টিভি চ্যানেল মালিকদের সমঝোতা: দর্শকদের কী লাভ?

ডা. মো. খায়রুল ইসলাম
Published : 5 Dec 2016, 06:08 AM
Updated : 5 Dec 2016, 06:08 AM

গত কয়েক দিনে আমরা নাটকীয় বেশ কিছু খণ্ড খণ্ড দৃশ্য দেখলাম। নাটকের মুখ্য চরিত্র বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল মালিকরা। যেহেতু উনারা টিভি চ্যানেল মালিক, দর্শকদের উনারা যা খুশি তাই দেখাতে পারেন। উনারা বিডিআর বিদ্রোহ কিংবা হলি আরটিজানের ঘটনার সরাসরি সম্প্রচার করতে পারেন। উনাদের নিজেদের ব্যবসায়িক ঝগড়াঝাঁটি আমাদের দেখাতে পারেন। আমরাও দেখে আমোদিত হয়েছি।

'গিবত' শুনতে আমাদের ভালোই লাগে!

সরকার সম্প্রচার নীতিমালা করতে চাইলেন, উনারা বাধা দিলেন। সরকার পিছিয়ে গেল। আমরা নাগরিক হিসেবে এবং দর্শক হিসেবে এখনও জানি না টিভি সম্প্রচার নিয়ে কার কাছে অভিযোগ করা যাবে।

এবার উনাদের বিবাদের একটি অন্যতম বিষয় ছিল, বাংলাদেশ থেকে কিছু বিজ্ঞাপন ভারতের চ্যানেলে চলে যাচ্ছিল। যাদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছিল তারাও টিভি চ্যানেলের মালিক। কাক কেন কাকের মাংস খাবে? বাকি মালিকদের দাবি হল, ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রদান বন্ধ করতে হবে। ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো আরও কামাই-রুজি করতে পারবে। মূলত এই নিয়েই মনকষাকষি, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ গালাগালি, মামলা– যা সবাই নিজ নিজ চ্যানেলে বেশ ঘটা করে দেখিয়েছেন।

হঠাৎ করেই তাদের মধ্যে সমঝোতাও হয়ে গেল। সমঝোতা হল দরবেশতুল্য অভিভাবকের নসিহতে। অন্দোলনের একজন নেতা ঘোষণা দিলেন– ভারতে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করা গেছে আর তারা এক হয়ে সব সমস্যার সমাধান করবেন; তাই আপাতত তাদের আন্দোলন স্থগিত করা হল।

আমরা যারা দর্শক তাদের কী হল?

আরও বেশি টাকার বিজ্ঞাপন যদি বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোয় প্রচারিত হয় তাহলে তো আরও বেশি করে বিজ্ঞাপন দেখতে হবে। তার মানে দর্শকদের বিড়ম্বনা বাড়বে বৈ কমবে না। অন্য ভাষায়, এই আন্দোলনের সাফল্য মানে দর্শকদের বিড়ম্বনা বাড়ানো।

গত কয়েক দিনে আমরা জেনেছি, বাংলাদেশে একটি ভারতীয় চ্যানেল 'ডাউনলোড' করতে বাংলাদেশি টাকায় মাত্র দেড় লাখ টাকা লাগে। আর বাংলাদেশি চ্যানেল ভারতে চালাতে গেলে পাঁচ কোটি টাকা– কেউ কেউ বললেন সাত কোটি টাকা লাগে। টিভি চ্যানেল মালিকরা দাবি তুললেন, বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল ডাউনলোড করার ফি এক করে দেওয়া হোক। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, "এটা অতি অন্যায্য।"

উনি অনতিবিলম্বে বাংলাদেশেও ভারতীয় চ্যানেল ডাউনলোড করার ফি পাঁচ কোটি টাকা করার কথা বললেন। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা আশান্বিত হলাম। পানির দরে ট্রানজিট ফি, টান্সশিপমেন্ট ফি ধার্য করা হয়েছে; এবার তার খানিকটা ব্যতিক্রম হবে। মিডিয়ার শক্তি অনেক। ভেবেছিলাম তাঁরা যখন দাবি তুলেছেন তাহলে এবার ভারতীয় চ্যানেলের ডাউনলোড ফি ন্যায্য করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গতকাল ফিসের অন্যায্যতার কথা বললেন। কিন্তু এই ফিস কি আদৌ পুনঃবিবেচনা করা হবে?

ভারতের সঙ্গে আমাদের দরকষাকষির রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে আশান্বিত হবার কারন দেখি না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশের প্রতি পাড়ায় মহল্লায় ছড়িয়ে থাকা ডিশ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ। সব মিলিয়ে এক জটিল অবস্থা। টিভি চ্যানেল মালিকদের আন্দোলন স্থগিত হয়ে গেল।আগামী কয়েক বছর পরেও আমাদের হয়তো একইভাবে আফসোস করে যেতে হবে।

টিভি চ্যানেল মালিকদের চলমান নাটক নিয়ে কেউ কেউ নৈর্ব্যক্তিকভাবে লিখেছেন। তবে যে প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সঙ্গে আসেনি তা হল, বিশ্লেষণ। কেন একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ভারতীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিতে চান? কেন বাংলাদেশের জাতীয় টিকা দিবসের বিজ্ঞাপন সরকারি অনুমতি নিয়ে ভারতীয় চ্যানেল প্রচার করা হয়েছিল? বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও যথাযথ আয়কর দিয়েই ব্যবসা করেন। কিন্তু ব্যবসার প্রসারে, ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজনে ব্যবসায়ীরা যা করার তাই করার চেষ্টা করেন। আর তারা তা করেন পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ ও গবেষণা করেই।

ভারতীয় চ্যানেলগুলোর বিষয় খুব একটা মনোমুগ্ধকর না হলেও একটি বৈশিষ্ট্য হল, এতে খুব কম বিজ্ঞাপন থাকে। তাই এসব চ্যানেলে দেওয়া বিজ্ঞাপনগুলো দর্শকরা দেখে থাকেন। এর বিপরীতে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোয় আধা ঘণ্টার অনুষ্ঠানে এক-তৃতীয়াংশ বা চল্লিশ/পঞ্চাশ ভাগ বিজ্ঞাপন থাকে। বিজ্ঞাপন বেশি থাকলে দর্শকরা যে সে অনুষ্ঠান দেখে না, তা বোঝার ক্ষমতা টিভি চ্যানেল মালিকদের কি নেই?

'রিমোট' নামক নির্মম যন্ত্রের কাছে টিভি চ্যানেল মালিকদের সব চেষ্টা মার খেয়ে যাবে যদি তাঁরা দর্শকদের আকৃষ্ট করে রাখতে ব্যর্থ হন। তাঁরা যে ব্যর্থ হয়েছেন এবং হচ্ছেন তা তো সুস্পষ্ট। তাই তাদের অতি দ্রুত দর্শকদের মন-মানসিকতা বুঝতে হবে।

প্রশ্ন হল, ভারতীয় চ্যানেলগুলো এত অল্প বিজ্ঞাপন দিয়ে চলে কীভাবে; কিংবা মুনাফা করে কীভাবে। এই জায়গাটাই বুঝতে হবে খুব ভালো করে। দেখতে হবে কয়টা ভারতীয় চ্যানেল ফ্রি আর কয়টা 'পে-চ্যানেল'। এর বিপরীতে কয়টা বাংলাদেশি চ্যানেল 'পে-চ্যানেল'। আমার জানামতে, যে চ্যানেলগুলোয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপন দিতে আগ্রহী সেগুলো মূলত 'পে-চ্যানেল'। সে কারণে সেসব অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন থাকে খুবই কম। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে একটিও 'পে-চ্যানেল' নেই। এখন ভাববার বিষয় হল, বাংলাদেশে 'পে চ্যানেল' করা কি সম্ভব? এ নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে কত ঘরে ডিশ সংযোগ আছে? আমি সংখ্যাটা সঠিক জানি না। হয়তো তা জরিপ করে বের করতে হবে। আলোচনার খাতিরে ধরে নিই যে, এক কোটি। যদি এক কোটি খানায়ও ডিশ সংযোগ থেকে থাকে তাহলে কম করে হলেও মাসে দেড়শ থেকে দুশ কোটি টাকা আদায় হয়। ডিশ ব্যবসায়ীরা এর সঙ্গে মহল্লাভিত্তিক বিজ্ঞাপন থেকে আয় করে আরও খানিকটা। সরকার এর থেকে কোনো রাজস্ব পায় কি না, জানি না।

দর্শকদের ভারতীয় চ্যানেল দেখানোর জন্য ডিশ ব্যবসায়ীরা কিন্তু ঠিকই বাৎসরিক ফি দেন। কিন্তু এই ব্যবসায়ীরা টিভি চ্যানেল মালিকদের একটি ঘষা পয়সাও দেন না। উল্টো, চ্যানেল মালিকরা তাদের চ্যানেল যেন রিমোটে সিরিয়ালে প্রথমদিকে থাকে সে জন্য কিছু প্রণোদনা দিয়ে থাকেন বলে শোনা যায়।

সিরিয়ালের বিষয়ে এখন একটা শৃঙ্খলা আনা হলেও তা অনেকখানেই মানা হয় না। নতুন চ্যানেলগুলো কীভাবে যেন ডিশ ব্যবসায়ীদের ম্যানেজ করে ফেলে; অনেকটা মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মতো। ডিশ ব্যবসায়ীদের আয় থেকে যদি এক-তৃতীয়াংশও বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল মালিকরা পেতেন তাহলে তাদেরকে বিজ্ঞাপনের উপর এমন করে নির্ভর করে থাকতে হত না; অনুষ্ঠান অনেকখানি বিজ্ঞাপনমুক্ত রাখা যেত। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? দেখবেন এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো টিভি চ্যানেল মালিক কথা বলবেন না। মূল সমস্যার সমাধান না করে উপসর্গমাফিক সমাধান হলে দর্শকপ্রিয়তা বাড়বে না।

ডিশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বা বণ্টন করা বা তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা সম্ভব হবে তা বলা মুশকিল। কারণ পাড়ায় মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব ব্যবসায়ী মূলত রাজনৈতিক পেশীধারী। ভারতেও শুরুর দিকে পরিস্থিতি এরকমই ছিল। তবে প্রায় তিন বছরের চেষ্টার পর ২০১৭ সাল থেকে থেকে এ বিষয়ে তারা একটি শৃঙ্খলা আনতে পারবে বলে আশা করছে। সে রকম একটা প্রচেষ্টা আমাদের দেশেও দ্রুত নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

উপসংহারে বলতে চাই যে, টিভি চ্যানেল মালিকরা একত্রিত হয়েছেন তা শুভ লক্ষণ। সেই সঙ্গে লক্ষণীয় যে, শিল্পী-কলাকুশলীরাও প্রায় একই রকম দাবিতে মাঠে নেমেছেন বা নামতে প্রণোদিত হয়েছেন। তবে তাঁরা যেন হালুয়া-রুটির ভাগে সন্তুষ্ট না হয়ে, আন্দোলন স্থগিত না করে দর্শক এবং নাগরিকদের স্বার্থে কিছু পদক্ষেপ নেন। আর এই কাজে ঢালাও মতামত কিংবা অনুমাননির্ভর না হয়ে তাঁরা যেন গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে, চিন্তা-ভাবনা করে সমস্যার মূলে হাত দেন এবং সমাধানের চেষ্টা করেন।

মনে রাখতে হবে যে, দিনশেষে দর্শকদের পছন্দ আর তাদের হাতের রিমোট সবচাইতে শক্তিশালী। দর্শকদের কাছে আপনাদের পরিবেশনা পছন্দ হলে দর্শকরা খুশি থাকবে; আপনারাও ভালো থাকবেন; নচেৎ নয়। তাই সব কিছুর উপরে দর্শকদের পছন্দের কথা, দর্শকদের স্বার্থের কথা ভাবুন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক