পদ্মা সেতু নিয়ে যে আলাপ ছড়িয়ে যাক বিশ্বব্যাপী

জায়েদ বিন নাসেরজায়েদ বিন নাসের
Published : 15 July 2022, 10:34 AM
Updated : 15 July 2022, 10:34 AM

প্রমত্তা পদ্মা বিশ্বের প্রথম দুটি খরস্রোতা নদীর একটি। অ্যামাজনের পরই এই পদ্মা নদী। অ্যামাজনের ওপর এখনও কোনো সেতু নির্মিত হয়নি। অ্যামাজনের একটি শাখা নদীতে ৩,৫৯৫ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হয়, যেটির কাজ ২০০৮ সালে শুরু হয়ে ২০১১ সালে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পদ্মার পাশে বাংলার যে জনবহুল জনপদ গড়ে উঠেছে অ্যামাজনের অতটা কাছে এমন জনপদ অবশ্য নেই। পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ আমাদের জন্য ভীষণ রকমের চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার ছিল। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জাতীয় গৌরবের ব্যাপার, আত্মনির্ভরশীলতার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। তাই বলে এর সাথে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের তুলনা বড়ই বেমানান। মানুষের জীবন বিসর্জনের সাথে কি করে অর্থ-বিত্ত ত্যাগ করার তুলনা হতে পারে? একটা দেশ অর্জনের সাথে একটা মস্ত বড় অবকাঠামো নির্মাণের তুলনা একেবারেই যায় না।

জাতি যেন অহমিকায় ভুগে আত্মতুষ্টির রোগে আক্রান্ত হয়ে না পড়ে সেজন্য তৎপর থাকতে হবে। ইতোমধ্যেই সেতুতে টিকটকারদের অসুস্থ আচরণ, নাট-বল্টু খোলা, যানবাহন দাঁড় করিয়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তোলা, সেতুতে মূত্র বির্সজনের মতো অসামাজিক এবং অসুস্থ কার্যকলাপ করতে দেখা গিয়েছে। জনগণের অর্থে ভবিষ্যতে মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগাপ্রকল্প আসছে। আমরা যেন মেগাপ্রকল্পের ভার নিতে পারি; উন্মাদের মতো আচরণ না করি– এই দিকটায় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যদি সজাগ না থাকি তবে মেগাপ্রকল্পকেন্দ্রিক নানা বাজে ঘটনায় অর্জিত আত্মসম্মান ভুলুণ্ঠিত হতে পারে। কতিপয় অভব্য মানেুষের জন্য বিশ্বের সামনে আমাদের মাথা হেট হোক– এটা আমরা কেউই চাই না। আনন্দে আত্মহারা হয়ে অপমানের ভাগীদার কেন হবো? কেন মান-সম্মান খোয়াব মাত্র গুটিকতক লোকের জন্য? এদেরকে থামানো দরকার। মান-মর্যাদা যাতে সমুন্নত থাকে সেজন্য জাতীয় ঐক্য ও সম্মিলিত প্রয়াসের বিকল্প নেই। আজকাল হাতে হাতে মোবাইল ফোন থাকায় কে কখন কোথায় কি করে ফেলছে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল। কিন্তু আত্মোপলব্ধি এবং আত্মসম্মানের কথা ভেবে নিজেরাই যাতে মান-মর্যাদা ডুবানের মতো কাণ্ড ঘটানো থেকে বিরত থাকি সে পথেই হাঁটতে হবে আমাদের। যদি আমরা আত্মসম্মান নিয়ে চলতে চাই তবে আমাদের আচার-আচরণে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরী।

পদ্মা সেতু জাতীয় সম্পদ, আমাদের দৃঢ় ঐক্যের প্রতীক। গণমানুষের বিসর্জনের সুফল হচ্ছে এই পদ্মা সেতু। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সারা বাংলার মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে দক্ষিণবঙ্গের কোটি মানুষের প্রাণের দাবি অর্জিত হয়েছে। আমাদের টাকায় আমরা নিজেদেরকে এই সেতু উপহার দিয়েছি। এজন্য আমরা নিজেদের প্রতি তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই পারি। উদ্বোধনের দিনই যেভাবে হেঁটে হেঁটে দলবেঁধে মিছিল করতে দেখা গিয়েছিল তখনই আঁচ করা দরকার ছিল লাগাম টেনে নিয়ন্ত্রণ না করলে এখানে কি রকম কাণ্ড যে ঘটতে পারে। আমাদেরকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। কালক্ষেপণ না করে সেতুতে সিসি ক্যামেরা বসানো দরকার। স্পিড মিটার বসানের পাশাপাশি নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য আমাদেরকে জরিমানার পরিমাণ বাড়াতে হবে। সেতুতে নির্দিষ্ট স্থান পরপর লাউডস্পিকারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। যাতে কেউ যানবাহন থামিয়ে নামতে চাইলেই সিসি ক্যামেরায় তাকে শনাক্ত করে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সতর্ক করা যায়। যে কর্তৃপক্ষ সেতুর দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে সে কর্তৃপক্ষ সেতুর দুই প্রান্তে সবসময় যানবাহন প্রস্তুত রাখতে পারলে তত্ত্বাবধায়ন করা অনেক সহজ কাজ হবে। যাতে সেতুর মধ্যপথে জরুরী প্রয়োজনে কালক্ষেপণ না করেই কর্তৃপক্ষ গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আমরা জনগণ এই সেতুর মালিক। তাই এটা দেখভাল করা, রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং এই সেতুকে সকল রকমের বিপদাপদ থেকে রক্ষা করার পবিত্রতম দায়িত্বটি আমাদের সকলের। আমাদের স্থাপনা যত বড় রুচিও সেরকম হওয়া চাই। যত বিশাল অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে হৃদয়ও ততটা উদার হোক আমাদের।

পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে বিশ্ব ব্যাংকের অনৈতিক কর্মকাণ্ড কম-বেশি আমাদের সকলেরই জানা। দেশের স্বাধীনতার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কার নামে মামলা দিতে হবে, কাকে গ্রেফতার করতে হবে, কোন পদ থেকে কাকে সরাতে হবে– সবকিছুতেই একরকমের অনধিকার চর্চা করেছে, নাক গলিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। চূড়ান্তে সফল না হলেও তাদের মিথ্যা অপবাদ ভুগিয়েছে বেশ। শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার না করে বিশ্ব ব্যাংকের কাছ থেকে এই প্রকল্পের জন্য ঋণ না নিয়েই কাজটা আমরা শেষ করেছি। দেশের বাইরের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশনামূলক সিদ্ধান্ত, খবরদারি, আদেশ দেওয়া, বাধ্য করা কারও চোখেই ভালো ঠেকেনি। নিঃসন্দেহে এদেশে অনেক দুর্নীতি হয়, এগুলো আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে মোকাবিলা করার কথা। অনেক প্রকল্পে দুর্নীতি হয় বলেই মানুষের কাছে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির চটকদার সংবাদকে বিশ্বাসযোগ্য করানো যাবে– এমন একটা ধারণাও তাদের মধ্যে হয়তো কাজ করেছে। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির খবর প্রথম যখন ছাপা হয় তখন আমিও মনে করেছিলাম কিছু বোধহয় ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত কানাডার আদালতে সবকিছুই মিথ্যা প্রমাণিত হয়। অর্থ ছাড়ের আগে ষড়যন্ত্র হতে পারে। কিন্তু বিশ্ব ব্যাংক আষাঢ়ে গল্প বানিয়ে চাউর করে।

দেশে দেশে বিশ্ব ব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহ ও দেশগুলো ঋণ দেয় আর ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয় নানান শর্ত। যেমন, অমুক প্রকল্পে ঋণ পেতে হলে পরামর্শক তমুক দেশ থেকে নিতে হবে। আবার কাঁচামাল কার থেকে ক্রয় করতে হবে– সেগুলোও মাতব্বররা ঠিক করে দেয় অনেকসময়। ঋণগ্রহতী দেশগুলো নিজস্ব স্বার্থ ও কল্যাণ বিবেচনা করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় স্বার্থ। আদতে ঋণ প্রদানকারীরা নানানভাবে ফন্দি-ফিকিরে অর্থ হাতিয়ে নেয়, কূটনীতিক নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে, নিজেদের আগ্রাসন বাড়িয়েই চলে। বাংলাদেশের পদ্মা সেতু এই দৈত্য-দানব ঋণ প্রদানকারী আগ্রাসীদের জন্য বড় এক হোঁচট। বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণ আগামীতে বিশ্বের দেশে দেশে ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটা উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কোনো প্রকল্পের জন্য ঋণ নিয়ে কোন খাতে কত ব্যয় করবে, কোত্থেকে কোন জিনিস ক্রয় করবে, কাকে পরামর্শক নিয়োগ দেবে– এই সমস্ত বিষয় ঋণগ্রহীতা দেশ নিজেই ঠিক করার সাহস পাবে; শোষিত-নিষ্পেষিত ও নানান দেশ ও গোষ্ঠীর অত্যাচার-নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের শিকার দেশগুলোর জন্য একটা বড় শক্তি ও উৎসাহ-অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে থাকবে পদ্মা সেতু৷ পদ্মা সেতু নিয়ে যেন আর উন্মত্ততা না ছড়ায়; ভবিষ্যৎ স্থাপনাকেন্দ্রিক কোনো বদনামের ভাগিদার যাতে আমরা না হই সেজন্য সবাইকেই সজাগ থাকতে হবে, যার যার অবস্থা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের পদ্মা সেতু এক অনন্য অনুপ্রেরণা, অদ্বিতীয় নজির।

বাংলাদেশের চপেটাঘাত বিশ্ব ব্যাংক তো ভুলতেই চাইবে, তারা চাইবে এ ঘটনা যেন বিশ্বব্যাপী মানুষ না জানুক, ধামাচাপা পড়ুক। অনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং নানান অবৈধ শর্তারোপের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণে শক্ত খুঁটি হচ্ছে আমাদের পদ্মা সেতু, বিশ্ব পাবে নতুন পথের ঠিকানা, নতুন আলোর সন্ধান। আমাদের পদ্মা সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে নানান শক্তি বিবেচনায় তুলনামূলক কমশক্তিধর দেশগুলো তথাকথিত মোড়ল, প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থাকে না বলতে পারার, ফিরিয়ে দেবার, দর কষাকষি করার উৎসাহ খুঁজে পাবে। এটাই পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় অর্জন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ঘোষণাপত্রকে বুকে ধরে পদ্মা সেতুর কাহিনি বিশ্বের দেশে দেশে জানাতে হবে। এই আলোচনা বিশ্বব্যাপী আলোড়নই শুধু ফেলবে না বরং নবদিগন্তের সূচনা করবে। সারা বিশ্ব জানুক ভাঙ্গার মাধ্যমে নয় বরং গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংকের মতো মোড়লদের প্রতিহিংসার প্রতিশোধ দিতে পারে এ বাংলা। পদ্মা সেতুর এই আলাপ যত বেশি ছড়াবে ও চর্চা হবে বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদীদের বুকে তত বেশি কাঁপন ধরবে। আসল কথা হচ্ছে পদ্মা সেতু স্বনির্ভরতার প্রতীক, এটি বিশ্বের সব দেশের জন্য জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার স্পৃহা। জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন এবং সমুন্নত রেখে সব দেশ যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেজন্য বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের করা পদ্মা সেতু অনন্য এক দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে। আমরা প্রত্যাশা করি তথাকথিত মোড়লদের হুমকি-ধামকি এবং ভয়ডর মোকাবেলা করে বিশ্বের সব দেশ জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে আপসহীন হবে, নিজ দেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে হবে বদ্ধপরিকর। দেশে দেশে মজলুমের যুথবদ্ধতায় প্রভাব-প্রতিপত্তি হারাতে থাকবে জুলুমবাজরা। তথাকথিত মোড়লদের দিন শেষ হয়ে আসবে, এ ধরিত্রীতে অত্যাচারিত-নিষ্পেষিত-শোষিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীটা হয়ে উঠবে সবার।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক