১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সংগ্রামী নেত্রী: ঠিকানা বাংলাদেশ

বাংলাদেশই ছিল তার একমাত্র ঠিকানা—কারাগার, গৃহবন্দিত্ব, অসুস্থতা আর একাকিত্বের মধ্যেও যে ঠিকানা বদলায়নি। সংগ্রামী সেই নেত্রীকে বিদায়–গুডবাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া।

সংগ্রামী নেত্রী: ঠিকানা বাংলাদেশ
খালেদা জিয়া–ক্ষমতা নয়, ইতিহাসই যার শেষ আশ্রয়।

শফিক রেহমান

Published : 03 Jan 2026, 08:01 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:27 PM

ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে বলা হয় আপসহীন নেত্রী। কিন্তু আমার বিবেচনায় তিনি আপসহীন তো ছিলেন বটেই। তবে তার চারিত্রিক গুণাবলি সংক্ষিপ্তভাবে বলার জন্য তাকে সাহসী ও সংগ্রামী নেত্রী বলা আরো উপযুক্ত ও সঙ্গত। ভেবে দেখুন, তিনি মৃত্যুর সঙ্গেই আপস করতে চাননি।

আমরা সবাই জানি, আমাদের সবার মৃত্যুই অবধারিত। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০১৮-তে তাকে কারাবন্দি করার পর তিনি অসুস্থতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। জীবন যুদ্ধে তিনি পরাজিত হননি। বিদেশি চাপে তাকে এক সময় জেল থেকে তার ভাড়া বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয় ৫ অগাস্ট ২০২৪ পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় সোয়া ছয় বছর। এই বন্দি অবস্থায় অসুস্থতা গুরুতর হয়ে পড়লেও তাকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ধরে নেওয়া যায় তাকে বন্দি করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। এর মধ্যে পদ্মা সেতু উদ্বোধনকালে তাকে এনে ‘টুস’ করে পদ্মায় ফেলে দেওয়ার, অর্থাৎ প্রকাশ্যেই হত্যার উসকানি দেওয়া হয়েছিল। অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ও হত্যার উসকানির চেয়েও মর্মান্তিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছিল ম্যাডামকে তার প্রিয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ না দিয়ে। দীর্ঘ বন্দি জীবনে ম্যাডাম তার সন্তান তারেক রহমান, পুত্রবধূ জোবাইদা এবং সিথি ও তিন নাতনির সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তার এই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা যে কত নিষ্ঠুর ও অমানবিক, সেটা সবাই বুঝবেন। তবুও তখন ম্যাডাম খালেদা জিয়া অবিচল থেকেছেন। 

৫ অগাস্ট ২০২৪-এ তিনি যখন বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্যাকুল ছিলেন ওই পরিজন লন্ডন প্রবাসী সন্তান, দুই পুত্রবধূ এবং নাতনিদের সঙ্গে দেখা করতে। অবশেষে লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তিনি লন্ডনে যান। পারিবারিক পুনর্মিলন হয়।

কিন্তু ম্যাডাম তো বারবারই বলেছেন, ‘বাংলাদেশই তার একমাত্র ঠিকানা।’ তাই তিনি লন্ডনের উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আগ্রহ ছেড়ে আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে। আবার মেনে নেন ঢাকার একাকী জীবন। ভেবে দেখুন, জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে এটা দেশপ্রেমের কত বড় সংগ্রামী সিদ্ধান্ত ছিল।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দম্পতি। ছবি: মো. লুৎফর রহমান বীনুর ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ বই থেকে নেওয়া

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দম্পতি

ম্যাডামের সংগ্রাম শুরু হয় অল্প বয়সেই। ১৯৭১-এ তার স্বামী জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। দুই শিশু সন্তান পিনো (তারেকের ডাক নাম) এবং কোকো (আরাফাতের ডাক নাম)–এদের নিয়ে তাকে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে হয়েছিল প্রায় নয় মাস। স্বামী কি যুদ্ধে নিহত হবেন? আহত হবেন? পঙ্গু অথবা মৃত হয়ে ফিরবেন?

তার সৌভাগ্য ১৯৭১-এ তার স্বামী ফিরে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিন্তু ৩০ মে ১৯৮১-তে জিয়ার অকাল মৃত্যুর পর খালেদাকে অকাল বিধবা হতে হয়। সেই দুর্ভাগ্য মেনে নিয়ে তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িতেই থাকতেন। 

এরপর নেতৃত্ববিহীন তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংক্ষেপে বিএনপির হাল ধরার জন্য দলীয় চাপে তিনি পার্টির চেয়ারপারসন হন। একজন অন্তর্মুখী গৃহবধূ থেকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে তিনি রাজি হন। তার এই রূপান্তর হয়েছিল সফল। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার বিশাল সততা, প্রখর প্রজ্ঞা, দুর্লভ দূরদর্শিতা এবং বিস্তীর্ণ মানবিকতার পরিচয় দিয়ে বিএনপিকে আরো শক্তিশালী দলে পরিণত করেন। 

৭–দলীয় জোটের নেত্রী হিসেবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া। ছবি: মো. লুৎফর রহমান বীনুর ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ বই থেকে নেওয়া

৭–দলীয় জোটের নেত্রী হিসেবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া

প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসন আমলে বিএনপি প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ওই সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একপর্যায়ে এরশাদ সরকারকে সহযোগিতা করে। কিন্তু বিএনপির অটল অবস্থান তাদের জন্য সুফল নিয়ে আসে ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতনের পর। প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীনের অন্তর্বর্তী সময়ের ১৯৯১-এর ইলেকশনে বিএনপি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়। 

খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। অনেকেই এখন স্বীকার করেন, ১৯৯১-১৯৯৬-এর খালেদা জিয়ার সরকারের আমলই ছিল শ্রেষ্ঠ সময়। সেই সরকারের আমলে দুর্নীতি ছিল ন্যূনতম এবং বাক্‌স্বাধীনতা ছিল সর্বোচ্চ। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম ছিল সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতার মধ্যে।

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বেগম খালেদা জিয়া। ছবি: মো. লুৎফর রহমান বীনুর ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ বই থেকে নেওয়া

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বেগম খালেদা জিয়া

এ সময় ম্যাডাম খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে তার শ্রেষ্ঠ উপহারটি দেন। সেটি হলো–তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রতি পাঁচ বছর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ ইলেকশন। পরপর দুটি ইলেকশন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে এখানে খালেদা জিয়ার একটি পার্থক্য আছে। প্রেসিডেন্ট জিয়া ক্ষমতায় থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন। কিন্তু ম্যাডাম অতি অল্প সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস করিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং সবার সঙ্গে একই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে থেকে ইলেকশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৯৬ ওই ইলেকশনে আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয় জামায়াতের সঙ্গে। এর ফলে তারা বিজয়ী হলেও বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বিরোধী রাজনৈতিক দল হয়। ‘স্থূল কারচুপি’, ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’– এসব ফালতু অভিযোগ না তুলে খালেদা জিয়া পার্টিকে প্রস্তুত করেন ২০০১-এর পরবর্তী ইলেকশনে বিজয়ী হওয়ার জন্য। এ জন্য তিনি ও তার পার্টি কোনো সহিংসতা, অশালীনতা ও অনিয়মের আশ্রয় নেয়নি। তার ও তার পার্টির এই শান্তিপ্রিয় আচরণের সুফল তারা পায় অক্টোবর ২০০১-এর ইলেকশনে। আবার তারা নির্বাচিত হন। 

কিন্তু সরকার গঠন করলেও এবার খালেদাকে ভিন্নধর্মী সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। ২০০৪-এ ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকা যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন তারা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছিল। ম্যাডাম খালেদা জিয়া রাজি হবেন না ভেবে আমেরিকার জর্জ বুশ প্রশাসন তখন তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়ালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল। উভয়েই চেয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেন ইরাকে যায়। ম্যাডাম খালেদা জিয়া রাজি হননি। আর তখনই তার ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ম্যাডামকে আমি এক দিন প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আপনি আমেরিকান প্রস্তাবে রাজি হননি। 

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, অকাল বিধবাদের বেদনা আমি বুঝি। আমি চাই না আমার দেশের কোনো নারীকে যেন সেই বেদনা সহ্য করতে হয়। 

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে সামরিক ক্যু হয়, যার কৌশলে ম্যাডামের বিএনপিকে রাজনীতিতে দুর্বল এবং আওয়ামী লীগকে সবল করা হয় এবং ডিসেম্বর ২০০৮-এর ইলেকশনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।

তাদের এই বিজয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনৈক আজ্ঞাবহ এক বিচারপতির রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তকরণ, এটা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পরামর্শেই। এভাবে চলতে থাকে প্রায় ১৫ বছরব্যাপী সুষ্ঠু ইলেকশনবিহীন আওয়ামী দুঃশাসন।

আজ এই মুহূর্তে দেশবাসীর আশা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরে আসবে–ম্যাডাম খালেদা জিয়া দেশবাসীকে যে সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটি দিয়েছেন, সেটি সযত্নে আবার লালিত হবে–এ কামনাই সবাই করছেন। 

খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বড় ছেলে তারেক রহমান। ছবি: মো. লুৎফর রহমান বীনুর ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ বই থেকে নেওয়া  

খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বড় ছেলে তারেক রহমান

মনে রাখতে হবে, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন ছিল সুদীর্ঘ। ১৯৮১-তে অকাল বিধবা, এরশাদ আমলে বহুবিধ নির্যাতন, জেনারেল মইন ইউ আহমেদের আমলে সাবজেলে জীবনযাপন, এরপর আওয়ামী দুঃশাসনের সময় কয়েক দশকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে বলপূর্বক বিতাড়িত এবং ২০১৮-২০২৪ পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা–এসব বহু সংগ্রামে তিনি থেকেছেন অসাধারণ অটল। তিনি তার মূল্যবোধ ও আদর্শ থেকে কখনোই সরে যাননি এবং মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাননি। নিখাদ সততা ও সদা সংগ্রামী এটিই খালেদা জিয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য। 

গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ছবি: পিআইডি

গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন খালেদা জিয়া

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ তাদের এক ঘোষণাপত্রে বলেছিল, লিবার্টি ইজ অলওয়েজ এন আনফিনিশড বিজনেস। অর্থাৎ স্বাধীনতা সব সময়ই একটি অসমাপ্ত সংগ্রাম। বাংলাদেশও তাই।

২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। আমি বিশ্বাস করি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিয়মিতভাবে সাধারণ ইলেকশন হলে মুক্তি আন্দোলন চলমান থাকবে এবং এক সময় সাধারণ মানুষ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে। সেটা বাস্তবায়ন করলেই হবে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। 

আপনি বাংলাদেশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আপনার একমাত্র ঠিকানা এটাই। আপনি শান্তিতে থাকুন। গুডবাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া।