ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তি এবং ১০০টি পিএইচডি গবেষণা

মাহফুজুর রহমান খান
Published : 10 Sept 2020, 05:36 PM
Updated : 10 Sept 2020, 05:36 PM

বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং পর্যালোচনা

ইদানিং পত্রিকা খুললেই আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং-এ বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তলানিতে থাকার বিষয়টি প্রকটভাবে চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনারও কোনও শেষ নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সচেষ্ট হলেও গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। চলতি বছরের (২০২০ সাল) টাইমস হায়ার এডুকেশনের র‍্যাংকিং দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ বছরও বিশ্বের সেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই, যেখানে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সেরা প্রতিষ্ঠানটি র‍্যাংকিং-এ ৩০১ থেকে ৩৫০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। নিচের সারণীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে র‍্যাঙ্কিংয়ে ১ নম্বরে থাকা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের র‍্যাংকিং-এ সেরা বিশ্ববিদ্যালটির বিভিন্ন সূচকে প্রাপ্ত নম্বরের তুলনা দেখানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক গড় নম্বর যেখানে ২১ দশমিক ৯ সেখানে ভারতের 'ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সাইন্সেস' এর সামগ্রিক গড় নম্বর ৪৮ দশমিক ৬ আর র‍্যাংকিং এ শীর্ষে থাকা যুক্তরাজ্যের 'অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের' সামগ্রিক গড় নম্বর ৯৫ দশমিক ৬। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সাইন্সেস-এর সাথে আমাদের মূল পার্থক্য হচ্ছে শিক্ষাদান আর গবেষণার স্কোরে, যা সত্যিই হতাশাজনক।

সারণী: ২০২০ সালের টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃক প্রদত্ত র‍্যাংকিংয়ে পৃথিবী সেরা ও ভারতের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূচকে প্রাপ্ত নম্বরের তুলনা (তথ্যসূত্র: টাইমস হায়ার এডুকেশনের বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং ২০২০)

টাইম হায়ার এডুকেশন যে পাঁচটি বিষয়ের মূল্যায়ন পূর্বক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংক নির্ধারণ করে তা পর্যালোচনা করলেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্দশার মূল কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। 

বিষয়গুলো হচ্ছে- শিক্ষাদান, গবেষণা, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি, শিল্প আয়, এবং আন্তর্জাতিকতা। প্রতিটি বিষয়ের উপর মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে স্কোরিং করা হয়। অতঃপর, শিক্ষাদানের স্কোর থেকে ৩০ শতাংশ, গবেষণার স্কোর থেকে ৩০ শতাংশ, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতির স্কোর থেকে ৩০ শতাংশ, শিল্প আয়ের স্কোর থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, এবং আন্তর্জাতিকতার স্কোর থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নিয়ে মোট ১০০ নম্বরের একটি সামগ্রিক গড় স্কোর প্রস্তুত করা হয়। শিক্ষাদানের স্কোর মূলত পাঁচটি কর্মক্ষমতা সূচকের উপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়- ১) খ্যাতি জরিপ, যার মাধ্যমে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের মান সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়, ২) শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাত, ৩) পিএইচডি শিক্ষার্থী-স্নাতক শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাত, ৪) প্রতিজন শিক্ষকের বিপরীতে কতজন পিএইচডি শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয় তার সংখ্যা এবং ৫) শিক্ষাদান থেকে প্রতিষ্ঠানের আয়। 

গবেষণার স্কোর নির্ধারণ করা হয় তিনটি সূচকের উপর ভিত্তি করে। ১) খ্যাতি জরিপ, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে সমসাময়িক গবেষকরা কিভাবে মূল্যায়ন করেন তা নির্ধারণ করা হয়, ২) গবেষণা আয়, যার মাধ্যমে গবেষণার গুরুত্ব ও মান নির্ধারণ করা হয়, এবং ৩) গবেষণার পরিমাণ অর্থাৎ ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি পরিমাণ উন্নত মানের গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে তার উপর। 

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রভাব নির্ভর করে সেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতির সংখ্যার উপর। অর্থাৎ সমসাময়িক গবেষকরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণাপত্রকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, উদ্ধৃতির সংখ্যা তার নির্দেশক। মোট উদ্ধৃতির সংখ্যার উপর নির্ভর করে এই বিষয়ের স্কোর প্রস্তুত করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প আয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রায়োগিক দিক নির্দেশ করে। বিশেষত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয় সমূহের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আয়ের উপর নির্ভর করে এই বিষয়ে স্কোর প্রস্তুত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকতার স্কোর তিনটি সূচকের উপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়। ১) দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীর অনুপাত, ২) দেশি-বিদেশি শিক্ষক/গবেষকের অনুপাত, এবং ৩) গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিমাণ।

দেখা যাচ্ছে, টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিং এর মোট ১০০ নম্বরের সামগ্রিক স্কোরের ৬০ ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান ও পরিমাণের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। উপরন্তু, শিক্ষাদানের যে ৩০ শতাংশ নম্বর আছে তারও একটি বিরাট অংশ পিএইচডি গবেষকের সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। উল্লেখ্য যে, পিএইচডি শিক্ষা মূলত গবেষণা ভিত্তিক। কাজেই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আমাদের দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহকে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে উপরের দিকে আনতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে উন্নতমানের গবেষণার কোনও বিকল্প নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার চিত্র: বাংলাদেশ বনাম উন্নত বিশ্ব

উন্নত বিশ্বে অধ্যাপকগণের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজগুলো মূলত সম্পন্ন হয় পিএইচডি গবেষক/শিক্ষার্থী এবং পোস্ট ডক্টরাল গবেষকদের দ্বারা। অধ্যাপকরা নতুন নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেন, গবেষণা প্রস্তাবনা লিখেন, গবেষণা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন, এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজন মাফিক পিএইচডি গবেষক এবং পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক নিয়োগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে গবেষণা কাজ সুসম্পন্ন করেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই চর্চার অভাব রয়েছে বা সুযোগ নেই। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন পিএইচডি গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে গবেষণার পরিমাণ ও মান উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাস্টার্স, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল গবেষকদের সকলেই স্থান, কাল অনুযায়ী জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন মাফিক মাসিক সম্মানী পান। উপরন্তু, তাদের গবেষণাকর্ম সু-সম্পাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ পেয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে একজন পিএইচডি গবেষকের মাসিক সম্মানী/বৃত্তি বাংলাদেশী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকদের মাসিক সম্মানীর থেকে বেশি। এই সম্মানীর টাকা নানাভাবেই আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ, বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ এর মাধ্যমে, অথবা অন্য কোনও ফেলোশিপ বা স্কলারশিপের মাধ্যমে এটির জোগান দেওয়া হয়। টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই দিয়ে থাকে, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ সাধারণত দেওয়া হয় অধ্যাপকরা বিভিন্ন উৎস থেকে যে গবেষণা বরাদ্দ পেয়ে থাকেন সেখান থেকে। 

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন মোতাবেক লাইব্রেরি বা অন্য কোনও প্রশাসনিক কাজে সহকারী হিসেবে এদেরকে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মাসিক সম্মানী নিশ্চিত করে। অনেকে আবার নিজ দেশের সরকারের বৃত্তির টাকায়ও উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেন এবং বৃত্তির আওতায় তার সম্মানী এবং গবেষণা ব্যয় দুইই থাকে বা কোনও একটি থাকে সেক্ষেত্রে অন্যটি বিশ্ববিদ্যালয়/তত্ত্বাবধায়ক জোগান দিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পিএইচডি গবেষণার বর্তমান অবস্থা হতাশাজনক, আর পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার সুযোগ খুবই সীমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিএইচডি গবেষণায় অর্থের অপ্রতুলতা এর একটি মূল কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে পিএইচডি গবেষকদের একাংশ বৃত্তিপ্রাপ্ত হন, সেই বৃত্তির পরিমাণ মাসিক তিন হাজার টাকার মতো। সুনির্দিষ্ট ভাবে পিএইচডি গবেষণাকর্ম পরিচালনার জন্য ৪ বছর (পিএইচডি কোর্সের মেয়াদকাল) মেয়াদি গবেষণা বরাদ্দের সংস্থান আছে বলে আমার জানা নেই, থাকলেও সেটি অপ্রতুল। দেশে বর্তমানে যে সকল পিএইচডি গবেষণা হয় তার সবই হয় জোড়াতালি দিয়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা খণ্ডকালীন। কাজেই এই রকম গবেষণা থেকে ভালো মানের প্রকাশনা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।  

বর্তমানে, বিভিন্ন বৃত্তির মাধ্যমে আমাদের দেশের শিক্ষক/কর্মকর্তাদের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ আছে, যা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু, তারা যখন দেশে ফিরে আসছেন তখন তাদের গবেষণাকর্ম চালু রাখার ন্যূনতম সুযোগ না থাকাটা দুঃখজনক। একারণে, দেশের টাকায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে সেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে আমাদের দেশিয় গবেষকরা যতটা ভূমিকা রাখছেন, দেশে ফেরত এসে আমাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে সেই ভূমিকা রাখতে পারছেন না। অথচ, যে পরিমাণ খরচ করে একজন গবেষক বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছেন তার অংশবিশেষ খরচের মাধ্যমে দেশিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দেশিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান উন্নয়ন সম্ভব। দেশের টাকায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের যে সুযোগ বর্তমানে আছে তা অবশ্যই চালু রাখতে হবে, কিন্তু এর পাশাপাশি দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্যও অনুরূপ বৃত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা প্রাপ্তির পর দেশে সেটি চালু রাখার সুযোগ সৃষ্টির প্রতি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।

আমরা যদি বছরে ১০০ টি পিএইচডি গবেষণা আমাদের দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করতে পারি, এবং প্রতিটি গবেষণা থেকে ন্যূনতম দুইটি করে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার শর্ত থাকে, তাহলে বছরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে ২০০টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হবে। বর্তমানে যে আন্তর্জাতিক মানের প্রথম শ্রেণির জার্নালে আমদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশনা হচ্ছে না বিষয়টি তা নয়, তবে এই সংখ্যাটি অত্যন্ত নগণ্য। ২০১৯-২০২০ সালে নেচার ইনডেক্সড জার্নালে বাংলাদেশ থেকে মোট প্রকাশনার সংখ্যা ৩৮, যার মধ্যে ৯টি প্রকাশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত। যেখানে একই সময়ে পাকিস্তান থেকে প্রকাশনার সংখ্যা ১৫৮, ভারতের জন্য এই সংখ্যা ১৬৩৫, আর চায়নার একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান (চাইনিজ একাডেমী অব সায়েন্স) থেকে এই সময়ে মোট প্রকাশনার সংখ্যা ৫৭৮৫ টি (তথ্যসূত্র: নেচার ইনডেক্স ২০২০)।

উপরের আলোচনা থেকে মোটা দাগে নিম্নলিখিত সারসংক্ষেপ তৈরি করা যেতে পারে-

১. গবেষণার পরিমাণ, মান  এবং মানসম্পন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়ে উন্নতির মূল চাবিকাঠি।

২. উন্নত বিশ্বে পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক্টরাল গবেষকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় অপরিহার্য। অধ্যাপকরা নতুন গবেষণা ক্ষেত্র তৈরি করে, গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরি করে বিভিন্ন উৎস থেকে গবেষণা বরাদ্দ আনেন, এবং  নতুন নতুন গবেষক তৈরি করেন। 

৩. পিএইচডি গবেষক এবং পোস্ট-ডক্টরাল গবেষকরা মাসিক সম্মানীর পাশাপাশি গবেষণায় প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ পেয়ে থাকেন।

৪. বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পিএইচডি গবেষণায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাব মান সম্পন্ন পিএইচডি গবেষণা কর্ম সম্পাদন ও পিএইচডি গবেষণার সংখ্যা বৃদ্ধির পথে একটি অন্যতম প্রতিবন্ধক।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং ও গবেষণার মানোন্নয়নে একটি প্রস্তাবনা

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের র‍্যাঙ্কিংয়ের উন্নয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা-মুখি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মান সম্পন্ন পিএইচডি গবেষণা চর্চা শুরুর লক্ষ্যে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে কতগুলো সুনির্দিষ্ট পয়েন্টের মাধ্যমে এখানে একটি প্রস্তাবনা পেশ করা হল। 

১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পরীক্ষামূলক ভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর ফুল ফান্ডেড ১০০টি পূর্ণকালীন পিএইচডি গবেষণা চালু করা যেতে পারে আগামী ৫ বছরের জন্য। এটির নামকরণ হবে 'বঙ্গবন্ধু ডক্টরাল ফেলোশিপ'। ৫ বছর পর্যবেক্ষণের পর এটির কার্যকারিতা পর্যালোচনার মাধ্যমে এটি চালু রাখার বিষয়ে এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৮৩টি বিভাগ এবং ১২ টি ইন্সটিটিউট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ ও ইন্সটিটিউটের জন্য বছরে একটি করে মোট ৯৫টি, আর বাকি ৫টি গবেষণা প্রস্তাবনার মান বিবেচনায় বা বিভাগের আয়তন বিবেচনায় দেওয়া যেতে পারে।

৩) প্রতিটি পিএইচডি গবেষণার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ৪ বছর, আর প্রতিটির জন্য মোট বরাদ্দ থাকবে অনুষদ/বিভাগ/বিষয় ভেদে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা। সুতরাং ১০০ টি পিএইচডির জন্য বছরে মোট বরাদ্দ দিতে হবে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা, যা আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনীতি বিবেচনায় খুবই সামান্য।

৪) প্রতিজন পিএইচডি গবেষক মাসিক সর্বসাকুল্যে ত্রিশ হাজার (৩০,০০০) টাকা হারে বৃত্তি পাবেন যা তিনি তার জীবন ধারণের জন্য খরচ করবেন। ৪ বছরে একজন শিক্ষার্থী মোট  (৩০,০০০ x ৪৮ = ১৪,৪০,০০০) চৌদ্দ লাখ চল্লিশ হাজার টাকা ভাতা/সম্মানী বাবদ পাবেন। বছরে পনের হাজার (১৫,০০০) টাকা হারে ৪ বছরে মোট ষাট হাজার (৬০,০০০) টাকা পাবেন দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়ার জন্য। ৪ বছরে সর্বমোট দুই লাখ (২০০,০০০) টাকা পাবেন দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেওয়ার জন্য। সর্বোচ্চ দুই লাখ (২০০,০০০) টাকা বরাদ্দ থাকবে আন্তর্জাতিক মানের এবং ন্যূনতম ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর সম্পন্ন জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশনার জন্য। 

৫) প্রত্যেকটি পিএইচডি ছাত্রের সহ-তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন করে অধ্যাপক থাকতে পারেন। সেই অধ্যাপকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, তার ভ্রমণ, সম্মানী, ইত্যাদি বাবদ পাঁচ লাখ (৫০০,০০০) টাকা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা সংশ্লিষ্টতা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকতা ও গবেষণার উচ্চমান নিশ্চিত করনে সহায়ক হবে। 

৬) অনুষদ/বিভাগ/বিষয় বিবেচনায় অবশিষ্ট ছয় (৬০০,০০০) থেকে ষোল লক্ষ (১৬০০,০০০) টাকা পিএইচডি গবেষণা কাজের উপাত্ত সংগ্রহ, ল্যাবরেটরির খরচ, এবং গবেষণা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ থাকবে। 

৭) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী পিএইচডি গবেষণার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা (গবেষণা বাবদ ছয় থেকে সর্বোচ্চ ষোল লক্ষ টাকার সম্ভাব্য খরচের সুনির্দিষ্ট হিসাব সহ) তৈরি করবেন এবং গবেষণা বরাদ্দের জন্য একাডেমিক কমিটিতে পেশ করবেন। বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি ওই বিভাগের শিক্ষক-গণের প্রস্তাবিত প্রকল্প সমূহ পর্যালোচনা পূর্বক অনূর্ধ্ব দুইটি করে প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট অনুষদ সমূহে পাঠাবেন। প্রতিটি অনুষদে একটি করে পিএইচডি প্রস্তাবনা মূল্যায়ন কমিটি থাকবে। এই কমিটি অনুষদ-ভুক্ত প্রতিটি বিভাগ থেকে প্রাপ্ত দুইটি প্রস্তাবনা মূল্যায়ন পূর্বক বিভাগ-ভিত্তিক একটি করে প্রস্তাবনাকে অর্থায়নের জন্য নির্বাচিত করবেন।

৮) বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচিত প্রত্যেকটি প্রকল্পের জন্য পিএইচডি গবেষক ভর্তি ও নিয়োগের লক্ষ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগ্রহী এবং সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করবে। আগ্রহী প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করবেন। এরপর বিভাগের একাডেমিক কমিটি প্রার্থীদের আবেদনের প্রাথমিক মূল্যায়ন পূর্বক অনধিক তিনজনের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। এরপর অনুষদের পিএইচডি প্রস্তাবনা মূল্যায়ন কমিটি/ভর্তি কমিটি তালিকাভুক্ত প্রার্থীদের সাক্ষাতকার গ্রহণের মাধ্যমে প্রত্যেক প্রকল্পের জন্য একজন করে প্রার্থী নিয়োগ ও ভর্তির জন্য চূড়ান্ত করবেন।

৯) শিক্ষকরা এই শর্তে গবেষণা বরাদ্দ পাবেন যে, এই ৪ বছর মেয়াদি গবেষণা থেকে কমপক্ষে দুই (২) টি ন্যুনতম ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর যুক্ত আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনা করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে অনুষদ/বিভাগ/বিষয় ভিত্তিক ন্যুনতম ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর স্থির করা যেতে পারে। যারা এই রকম প্রকাশনা করতে ব্যর্থ হবেন, ভবিষ্যতে উনারা তাদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণায় আর কোনও বরাদ্দ পাবেন না।

১০) পিএইচডি গবেষণাকর্মের সমস্ত ব্যয় (শিক্ষার্থীর সম্মানী ও সেমিনার অংশগ্রহণ ব্যয় ব্যতীত) শিক্ষার্থীর তত্ত্বাবধায়ক দ্বারা পরিচালিত হবে। তবে, যে কোনও ধরনের যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, সফটওয়্যার ইত্যাদি ক্রয় করতে হবে বিভাগীয় ক্রয় কমিটির মাধ্যমে। আর গবেষণা কর্ম সম্পাদন শেষে তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক মহোদয় সকল যন্ত্র-পাতি, কম্পিউটার, সফটওয়্যার বিভাগের চেয়ারম্যান মহোদয়কে বুঝিয়ে দিবেন, যা বিভাগের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পরবর্তীতে অন্য কোনও গবেষণায় ব্যবহার করা যাবে।

১১) প্রত্যেক পিএইচডি গবেষক নিজ নিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং একাডেমিক স্টাফ হিসেবে বিবেচিত হবেন। বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় একজন গবেষককে একাডেমিক কাজে নিয়োজিত করতে পারবে।

১২) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যাঁদের পিএইচডি নেই তারাও পিএইচডি গবেষক হিসেবে ভর্তি হতে পারবেন, কিন্তু তিনি পিএইচডি গবেষণার মাসিক ভাতা/সম্মানী নিতে পারবেননা। তবে দেশে-বিদেশে সেমিনারে অংশগ্রহণ জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নিতে পারবেন এবং ১১ নং পয়েন্ট তার জন্য প্রযোজ্য হবে না।

উপরে পয়েন্টসমূহ আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত হয়েছে। কাজেই মূল বিষয়কে ঠিক রেখে কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন এর মাধ্যমে উপরের প্রস্তাবনাকে চূড়ান্ত করা যেতে পারে। অন্যথায়, গবেষণায় বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা দুষ্কর হয়ে যাবে।

উপরের প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মানোন্নয়ন, র‍্যাংকিং উন্নয়ন ছাড়াও নিম্নোল্লিখিত সুবিধাসমূহ পাওয়া যাবে-

১) বছরে কমপক্ষে ১০০ জন মেধাবীর কর্মসংস্থান হবে।

২) দেশের প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিবেচনায় গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরি হলে গবেষণার ফলাফল সরাসরি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজে আসবে।

৩) পিএইচডি গবেষণায় বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযোজনার মাধ্যমে আমাদের গবেষণার মান নিশ্চিতকরণ সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্জাতিকতার স্কোর বাড়ানো সম্ভব হবে। 

৪) গবেষণার পাশাপাশি পিএইচডি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে জড়ানোর মাধ্যমে তাঁদের শিক্ষকতার  একধরণের প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ তৈরি হবে। উল্লেখ্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মণ্ডলীর বর্তমানে কোনও ধরণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই।

৫) বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার সমূহে নির্দিষ্ট ফি (গবেষণা বাবদ প্রাপ্ত বরাদ্দ থেকে) প্রদানের মাধ্যমে গবেষণা কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থা করে গবেষণাগার গুলোকে সচল রাখার জন্য নিয়মিত নিজস্ব ফান্ডের ব্যবস্থা করা যাবে।

৬) অধিকন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণাগারে বর্তমান উচ্চমানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যা আছে সেগুলোর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং এগুলো পরিচালনার কাজেও এই গবেষকগণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

৭) সর্বোপরি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকারের গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হবে।

গত এক যুগে বাংলাদেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ২০১৫ সালে আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। কিন্তু, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের শিক্ষা (বিশেষত উচ্চ শিক্ষা) ও গবেষণার কোনও উন্নয়ন হয়নি, যা নিতান্তই দুঃখজনক ও ভবিষ্যতের জন্য অমঙ্গলজনক। একটি দেশের টেকসই উন্নয়নে শিক্ষা ও গবেষণা অপরিহার্য। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে আমরা যদি শিক্ষা ও গবেষণা খাতকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে না পারি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের এ উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। কাজেই, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অচিরেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে গবেষণামুখী করা সময়ের দাবি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক