১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দীর্ঘস্থায়িত্বই কি টেকসই হওয়ার প্রমাণ?

পরিবেশবিদরা সাইসটেইনেবিলিটিকে একভাবে ব্যাখ্যা করেন, উন্নয়ন সংস্থাগুলো আবার আরেকভাবে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যভাবে, আবার শিক্ষা বা প্রযুক্তি খাতে এর প্রয়োগ একেবারেই ভিন্নরকম।

দীর্ঘস্থায়িত্বই কি টেকসই হওয়ার প্রমাণ?
বর্তমানে সাইসটেইনেবিলিটি শব্দটি বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত হলেও এর অর্থ একেক ক্ষেত্রে একেক রকম। ছবি: এআই

বিধান চন্দ্র পাল বিধান চন্দ্র পাল

Published : 30 Aug 2026, 04:40 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:02 PM

প্রায় ২,৭০০ বছর আগে নির্মিত চীনের মহাপ্রাচীর আজও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মিশরের কারনাক মন্দির কমপ্লেক্স ৩,৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানবসভ্যতার ইতিহাস বহন করে চলেছে। জাপানের হোরিউ-জি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা কাঠের স্থাপনাগুলোর অন্যতম, যার বয়স প্রায় ১,৩০০ বছর। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্রেট ক্লক, যা ‘বিগ বেন’ নামে পরিচিত, ১৮৫৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এবং এখনো সঠিক সময় দিয়ে যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে সংরক্ষিত বেভারলি ক্লক প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ ছাড়াই বায়ুচাপ ও তাপমাত্রার ক্ষুদ্র পরিবর্তন থেকে শক্তি সংগ্রহ করে চলছে; দৃষ্টিনন্দন এই ঘড়িটিও কখনোই বন্ধ হয় না।

এগুলোর বেশিরভাগই নিজের চোখে দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রতিবারই আশ্চর্যের সঙ্গে মনে হয়েছে, মানুষের তৈরি কিছু সৃষ্টি কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী, এমনকি সহস্রাব্দ পেরিয়েও টিকে থাকতে পারে! এর উত্তর একটাই—দূরদর্শী নকশা, উপযুক্ত উপকরণ, দায়িত্বশীল রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।

কিন্তু কোনো কিছু দীর্ঘদিন টিকে থাকলেই কি তাকে স্থায়িত্বশীল বা টেকসই বলা যায়? আমরা আজ যে স্থায়িত্বশীলতা বা সাইসটেইনেবিলিটির কথা বলি, তার সঙ্গে এই দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বের সম্পর্ক কী বা কোথায় কিংবা কতটুকু? কোনো প্রকল্প দুই বা তিন বছর চললেই কি তা স্থায়িত্বশীল হয়ে গেল? নাকি স্থায়িত্বশীলতার সঙ্গে গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি কোনো যোগসূত্র রয়েছে?

বর্তমানে সাইসটেইনেবিলিটি শব্দটি বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত হলেও এর অর্থ একেক ক্ষেত্রে একেক রকম। পরিবেশবিদরা একে একভাবে ব্যাখ্যা করেন, উন্নয়ন সংস্থাগুলো আবার আরেকভাবে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যভাবে, আবার শিক্ষা বা প্রযুক্তি খাতে এর প্রয়োগ একেবারেই ভিন্নরকম। অনেক সময় কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চললেই তাকে সাসটেইনেবল বলা হয়। ফলে একই শব্দ ব্যবহার হলেও এর ব্যাখ্যা, মূল্যায়ন এবং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিভ্রান্তি কম-বেশি রয়েছে এবং তা ধীরে ধীরে আরও প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।

আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভিত্তি এসেছে ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ব্রুন্ডল্যান্ড কমিশনের ‘আওয়ার কমন ফিউচার’ প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন হলো এমন উন্নয়ন যা বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণ করে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাকে কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত করে না। পরবর্তীতে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। একইভাবে ওইসিডি উন্নয়ন কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বজায় রাখার সক্ষমতাকে সাসটেইনেবিলিটি মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হিসেবেও বিবেচনা করে।

তবে বাস্তব প্রয়োগে এখনো একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, প্রকৌশল, পরিবেশ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন সবক্ষেত্রের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এমন একটি কার্যকর ও অভিন্ন সংজ্ঞা এখনো পাওয়া যায় না কিংবা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা ও সূচক ব্যবহার করে থাকে, যা তুলনামূলক মূল্যায়ন এবং নীতিনির্ধারণেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং প্রক্রিয়াকে অনেকটাই জটিল করে তোলে।

এখন সময় এসেছে স্থায়িত্বশীলতাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকরভাবে সংজ্ঞায়িত করার। স্থায়িত্বশীলতা শুধু দীর্ঘসময় ধরে টিকে থাকার বিষয় নয়; এটি এমন একটি সক্ষমতা, যার মাধ্যমে কোনো ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান, পণ্য, কর্মসূচি বা প্রযুক্তি পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে দায়িত্বশীলভাবে সম্পদ ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান ও মূল্যও সৃষ্টি করতে পারে।

আর এই দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করলে স্থায়িত্বশীলতার মূল্যায়নও আরও বাস্তবসম্মত হবে। তখন কেবল সময় নয়; বরং অভিযোজনের সক্ষমতা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, সুশাসন, স্থানীয় সক্ষমতা, আর্থিক ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মতো বিষয়ও সমানভাবে গুরুত্ব পাবে।

বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের যুগে কেবল নতুন উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন উদ্ভাবন, যা সময়ের পরীক্ষায় ভালোভাবে টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও মূল্য সৃষ্টি করবে। তাই “কত দিন টিকে থাকল”—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আমাদের আরও কিছু প্রশ্ন জোরালোভাবে করতে হবে: “কীভাবে টিকে থাকল, কেন টিকে থাকল এবং ভবিষ্যতের জন্য কী মূল্য রেখে গেল?” কিন্তু এখানেই কি সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে আমাদের ভাবনা শেষ?

কোনো কিছু দীর্ঘদিন টিকে থাকলেই কি তা সত্যিই সাসটেইনেবল? নাকি টিকে থাকার ধরন, তার ভিত্তি এবং ওই টিকে থাকার জন্য আমরা কী মূল্য দিচ্ছি, তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ? হয়তো এখান থেকেই সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে আমাদের আরও গভীর একটি আলোচনার শুরু হতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু “কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়?”—তা নয়; বরং আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো: “আমরা আসলে কোন ধরনের সাসটেইনেবিলিটি চাই?” ওই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে হবে।

বিধান চন্দ্র পাল লেখক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও উদ্যোক্তা। ই-মেইল bidhan.probhaaurora@gmail.com