রক্ষণাবেক্ষণ করে দেশীয় উৎপাদনেই পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব

মো. নাহিদুল ইসলাম
Published : 24 Nov 2019, 08:07 AM
Updated : 24 Nov 2019, 08:07 AM

বছরের কোনো না কোনো সময় পেঁয়াজ নিয়ে হাহাকার শোনা যায়। বেকায়দায় পড়ে যায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তড়িঘড়ি করে পেঁয়াজের গোডাউনে অভিযান চলে। বাধ্য হয়ে সুদূর মিশর থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। প্রতিকেজি দুইশত টাকার অধিক মূল্যেও পেঁয়াজের লেনদেন হয়। শেষে দেখা যায় বাজার অব্যবস্থাপনাই এই সংকটের জন্যে দায়ী।

বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করার জন্যে অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন। আমি একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবছিলাম। গত পাঁচ বছর যাবত পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছি। আমার পিএইচডি থিসিস এর একটি বড় অংশের ফোকাস ছিল পোস্ট হার্ভেস্ট লস কমানো। ডেনমার্কের পেঁয়াজ উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলেও দেশের এই সেক্টরটি সম্পর্কে পুরোটাই অজ্ঞ ছিলাম। গত কয়েকদিনে পেঁয়াজের পুরো ব্যাপারটা বোঝার জন্যে আমি দেশীয় চাহিদা, উৎপাদন, ও আমদানি সংক্রান্ত ডেটা খুঁজতে থাকি। "কৃষি প্রযুক্তি হাতবই" থেকে শুরু করে এ সংক্রান্ত গত কয়েক বছরের পত্রিকার রিপোর্টগুলো পড়ে ফেলি। মাঠ পর্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানের জন্যে কৃষিবিদ বন্ধুমহলের সাথে যোগাযোগ করি।

উৎপাদন ও আমদানি সংক্রান্ত ডেটার উৎস হিসেবে ডিপার্টমেন্টে অফ এগ্রিকালচার এক্সটেনশন (DAE) ও ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং (DAM) কে দেখা যায়। দুটো সংস্থার হিসেবে খুব বেশী তফাৎ নেই। ২৭ অগাস্ট ২০১৯ একটি পত্রিকার রিপোর্টের মাধ্যমে জানতে পারলাম, DAE এর ওয়েবসাইটে ডেটা পরিবর্তন করা হয়েছে। তাই এখানে গ্রাফ তৈরি করতে DAM হতে প্রাপ্ত ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ডেটাই ব্যবহার করলাম।

গ্রাফটির দিকে তাকালে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্যভাবে আমাদের উৎপাদন বেড়েছে, সেই সাথে কমেছে আমদানির পরিমাণ। কৃষিপ্রধান একটি দেশের জন্যে এর চাইতে ভাল সংবাদ আর কিইবা হতে পারে! অন্যদিকে, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ২৩ লক্ষ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে সাথে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ ৯২ হাজার টন পেঁয়াজ। আমাদের বাৎসরিক চাহিদা ২৪ লক্ষ ১৪ হাজার টন হলে, এবছর আমাদের ১০ লক্ষ টন পেঁয়াজ বেশী থাকার কথা। এত বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ অতিরিক্ত থাকার কথা হলেও কেন এত হাহাকার! এর জন্যে কি দায়ী শুধুই বাজার অব্যবস্থাপনা!

ভালোভাবে লক্ষ করে থাকলে গ্রাফের একটি জায়গায় চোখ আটকে যাওয়ার কথা। সাদা কলামটি যেটি এক বছরে সর্বমোট নষ্ট হওয়া পেঁয়াজের পরিমাণ নির্দেশ করছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নষ্ট হওয়া পেঁয়াজের পরিমাণ সাত লক্ষ তিরানব্বই হাজার মেট্রিক টন, যা একই অর্থবছরে আমদানিকৃত পেঁয়াজের চেয়েও বেশি। পেঁয়াজ নষ্ট হওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০০৯ সালের অগাস্টে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে একটি খবর প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে কয়েকটি বাক্য হুবহু আমি এখানে দিয়ে দিচ্ছি। "সুষ্ঠু সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ৫০ কোটি টাকার পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়। এছাড়া প্রচলিত সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকার ফলে আরও ১২ লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি হয়ে থাকে। যার বাজার মূল্য আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এভাবে বছরে শুধু উত্তরাঞ্চলেই প্রায় একশত কোটি টাকার পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে থাকে।" এই বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারলে চাহিদা মিটানোর পরেও আমাদের অনেক অবশিষ্ট থাকত।

আসলেই আমাদের সংরক্ষণাগারের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ২০১৪ এর এপ্রিলে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে "মেহেরপুর শহরের চারটি স্থানে কয়েক শ মণ পেঁয়াজ সড়কে ফেলে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেছেন পেঁয়াজ চাষিরা।" সংরক্ষণাগারের অভাবে একদিকে যেমন টনকে টন পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের কৃষকেরা। ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ পত্রিকাতে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, "শরিয়তপুরে উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করে কৃষকের বিঘাপ্রতি লোকসান হয়েছে ১১ হাজার টাকা"। একই বছরের ডিসেম্বরের ১১ তারিখের রিপোর্টে বলা হয়েছে "মাদারীপুরে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও নেই ফসল সংরক্ষণাগার"।

এই বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ শুধু সংরক্ষণাগারের অভাবেই নষ্ট হয়, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। উত্তোলনের পর পেঁয়াজ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হবে কিনা, কতদিন ভাল থাকবে এসব নির্ভর করে কিভাবে চাষাবাদ করা হয়েছে, কোন আবহাওয়ায় উত্তোলন করা হয়েছে, কিভাবে উত্তোলন করা হয়েছে, অতঃপর কিভাবে হ্যান্ডেল ও সংরক্ষণ করা হয়েছে ইত্যাদির উপর।

ডেনমার্ক শীতপ্রধান দেশ এবং মোটেও পেঁয়াজ উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর একটি নয়। এখানে সারা বছরে এক ঋতুতেই পেঁয়াজ চাষ হয়। উপরন্তু অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ মানে ক্ষেতে থাকা অবস্থায় বা সংরক্ষণাগারে কোনো ধরনের রাসায়নিক, রেডিয়েশন ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না। এতে করে অর্গানিক পেঁয়াজগুলো খুব সহজেই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে ও পচে যেতে পারে। অথচ ডেনমার্ক, এক ঋতুতে উৎপাদিত অর্গানিক পেঁয়াজ দিয়ে সারা বছর অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও সুইডেন, জার্মানি ও নরওয়েতে রপ্তানি করে থাকে। অন্যদিকে আমাদের শীতকালীন, গ্রীষ্মকালীন ও সারাবছর চাষের জন্যে যথাক্রমে বারি পেঁয়াজ-১, পেঁয়াজ-২ ও পেঁয়াজ-৫ রয়েছে। এরপরেও বছরের কোনো না কোনো সময় আমাদেরকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।

ডেনমার্কে এটি সম্ভব হয়েছে কয়েকটি কারণে। ভাল বীজ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া খামারে যারা কাজ করেন তারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত, তারা ফসলের ভাষা বুঝেন, নতুন কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে সেটি সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে কোলাবোরেশনে গবেষণা করেন, সর্বোপরি পেঁয়াজ লাগানো থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।

পেঁয়াজ উত্তোলনের পরে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর কিউরিং এবং সংরক্ষণ। ফসলের কোন ধরনের কিউরিং কতদিনের জন্যে প্রয়োজন সে সিদ্ধান্ত নিতে ফসলকে বুঝতে হয়। একটি ভাল কিউরিং প্রসেস পেঁয়াজের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে সংরক্ষণ ক্ষমতাও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এরপরের ধাপ হিমাগারে পেঁয়াজের সংরক্ষণ। সংরক্ষণ ক্ষমতা পেঁয়াজের কাল্টিভার ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে, যেমন আমাদের বারি পেঁয়াজ-১ এর সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি। সংরক্ষণাগারের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করেও পেঁয়াজকে অনেকদিন পর্যন্ত ভাল রাখা যায়।

পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্যে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন সংরক্ষণাগার। একদিকে আমাদের যথেষ্ট সংরক্ষণাগার নেই, অন্যদিকে বিদ্যমান সংরক্ষণাগারগুলোও মানসম্মত নয়। ডেনমার্কসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন ইউকে'তে পেঁয়াজ কাঠের বাক্সে করে রাখা হয়। একেকটি বাক্স প্রায় দুই টন পরিমাণ পেঁয়াজ ধারণ করতে পারে। এই বাক্সগুলির ভেতর দিয়ে বাতাস চলাচল করতে সক্ষম। বাক্সগুলিকে একটির উপর একটি বসিয়ে স্তূপ করা হয়, এতে করে নিচে অবস্থিত পেঁয়াজগুলোকে অতিরিক্ত ওজন সহ্য করতে হয় না। একটি মাঝারি আকারের সংরক্ষণাগারে প্রায় পাঁচশত টন পেঁয়াজ রাখা হয়। বর্তমানে আধুনিক পেঁয়াজ সংরক্ষণাগারগুলো ভ্যাকুয়াম টেকনোলজিতে কাজ করে থাকে। এতে করে প্রয়োজনমতো শূন্যতা সৃষ্টি করে বাক্সগুলির ভেতর দিয়ে বাতাস চালনা করা যায়।

এদিকে, ১৪ অগাস্ট ২০১৫ সালে "কাজ করছে বিকল্প হিমাগার" শিরোনামে একটি লেখা পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। সেখানে একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে পেঁয়াজগুলোকে স্তূপ করে রাখা হয়েছে এবং কর্মীরা পেঁয়াজের উপরে বসে গুণগত মান যাচাই-বাছাই করছেন।

রিপোর্টে বলা হয়েছে বিকল্প হিমাগারে চারমাসে পেঁয়াজের ওজন তেমন কমেনি সাথে পচনের হারও কম ছিল। ওজন অবশ্য ভিন্ন কারণে কমে থাকে, তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় অর্গানিক পেঁয়াজ এভাবে স্তূপ করে সংরক্ষণ করা হলে বেশিরভাগ পেঁয়াজ পচে যেত। অন্যদিকে, খালি চোখে শুধু বাহ্যিক পরীক্ষা করে কোনো ক্রমেই পেঁয়াজের ভেতরের অবস্থা জানা সম্ভব নয়। কোনো পেঁয়াজের ভেতরে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকলে হিমাগার থেকে বের করার পর স্বাভাবিক তাপমাত্রায় অল্প কিছুদিনেই সম্পূর্ণ পচে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ভুলক্রমে আক্রান্ত পেঁয়াজ ভাল পেঁয়াজের বস্তায় রাখা হলে আক্রান্ত পেঁয়াজ থেকে ভাল ও সুস্থ পেঁয়াজে জীবাণু ছড়াতে পারে। উন্নত বিশ্বে এই কাজের জন্যে স্বয়ংক্রিয় সর্টিং মেশিন ব্যবহার করা হয়। এই মেশিনগুলো ইনফ্রারেড রশ্মি ব্যবহার করে দ্রুততার সাথে ও নিখুঁতভাবে পেঁয়াজের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারে। সেক্ষেত্রে বাছাইকৃত বিভিন্ন গ্রেডের পেঁয়াজগুলোর জন্যে আলাদা ব্যবস্থা নেয়া যায় ও সুস্থ পেঁয়াজের আক্রান্ত হওয়া বন্ধ করা যায়। এছাড়া লোডিং আনলোডিং ও পরিবহনের এর সময় ফিজিক্যাল ইমপ্যাক্ট এর কারণে পেঁয়াজে পচন শুরু হতে পারে। এভাবেই নষ্ট হওয়া পেঁয়াজের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং তা লক্ষ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায়।

সময় এসেছে পেঁয়াজের পোস্ট হার্ভেস্ট লস নিয়ে ভাববার। সরকারের উচিত পেঁয়াজ চাষাবাদের এলাকাগুলোতে অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত সংরক্ষণাগার স্থাপন করা। পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার প্রতিটা কারণ যথাযথ বিশ্লেষণ করে সেগুলোর সমাধানে কাজ করা। এভাবেই সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পেঁয়াজের পোস্ট হার্ভেস্ট লস কমিয়ে আমাদের দেশীয় উৎপাদনেই আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক