একটি মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন

চিররঞ্জন সরকারচিররঞ্জন সরকার
Published : 2 May 2017, 04:05 AM
Updated : 2 May 2017, 04:05 AM

কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই রমেল চাকমাকে হত্যা করা হয়েছে। রমেলকে হত্যা করে লাশটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা এটা করেছে, তারা জানে, এটা অন্যায়, এটা একটা অপরাধ। তাই পরবর্তীকালে রমেলকে নিয়ে বিভিন্ন গল্প বানানো হয়েছে। এর মধ্যে একটা গল্প হচ্ছে যে, রমেল একটা বিরাট গুণ্ডা-সন্ত্রাসী ছিল, তাকে গ্রেপ্তার করার সময় বেবিট্যাক্সির ধাক্কায় সে মারা গেছে। রমেলের মৃত্যু একটি দুর্ঘটনা। আর রমেল ঠিক নির্দোষ তরুণ ছিল না।

আরেকটা কাজ করা হচ্ছে, যারা রমেলের হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন তাদের প্রতি কলঙ্কলেপন করে বলা হচ্ছে ওরা দালাল, বাস্তবতা ও প্রকৃত ঘটনা জানে না ইত্যাদি।

রমেলের মৃত্যুকে 'দুর্ঘটনা' বলে যে গল্পটি বাজারে ছাড়া হয়েছে তার মধ্যে বেশ খানিকটা হিন্দি সিনেমার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, আর্মির তাড়া খেয়ে রমেল পাহাড়ে উঠে পড়েছিল, পাহাড় থেকে গড়িয়ে সে রাস্তায় বেবিট্যাক্সির সামনে এসে পড়ে, আর তাতেই এমন আহত হয় যে সেই আঘাতে তার শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়।

আর গল্পের শেষ টানা হয় এভাবে: রমেলের শেষকৃত্য হয়েছে যথাযথ নিয়মে ওর আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে। এই আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ছিল পুলিশ আর কিছু সেটেলার, সঙ্গে একটি মাত্র চাকমা নাম– তিনি নাকি রমেলের মামা। ব্যাস।

সঙ্গত কারণেই এসব 'গল্পের' সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ বা জেলা পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে মিল নেই। রমেল চাকমা সেনাসদস্যদের নির্যাতনে মারা গেছে বলে অভিযোগ করেছে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। সেনাবাহিনীর তাকে আটকের কথা স্বীকার করলেও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আর পুলিশ বলছে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে সেনাসদস্যরা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল রাশেদুল হাসান বলেন:

"গত ৫ এপ্রিল তাকে ট্রাক পোড়ানো এবং বাস লুটের মামলায় সেনাসদস্যরা আটক করেন এবং ওইদিনই (৫ এপ্রিল) তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর পুলিশের তত্ত্বাবধানে তিনি পরবর্তী ১৪ দিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ এপ্রিল তিনি মারা যান। সেনাবাহিনীর নির্যাতনে তিনি মারা গেছেন বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়, সত্য নয়।"

আর নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বলেন:

"রমেলকে আমরা গ্রেপ্তার করব কেন? তার নামে তো কোনো মামলা নেই। তাকে কারা আটক করেছে সেটা আর্মির অফিসাররা বলতে পারবেন। তাকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রথমে নানিয়াচর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তারপর পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।"

(সূত্র: 'ডয়চে ভেলে', ২৪ এপ্রিল ২০১৭)

এখানে তাহলে গড়মিলটা কোথায়? যদি সেনাসদস্যরা রমেল চাকমাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন না-ই করে তাহলে সে মারা গেল কীভাবে?

আবার রমেল চাকমার পরিবারের কাছ থেকে লাশটিই বা কেন ছিনিয়ে নেওয়া হল? প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ বলেছেন যে, বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি-নীতি না মেনে লাশের উপর পোট্রোল ঢেলে দিয়ে লাশটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একটি লাশ নিয়ে এটা কোন ধরনের রসিকতা?

রমেল চাকমাকে সন্ত্রাসী প্রমাণ করতে একাধিক ভূঁইফোড় অনলাইনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগে অস্ত্রসহ আটক এক যুবকের ছবি প্রকাশ করে বলা হচ্ছে: এটাই রমেল চাকমা। যদিও ছবিতে প্রকাশিত যুবকের সঙ্গে সদ্য নিহত রমেল চাকমার বয়স, বাবার নাম কিছুই মেলে না। অনলাইনে প্রচার করা হচ্ছে রমেল চাকমা এক বিরাট সন্ত্রাসী দলের বিরাট এক কমান্ডার, বড় বড় সব রাইফেল-কামান-বন্দুক ছিল ওর কাছে, সে বিরাট চাঁদাবাজ, ট্রাক লুট করেছে, অনেক অরাজকতার নায়ক ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ পুলিশ বলেছে, রমেল চাকমার নামে তাদের কাছে কোনো অভিযোগ নেই!

একদল আবার নিহত রমেলের চরিত্র হননের 'মহান ব্রত' নিয়ে মাঠে নেমেছেন। কয়েকটা ফেক ফেসবুক প্রোফাইল খুলেছে আদিবাসী মেয়েদের নাম আর ছবি দিয়ে। এসব আইডি থেকে রমেলকে নিয়ে, রমেলের বিচার চেয়ে যারা আন্দোলন করছেন তাদের নিয়ে ধারাবাহিক বিষোদগার করা হচ্ছে।

রমেলকে নিয়ে যা করা হয়েছে, যা করা হচ্ছে, তা ভয়াবহ অন্যায়, অবিচার। একজন মানুষ, কলেজ পড়ুয়া একটি তরুণ, সে যতবড় অপরাধীই হোক, তাকে তো বিনা বিচারে হত্যা করা যায় না। এটা অন্যায়। এটা আইনের চোখে একটি খুন। অপরাধ। যদি মহল বিশেষের প্রচারণা অনুযায়ী মানা হয় যে, রমেল সন্ত্রাসী ছিল, চাঁদাবাজ ছিল, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা হল না কেন?

কেউ অপরাধী হলে তার বিচার করতে হবে, আইনে সোপর্দ করতে হবে। আইন অনুযায়ী কেউ অপরাধী প্রমাণিত হলে তার জেল-ফাঁসি যা খুশি তা-ই হতে পারে। তখন কারোর কিছু বলার থাকে না। কিন্তু বিনা বিচারে কাউকে হত্যা করা হবে কেন? একজন মৃতব্যক্তির নামে মিথ্যে কলঙ্কই বা লেপন করা হবে কেন?

আদিবাসীদের প্রতি, রমেলের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা অত্যন্ত ঘৃণ্য। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার আছে, মর্যযাদা নিয়ে বেঁচে থাকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার। রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই তা নস্যাৎ করতে পারে না। এ ব্যাপারে নির্বিকারও থাকতে পারে না।

বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এত বড় একটা রাষ্ট্রীয় অনাচারের পরও কারও মুখে তেমন কোনো 'রা' নেই। অনেকে বলছেন, কী কথা বলব? বলেই বা কী লাভ? এদেশে তো সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায় না। অভিযোগ করে কোনো ফল মিলবে না, উপরন্তু দুর্ভোগ আরও বাড়বে। এমনটা ভাবাই যেন এদেশে স্বাভাবিক। কারণ এদেশে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ভূরি ভূরি।

প্রশ্ন হল, রমেলের প্রতি, একটি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি এমন জঘণ্য অন্যায় আচরণ করা হবে, অথচ এর কোনো বিহিত হবে না? প্রতিবাদ হবে না? আদিবাসীরা তো মানুষ, নাকি? ওদের প্রতি অন্যায় হবে, আমরা মানুষ হয়ে যদি ওদের পক্ষে শুধু মুখের কথাটা বলে একটা প্রতিবাদও না করি তাহলে আমরা কিসের মানুষ?

পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি 'বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ' হয় তাহলে কেন এই অনাচার? এ ধরনের আচরণ তো ইজরায়েল করে থাকে ফিলিস্তিনে! তা নিয়ে বারে বারে দুনিয়াজোড়া নিন্দার ঝড় ওঠে। সেটা যদি অন্যায় হয়, অপরাধ হয়, তাহলে এটা নয় কেন?

আমরা ক্রমেই বিবেকের টুটি টিপে ধরে, চোখে ঠুলি পরে দিন কাটাচ্ছি। উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অধিকারের কথা বললেই, ভিন্ন সুর শোনা গেলেই তাকে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে 'রাষ্ট্রদ্রোহী' বলে! মাঠে তো নয়ই, যারা অনলাইনে একটু প্রতিবাদী হচ্ছেন, তাদের উদ্দেশে কটূক্তি বর্ষিত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের নামে 'দেশপ্রেম'-এর আরও বেশ কয়েকটি ঘুঁটে দেওয়া হচ্ছে অশ্লীল গালিগালাজ সমেত।

কাকে বোঝাব এই কৃত্রিম 'দেশপ্রেম'-এর জোয়ারে শুধু আদিবাসী কিংবা রমেলরাই ভেসে যাচ্ছে না, ন্যায়, ধর্ম, মনুষ্যত্ব, এমনকি গণতন্ত্রও সাংগুর জলে ভেসে যাচ্ছে? তার খেয়াল কে রাখে!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক