Published : 11 Nov 2025, 09:32 PM
বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য আর অনিবার্য অংশের নাম চট্টগ্রাম। কিন্তু ভেতরে থেকেও আলাদা। আলাদা নানা কারণে। ওই সব কারণের প্রধানটি হলো চট্টগ্রামের ভাষা। ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের বড় বাহন। আমরা যারা চট্টগ্রামে জন্মেছি, যাদের বাড়িঘর চট্টগ্রামে—এই ভাষায় কথা না বলা পর্যন্ত গলার কাছে যে অসুবিধা কাঁটার মতো আটকে থাকে, তাকে সরানো যায় না।
চট্টগ্রামের মানুষ নিজেদের ভাষায় কথা বললে বাংলাদেশের অন্য সব অঞ্চলের মানুষের প্রায় সবার মূক ও মৌন দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। যারা বলেন এই ভাষা কঠিন বা দুর্বোধ্য তাদের হয়তো কেউেই আরবি, ফারসি বা ফরাসি বোঝেন না। তাই বলে কি ওই ভাষাগুলো আসলেই দুর্বোধ্য?
বলছি গত ৯ তারিখ রোববার সিডনির ফেয়ার ফিল্ড শো গ্রাউন্ডে আয়োজিত চট্টগ্রাম উৎসবের কথা। ধারণাতীত জনসমাগম আর ভালোবাসায় উপচে পড়া এই আয়োজন ছিল দেখার মতো। আমি জানতাম সভাপতি শাহ আলম সৈয়দ কাজের মানুষ। বহুকাল থেকে তাকে চিনি। আর সাধারণ সম্পাদক ইফতু? ইফতেখার উদ্দীন ইফতু আমার যৌবনে দেখা তুর্কি তরুণ। যারা চট্টগ্রামের মানুষ তারা সিটি কলেজ যে কী, খুব ভালো জানেন। যারা জানেন না তাদের বলি, এই তরুণ সেই ঝড়ের মিছিলে নির্বাচিত নেতা। তার সাংগঠনিক শক্তির আরও একবার প্রমাণ মিলল রোববারের মেজবান আয়োজনে।
মেজবান বা মেজ্জান আসলে কী? দেশের আর কোন এলাকার মানুষ এমন বিচিত্র খাদ্যভূক নয়। শুটকি মাছের কত রকমের পদ হতে পারে তা অন্যরা কল্পনাও করতে পারবেন না। এই খাদ্যের এক মহা উৎসবের নাম মেজবান। কী এই মেজবান? এ নিয়ে যা জানা যায় তা হলো—
"ঐতিহ্যবাহী মেজবান সম্পর্কে জানা যায়, ১৮ দশকের দিকে চট্টগ্রামে মেজবানের প্রচলন শুরু হয়। অতীতে চট্টগ্রামের ধনী লোকেরা বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে গরিব লোকদের উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করতেন। সেই থেকে মেজবানের প্রচলন চলে আসছে। মেজবান শব্দটি একটি ফারসি শব্দ। এই মেজবানকে মেজ্জানি বলা হয়ে থাকে..."
মনে রাখতে হবে শুধু মুসলমান সম্প্রদায় না, হিন্দু বৌদ্ধ বা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যও মেজবান অবারিত।
সিডনির এই মেজবানে এসেছিলেন দেশসেরা, পৃথিবীখ্যাত বাবুর্চি আবুল বাবুর্চি। আমাদের এই সিডনি শহরে দেশ থেকে যারা আসেন তারা সাধারণত সাহেবি পোশাকেই আসা-যাওয়া করেন। নেহায়েত না হলেও দামি শার্ট-প্যান্ট তো থাকবেই। অথচ কাল বিকেলে সিডনির ফেয়ারফিল্ডের মঞ্চে আবুল বাবুর্চি উঠলেন লুঙ্গি পরিধান করে—একেবারে খাঁটি চাটগাঁইয়া স্টাইলে। এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দিল, নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করাই একধরনের প্রতিরোধ ও গর্বের প্রকাশ। বহুজাতিক দেশ অস্ট্রেলিয়ার শ্বেতাঙ্গ মান্যবরেরা তার হাতে সম্মাননা পদক দিতে গিয়ে অবাক হলেও খুশি হয়েছেন ব্যাপক। এমন স্বীকৃতি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার প্রতীক। আমার মনে হয়েছে এই হচ্ছে স্বীকৃতি—পেশা কী সেটা বড় না, বড় হচ্ছে আপনি সে পেশায় কতটা সার্থক, কতটা উজ্জ্বল। আবুল বাবুর্চি রন্ধনশিল্পী। তার সুনাম দেশ পেরিয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ায় চট্টগ্রামও আজ তাকে নিয়ে গর্বিত।
এই উৎসবের শুরুতেই ঢোকার পথে আমাদের প্রিয় শহরের সুবিখ্যাত চেরাগি পাহাড়ের ছবি এবং তার সামনে দাঁড়িয়ে ফটো তোলার বিশেষ আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করেছে। এই চেরাগি পাহাড় নানা কারণে বিখ্যাত। এর পাদদেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হয়। আমার জন্য এ এক তীর্থ। এর সঙ্গেই লাগোয়া আমাদের প্রাণায়াম কেন্দ্র। আরেক পাশে সুবিখ্যাত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রিত দৈনিক আজাদী অফিস। আপনি চেরাগি পাহাড় মানেই জানবেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো। ইতিহাস বলে এই চেরাগি পাহাড়ে আলো জ্বেলে জিন-ভূতদের বশ করেছিলেন আউলিয়ারা। সে থেকে এ আমাদের আলোর উৎস। সেই ছবিটির সামনে কাল ফটো তোলার ধূম লেগে গিয়েছিল। আমার মনে হয়েছে, প্রবাসেও আমরা অজান্তেই ফিরে যাই আমাদের মাটির খোঁজে।
আমাদের অঙ্গরাজ্যের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনস সশরীরে হাজির না হলেও ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ক্যাম্বেলটাউনের মেয়র ডার্সি লাউন্ড, ডেপুটি মেয়র খলিল ভাই ছিলেন উপস্থিত তারকা। আমাদের বাঙালি কমিউনিটির নেতারাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষে সয়লাব ছিল এই শো গ্রাউন্ড। নামে চট্টগ্রাম উৎসব হলেও এর মূল শিকড় ছিল দেশের গভীরে। এই আয়োজন যেন স্মরণ করিয়ে দিল, প্রবাসে থেকেও মানুষ তার মাটির টানে, সংস্কৃতির সূত্রে জড়িয়ে থাকে। আমি বিস্মিত হয়েছি এই কারণে যে উদ্যোক্তারা আমাদের পুত্র, অভিনেতা-নির্দেশক অর্ক দাশকেও সম্মান জানিয়েছে। দিয়েছে হল অব অনার অ্যাওয়ার্ড। চট্টগ্রাম শহরে জন্ম নেওয়া অর্কের এটা অনেক বড় প্রাপ্তি।

আমার বন্ধু সহপাঠী গায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন সবসময় সপ্রতিভ। কাল তাকে দেখেই বুঝেছি, সে নেপথ্যে প্রচুর পরিশ্রম করছে। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আন্তরিকতায় এই উৎসবে গান গাইতে এসেছিলেন আমাদের আরেক বন্ধুপ্রতিম সহপাঠী, দেশ-বিদেশে একনামে পরিচিত কণ্ঠশিল্পী, রেনেসাঁ খ্যাত নকীব খান। উপস্থাপিকা জুই সেন পল আমাকে যখন মঞ্চে ডেকে নকীবকে আমন্ত্রণ জানাতে বললেন, আমি যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েছিলাম। বহুকাল পরে আমি, মামুন আর কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী নকীব খান যখন একসঙ্গে দাঁড়ালাম, তখন মনে হচ্ছিল—জীবনের গোধূলিবেলাতেও শিল্প আমাদের তরুণ রাখে, রাখে একসূত্রে বাঁধা। সন্ধ্যা অবধি তার বিখ্যাত গানগুলোর পাশাপাশি নকীব সোলসের সোনালি দিনের গানগুলো গেয়ে আমাদের ভাসিয়ে নিয়েছিলেন ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’র সৈকতে।
আর সৈকত মানেই চট্টগ্রাম, পাহাড় মানেই চাটগাঁ। ইতিহাস বলে—সমুদ্র আর পাহাড় যেখানে একসঙ্গে, সেখানকার মানুষ হয় পর্বতের মতো দৃঢ় আর সাগরের মতো উদার। সিডনির চট্টগ্রাম উৎসব ছিল তার জীবন্ত চলমান এক উদাহরণ। প্রবাসে জন্ম নেওয়া এই ঐক্য ও গর্বের স্পন্দনই বলে দেয়, জাতিসত্তা কখনো সীমান্তে থেমে থাকে না। জানা-অজানা, চেনা-অচেনা যাদের যোগে এটি সার্থক হয়েছে তাদের সবাইকে ভালোবাসা। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করে চলুক।