২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

জেন্ডার মানে শুধু ‘নারী’ নয়

ইসরাত বিজু

Published : 10 Mar 2016, 04:17 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:46 PM

নারী হয়ে নারী-বিষয়ক কিছু লেখা বা তর্ক-বিতর্ক চালানোর ব্যাপারটা কেন যেন 'নারীবাদী' ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়া হয়। একজন পুরুষ যদি নারী-বিষয়ক কোনো লেখাজোখা বা আলাপ-সংলাপে কোনো কথা বলেন বা লেখেন, কখনও তাকে কেউ 'নারীবাদী' বলবে না। বস্তুত দেশে-বিদেশে এমন অনেক পুরুষ লেখক নারীর অধিকার নিয়ে অনেক সোচ্চার ছিলেন, এখনও অনেকে কাজ করে যাচ্ছেন। এক ঝটকায় তাকে বা তাদের কেউ 'নারীবাদী' ক্যাটাগরিতে ফেলে ট্যাগ বসিয়ে দেয়নি কেউ।

সেই সত্তর-আশির দশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটু একটু করে জেন্ডার-বিষয়ক সমতা, বৈষম্য বিলোপ ও সমঅধিকারের ব্যাপারগুলোর ধারণা বা প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সচেতনতা শুরু হয়। যার আরও বেশ কিছু বছর পর নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশেও দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়। তবু তখনও নারী হয়ে নারীদের একান্ত বোধ নিয়ে লিখতে গিয়ে লেখক তসলিমা নাসরিনকে দেশান্তরী হতে হয়। বিশ্বাস করি, দৃশ্যপট এখন বেশ পাল্টে গেছে।

অবশ্যই ৮ মার্চ নারী দিবস বলে নারী-সংশ্লিষ্ট আলোচনার জন্য এ অবসর বেছে নিইনি। কারণ দিবসটির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনুভূত হয় না। তবে এটা স্বীকার করে নেওয়াই যায় যে, দিনটি 'মনে' নিয়ে হোক বা 'মেনে' নিয়ে, সবার দৃষ্টি কিছুটা এদিকে, মানে নারী-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিবদ্ধ থাকবে বৈকি। সব বিষয়ে আমি খোলামেলা, উদার, ধর্মান্ধহীন চিন্তা করতে পছন্দ করি। তাই একটু নারীঘেঁষা আজকের লেখাটি, প্লিজ, নিজ গুণে মেনে নেবেন।

জেন্ডার শব্দটি অনেকে শুধুমাত্র এমন সরল দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেন বা বুঝেন যে, এটি হল নারী-বিষয়ক 'একচেটিয়া সুবিধাসমূহ ভোগ'এর এজেন্ডা। হ্যাঁ, আমরা অনেকেই 'জেন্ডার' বা এ বিষয়ক আলোচনাকে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি দিয়ে 'প্যাঁচাল-পাড়া' বলেই মনে করি। অনেক দিনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি। আমার এখন নতুন করে এ বিষয়ের অবতারণা করার কারণ, আজ এত বছর ধরে এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ, উদ্যোগ এবং সচেতনতার পরও উচ্চতর কর্মক্ষেত্রের পরিবেশেও আজও জেন্ডার বা এ-বিষয়ক আলোচনার বিষয়ে ধারণাগুলো্ এমনই।

একটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থায় একই সময়ে দুজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় যাদের একজন নারী ও অপর জন পুরুষ। অফিস ততদিনে অফিশিয়াল মেইলের মাধ্যমে সবার কাছে নিয়োগপ্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত বায়োডাটা এবং অভিজ্ঞতার আগপাশতলা পাঠিয়ে দিয়েছে। জয়েন করার পর পূর্বতন সহকর্মী যারা নতুন যোগদানকৃতদের যোগ্যতার ব্যাপারে জেনেও সৌজন্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে অবশ্যই পুনরালোচনা চালান। কিন্তু 'জেন্ডার' প্রসঙ্গটি মাথায় না থাকলেও ধুম করে চলে আসে, যখন নতুন দুজন নারী ও পুরুষ 'সৌজন্যমূলক' জানতে চাওয়ার মুখোমুখি হন।

অবশ্যই সৌজন্যের বৈষম্যমূলক আচরণটি নারী সহকর্মীই পান। পুরুষ সহকর্মীর প্রতি সৌজন্যমূলক কুয়েরিজ থাকে তার কাজ ও যোগ্যতা প্রসঙ্গে; আগে কোথায় ছিলেন, কী কী দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল, ওখানকার অমুক ভাইকে চেনেন কি না, প্রকল্পের বিস্তারিত। অর্থাৎ পুরোপুরি অফিশিয়াল জানতে চাওয়াগুলো– যেখানে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আলোচনা একেবারেই থাকে না, অন্তত প্রথম দিন নয়।

অপরদিকে, একই পজিশনে যোগদান করা নারী সহকর্মীটির প্রথম কয়েক দিন চলে শুধুমাত্র 'স্ক্যানড' হতে হতে! উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিটি থেকে শুরু করে পুরুষ ক্লিনার ও অফিসের গাড়িচালকের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় প্রশ্নটি হয় এ রকম, ''আপার বেবি কয়টা? দুলাভাই কী করেন? কোথায় থাকেন?''

সেই নারী তখন হয়তো তার সদ্যসমাপ্ত অফিশিয়াল কাজের কোনো প্রাসঙ্গিক আলোচনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যখন বিব্রত নারী সহকর্মীর জবাব যদি না-বাচক হয়, তখন অতি উচ্চশিক্ষিত সহকর্মীও রীতিমতো আক্ষরিক অর্থেই চোখ কপালে তুলেন, "ও ও ও! আপনার এখনও বিয়েই হয়নি!!"

তার পরের স্পেলের 'কুয়েরিজ' সিরিজে ক্রমান্বয়ে গুগলি, ইয়র্কার, শর্ট বল, ইন-সুইঙ্গার আসে, "তাহলে কার সাথে থাকেন? বাসায় কে কে থাকে? নিজের ফ্ল্যাট? ও, ভাড়া বাসা? কেন! বিয়েশাদি তো করেননি, সবই তো ব্যাংকে জমা থাকার কথা! (প্রথম দিনেই!!!) ভাড়া কত দেন? ও, মা বাবার সাথে থাকেন? ভাই-বোন কয়জন? আর কেউ ইনকাম করে?"

পরের সমস্ত দিনগুলোর জন্য তাকে একটি 'ক্যাটাগরিতে' ফেলে দেওয়া হয়। তারপর দ্বিতীয় দফা স্ক্যানিং শুরু হয়, "ডিরেক্ট এপ্লাই করেছিলেন? সার্কুলারটা কবে হয়েছিল মনে আছে? সাক্ষাৎকারে কে কে ছিলেন? কবার ডেকেছিল? কাউকে চিনতেন এখানের?"

অর্থাৎ শিওর হতে চাইছেন আসলেই তিনি পদ্ধতিগতভাবে এসেছেন কি না। কারণ, তার ধারণা সে নারী কর্মী কারও রেফারেন্সে এসে থাকবেন। তারপর স্ক্রুটিনি করতে করতে যদি দেখা যায়, নারী কর্মী প্রশ্নকর্তা চাইতে বয়সে, কাজের অভিজ্ঞতায়, সিনিয়র তখনই তাকে 'কন্ট্রোল' করার ইচ্ছা জেগে ওঠে– 'যদি তার জায়গাটি নিয়ে নেয়' জাতীয় নিরাপত্তাহীনতা থেকে!

ভেবেছিলাম এবং আপনারাও ভাবছেন, পরিস্থিতি এখন এ রকম নেই। আমি অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে জানাচ্ছি যে, পরিস্থিতি এখনও এ রকমই আছে। যখন পুরুষ সহকর্মীটির বয়ানে শোনা যায়, "আমার ওয়াইফকে কখনও জব করতে দিব না। নারী থাকবে ঘরে। ওকে নিয়ে ওর কলিগেরা হাসাহাসি করবে, তাকাবে, সারাদিন পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াবে"– তখন সে পুরুষ সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা, "আপনিও কি তবে আপনার নারী সহকর্মীকে নিয়ে হাসাহাসি করেন? বা আপনার এত নারী সহকর্মী আপনার সঙ্গে যে ঘোরাফেরা করে তারা কি তবে নিরাপদ নন আপনার কাছে?"

নিরুত্তর।

এখনও উচ্চশিক্ষিত কেউ কেউ বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অবশ্যই ৪/৫ বছরের গ্যাপ থাকা উচিত। সমান সমান হলে স্ত্রী 'শাসন' মানবে না, তাকে 'কন্ট্রোল' করা যাবে না। তাহলে স্ত্রী হলেন– শিশুসম শাসনযোগ্য এক প্রাণি এবং যাকে সর্বদাই কলের পুতুলের মতো কন্ট্রোল করা যায়! মোবাইল অপারেটরের বারংবার পাঠানো বার্তায় অতীষ্ঠ হয়ে তেমনি আরেক জনের বিষোদগার, "অমুক অপারেটর যদি আমার গার্লফ্রেন্ড হইত, তাইলে তারে থাপড়াইতে থাপড়াইতে শিক্ষা দিয়ে দিতাম!"

গার্লফ্রেন্ড মোবাইল অপারেটরের মেসেজের সঙ্গে তুলনীয়? আর তাকে থাপড়াইতে থাপড়াইতে শিক্ষা দেওয়া হয়?

আমি জানি, আপনি– হ্যাঁ ভাই, যিনি এ কথা বলেছিলেন– আপনি এ লেখা পড়বেন।

খুব বেশি 'নারীবাদী লিখে ফেলছি কিন্তু! ক্ষমাপ্রার্থী।

বাসে দয়ায় পড়ে পাওয়া, বরাদ্দকৃত 'মহিলা সিট' কখানার জেরের মূল্য যে প্রতিদিন কত নারীকে কতভাবে চুকাতে হয়, তা বাসে চড়া নারী মাত্রই জানেন। আরও এক যুগ আগে একটি বিভাগীয় শহরে উচ্চশিক্ষার সূত্রে বসবাসের সময় যে আচরণ দেখেছি, "সমান অধিকার চায় আবার! তো তাইলে, উবায়া (দাঁড়িয়ে) যাইতে আবার সমস্যা কি তা তারার? অনো গিয়া আর ফারল না নে?"

সেই একই কথা আজ অহরহ এই মহানগর নামের ঢাকার গণপরিবহনের যানেও সমানভাবে চলছে। নির্দিষ্ট সময়ে অফিস পৌঁছানোর তাড়া নিয়ে যে নারী ঘর থেকে বেরোন, পাবলিক লোকাল বাসে ফার্মগেইট, কারওয়ান বাজার বা মিরপুর দশের পয়েন্টে সে খালি সিটের আশা না করেই উঠেন। কিন্তু লোল দৃষ্টি থেকে কাপড় ঠিক রাখতে বা ছিনতাইয়ের ভয়ে ব্যাগের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যন্ত থাকায় এবং দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কোনো অবলম্বন না থাকায় ব্রেক কষায় এদিক ওদিক এলোমেলো অবস্থায় গণপরিবহনে তার চূড়ান্ত যুদ্ধটি হয় ভিড়ের মাঝে হিলহিলে লালায়িত পুরুষ-স্পর্শ থেকে শরীরের মান বাঁচানো।

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একা সে দ্রৌপদী-নারীর চারপাশে সব দুর্যোধনরুপী বীর কৌরবপুত্র। আর ধর্মপুত্ররুপী ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরসম পাণ্ডবপুত্রগণ নীরব নির্বিকার চাউনি মেলে দেন প্রকৃতির পানে– এবার আমের মুকুলের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজে নির্যাতিত দ্রৌপদীর 'বেশ্যা' উপাধিপ্রাপ্তির সভার কোলাহল।

কখনও কখনও তিতি-বিরক্ত হয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে জ্ঞানগর্ভ বাণী প্রদান, "এদের বেশি বেশি (অধিকার) দিয়ে মাথায় তুলে ফেলা ফেলা হয়েছে। আরও চায়। পুরো দুনিয়া গিলে ফেলবে এরা!"

অন্যজন পাশ থেকে, "ভদ্র মেয়েমানুষ হইলে কি চিল্লাইত? এরে দেখেই (কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ যদিও) বোঝা যায় কী ধরনের মহিলা সে।''

এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলা নয়, সে ভাই আপনি নিজেও জানেন।

একসঙ্গে বসে বিদেশি কনসালটেন্টকে দিয়ে পাঁচতারা হোটেলে লাখ লাখ টাকার জেন্ডার অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশনের ওপর দিনভর ইনডাকশান ওয়ার্কশপ করা হয়। পরদিন অফিসে এসে চা খেতে খেতে বারান্দায় বসে টিপ্পনি– "এ কান দিয়ে ঢুকসে, ওই কান দিয়ে বের করে দিসি। এসব প্যাঁচাল গেজানি কে শোনে!"

জেন্ডার অ্যাডভাইজারকে মুখ টিপে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, "আমাদের জেন্ডার আপা!"

পৃথিবী পাল্টাচ্ছে সবাইকে নিয়েই। পৃথিবীটা গড়ছি সবাই মিলেই। এখনও প্রাকৃতিকভাবে সন্তান পৃথিবীতে আসতে ঠিক একজন পুরুষ এবং একজন নারীর সমান উপস্থিতির প্রয়োজন হয়। এখানে কেউ কাউকে ক্ষমতা বা অধিকার দেবার অধিকারই রাখি না। সবাই স্বতন্ত্রভাবে মানুষ হিসেবে সে প্রাপ্য অধিকারের সম্মানবোধটুকু জন্মগতভাবে নিয়ে আসে। শুধু হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। যে নারী নমাস সন্তান পেটে ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টকর, তীব্র বেদনার মাঝে যে কোনো পরিস্থিতিতে সন্তান জন্ম দিতে পারে, তার কাছে দুঘন্টা ঠায় বাসে দাঁড়িয়ে ঠিকমতো গন্তব্যে পৌঁছানো কষ্টকর কাজ নয়।

ভাই, যেভাবে তিনি প্রবল সচেতন থেকে আপনার সঙ্গে গা বাঁচিয়ে এতটুকুন হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনিও ঠিক অতটুকু চেষ্টা করুন না। নারীটিকে সিট দেবার চাইতে এভাবেই সব থেকে বড় সাহায্যটি তবে করা হয়ে যাবে।

দৃশ্যপট পাল্টেছে বেশ। কিন্তু পরিস্থিতি আদতে কতটুকু পাল্টেছে? এখনও কেন চিৎকার করে 'অধিকার চাই' বলে যুঁঝতে হবে? আমরা এখনও 'জেন্ডার' অর্থে বুঝি 'একান্তই নারী-বিষয়ক ব্যাপার'। কিন্তু কজন আক্ষরিকভাবেই বোঝে, জেন্ডার মানে নারী-পুরুষ-এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্র্যান্সজেন্ডার) সবার অধিকার নিয়ে কাজ করা। অবশ্যই জেন্ডার মানে শুধুই 'নারীঅধিকার' 'নারীঅধিকার' বলে গলা ফাটানো নয়। জেন্ডার মানে মানুষ হিসেবে যার যার প্রাপ্য সম্মানটুকু, অধিকার দেওয়া। জেন্ডার মানে 'লিঙ্গ'ও বটে। কিন্তু লিঙ্গ মানে শুধু জননেন্দ্রিয় নয়!