Published : 08 Jul 2022, 10:49 PM
মানুষ এবং রোবর্টের মধ্যে মূল পার্থক্য, হৃদয় বা অনুভূতি থাকা বা না থাকা। ৮ জুলাই সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে নারা শহরে এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে-কে গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। অতি সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে নারা মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
নারা শহরের ওই ঘটনাস্থল থেকে ওসাকা শহরে আমার কর্মস্থল মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে। দুপুর ১১টা থেকে ১২ টা অথবা ১২ টা থেকে ১টা পর্যন্ত সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলিতে লাঞ্চ বিরতি। আমরা দুইজন বিদেশি শিক্ষক অফিসের বাইরে গিয়ে এ নিয়ে অনেক কথা বলে এলাম। জাপানিজ সবাই লাঞ্চ করে আবার যার যার কাজে ফিরে গেল। ছাত্র–ছাত্রীরা লাঞ্চের পর খেলার বিরতিতে খেলা শেষ করে ক্লাশে ফিরে গেল। বিরতির সময় সবাই মোবাইল ফোনে নিউজটা একবার অল্প সময়ের মধ্যে দেখে নিল। দ্রুত খবর পড়া থেকে চোখ সরিয়ে মাঙ্গা বা কার্টুন এর উপর মনোযোগী হয়ে গেল। লাঞ্চ বিরতি শেষ হবার ঠিক ১০ মিনিট আগে যে যার কাজে যোগ দেবার জন্য তৈরি হয়ে গেল। কারো চোখে পানি নেই, মুখে কোনো মন্তব্য নেই, প্রতিবাদ মিছিল বা কর্মবিরতি এরা বোঝে না।
জাপানের সামাজিক মাধ্যমে কোনো পোস্ট বা মন্তব্য নেই। সারা দেশে এই মুহূর্তে যে সমস্ত বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো ছিল সেগুলো যথারীতি শুরু হয়েছে এবং পরিচালিত হচ্ছে । ১০ জুলাই জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ নির্বাচনকে সামনে রেখে এলডিপির প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানাতে নারা এসেছিলেন আবে।
জাপানের নির্বাচনে ১০ থেকে ১২ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে যায়। অতএব ৯০ শতাংশ মানুষের মধ্যে দেশ বা রাজনীতি নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সব কথা সবাই খুব স্বাভাবিকভাবে বলছে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই। জিজ্ঞেস করে জানলাম আলোচনা নিষিদ্ধ নয়। তবে জাপানি সংস্কৃতিতে কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন আলোচনা রুচিসম্মত নয় বা অদ্ভুত আচরণ বলে গণ্য হয়।
সাধারণত জাপানের প্রধানমন্ত্রীরা মেয়াদ পূরণ করতে পারেন না। এখানে প্রবাদ আছে কারো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার পরিকল্পনা থাকলে তাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দেয়া হয়। জাপানের লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই নেতা শিনজো আবে ২০০৬ থেকে ২০০৭ এবং ২০১২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত দুই পর্বে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন । অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের একটি কঠিন সময়ে তিনি হাল ধরেছিলেন। তার প্রণীত অর্থনৈতিক কৌশল-কে 'আবেনমি' বলা হয়।
জাপানে গোলাগুলি বা হত্যাকাণ্ড খুব বিরল ঘটনা। হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আঘাত ছাড়াই তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
এলডিপি দলের আরেকজন নেতা নাগাসাকি শহরের মেয়র ইচ্চ ইতো-কে ১৭ এপ্রিল ২০০৭ গুলি করে হত্যা করা হয়। এখনও আমার মন কাঁদে তার জন্য। তিনি আমাকে ১৯৯৯ সালে জাপানে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বিখ্যাত বই 'দ্য বেলস অব নাগাসাকি' বাংলা ভাষায় অনুবাদের অংশ হিসেবে এই ভ্রমণটি ছিল আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
২ মে ১৯৯৫ নাগাসাকির মেয়র হিসেবে ইচ্চ ইতো তার প্রথম মেয়াদ শুরু করেছিলেন। দক্ষতার সাথে নগর সরকার পরিচালনা করে একটি পর্যটন শহরের পুনরুজ্জীবন করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে মেয়র হিসাবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে তার তৃতীয় মেয়াদে জয়লাভ করেন। ১৭ এপ্রিল ২০০৭ তার চতুর্থ মেয়াদের জন্য পুনঃনির্বাচনের প্রচারণা চালানোর সময়, নাগাসাকি স্টেশনের বাইরে তার প্রচার অফিসের সামনে একটি গাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাকে গুলি করা হয়।
সাথে সাথে তাকে নাগাসাকি ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরের দিন ভোরে তিনি মারা যান। ইচ্চ ইতো ছিলেন নাগাসাকির দ্বিতীয় মেয়র যাকে গুলি করা হয়েছিল। ১৯৯০ সালে তার পূর্বসূরি মেয়র হিতোশি মোতোশিমা-কে গুলি করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন।