১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ডোমেইন নলেজই কী আমাদের বাঁচাবে?

চাকরি হারানোর ভয় নাকি ব্যবসার সুযোগ? এআই যুগে বিজয়ী হবে কে?

ডোমেইন নলেজই কী আমাদের বাঁচাবে?
সঠিক ডোমেইন নলেজের সঙ্গে এআই টুলের ব্যবহারে ব্যবসার অমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। ছবি: এআই

রকিবুল হাসান রকিবুল হাসান

Published : 14 Aug 2026, 12:42 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

ঢাকায় আজকাল এআই নিয়ে অনেক ইভেন্ট হচ্ছে। সত্যিই ভালো লাগছে, কারণ সবার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সবাই নিজের ব্যবসার সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন। সপ্তাহে অন্তত দু-তিনটি এমন আয়োজনে যাচ্ছি। কখনো হয়তোবা ছোট একটা অফিসের কনফারেন্স রুমে, কখনো বড় হোটেলের হলে। জায়গা যাই হোক, প্রশ্নগুলো প্রায় একই রকম।

ভালো দিক হচ্ছে, ব্যবসার ওয়ার্কফ্লোগুলোকে কীভাবে অপটিমাইজ করা যায়, সেটা নিয়ে রীতিমতো পিএইচডি লেভেলের আলোচনা চলছে। মানুষ এখন আর শুধু ‘এআই কী’ জিজ্ঞেস করছে না; জিজ্ঞেস করছে, "আমার নির্দিষ্ট সমস্যায় এটি কীভাবে কাজে লাগবে?"

তবে সবার মধ্যে কেন যেন একটা শঙ্কা কাজ করছে। এই শঙ্কাটা বুঝতে পারি। নতুন কিছু এলে ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক; বিশেষ করে যখন খবরের কাগজে প্রতিদিন লেখা আসছে, এআই এই চাকরি খাবে, ওই চাকরি খাবে। কিন্তু আমি একটা কথা বারবার বলি—যার যে পেশায় ডোমেইন নলেজ আছে, তিনিই শেষমেশ জিতবেন।

মানে ধরুন, আপনি টেক্সটাইল ব্যবসায় আছেন বিশ বছর। ফ্যাব্রিকের কোয়ালিটি বোঝেন, বায়ারের মন বোঝেন, সাপ্লাই চেইনের প্যাঁচ বোঝেন—এই বোঝাটাই আপনার আসল পুঁজি। এই পুঁজিটা কিন্তু কোনো বইয়ে লেখা নেই, কোনো কোর্সে শেখানো হয় না। এটি তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ভুল করে, শিখে, আবার ভুল করে। এই অভিজ্ঞতা কোনো এআই মডেল রাতারাতি বানাতে পারবে না।

এআই এখানে কী করছে? এআই আপনাকে নতুন জ্ঞান তৈরি করে দিচ্ছে না; এআই আপনার হাতে থাকা জ্ঞানটাকে দ্রুত কাজে লাগানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। তাই যে ব্যবসার মালিক (কিংবা যেকোনো বিজনেস ইতিনিটের হেড) এআই ঠিকঠাক ব্যবহার করতে শিখবেন, তাকে আটকানো মুশকিল হয়ে যাবে। কারণ তার কাছে দুটোই আছে—ডোমেইন নলেজ, আর সেটাকে গতি দেওয়ার টুল। আর সেই টুলটাই তাকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে দেবে।

উল্টো দিকটাও ভাবুন। যার শুধু এআই টুল চালানো জানা আছে, কিন্তু আসল ব্যবসাটা বোঝেন না, তিনি বেশি দূর যেতে পারবেন না। আমি দেখেছি, শুধুমাত্র টুল দিয়ে ভালো প্রশ্ন করা যায় না। অথচ ভালো প্রশ্নটা তৈরি না হলে ব্যবসা দাঁড়াবে না। এআইকে যত ভালো প্রশ্ন করবেন, তত ভালো উত্তর পাবেন। কিন্তু ভালো প্রশ্ন তৈরি করার জন্য আগে সমস্যাটা গভীরভাবে বুঝতে হয়।

আমি এক সময় চাকরি করেছি, কিন্তু এখন ব্যবসা চালাচ্ছি বলে দেখছি—ভালো প্রশ্নটা তৈরি হয় ডোমেইন নলেজ থেকে। চাকরিতে থাকতে এই জিনিসটা এত স্পষ্ট বুঝতাম না। এখন বুঝি, কারণ প্রতিদিন নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটি যে কত বড় শক্তি, যারা ব্যবসা করছেন তারাই জানেন। এটা ঠিক যে, যিনি ব্যবসা বোঝেন, তিনি কোনো না কোনোভাবে এআইকে সঙ্গে নিয়ে নেবেন। দেরিতে হোক বা তাড়াতাড়ি, তিনি ঠিকই রাস্তা খুঁজে বের করবেন। এই কারণেই আমি বিজনেস হাউজগুলোকে প্রায় বিনামূল্যে পরামর্শ দিই—টাকার জন্য নয়। কারণ আমি বিশ্বাস করি, তারা জিতলে আমরাও একসময় জিতব।

দেশের অর্থনীতি তো আসলে এই ব্যবসায়ীদের হাতেই চলে। তারা যদি এআই দিয়ে নিজেদের কাজ আরও ভালো করতে পারেন, তাহলে লাভটা শেষমেশ পুরো দেশেরই। একটা ছোট পোশাক কারখানার মালিকের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হচ্ছিল। তিনি বায়ারের ইমেইলের উত্তর দিতে অনেক সময় নষ্ট করতেন; এআই দিয়ে সেটা এখন মিনিটে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইমেইলের ভাষাটা এখনও ঠিক করে দেন তিনি নিজেই। কারণ বায়ারের মেজাজ কেমন, সেটা তিনিই ভালো জানেন; এআই শুধু বেসিক খসড়া বানিয়ে দিচ্ছে।

সবচেয়ে ভালো জিনিস হচ্ছে, এই ইভেন্টগুলোতে যাওয়া আমার কাছে শুধু নেটওয়ার্কিং নয়। এটি দুই দিক থেকেই একধরনের বিনিয়োগ। মানুষকে বোঝানোর একটা বিনিয়োগ যে, এআই ভয়ের কিছু না—এটি তারই হাতিয়ার। আরেকটা হচ্ছে, বিজনেসগুলোর সমস্যা বোঝা, যা আমাকে খুব টানে। ব্যবসায় যদি আপনি সমস্যা সমাধান করতে পারেন, তাহলে সেটা আরেকটা ব্যবসা এনে দেয়। এই সার্কুলার বিনিয়োগ সবাইকে টিকিয়ে রাখবে।

আমার মনে হয়, এই ইভেন্টগুলো ধীরে ধীরে একটা কালচার তৈরি করছে—যেখানে এআই আর কোনো ভয়ের নাম নয়; যেখানে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে এআই দিয়ে আরও শক্তিশালী করতে শিখছে। আর এই কালচারটাই আসলে আমাদের অনেক দিন ধরে দরকার ছিল।

রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক লেখক। ই-মেইল: rakibul.hassan.mail@gmail.com