১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আদিবাসী নেই’: বিতর্ক উসকে দেওয়ার নেপথ্যে কী?

‘আদিবাসী নয়, সকলেই অধিবাসী’—মন্ত্রীদের এই বয়ান কি ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ, নাকি কলোনিয়াল মানসিকতার পুনরাবৃত্তি?

‘আদিবাসী নেই’: বিতর্ক উসকে দেওয়ার নেপথ্যে কী?
আত্মপরিচয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার আদিবাসী জাতিগোষ্ঠির প্রতিনিধিরা।

পাভেল পার্থ পাভেল পার্থ

Published : 15 Aug 2026, 03:24 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

‘আমরা সকলেই বাংলাদেশের অধিবাসী এবং বাংলাদেশি’ বক্তব্যটি সঠিক এবং এতে বাংলাদেশের কোনো বর্গের আপত্তি নেই। কিন্তু বাংলাদেশে ‘আদিবাসী নেই’ অংশটুকু এক ঐতিহাসিক ভুল।

‘আদিবাসী পরিচয়’ নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও তথ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য পুরনো এক কার্বন-কপি বাইনারিকে উসকে দিয়েছে আবার। তারা বলেছেন, ‘আমরা সকলেই বাংলাদেশের অধিবাসী, এখানে কোনো আদিবাসী গোষ্ঠি নেই’। ঢাকায় ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাকটস রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব তারা বলেন।

মন্ত্রীদের বক্তব্যে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে দেশের আদিবাসী সংগঠনসমূহ। তবে এ তর্ক নতুন কিছু নয়, এক ঐতিহাসিক কলোনিয়াল লিগাসির নমুনামাত্র। ক্ষমতাকাঠামোর উপস্থাপন রাজনীতির অমীমাংসিত ভঙ্গি।

জাতিরাষ্ট্র, জাতিসংঘ বা অন্যান্য এজেন্সি তৈরির বহু আগে থেকেই ‘আদিবাসী পরিচয়টি’ বহুল প্রচলিত ও ঐতিহাসিকভাবে সমাজস্বীকৃত।

রাষ্ট্র জবরদস্তি করে জনইতিহাস পাল্টে দিতে পারে না। গণঅভ্যুত্থানের রক্তদাগ লাগা নির্বাচিত সরকার কি আগের রেজিমগুলোর মতো আদিবাসী আত্মপরিচয় নিয়ে একই বাহাদুরি করতে পারে? আদিবাসী, বাঙালি, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দু পরিচয়ের পাতা দিয়ে একটি ইনক্লুসিভ গাছ আঁকা হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের এই সিগনেচার গ্রাফিতির আওয়াজ ছিল ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’। কিন্তু গাছ থেকে আদিবাসী পাতাটি ছেঁড়ার তুলকালাম রক্তকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। একইসঙ্গে জনগণ সেই তুলকালাম রুখেও দাঁড়িয়েছিল। মন্ত্রীদ্বয় কেন হাইবারনেশন থেকে এক অযথা জাত্যাভিমানী তর্ককে আবারো সামনে আনলেন? এই প্রবণতা প্রমাণ করে মানুষ রক্ত দিয়ে রেজিম বদলালেও ক্ষমতার বয়ান বদলায় না।

‘আদিবাসী’ ও ‘আদিবাসিন্দা’ পরিচয়কে অনেকে একই অর্থে গুলিয়ে ফেলেন—যদিও এরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন অর্থ বহন করে এবং এই গুলিয়ে ফেলার চলও খুব বেশিদিনের নয়। তবে পরিচয় নির্মাণের এই হেজিমনি আবার খুব পোক্তও নয়। তাই ক্ষমতার বলয়কে উপজাতি, আদিবাসী, নৃগোষ্ঠি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠি, পাহাড়ি, অ্যাবোরজিনাল, এথনিক মাইনরিটি, এথনিক রেস বা ট্রাইবালের মতো বহু শব্দ আমদানি করতে হয়েছে। জোর করে এসব বাইনারি পরিচয় চাপিয়ে দিলেও পরে তা নানাভাবে বাতিল হয়েছে। যেমন, সংবিধানে থাকলেও ২০২৬ সালের বিএনপি কিংবা এনসিপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘উপজাতি’ শব্দটি নেই। আবার সংবিধানে না থাকলেও সরকারিভাবে সর্বাধিক ব্যবহৃত পরিচয়টি হলো ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি’।

নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি ‘নৃগোষ্ঠি এবং নৃজাতি’ শব্দগুলো ব্যবহার করলেও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ ২০২৫’ প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি জরিপ ২০২৬’।

আদিবাসীদের কী নামে ডাকব, এ নিয়ে রাষ্ট্র দেশ স্বাধীনতার পর থেকেই সিদ্ধান্তহীন ও বলপ্রয়োগকারী।

আমাদের মাননীয় মন্ত্রীরা দুই দিন পরপর ‘কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের’ মতো দেশে ‘আদিবাসী আবিষ্কারের’ উসকানি দেন, তা রাষ্ট্রের মানবিক মর্যাদা ও বহুত্ববাদের প্রবাহকে ক্ষুণ্ন করে। পতিত রেজিমের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেছিলেন, আদিবাসীরা আর্য। তখনকার শিক্ষামন্ত্রীও বলেছিলেন, দেশে আদিবাসী নাই। সকল রেজিমে মন্ত্রীদের এই নিরলস ‘আদিবাসী আবিষ্কার’ আদিবাসী জীবনে ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, ভয়ের সংস্কৃতি, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষয় থামাতে পারেনি। বরং আমাদের প্রিয় মন্ত্রীগণ বর্মাছড়ায় ভেরোনিকা ও খ্রিষ্টিনা কেরকেটা বা বান্দরবানের ৫ জন রেংমিটচ্যু ভাষাভাষীদের পাশে দাঁড়াতে পারতেন। তাতে দেশ থেকে খাড়িয়া ও রেংমিটচ্যু ভাষা হারিয়ে যেত না। কিংবা রাষ্ট্র যেভাবে ফুটবলার স্মৃতি কিসকুর পাশে দাঁড়িয়েছে, এই তৎপরতা বাড়াতে হবে। আদিবাসী ভূমিদখল, স্থাননাম পরিবর্তন, প্রাণ-প্রকৃতির বিনাশ, দশাসই উন্নয়নকে প্রশ্ন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবার জন্যই আমরা মন্ত্রীদের নির্বাচন করি। কোনো কলোনিয়াল লিগাসি টানা বা বাইনারি বিতর্ক উসকে দেওয়ার জন্য নয়।

রাষ্ট্র বহু বিচিত্র পরিচয় আমদানি করলেও একমাত্র ‘আদিবাসী’ পরিচয়টিই হারিয়ে যায়নি। এমনকি রাষ্ট্রের বহু নথি ও দলিলেও তা স্বীকৃত। আদিবাসী আত্মপরিচয় প্রশ্নে লম্বা সময় ধরে আমরা সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ ও সাক্ষ্য হাজির করে চলেছি। চলতি আলাপখানি সেই সাক্ষ্যেরই এক পরম্পরা এবং বারবার এই বিতর্ক উসকে দেওয়ার নেপথ্যে কী সেটা জানার চেষ্টা।

‘আদিবাসী’ পরিচয় ব্যবহারের এক ধারাবাহিক নির্ঘণ্ট

কোল, ভীল, মুণ্ডা, মুসহর, কড়া, কডা, ওঁরাও, বেদিয়া, মাহাতো, পাহাড়িয়া, কন্দ, খাড়িয়া, কোচ, লোহার, হদি, মান্দি, হাজং, ডালু, বানাই ইত্যাদি জাতিসত্তা বাঙালি ও নিজেদের ভেতর আদিবাসী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। মুসহর, কোল, কডা, মুন্ডা পাড়া না বলে বাঙালিরা বলে ‘আদিবাসী পাড়া’। ‘আদিম’, ‘অপর’, ‘অসভ্য’ কিংবা ‘বন্য’ বোঝাতে বাঙালিদের মতো গরিষ্ঠবর্গের আয়নায় ‘আদিবাসী’ শব্দটি দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হলেও, সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় আদিবাসী সমাজ এই প্রত্যয়কে এক সাংস্কৃতিক একক বর্গীয় পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। ‘সাঁওতাল পরগণা অ্যাক্টে (১৮৫৫)’ সাঁওতালদের ‘আনসিভিলাইজড রেস’ বলা হয়েছিল। বেশকিছু ঔপনিবেশিক দলিলে আদিবাসীদের ‘ক্রিমিনাল ট্রাইব’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। আমরা চলতি অংশে ধারাবাহিকভাবে দলিল, নমুনা ও প্রমাণ-সাক্ষ্যের ভেতর দিয়ে আদিবাসী পরিচয় ব্যবহারের ঐতিহাসিক খতিয়ান টানব।

হাতিখেদা বিরোধী আন্দোলন (১৮৪০), হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), উলগুলান (১৯০০), টংক বিদ্রোহ (১৯৪০), তেভাগা (১৯৪৫), ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলন (২০০৪) কিংবা ফুলবাড়ি কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের (২০০৬) স্থানীয় ইতিহাস বয়ানের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী পরিচয়ের’ হদিশ মেলে।

‘ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে (১৯০৯)’ ‘অ্যাবোরজিনাল’ শব্দটি আছে। ১৯২১ সালে চা-বাগানের অন্যায় জুলুমের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘মুলুকে চল’ আন্দোলনের সময়েও ‘বাগানি আদিবাসী’, ‘কুলি আদিবাসী’ শব্দের চল ছিল। ১৯২০ সালে বর্তমান ভারতের ‘ছোটনাগপুর উন্নতি সমাজের’ পত্রিকায় ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার আছে। বাংলা একাডেমির ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানের (২০১৩)’ প্রথম খণ্ডে ১৯৪১ সালে প্রকাশিত আজাদ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ করে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘আদিবাসিন্দা’। বাংলা একাডেমির অভিধানের ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়নটি আদিবাসী আত্মপরিচয়ের জায়গা থেকে ভুল এবং এই ব্যাখ্যাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ভেতর আরো বেশি বর্ণবাদী জাত্যাভিমানী প্রবণতা প্রকট করে।

ব্রিটিশ উপনিবেশের আগে-পরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের বহু স্কুলের নামে ‘আদিবাসী’ শব্দটি আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর কলেরা মহামারির সন্ধিক্ষণে ১৯৪৪ সালে নওগাঁর বদলগাছিতে ‘পাহাড়পুর/সোমপুর বৌদ্ধ বিহারের’ কাছে নির্মিত হয় ‘পাহাড়পুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়’। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের মহেশপুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়, শেরপুরের শ্রীবরদীর বাবেলাকোনা আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের খৈচালা আদিবাসী রেজি. বে. প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিনাজপুরের কাহারোলের সাধনা আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বটতুলী আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নওগাঁর ধামইরহাটের সোনাদিবী আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোনো সংগঠন, বিদ্যায়তন, জাতিসংঘ, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বা ডিপস্টেট কেউ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এমন সব শিক্ষালয় গড়ে তোলেনি। আদিবাসী নাম নিয়ে এসব বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে একেবারেই স্থানিক সামাজিক তৎপরতা হিসেবে, যার একটি বড় অংশই ছিল বাঙালি সমাজের সহযোগিতা।

ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিতে Indigenous hillman পরিচয়টি আছে। The Indian Income Tax Act of 1922, The Indian Finance Act of 1941, The Forest Act of 1927-এ Indigenous hillman আছে। ১৯৫০ সালে ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে’ সাঁওতাল, মুন্ডা, বানাই, ডালু, হদি, পাহাড়িয়া ইত্যাদি জাতিসমূহের নাম উল্লেখ করে ‘অ্যাবোরিজিনাল’ পরিচয়টি ব্যবহার করা হয়েছে। এই আইনটি এখনো কার্যকর, এই আইনে উল্লিখিত জাতিসত্তার জমি জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বিক্রয় ও হস্তান্তরযোগ্য নয়।

১৯৬২ সালে কাঁটাতারের ঘেরাও টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে যখন জাতীয় উদ্যানের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে তৈরি দাবিনামার শুরুতেই মান্দি-কোচ জনগোষ্ঠি লেখেন ‘আমরা মধুপুর গড়ের আদিবাসী জনগণ’। বাংলায় বাঙালির লেখা প্রথম আদিবাসী বিষয়ক এথনোগ্রাফি আবদুস সাত্তারের ‘আরণ্য জনপদে’। বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত বইটির ভূমিকায় লেখক লিখছেন, ‘...আদিবাসীদের সম্পর্কে মাত্র কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা আসলে কিছুই নয়, এ ব্যাপারে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।’ যদিও লেখক একইসঙ্গে বইটিতে ‘উপজাতি’ এবং ‘আদিবাসী’ উভয় পরিচয়কেই ব্যবহার করেছেন।

আমরা দেখতে পাই ঔপনিবেশিক আমল, দেশভাগ ও পাকিস্তান আমলে আদিবাসী পরিচয়ের বহুল ব্যবহার। নওগাঁর ধামইরহাটের জগদল আদিবাসী স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন দেশে, ১৯৭২ সালে। ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে প্রথম কোনো জনপ্রতিনিধির বয়ানেও আমরা এই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি দেখি। ১৯৭২ সালে গণপরিষদে দাঁড়িয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও বলেছিলেন, “...আমরা বাঙালি নই, আমরা অনেকে চাকমা, মারমা, সংবিধানে সকল জাতিসত্তার পরিচয় নাই।”

১৯৮৪ সালে প্রকাশিত আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের ‘শালবনের রাজা’ গল্পে ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি আছে। একই সালের আয়কর অধ্যাদেশের ষষ্ঠ তফশিলের ২৭ নং অনুচ্ছেদে তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি জনগণকে আদিবাসী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ২০০২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকল্প কর্মসূচি সংক্রান্ত নীতিমালায় আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিধি ১ শাখা ১৪৩ নং স্মারকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আদিবাসী পরিচয়টি দেশের বহু আদিবাসী সংগঠনের নামে আছে, যাদের অনেকে তৈরি হয়েছে পাকিস্তান আমলে এবং অনেকে দেশ স্বাধীনের পর। টাঙ্গাইলের ‘জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালে এবং রাজশাহীতে ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে।

২০০৩ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের আদিবাসী দিবসের প্রকাশনা ‘সংহতি’তে (৯/৮/২০০৩) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা ‘আদিবাসী’ উল্লেখ করে বাণী দিয়েছেন। ২০০৫ সালের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রেও আদিবাসী শব্দটি সংযুক্ত হয়েছিল। ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে জানানো হয় দেশে কোনো আদিবাসী নেই। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো ১৯ এপ্রিল ২০০৬ তারিখের চিঠিতে আদিবাসী শব্দটির পরিবর্তে ‘উপজাতি’ লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়, দেশে উপজাতি আছে কিন্তু আদিবাসী নেই।

জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০), ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন (২০১০) এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি (২০১১) ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ রাষ্ট্র দুটি নীতিতে আদিবাসী শব্দটি বহাল রেখে একই সালের ২৮ জানুয়ারি ‘আদিবাসী’ সম্বোধন না করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে উপজাতি, নৃগোষ্ঠি, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ইত্যাদি পরিচয় যুক্ত হয়। ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত এক বার্তায় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী দেশের আদিবাসী জনগণকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় না দেওয়ার কথা বলা হয়। ২০২২ সালের ১৯ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে টেলিভিশন টকশোতে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার না করার জন্য একটি নির্দেশনা জারি করা হয়।

জাতিসংঘ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা

বাংলাদেশে যারা আদিবাসী আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করেন, তারা এই পরিচয়ের সঙ্গে বহু কল্পকাহিনি ও বানোয়াট গুজব প্রতিষ্ঠা করে চলেন। তার প্রধানতমটি হলো এই পরিচয় জাতিসংঘের দেওয়া। অথচ চলতি লেখাতেও আমরা প্রমাণসহ হাজির করেছি, জাতিসংঘ জন্মের বহু আগে থেকেই এই পরিচয় সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আরেকটি গুজব এবং বানানো উসকানি হলো আদিবাসী পরিচয় দিলে দেশ টুকরো হয়ে যাবে।

আদিবাসী ভূমি, আত্মপরিচয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার কনভেনশন ১০৭ (১৯৫৭) এবং আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (১৯৮৯)—এ দুটি সনদ বহুল আলোচিত। এর ভেতর ১০৭ বাংলাদেশ অনুসমর্থন করলেও এখনো ১৬৯ অনুসমর্থন করেনি। উভয় কনভেনশনই আদিবাসীদের বৈষম্যহীন, সমঅধিকার এবং প্রতিনিধিত্বশীল অংশগ্রহণ নীতির কথা বলে।

জাতিসংঘ ১৯৯৩ সালে আদিবাসী বর্ষ, আদিবাসী দিবস ও আদিবাসী দশক ঘোষণার পাশাপাশি আদিবাসী বিষয়ক মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (২০০৭) এবং স্থায়ী ফোরামের পাশাপাশি প্রাণবৈচিত্র্য, পরিবেশ সুরক্ষা, লোকায়ত জ্ঞান ও জলবায়ু সুরক্ষার বহু আন্তর্জাতিক দলিল পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য আদিবাসী ন্যায্যতার প্রশ্নকে বৈশ্বিকভাবে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ (১৯৯২) কিংবা প্যারিস জলবায়ু চুক্তি (২০১৫)-সহ বহু দলিল যাতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর ও সমর্থন করেছে, তাতে আদিবাসী অধিকারের অঙ্গীকার আছে।

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ ভাগ আদিবাসী মানুষেরা কোনো প্রকল্প বা সহযোগিতা ছাড়া নিজেরাই পৃথিবীর মোট প্রাণবৈচিত্র্যের ৮০ ভাগ রক্ষা করেন। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী আদিবাসীরা প্রায় ৭,০০০ ভাষায় কথা বলেন। ‘আদিবাসী নাই’ এই কথার মরমার্থ হলো পৃথিবীতে বন, পাহাড়, বাস্তুতন্ত্র, বন্যপ্রাণী, নদী, ভাষা, লোকায়ত বিজ্ঞান, শস্যফসলের বৈচিত্র্যের ধারাবাহিকভাবে মৃত্যু। জাতিসংঘ আদিবাসীদের কোনো একক সংজ্ঞা দেয়নি। বরং সাতটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে আদিবাসীরা নিজেরাই নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করবেন—এই নীতিকে সমর্থন করেছে। আত্মপরিচয়ের অধিকার, প্রাক-উপনিবেশ থেকে জাতিরাষ্ট্র গঠন সকল পর্বে ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং সম্পর্ক, ভূমি ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক সম্পর্ক, স্বতন্ত্র সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রথাগত শাসন কাঠামো, স্বতন্ত্র ভাষা-সংস্কৃতি-জ্ঞানব্যবস্থা, বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে অতিপ্রান্তিক ও অপ্রভাবশালী অবস্থান এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের যৌথ সামাজিক মালিকানার নীতিকে ধারণ করা। ‘আদিবাসী’ মানে কে কোথায় আগে এসেছে নাকি পরে এসেছে কিংবা কার নাক চ্যাপ্টা নাকি থুতনি গোল বা ভুরু কোঁচকানো বা কে ঝোল না ভর্তা খায়—এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এসব অতি অবৈজ্ঞানিক ও জাতদেমাগী প্রবণতা পৃথিবীতে বহু আগেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে বাতিল হয়েছে। কেবল আদিবাসী বা বাঙালি নয়; সকল জাতির আত্মপরিচয় তার ঐতিহাসিকতার পরম্পরা। মন্ত্রী মহোদয়গণ আশা করি এসব পরম্পরাকে অস্বীকার করবেন না।

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যাটা জরুরি

‘আদিবাসী আবিষ্কারে’ অবদান রাখা জনপ্রতিনিধিদের সামনে ২০০৩ সালের একটা দলিল হাজির করছি। বিএনপি তখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদিবাসী দিবসের শুভেচ্ছা বাণীতে লিখেছিলেন, “আমাদের জনগোষ্ঠিরই একটি অংশ আদিবাসী, যারা মুক্তিযুদ্ধসহ দেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছে, আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় সম্পদ।” এমনকি ২০১৯ সালে বিএনপির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেওয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটুকু মনোযোগ দিয়ে পাঠ করার আহ্বান জানাচ্ছি। সেখানে দারুণভাবে জাতিসত্তা ও জাতীয়তা এবং আত্মপরিচয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া আছে।

আসলে এই আত্মপরিচয়ের সংকটটি রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আর এর লিগাসি টানছে সকল রেজিম। শেখ মুজিবুর রহমান সকল আদিবাসীদের ‘বাঙালি’ হয়ে যাওয়ার যে দাম্ভিক জাত্যাভিমানী আহ্বান জানিয়েছিলেন, আজ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীরাও সেই লিগাসিই টানছেন।

কী ঘটেছিল ১৯৭২ এবং ২০১১ সালে যখন সংবিধান তৈরি ও সংশোধন ঘটেছিল? ১৯৭২ সালের গণপরিষদ বিতর্কে তৎকালীন সাংসদ সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী জনাব মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বলেছিলেন, একটি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চাইতে একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিক মর্যাদাজনক নয়? সেই নেতাই দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর আবার জাতীয় সংসদে ২০১১ সালে দেশের আদিবাসী জনগণকে ‘উপজাতি’ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য প্রস্তাব পেশ করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে ‘বাংলাদেশ বহু জাতির দেশ’ এমন বাক্য প্রস্তাব করে দেশের আদিবাসী-বাঙালিসহ সকলের জাতিগত আত্মপরিচয়কে অন্যভাবে অস্পষ্ট করে তোলা হয়েছে।

সময় বদলায়, চিন্তা বদলায়, সমাজ বদলায়, ভাষা বদলায়, দেশ বদলায়। তবে ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি কোনো নিছক ভাষিক সংবেদনশীলতার বিষয় নয়। এটি এক ঐতিহাসিক বহুল চর্চিত ও সামাজিকভাবে বোধগম্য কিছু জাতিগোষ্ঠির পরিচয়। যারা কোনো জাতিরাষ্ট্র গঠন কিংবা ঔপনিবেশিক শোষণের বহু আগে থেকেই কোনো ভূগোলে বসবাস ও বিস্তার করে এসেছেন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি মান্য করেও এখনো অবধি প্রথাগত শাসনকাঠামোর মাধ্যমে সমাজ পরিচালিত করে আসছেন এবং যারা সামাজিক মালিকানার বোধ নিয়ে প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় অবদান রাখবার ভেতর দিয়ে এক বিশ্ববীক্ষা ধারণ করে চলেছেন—এমন জাতিগোষ্ঠির একক সামাজিক শ্রেণি পরিচয় ‘আদিবাসী’।

রাষ্ট্র কিংবা মূলধারার মনোজগতে কার কাছে কীভাবে আজ হঠাৎ কেন এই প্রত্যয়খানি এতো অচেনা, অনৈতিহাসিক এবং সাংঘর্ষিক হয়ে উঠল? এর প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে ফায়সালা করতে হবে। আদিবাসী প্রত্যয় ব্যবহার তর্কের একটা সমাধান দরকার। বিশেষ করে রাষ্ট্রের তরফ থেকে এর একটা গ্রহণযোগ্য, সংবেদনশীল, ঐতিহাসিক ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাসহ আদিবাসী আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি জরুরি।

পাভেল পার্থ লেখক ও গবেষক। ই-মেইল: animistbangla@gmail.com

দেশে 'আদিবাসী গোষ্ঠী নেই', সবাই 'অধিবাসী': স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘দেশে আদিবাসী গোষ্ঠী নেই’: দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ আদিবাসী পরিষদের