‘বহিরাগত উপাচার্য’ নিয়োগের সংকট

নাদিম মাহমুদ
Published : 11 June 2021, 08:03 PM
Updated : 11 June 2021, 08:03 PM

কয়েক মাস ধরে উপাচার্যবিহীন চলা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সচল করতে সম্প্রতি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছে সরকার। নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের অনেকেই 'ক' বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে 'খ' বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন থেকে দেশের প্রধান কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা নিয়োগ হচ্ছেন অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠাই পেয়েছে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেরা দাঁড়াবে বলে। শিক্ষা ও মৌলিক গবেষণায় জ্ঞান সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন দায়িত্ব, তেমনি নেতৃত্ব তৈরি করাও। 

দেখা যাচ্ছে, বিভাগীয় প্রধান থেকে প্রভাষক পদ পর্যন্ত নিয়োগ কেবল স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হলেও কেবল উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। নিয়োগের সময় আবার শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, 'নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হবে'। 

সম্প্রতি কয়েকজন 'বহিরাগত উপাচার্যে'র বিশ্ববিদ্যালয় বিমুখতার প্রেক্ষিতে সরকার সম্ভবত এ শর্তজুড়ে দিয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যদি ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা শুরু থেকে কর্মরত শিক্ষকদের ভেতর থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন, তাহলে এমন শর্ত নিষ্প্রয়োজন ছিল।

'বহিরাগত উপাচার্য' নিয়ে আলোচনার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়- সেটি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন সামান্য হলেও আছে বলে মনে করছি। 

দেশের শীর্ষ চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যে আইন দ্বারা পরিচালিত সেই ১৯৭৩ অ্যাক্টে (ঢাকা) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের অধ্যাদেশের ১১ (১) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, 

The Vice-Chancellor shall be appointed by the Chancellor for a period of four years from a panel of three persons to be nominated by the Senate on such terms and conditions as may be determined by the Chancellor, and shall be eligible for re-appointment for a further period of four years.

সিনেট থেকে মনোনীত ব্যক্তির মধ্যে উপাচার্য হিসেবে আচার্য কর্তৃক নিয়োগের কথা বলা হলেও, এরপর নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। 

'সিনেট' শব্দটিকে বাইরে রেখে, ১৯৮৬ সালের ২৫ অগাস্ট অধ্যাদেশে আসা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ (১) ধারার বলা হয়েছে,  ভাইস-চ্যান্সেলর (উপাচার্য), চ্যান্সেলর (আচার্য) কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে চার বছরের জন্য নিযুক্ত হবেন।

প্রায় একই বাক্য লেখা আছে, খুলনা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ধারায়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একই পথক্রমে রয়েছে।

এসব নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য কোত্থেকে থেকে নির্বাচন করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা আসছেন সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্য থেকেই। বিষয়টা অনুমেয় যে, ৭৩ অধ্যাদেশের আদলে গড়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য আসা উচিত ছিল সেসসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই। কিন্তু সেটা চোখে পড়েনি।

তবে ব্যতিক্রম হলো সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে উপাচার্য নিয়োগের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, 

The Vice-Chancellor shall be appointed by the Chancellor from amongst the academicians with specialization in the field of agricultural science and technology or a reputed professor from any university for a period of four years on such terms and conditions as the Chancellor may determine.

উপাচার্য কারা ও কোন প্রতিষ্ঠানের থেকে হবেন তার ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যরা আসছেন সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্য থেকেই। প্রশ্ন হলো, 'বহিরাগত' উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিলে সমস্যা কোথায়? কেন উপাচার্যদের নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেই নিতে হবে?

গত এক দশক ধরে 'বহিরাগত' উপাচার্য দ্বারা পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাবে, সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তারা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়ে গিয়েছেন, সেখানকার অভ্যন্তরীণ পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি। প্রেষণে দায়িত্ব নিয়ে উপাচার্যদের একটি বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারসাম্য ফেরাতে পারেননি।

এদের মধ্যে কয়েকজন উপাচার্য বাইরে থেকে গিয়ে 'শিক্ষক রাজনীতি'র জটিল বেড়াজালে জড়িয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে  অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।

অনেকে আবার কালেভদ্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চেয়ারে বসেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজধানীতে 'লিয়াজোঁ ক্যাম্পাস' থাকছে, সেখানে বসতে স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন তারা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন কার্যক্রম যেমন পিছিয়ে যাচ্ছে, তেমনি অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে থাকছে জট। কোনও গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাগজ উপাচার্য স্বাক্ষরের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষায় করার ঘটনাও হরহামেশা ঘটছে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মায়াও তৈরি হয় না। 

আগেই বলেছি, বাইরে থেকে যাওয়া উপাচার্যরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন, তারা বিভিন্নভাবে স্থানীয় শিক্ষকদের রোষানলে পড়ছেন কিংবা কেউ কেউ আধিপত্য বিস্তার করতে শিক্ষকদের বিভক্তিতে ফেলছেন। যার কারণে, বহিরাগত উপাচার্যদের কাঁধে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরজুড়ে পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হচ্ছে। আন্দোলন ও সংগ্রামের বেড়াজালে সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ব্যবস্থা 'আইসিইউ'-তে চলে যাচ্ছে।    

কয়েক বছর আগে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদেশি হওয়ায় সেটি নিয়ে আমাদের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। খোদ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই মন্তব্য করেছেন, আমাদের দেশে কী যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ছিল না, যে ভিনদেশীকে আনতে হবে? 

ঠিক একই কথা চলে বেশিরভাগ অভাগা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও, যাদের উপাচার্যরা এসেছেন অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কেন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সেখানকারই শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকদের ভেতর থেকেই হচ্ছেন না? 

একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ৩৬ বছর হয়ে গেছে। এরইমধ্যে দেখলাম সেখানকার উপাচার্যও 'বহিরাগত'। কেন ওই প্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে শিক্ষক এনে উপাচার্য পদ চালাতে হবে? শত শত শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন, তাহলে তাদের একজন কেন উপাচার্য পদের দায়িত্ব কেন নিতে পারবেন না? শিক্ষকরা যদি গবেষণায় এগিয়ে যেতে পারেন, তাহলে কেন উপাচার্য পদে যাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হচ্ছে না? 

উপাচার্য পদ কি খুব কঠিন কিছু? নাকি সরকার ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না? বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় যোগ্যতা যদি এদের না থাকে, তাহলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করবে কীভাবে?

নব্বই দশকের পর প্রতিষ্ঠিত ৯০ ভাগেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় বহিরাগত উপাচার্য দিয়ে চালাচ্ছে। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ঔপনিবেশিক শাসনের আদলে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার কাঠামো সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কখনওই সুখকর নয়।

উপাচার্য পদটি আসলে এখন রাজনৈতিক পদ। ফলে শিক্ষা ও গবেষণায় পটুদের টপকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত রাজনৈতিক মদদপুষ্টরা এই পদে আসছেন। 

মনে করা হচ্ছে, পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাওয়া অধ্যাপকরা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিলে নিশ্চয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভালভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। ফলে ক্ষমতাসীনদের অনুগত অল্প কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পাচ্ছেন। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় বলে দাবি করা হলেও, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই যখন বাইরের আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেন, তখন তাকে কোন অবস্থায় স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না। 

নৈতিকভাবেও ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছোট করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা শত শত অধ্যাপকদের অপমান করা হয়। দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তি যখন অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেন, তখন সেই শিক্ষকদের আত্মসম্মানে ঘা লাগাটা স্বাভাবিক নয় কি?  

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের ভিত্তি তৈরি করতে কিছুটা সময় নেয়। আর সেখানে বহিরাগত উপাচার্য, বিভাগীয় প্রধানদের এনে অনুজদের তৈরি করা মোটেই দোষের কিছু নয়। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য এসেছেন বাইরে থেকেই। এরপর নিজেরাই নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। 

ছেলে-মেয়েরা যখন বড় হয়, পিতা-মাতা তখন তাদের স্বাধীনতা দেন। আর যে পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের নিয়মের বুলিতে আটকাতে চান, সেই সন্তানরা পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে। আমাদের এসব অভাগা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাই।

শিক্ষা-দীক্ষায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যেমন শক্ত হয়ে দাঁড়ানো শিখতে হয়, তেমনি যোগ্য নেতৃত্বে সক্ষমতাও তার তৈরি করতে হয়। আশা করি, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক