Published : 30 Jul 2026, 12:31 PM
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলে ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং প্রায় এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি শুধু শিল্পাঞ্চল নয়, বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খল, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নতুন অর্থনৈতিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার কৌশলগত পদক্ষেপ।
এই অর্জনকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে। কারণ উন্নয়ন কখনো অঞ্চলভিত্তিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; উন্নয়ন হলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে এই সাফল্যের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশের উন্নয়ন কি দেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে?
গত পাঁচ দশকে দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে শিল্পায়ন, সমুদ্রবন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের বিস্তার ঘটেছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও খুলনা শিল্পবিকাশের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চল এখনো প্রধানত কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই অঞ্চলই বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা ও পানিসংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত বহন করছে।
আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেবল শিল্পপ্রকল্প হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। উদ্যোগটি মূলত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বেল্ট অ্যান্ড রোডের মূল ধারণা হলো অবকাঠামো, শিল্প, বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই উদ্যোগে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক উৎপাদন ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এই বাস্তবতায় ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং উদীয়মান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ব্রিকস এখন শুধু পাঁচটি দেশের জোট নয়, এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের বিকল্প প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে, তাহলে অবকাঠামো অর্থায়ন, প্রযুক্তি, শিল্প বিনিয়োগ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
তবে এই সম্ভাবনাকে সফল করতে হলে বাংলাদেশকে একমুখী কৌশল নয়, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হলেও ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে ‘সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে’ সবার সঙ্গে সহযোগিতা, কারও সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়—এই নীতি।
বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানকে ঘিরে যে উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে, তা এখন নতুনভাবে বিবেচনার সময় এসেছে। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভৌগোলিক অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হতে পারে। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও শিল্পভিত্তি, ভারতের বৃহৎ বাজার এবং সীমান্ত-সংযোগ—এসব একত্রে সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিস্তা নদী শুধু আন্তঃসীমান্ত নদী নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। তিস্তা অববাহিকা বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতের পানি, কৃষি, পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি বহুপাক্ষিক অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতার ধারণাও গুরুত্ব পেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। প্রকল্পটি কেবল নদীশাসন বা খননের প্রকল্প নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি পুনর্গঠনের সমন্বিত রূপকল্প। বহু বছর ধরে 'তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ' শান্তিপূর্ণভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অবস্থান কখনোই দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের বিরোধিতা নয়; তারা বরাবরই বলে এসেছে—বাংলাদেশের উন্নয়ন হতে হবে সুষম, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীন।
আনোয়ারায় যদি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বমানের শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠতে পারে, তবে উত্তরাঞ্চলের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত তিস্তা অববাহিকার জন্য সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন রাজধানী, সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি কৃষি, নদী এবং প্রান্তিক অঞ্চলও সমান গুরুত্ব পায়।
একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড চেইন, আধুনিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং সীমান্ত বাণিজ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের কৃষি উৎপাদন যদি আধুনিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে শুধু আঞ্চলিক বৈষম্যই কমবে না, জাতীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
অবশ্য শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী; একইভাবে তিস্তা উত্তরাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ। তাই উন্নয়ন যেন নদী ও পরিবেশের বিনিময়ে না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক পরিবেশমান, সবুজ প্রযুক্তি এবং কার্বন-সংবেদনশীল শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা মূলত সংযোগ, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিযোগিতা। যে দেশ নিজেকে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, সেই দেশই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকবে। বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ এখন বাস্তব।
কিন্তু এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হলে উন্নয়নকে কেবল শিল্পাঞ্চল বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বেল্ট অ্যান্ড রোড, ব্রিকস, বঙ্গোপসাগরীয় সহযোগিতা এবং ভারত-নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযোগ—সব কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক ভারসাম্যকে।
আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এখন প্রয়োজন একই দূরদৃষ্টি নিয়ে উত্তরাঞ্চলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং অবকাঠামোগত রূপান্তরকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক প্রকল্পে নয়, উন্নয়ন এমন রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দর্শনে নিহিত, যেখানে শিল্প, কৃষি, নদী, পরিবেশ, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য পরস্পরকে শক্তিশালী করবে। বেল্ট অ্যান্ড রোডের সংযোগ, ব্রিকসের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ভারত-ভুটান-নেপাল-বাংলাদেশের সহযোগিতার বাস্তবতাকে যদি সুষম জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার উৎপাদন কেন্দ্রই নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতারও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। আর সেই উন্নয়নের ভিত্তি হবে—কোনো অঞ্চলের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের সমান অগ্রযাত্রা।
নজরুল ইসলাম হক্কানী শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও নদী আন্দোলনের সংগঠক। ই-মেইল: nazrul.hakkani@gmail.com