১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নোবেল শান্তি পুরষ্কার বির্তক

নাদিরা মজুমদার

Published : 30 Oct 2012, 07:36 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:51 PM

২০১২ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কারটি এককভাবে দেয়া হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ণকে (ইইউ)। ইইউ'র পুরষ্কারপ্রাপ্তি, খুশি ও বিতর্ক-দুইয়েরই প্রবল বাক্যবন্যার সৃষ্টি করেছে। ১৯০১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে ২৪বার – হয় এককভাবে, কখনো বা ব্যক্তির সহযোগি হিসেবে, সংস্থাকে শান্তি পুরষ্কার দেয়া হয়েছে। ২০১২ সালের সর্বশেষ গ্রহীতা ইইউ ছাড়াও বিভিন্ন বছরে নানাধরণের সংস্থা শান্তি পুরষ্কারের গ্রহীতা ছিল; যেমন, ইন্টারগভরমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ, গ্রামীন ব্যাঙ্ক, স্বয়ং জাতিসংঘ, কখনোবা জাতিসংঘেরই অধীনস্থ উদ্বাস্তু সংস্থা, শিশু সংস্থা, পীস-কিপিং ফোর্সেস, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বা আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থা কি এ্যমনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি। কোন কোন সংস্থা আবার একাধিকবার শান্তি পুরষ্কারপ্রাপ্তির গৌরব অর্জন করে। তা সত্ত্বেও কখনোবা সংস্থার শান্তি পুরষ্কার প্রাপ্তি প্রায়শই বিতর্কের জন্ম দেয়। নোবেল পুরষ্কারের ক্ষেত্রে বোধকরি নোবেল শান্তি পুরষ্কারের বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি আত্মলীন, বিষয়কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা দূষিত হয়ে থাকে; পুরষ্কারের মাহাত্ম্যের প্রতি আস্থা ও ভক্তির ঘাটতি প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে, অনিবার্যভাবেই র্দীঘমেয়াদি পক্ষ-বিপক্ষের বাতবিতন্ডা ও বিতর্কও অব্যাহত থাকে।

ইইউ' র নোবেল শান্তি পুরষ্কারপ্রাপ্তি ইউরোপে যথেষ্ট ব্যঙ্গোক্তি এবং অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধাপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে বটে, তবে ইউরোপ মহাদেশের ভূ-খন্ড থেকে যুদ্ধ নামক সংক্রামক ব্যাধির উৎপাটন করে ইউরোপের নাগরিকদের যুদ্ধবিহীন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন প্রতিষ্ঠায় ইইউ'র কৃতিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ইউরোপের ইতিহাস, উদাহরণ স্বরূপ, অন্তত বিগত শতাব্দির ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যাবে যে নিজেদের মধ্যে অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াও ইউরোপ মহাদেশ দুদুটো বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে অসংখ্য মৃত্যু, অসংখ্য গৃহহীন, বিজয়ী কর্তৃক বিজিতের নিগ্রহ, মহামারি, মহাদুর্ভিক্ষ, উত্তাপবিহীন শীতকাল ইত্যাদি ক্লেশের অবতারণা করে। প্রথম মহাযুদ্ধের ফলস্বরূপ বিদ্যমান সাম্রাজ্যগুলো ভেঙ্গে গুড়ে যায়; নতুন ইউরোপীয় শক্তি বিন্যাসের স্ফটিকীকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয় বিজিত জার্মানি ও তার উপনিবেশ এবং ধ্বসে যাওয়া সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ। ফলস্বরূপ, বিশটি বছর পেরোতে না পেরোতেই আত্মম্ভরী বিজয়ী ইউরোপের বিরুদ্ধে বিজিত লাঞ্ছিত, অপমানিত জার্মানির নেতৃত্বে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। সম্পূর্ণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধটিই তুলনাহীন নির্মম নৃশংসতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় ঠাসা এক অধ্যায়ের জন্ম দেয়। নৃতাত্ত্বিক বিশোধণ-যাতে জার্মানি ছাড়াও কখনোবা মিত্রবাহিনীও অংশ নিয়েছিল, এই যুদ্ধে ঘটে; চূর্ণবিচূর্ণ ইউরোপ পরিণত হয় এক মহাশশ্মাণে – কোটি কোটি মানুষ হয় গৃহহীন, হয় স্থানচ্যুত; সরকারি হিসেব অনুযায়ী, জার্মানিতে ২০ মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন হয়, যুদ্ধাবসানের শেষ বছরটিতে বোমাবর্ষণ করে ফ্রান্সের কমকরে পাঁচলাখ বাড়ি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়; ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিজিল্যান্ট দলের হাতে হাজারে হাজারে নাৎসী সহচরের নিগ্রহও বাদ যায় না; যুদ্ধ শেষে, মিত্রবাহিনীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী বিভিন্ন দেশ থেকে জার্মান বিতাড়ণ শুরু হয়। সেইসঙ্গে ছিল ভয়াবহ ক্ষুধা, মাথা গোজার মতো একটুকু ছাদের অভাব; ১৯৪৭ সালের শীতকালটি আসে তার সব কয়টি মরণছোবল নিয়ে। এরই মধ্যে, নানান দেশে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ-বাহিনীগুলো স্বেচ্ছায় আদৌ অস্ত্র সমর্পণ করবে কিনা, বাড়তি মাথাব্যথা হয়ে দেখা দেয়। ১৯৪৫ ও ১৯৪৯ সালের সময়সীমায়, অধিকাংশ জার্মান বিশ্বাস করত যে "আইডিয়া হিসেবে নাৎসীবাদ ভাল ছিল, তবে তার প্রয়োগ হয় কুৎসিতভাবে"। এমন এক ধ্বংসস্তূপ থেকে যুদ্ধবিহীন সমৃদ্ধশালী ও শক্তিশালী ইউরোপের আর্বিভাব রূপকথার বিষয় হয়ে থাকতে পারত। থাকেনি।

সীমাহীন অনেক অসংখ্য গাদা গাদা অনিশ্চয়তা থেকে ইউরোপকে টেনে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বিশাল ভূমিকা তো রয়েছেই, আর রয়েছে ফরাসি রর্বাট শুমানের ঐতিহাসিক "শুমান ঘোষণা"র সফল বাস্তবায়ন-যা পরবর্তীতে ইউরোপীয় একাঙ্গীকরণ প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। জার্মানির জন্য ভার্সাই চুক্তির মতো অবমাণনাকর কোন চুক্তি আর নয়, ফ্রাঙ্কো-র্জামান শত্রুতাও আর নয়, বরং ইউরোপের ভূ-খন্ডে যুদ্ধকে অচিন্তণীয় ও কাঁচামালের দিক দিয়েও অসম্ভব করে তোলার মহামন্ত্রে অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্রান্স, ইতালি ও বেনেলুক্সের তিনটি দেশ-বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবুর্গ, জার্মানিকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে "ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি"। প্রাথমিক দফায় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি গঠণের মূল কারণ ছিল যে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরিতে সেই সময়ে এই দুটি বস্তু ছাড়া চলত না; এবং জার্মানিও তাই সঙ্গে থাকলে – একদিকে যেমন তার ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপরে সরাসরি নজর রাখা সহজ হবে, অন্যদিকে আবার বিজয়ীদের সঙ্গে সমর্মযাদা প্রাপ্তি আত্মশ্লাঘার জন্ম দেবে না। ১৯৫১ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি'র প্রতিষ্ঠা হয়। কয়েক বছর বাদে রোম চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় আরো দুটি সংস্থার : ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কমিউনিটি – যা কমন মার্কেট নামেও পরিচিত, এবং ইউরোপীয় পারমানবিক শক্তি কমিউনিটি। কয়লা ও ইস্পাত এবং অর্থনৈতিক, এই দুই কমিউনিটি ইউরোপীয় ইউনিয়ণের সঙ্গে পরে একীভূত হয়, কিন্তু "ইউরোপীয় পারমানবিক শক্তি কমিউনিটি" প্রশাসনিকভাবে ইইউ'র অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও নির্ভরমুক্ত সংস্থা হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। ১৯৯৩ সালে ইইউ আধুনিক অবয়ব অর্জন করে মাস্ট্রিক্ট চুক্তির মাধ্যমে।

রবার্ট শুমান ছিলেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ; ছিলেন ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী, বৈদেশিক মন্ত্রীও দু'বার ফ্রান্সের প্রধাণমন্ত্রী। যুদ্ধোত্তর ইউরোপ ও ট্রান্স-আটলান্টিকের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়তে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। ১৯৪৯ সালে যখন ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়, ছিলেন তার অন্যতম প্রধাণ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন; একইভাবে একই বছর যখন প্রতিষ্ঠিত হয় কাউন্সিল অব ইউরোপ-সেখানেও উপস্থিত থাকেন অন্যতম প্রধাণ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে। অতঃপর ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন "ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি"- যা থেকে জন্ম নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ণ নামক এক ভূ-রাজনৈতিক অন্তিত্ব বা জিয়ো-পলিটিক্যাল এনটিটি; ছয়টি দেশ নিয়ে যার শুরু- বর্তমানে তার সদস্য সংখ্যা ২৭। "ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি" একদিকে যেমন ফ্রাঙ্কো-জার্মান তীব্র অবিশ্বাস ও গভীর সন্দেহের অবসান ঘটাতে সাহায্য করে, অপরদিকে জার্মানিকে ন্যাটো'র অন্তর্ভুক্ত করায়, ফ্রান্সও সহজেই জার্মানির পুণঃসামরিকীকরণের বিরোধিতা থেকে সরে আসে। সূচনা হয় নতুন এক অধ্যায়ের।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউরোপের এই মহাসঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও ছিল অতুলনীয়। মার্শাল প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কমকরে ১৩ বিলিয়ণ ডলার (এক বিলিয়ণ = একের পরে নয়টি শূন্য) পরিমাণের সাহায্য দেয়। এখনকার হিসেবে পরিমাণটি ১০০ বিলিয়ণ ডলারেরও বেশি। বিগত শতাব্দির চল্লিশের দশকে পরিমাণটি ছিল বিশাল বিপুল। যুদ্ধাবসানের সাত বছর বাদে, অর্থাৎ ১৯৫২ সালে মার্শাল প্রকল্প সমাপ্ত হয়। "ইউরোপীয় ইউনিয়ণ প্রজেক্টে"র সাফল্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ছাড়াও ইউরোপেরও যে প্রচুর শ্রম রয়েছে, অস্বীকার করার উপায় নেই কোন। ইইউ'র কোন সদস্যদেশ নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে বসবে – অসম্ভব, কল্পনাতীত। ইইউ'র রূপান্তর প্রক্রিয়ার গভীরতা অনেক অনেক গভীর; তবে এই গভীরতার শিকড় কেবলমাত্র ইইউ ও ট্রান্স-আটলান্টিক চৌহদ্দির মধ্যে সীমিত। বলা যায় যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইউরোপ মোটামুটি নিজের পায়ে দাঁড়াবার শক্তি ১৯৫২ সালের মধ্যেই অর্জন করে। তদুপরি, একক ভিত্তিতে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে ন্যাটো প্রতিষ্ঠার বছরই কাউন্সিল অব ইউরোপও প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সুবিচারের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পথ খুলে যায়। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়। ইউরোপীয় দেশগুলো কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠণে মনোনিবেশে সক্ষম হয়। অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ও ন্যাটো'র মাধ্যমে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টির ফলে যুদ্ধোত্তর বিশৃংখলার সুযোগে চরমপন্থী আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে না। এবং ন্যাটো প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব আরো স্বচ্ছভাবে ব্যক্ত করেন ন্যাটো'র প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল লর্ড ইসমে; বলেন "রুশদের ঠেকাও, আমেরিকানদের ঢোকাও, জার্মানদের দাবিয়ে রাখো"।

কিন্তু একই সময়ে এশিয়াতেও যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধজনিত ক্ষতের উপশমে ও নির্মূলে ইউরোপীয়-কায়দার উদ্যোগ আয়োজনের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে জুজুর ভয় এখনো বর্তমান; কিন্তু ফ্রাঙ্কো-জার্মান কি এ্যংলো-জার্মান জুজুর ভয় ইতিহাস হয়ে রয়েছে। বা এমনকি ইইউ'র অনুরূপ সংস্থা হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত আফ্রিকা ইউনিয়ণের আবির্ভূত হওয়ার প্রচেষ্টাও স্থবির হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় প্রজেক্টের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বিরাজমান পার্থক্যের সুরাহা করতে আর কখনোই যুদ্ধ করেনি বটে, তবে মানতেই হয় যে ইউরোপীয় শান্তি ও "বিশ্ব" শান্তি প্রচেষ্টার সঙ্গে অজস্র কুৎসিত অভিজ্ঞতাও জড়িয়ে রয়েছে। স্পেন বা পর্তুগালের ফ্যাসিস্ট আচরণ বা ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, নেদারল্যান্ডস কি যুক্তরাজ্য বা বেলজিয়ামের নৃশংসতা কম ছিলো? বা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য; কিংবা, ইয়োগোস্লাভিয়ার নৃতাত্ত্বিক সহিংসতাসহ আরবীয় বসন্তের সিলেকটিভ প্রয়োগ, ইত্যাদি ইত্যাদি। বা নতুন বিশ্ববিন্যাসের যুগে সম্পূরক শক্তি হিসেবে ইইউ' বিশ্বকে 'পশ্চিম-পূব'-য়ের বিভক্তিকরণ সীমারেখাকে আরো সুস্পষ্ট করতে সাহায্য করে। এতো কিছু সত্ত্বেও ইইউ ইউরোপের ভূ-খন্ডে যুদ্ধকে অকল্পনীয় ঘটনায় পরিণত করতে সফল হয়। সংস্থা হিসেবে ইইউ'র শান্তি পুরষ্কার প্রাপ্তি যে বিতর্কের অবতারণা করে, সংক্ষেপে সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। চেক প্রেসিডেন্ট ভাৎস্লাভ ক্লাউস দিয়ে শুরু করা যাক। ইইউ'র কার্য সম্পাদন কৌশলের সমালোচক হিসেবে ক্লাউস সুবিদিত। ইইউ'র নোবেল শান্তি পুরষ্কার প্রাপ্তির খবর শুনে ক্লাউস বলেন, এমন উদ্ভট ও খেপামি আর কাকে বলে! আমলা পরিচালিত ইইউ' বরং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে "কোণঠাসা" করতে তৎপর। ইইউ'কে পুরস্কৃত করা "প্রায় অবৈধ" উদ্যোগ, তারচেয়ে বরং যদি সেই আদি কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি'কে পুরষ্কারটি দেয়া হত তো মানে বোঝা যেত। এন্ডারস ব্রেইভিকের দেশ নরওয়ে ইইউ'র সদস্য নয়; নরওয়ের নোবেল শান্তি কমিটির সিদ্ধান্তকে তাই কেউ কেউবা নর্ডিক ধাপ্পাবাজি বলতেও সঙ্কোচবোধ করেননি। কেউবা বলেন যে শান্তি কমিটিতে, হয় ব্যঙ্গনবিশ স্যাটায়ারিস্টের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বা নয়ত সংস্থাটির মর্যাদাহানিতে প্রতিপক্ষদল কর্মতৎপর রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কেউবা ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট ওবামা'র শান্তি পুরষ্কার প্রাপ্তির প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। জর্জ বুশকে পুরস্কৃত না করে যে ওবামাকে পুরস্কৃত করা হয়, সেই ওবামা আফগানিন্তানে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন, চালক-বিহীন ড্রোণ বিমানের আক্রমণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়, লিবিয়া'র রক্তক্ষয়ী বিপ্লবেও আমেরিকা জড়িয়ে পড়ে। এই দলের মতে, 'হোমওয়ার্ক' না দেখে কাউকেই আগাম পুরষ্কার দেয়া মোটেই ঠিক নয়। কেবল নোবেল শান্তি পুরষ্কারের ক্ষেত্রেই নয়, যেকোন পুরষ্কারই 'হোমওয়ার্ক' সমাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া উচিত। কেউবা এমনও বলছেন যে কেবলমাত্র স্বয়ং ইইউ'কেই শান্তিরক্ষক বলে যারা মনে করেন তারা আসলে জড়বুদ্ধির রোগে ভুগছেন। তাদের মতে, প্রধাণত আমেরিকান, রুশ ও ব্রিটিশদের নিয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী ১৯৪৫ সালে জার্মানিকে পরাজিত করে ও নিরস্ত্র করে। জার্মানরা অসাধারণ রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণ করে নিজেদের জন্য শান্তিপ্রিয় সমাজ গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে ইইউ'র ভূমিকা অতি নগণ্য। বরং আমেরিকা ও ব্রিটিশ প্রাধান্যবহুল ন্যাটো মূলত পশ্চিম ইউরোপের শান্তিরক্ষকের দায়িত্ব পালন করে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের ও যুক্তরাজ্যের ট্যাক্সদাতার বিরাট আত্মত্যাগ অস্বীকার করার উপায় নেই। যুক্তরাজ্য থেকে আগত এই মন্তব্যের মধ্যে পুরানো ফ্রাঙ্কো-ইংলিশ রেষারেষির আভাস রয়েছে। কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি এবং কমন মার্কেট প্রতিষ্ঠাকালে ফ্রান্স সযত্নে যুক্তরাজ্যকে সব কর্মকান্ডের বাইরে রাখে; যুক্তরাজ্য একাধিকবার প্রবেশের প্রচেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। শার্ল দ্য গ্যলের ঐতিহাসিক ঘোষণা–'যুক্তরাজ্যকে আমার মৃতদেহ ডিঙিয়ে ঢুকতে হবে' -র সত্যতা প্রমাণও হয়, যুক্তরাজ্য অবশেষে উপরোক্ত সংস্থার সদস্য হয় দ্য গ্যলের মৃত্যুর পরে। ফ্রাঙ্কো-ইংলিশ রেষারেষির অনেক কারণ রয়েছে; যেমন, যুদ্ধোত্তরকালে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দামি মিত্রে পরিণত হয়, ন্যাটো'র পরিচালনায়ও যুক্তরাজ্যের প্রাধান্য ছিল প্রবল, যার ফলস্বরূপ, দ্য গ্যলের আমলে ফ্রান্স ন্যাটো'র কমান্ড থেকে নিজেকে প্রত্যাহারও করে। ফ্রাঙ্কো-ইংলিশ রেষারেষির পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশের মধ্যেও নানাবিধ রেষারেষি ও মনোমালিন্য ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো যুদ্ধকে বর্জন করে ও আলাপআলোচনার মাধ্যমে সমাধানের এক নতুন পন্থা গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা করে। এই প্রসঙ্গে এক তুর্কি মন্তব্যের উল্লেখ না করলেই নয়। দৈনিক র‌্যাডিক্যাল পত্রিকায় ফেহিম তাসকেতিন লেখেন, "ইইউ'র পুরষ্কার প্রাপ্তি খুশি মেশানো অনেক হাসিমুখেরও জন্ম দিয়েছে। … পুরষ্কারটি ইইউ'র আসলে অনেক আগেই পাওনা ছিল। … ইইউ প্রজেক্ট নিয়ে মতবিরোধের কোন অবকাশ নেই। …তবে ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড যখন অতপর ইউরোপীয় মহাদেশের অংশভুক্ত হয়, বা অন্তত ২০০৪ সালে ইইউ'র মহাসম্প্রসারণের মাধ্যমে ঠান্ডাযুদ্ধ যুগের সত্যিকারের অবসান ঘটে, সেসময়ে ইইউ'র পুরষ্কারটি পাওয়া উচিত ছিল। ….যদিও ইইউ একটি শান্তি-প্রজেক্ট, কিন্তু বিশ্বশান্তিতে তার কোন প্রভাব পড়ে না।…অসময়ের পুরষ্কার প্রাপ্তি তাই অজস্র প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। রেইসিজম, ভিনদেশি-ভীতি ও ঘৃণা এবং ইসলামোফোবিয়ায় কন্টকিত এই সময়ে, এগুলোর প্রকাশ ও বিকাশ রোধে যুক্তিগ্রাহ্য রাজনৈতিক কৌশলের অভাব ও ঘাটতি বড়ো বেশি করে অনুভূত হচ্ছে …"।
হতে পারে যে এই গভীর সংকটকালে ইইউ'র জন্য ভাল খবর পাওয়া খুব জরুরী, বা হতে পারে যে বিশ্ব রাজনীতিতে ইইউ'র প্রভাব বৃদ্ধির 'টনিক' এই পুরষ্কারপ্রাপ্তি; বা দুটোই হতে পারে। কারণ, খোদ নরওয়ের পীস কাউন্সিল নোবেল কমিটি'র সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক মাত্রা সম্বলিত বলে অভিযোগ তুলেছে, এবং বলে যে ইইউ'কে পুরষ্কার প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে আলফ্রেড নোবেলের মিশন স্টেটমেন্টকে খুব একটা পাত্তা না দেয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কমিটি প্রধাণ থর্বয়োর্ণ জাগল্যান্ডের পদত্যাগের দাবিসহ নতুন এক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে পীস কাউন্সিল, যাতে থাকবেন এমন সব ব্যক্তিত্ব যাদের আন্তর্জাতিক শান্তি সংক্রান্ত জ্ঞান নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই।

ষাট দশক বাদে, ইইউ যখন বৃহত্তম সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে, তখনই ইউরোপে শান্তি ও গণতন্ত্র বিকাশের জন্য ইইউ'কে শান্তি পুরষ্কারটি দেয়া হয়। ইউরোজোনের অস্থিরতা, গণবিক্ষোভে উত্তাল গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল, কি যুক্তরাজ্য যদিও "শান্তি"র বার্তাবাহক নয়, বা হতে পারে যে অসময়ের পুরষ্কার প্রাপ্তি এটি, বা নরওয়ের পীস কাউন্সিলের মতে হতে পারে যে বিগত বছরে বিশ্বশান্তির বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয় ইইউ, তবে মানতেই হয় যে কমন মার্কেট, সহজ সরল ভ্রমণ, ব্যবসাবাণিজ্য ইত্যাদিতে ইইউ'র ইতিবাচক ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইইউ'র তরফ থেকে ১০ই ডিসেম্বর কে হাত বাড়িয়ে পুরষ্কারটি নেবে – তার মীমাংসা হয়নি এখনো। ক্যান্ডিডেট তিনজন – ইউরোপীয় কাউন্সিল প্রধাণ হেরমান ফান রমপয়, বা ইউরোপীয় কমিশন প্রধাণ খোসে মানুয়েল বারোসো, কিংবা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের স্পীকার মার্টিন শুল্জ্; হয়তবা তাঁরা তিনজনেই একসঙ্গে স্টেজে উঠবেন।

নাদিরা মজুমদার: বিশ্লেষক, লেখক, সাংবাদিক।