাসন’ ইত্যাদি নামে আমরা কত অপমানজনক আচরণকে স্বাভাবিক করে তুলেছি।

বন্ধুদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা স্বাভাবিক, কিন্তু সুস্থ রসিকতা আর বুলিং এক নয়। যেখানে দুজনেরই স্বাচ্ছন্দ্য থাকে, সেখানে মজা থাকতে পারে; কিন্তু একজনের আনন্দ যদি অন্যজনের অপমানের কারণ হয়, সেটি আর মজা থাকে না। এই অপমান কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে আছে গোটা সমাজে।

আমরা মাঝেমধ্যেই কিছু আপত্তিকর ঘটনা ঘটতে দেখি। অনেকে জোর করে বাউল-ফকিরদের চুল-দাড়ি কেটে দেয়। না বুঝেই তাদের পোশাক-আশাক ও বিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়। কেউ আবার অন্যের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে হাসাহাসি করে। গায়ের রং, চেহারা বা তোতলানো নিয়ে বিদ্রূপাত্মক নাম দেওয়া হয়। কেবল দর্শকের মনোযোগ পাওয়ার জন্য কাউকে অপমান করে ভিডিও বানানো হয়। এসব কাজকে ‘মজা’ বলা হলেও এগুলো আসলে নিষ্ঠুর বুলিং।

আশপাশের মানুষের আচরণে এই সমস্যা আরও বাড়ে। তারা বিষয়টি দেখে হাসে, ভিডিও করে এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে বুলিংকারী একা থাকে না। তার সঙ্গে একটি বড় দর্শকগোষ্ঠিও যুক্ত হয়ে যায়।

অপমানকে বিনোদন ভাবার এই অভ্যাস শিশুরা একদিনে শেখে না। বড়দের আচরণ থেকেই তারা এসব শেখে। চারপাশের রসিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যম দেখে তারা বুঝতে শেখে কাকে নিয়ে হাসাহাসি করা যায়।

এই অপমান তুচ্ছ কিছু নয়, এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বারবার হেয় হওয়া শিশু ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারায়, নিজেকে গুটিয়ে নেয়, স্কুল বা মানুষের সঙ্গ এড়াতে শুরু করে। কেউ কেউ বছরের পর বছর সেই অপমানের বোঝা বয়ে বেড়ায়, যা তার পড়াশোনা, সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ ছাপ ফেলে। ‘বাচ্চাদের ব্যাপার, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে’ বলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখলে এই গুরুতর ক্ষতিটাই আমরা অগ্রাহ্য করি।

বুলিং তাই কেবল ভুক্তভোগী আর বুলিংকারীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সংস্কৃতি। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান কেবল পরীক্ষার ফল বা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না; আরও জরুরি প্রশ্ন, একজন দুর্বল, নতুন বা একা শিক্ষার্থী সেখানে কতটা নিরাপদ। প্রতিটি ঘটনায় বুলিংকারী ও ভুক্তভোগীর বাইরে একটি তৃতীয় পক্ষও থাকে, যারা তা দেখে; কেউ হাসে, কেউ চুপ থাকে। এই নীরবতা বুলিংকে আরও শক্তিশালী করে, কারণ বুলিংকারী বুঝে নেয় তার আচরণের বিরুদ্ধে সামাজিক বাধা নেই। প্রত্যক্ষদর্শীর সরাসরি সংঘাতের মধ্যে জড়ানো উচিত নয়, তবে নিরাপদে শিক্ষক বা দায়িত্বশীল কাউকে জানানো এবং ভুক্তভোগীকে একা না রাখাও এক ধরনের সাহস। যে শিক্ষার্থী জানে তাকে অপমান করলে কেউ পাশে দাঁড়াবে না, সে কেবল বুলিংয়ের নয়, নীরবতারও শিকার হয়।

ডিজিটাল যুগে এই অপমান আরও দূর পর্যন্ত পৌঁছায়। শ্রেণিকক্ষে কয়েকজনের সামনে হওয়া হেনস্তা অনলাইনে মুহূর্তে বহু মানুষের কাছে ছড়িয়ে যায়, আর একটি পোস্ট মুছে ফেললেও তার স্ক্রিনশট থেকে যেতে পারে। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ শেখানো দরকার, কারণ অনলাইনে স্বাধীনতা মানে অন্যকে অপমান করার স্বাধীনতা নয়।

এই দায় ঘর থেকেই শুরু। বুলিংয়ের শিকার শিশু সবসময় মুখ ফুটে কিছু বলে না; তার আচরণেই বদল আসে—স্কুলে যেতে অনীহা এবং পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। তাই অভিভাবকের প্রথম কাজ বিচার নয়, মন দিয়ে শোনা; ‘তুমি কী করেছিলে’র আগে জানতে চাওয়া ‘তোমার সঙ্গে কী হয়েছে’। যে শিশু বিশ্বাস করে বড়দের বললে তাকে দোষ না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো হবে, সে-ই কেবল সমস্যাটা খুলে বলতে পারে; আর যত আগে বিষয়টি ধরা পড়ে, ক্ষতি তত কম হয়। শিক্ষকও কেবল পাঠদানকারী নন, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশের অন্যতম নির্মাতা; কোনো শিক্ষার্থী বারবার হাসির পাত্র হচ্ছে কি না, সেদিকে তাকে খেয়াল রাখতে হয়। প্রতিটি মতবিরোধকে বুলিং বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ‘শিশুদের ব্যাপার’ বলে সব এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। আর অভিযোগ এলে প্রতিষ্ঠানে একটি স্পষ্ট প্রক্রিয়া থাকা দরকার, যেখানে বুলিংয়ের সংজ্ঞা, অভিযোগের পথ, গোপনীয়তা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিশোধ ঠেকানোর নিশ্চয়তা থাকবে। কারণ অভিযোগ করার পর শিক্ষার্থীকে যদি উল্টো ভয় দেখানো হয়, তবে কোনো নীতিমালাই কাজ করে না।

গুরুতর এবং পুনরাবৃত্ত বুলিংয়ে জবাবদিহি অবশ্যই দরকার, তবে কেবল শাস্তি দিয়ে বুলিং বন্ধ হয় না। প্রতিরোধ শুরু হতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকেই—অন্যকে সম্মান করা, ভিন্নতাকে গ্রহণ করা আর মতবিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে মেটানো শিখিয়ে; প্রয়োজনে ভুক্তভোগী ও বুলিংকারী দুজনের জন্যই মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বুলিংকারীর আচরণ যে ভুল তা স্পষ্ট করেও তাকে চিরস্থায়ীভাবে ‘খারাপ’ বলে দাগিয়ে না দিয়ে বদলানোর সুযোগ রাখতে হবে। অনেক সময় যে শিশু বুলিং করে, সে নিজেও কোনো না কোনোভাবে কষ্টে থাকে, তাই কেবল শাস্তি নয়, তার আচরণের কারণ বোঝাও জরুরি। আসল প্রশ্নটা মানসিকতার। আমরা সন্তানকে ভালো ফল করতে আর প্রতিযোগিতায় জিততে শেখাই, কিন্তু অন্যকে সম্মান করার শিক্ষা কি একই গুরুত্বে দিই? একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রথম হয়েও যদি অন্যকে অপমান করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে শেখে, সেই শিক্ষায় বড় ঘাটতি থেকে যায়, কারণ শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও।

কালীগঞ্জের শিশুটির চুল হয়তো আবার গজাবে, কিন্তু সবার সামনে অপমানিত হওয়ার স্মৃতি অত সহজে মুছবে না। আমরা এমন এক সংস্কৃতি চাই, যেখানে শক্তিশালী হওয়া মানে দুর্বলকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়, দুর্বলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যের কান্নার বিনিময়ে তৈরি হাসিকে ‘মজা’ বলা বন্ধ হোক। কোনো শিশু যখন বলে ‘আমাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে’, তখন প্রথমেই তাকে বিশ্বাস করার মতো একজন মানুষ হয়ে ওঠা জরুরি, কারণ একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা কেবল তার অধিকার নয়, একটি সভ্য সমাজের দায়িত্বও।

এটিএম মহিবুল্লাহ শিক্ষক ও লেখক। ই-মেইল: mohibshamim97@gmail.com