শঙ্কার সময়ে স্বাধীনতার হাসি

আব্দুল্লাহ আল মুঈদ
Published : 16 July 2022, 02:03 PM
Updated : 16 July 2022, 02:03 PM

২০০৭ সাল জুড়েই নাৎসি-বাহিনীর মতো করে রাতের আঁধারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিলো রাজনৈতিক নেতাদের, দেশে জরুরি-অবস্থার দোহাই দিয়ে।

১৫ জুলাই ২০০৭, রাত তখন প্রায় এগারোটা, ঢাকা জুড়ে টিপটিপ বৃষ্টি। বিবিসি বাংলার কাদির কল্লোল ভাই আর বিবিসি ইংরেজি সার্ভিসের আমি রোজকার মতো অফিসে বসে অপেক্ষা করছি, কোনো রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার খোঁজ পেলেই দৌড়াবো খবর সংগ্রহে। বসে আছি সেই রাত নয়টা থেকে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাদির ভাই একটা ফোনে ছিলেন। রেখেই আমাকে বললেন, 'আজ রাতে বড় একজন অ্যারেস্ট হবেন, আপনার প্ল্যান কী?' আমি সাথে সাথে ব্যাগে পিডি ১৭০ ক্যামেরা ভরে বললাম, "ভাই, চলেন।" যদিও তখনো জানি না কে গ্রেপ্তার হবেন বা কোথায় যেতে হবে।

কাদির ভাইয়ের সাথে চলে গেলাম ধানমণ্ডিতে সেই সময়ে শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন- এর সামনে। ততোক্ষণে ১৬ জুলাইয়ের প্রথম প্রহর শুরু হয়ে গেছে। আমাদের আগেই সেখানে হাজির 'ভয়েস অব আমেরিকা'র কাদির ভাই আর রয়টার্সের রফিক ভাইসহ আরো জনা-দশেক সাংবাদিক। কাউকে 'সুধা সদনে' ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না, কিন্তু রাস্তায় পুলিশের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। সাংবাদিকরা মিলে বৃষ্টি এড়িয়ে চললো ধুম আড্ডা, সিগারেট আর চা। কিন্তু সবার নজর রাস্তায়। এই বুঝি এলো গ্রেপ্তারের কনভয়। কিন্তু কিসের কী! রাত একটা-দেড়টা পার হয়ে গেলেও কারোর দেখা নেই। 'সুধা সদনে'র সামনের পুলিশ চেকপোস্ট- এর পুলিশ সদস্যরাও গা-ছাড়া ভাবে বসে আছেন, কোনো নড়াচাড়া নেই। 

একেতো বৃষ্টি, তার উপর মশার উৎপাত, সাথে থাকা সিগারেটের সংখ্যাও তলানিতে। কেউ একজন বলে উঠলেন, 'ভুয়া নিউজ। আইজ শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করবে না মনে হয়।' এক এক করে সাংবাদিকেরা চলে যেতে শুরু করলেন। কাদির কল্লোল ভাই বললেন, 'কী করবেন মুঈদ?' আমি বললাম, 'ভাই, থাকি আরো কিছুক্ষণ। অফিসে গেলে তো চেয়ারেই বসে থাকতে হবে।' 

বোধকরি তখন রাত তিনটা বা সোয়া তিনটা। সিএনজির ভেতর থেকে দেখলাম কয়েকটা জিপ আর ট্রাকে করে বিডিআর (তখনো বিজিবি নামকরণ হয়নি) আর পুলিশ আসছে। ক্যামেরা নিয়ে নামলাম কিন্তু আটকে দিলো। কার্ড দেখানোর পর ছবি তুলতে দিলেও জায়গা থেকে নড়তে দিচ্ছিলো না। আবার ফোনেও কাউকে পাচ্ছিলাম না, নেটওয়ার্ক ডাউন।

কাদির কল্লোল ভাই, রাসেল মাহমুদ শুভ আর আমি ছাড়া পুরো তল্লাটে বোধহয় আর কোনো সাংবাদিক সেদিন ছিলেন না। আর ধানমণ্ডির রাস্তাগুলো আটকে দিয়ে সাংবাদিকদের আসতেও দেয়া হচ্ছিলো না। 

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা 'সুধা সদনে' ঢুকে পড়লো, আমরা বাইরের রাস্তায় অপেক্ষায়। আমি তখন যারপরনাই বিরক্ত, একে তো ছবি তুলতে বা সংবাদ সংগ্রহ করতে দিচ্ছে না, ভেতরে কী হচ্ছে তার এক বিন্দুও বোঝা যাচ্ছে না। আমি গিয়ে পুলিশের এক কর্তাকে বললাম, "আপনারা আপনাদের কাজ করুন, আমাদের দায়িত্ব আমাদের পালন করতে দিন, সদয় হলেন কি না বোঝা না গেলেও ছবি তুলতে আর বাঁধা দেয়নি। 

এভাবেই পার হয়ে গেলো প্রায় দুই ঘণ্টা। ভোর সাড়ে চারটা বা পাঁচটার দিকে মোবাইলে নেটওয়ার্ক পেতেই ফোন করলাম, লন্ডনে বিবিসির সেন্ট্রাল নিউজের ডেস্কে, জানালাম কী হচ্ছে, ফোনে ঘুম ভাঙালাম সাউথ-এশিয়া এডিটরের। প্রথম নিউজ পাঠালাম মোবাইলে মেসেজ লিখে, সকাল পাঁচটায়। সারা দেশ এবং বিশ্বকে জানিয়ে দিলাম প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। 

আমার মাথায় তখন ঘুরছে বছরখানেক আগের স্মৃতি। শেখ হাসিনার ইন্টারভিউ নিতে এসেছিলাম এই সুধা সদনে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র এই কথা কাদির কল্লোল ভাই তাকে বলার পর উনি আমার সাথে কথা বলেছিলেন। আমার পারিবারিক অবস্থা, আমার শুকনো-পাতলা গড়ন আর অন্যান্য বিষয় নিয়ে, মাতৃস্নেহে জোর করে খাইয়েছিলেন মিষ্টি, বাদাম আর দই। আমি শুধুই মনে মনে কামনা করছিলাম, শেখ হাসিনা নিরাপদ থাকুন, তার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

পৌঁনে ছয়টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে সুধা সদন থেকে বের করে আনলো পুলিশ। তাকে নিয়ে একটা জিপে তুললো, আমি অধীর অস্থিরতায় মাথার উপর হাত নাড়ছি যেন উনি, আমার আর কাদির ভাইয়ের দিকে একটিবারের জন্য দৃষ্টি ফেলেন, সেখানে তখন নাগরিক বলতে আমরা এই দুইজনই আছি, কোনো নেতা-কর্মী বা জনসাধারণ নেই। 

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে মাথা ঘুরিয়ে তাঁকালেন একবার আমাদের দিকে। তার মুখে দেখলাম অচিন এক অভিব্যক্তি। যা আমার মনে থাকবে চিরকাল।

তাকে বহনকারী গাড়িটা যখন আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, আমি উঠে দাঁড়ালাম সিএনজি বাম্পারের উপর, তাকে একটিবার দেখতে। তার গাড়িটা আমাদের সামনে এসে একটু স্লো করলো কনভয়ের সামনের গাড়ির কারণে, মূহূর্তের জন্য দেখলাম উনি হাত নাড়ছেন কাদির ভাই আর আমার দিকে। মনে হলো মুখে যেন একটা স্মিত হাসি দেখলাম।

তাকে নিয়ে কনভয় এগিয়ে চললো, আমরাও পিছু নিলাম। গাড়িতে বসেই আমার জীবনের প্রথম ব্রডকাস্ট করলাম সকাল ছয়টায় আর সাতটায়- "Police in Bangladesh have arrested former Prime Minister Sheikh Hasina after a raid on her house in Dhaka." 

বিবিসি নিউজ লিখলো- "Sheikh Hasina was arrested after a two-and-a-half hour raid on her house, involving about 1,000 policemen," the BBC's Abdullah Muyid in Dhaka reports. 

এরপরের ঘটনা বা দিনপঞ্জি সবাই পেয়ে যাবেন পত্র-পত্রিকায়, আর অন্যদের বয়ানে। আমি শুধু সেই হারিয়ে যাওয়া আড়াই-ঘণ্টার বর্ণনা দিলাম, যখন সুধা সদন আর শেখ হাসিনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো সারা দেশের মানুষের কাছ থেকে। আমি বললাম নিজের ভাষায়, নিজের স্মৃতি থেকে।

আজকের ২০২২-এর ১৫ জুলাইয়ে আরামদায়ক চেয়ারে বসে এই অনুভূতি অনেকেই যেমন অনুভব করবেন না, তেমনি সেই 'আতংক আর শঙ্কার সময়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম' করে যাওয়া আমাদের কথাও অনেককেই স্পর্শ করবেনা। তাতে কী?

২০০৮-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবার পর আবার বিবিসি ইংরেজির জন্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র ইন্টারভিউ নিতে যাই। 

এবার আমি প্রায় সারাটা সময় তাকিয়ে ছিলাম তার মুখের দিকে, আমি অবাক হয়ে দেখলাম তার সেই অচিন স্মিত হাসি, যা দেখেছিলাম ২০০৭- এর এক কাল রাতে, জিপের কাচের ওপাশে। এ এক অনির্বচনীয় অভিব্যক্তি, এই হাসিতে মিশে আছে দৃঢ়তা ও কঠিন সংকল্পের সাথে পরম মমতা। 

আজ পনেরো বছর পর সেই সংকল্পের অচিন হাসিটা বোধকরি তেমনি আছে, আর এমনি অমলিন থাকুক আগামী দিনে, এই শুধু প্রার্থনা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক