রাজনীতিতে কে থাকবে আর কে থাকবে না

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 14 Jan 2016, 04:15 AM
Updated : 14 Jan 2016, 04:15 AM

নতুন এক খবরে সামাজিক মিডিয়া তোলপাড়। বিএনপিকে অবৈধ ঘোষণা করা হতে পারে। হতেই পারে। জিয়াউর রহমানের গদি দখল বেআইনি তো বটেই। তাদের রাজনীতি বন্ধও হতে পারে। তা-ও কি অযৌক্তিক? কিন্তু তার আগে যে কটি প্রশ্নের জবাব জানা দরকার।

সবার আগে জানতে চাই এরশাদের শাসনামল কি বৈধ? তিনি কি জনরায়ে এসেছিলেন? প্রশ্নটি সঙ্গত। কারণ এরশাদের আমলটি কিন্তু জিয়াউর রহমানের আমলের চেয়ে দীর্ঘ। প্রায় নয় বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ অগণতান্ত্রিকতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। তাকে হটাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীরা জান দিয়েছেন। কত বুক খালি, কত নারীর শাড়ির আঁচল লুণ্ঠিত আর কত যৌবনের স্বপ্ন ধ্বংস হয়েছিল সে সব কারও অজানা নয়।

সে আমলের শাসক ও তার দল আজ বিরোধী দলের আসনে। সে-ও রহস্যময় এক যাত্রা। গানের কলির মতো, 'এই আছে এই নেই'। মাঝে মাঝে মনে হয় বেগম সাহেবা, মাঝে মাঝে হুজুর নিজে। এরা কি কারণে বৈধ? সরকারি দলের সঙ্গে থাকলে বৈধ, আর না থাকলেই কি অবৈধ?

যদি এমন কিছু ঘোষণা করা হয় বা হাইকোর্টের নির্দেশের ভিত্তিতে বিএনপিকে আপাতত চোখের আড়ালে রাখার ব্যবস্থা করা হয় তার পরিণাম কি শুভ হবে? জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এখন চরম বেহাল দশা। খালেদা জিয়াকে শেষ জনসভায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেখিনি। কেউ একজন পা গুছিয়ে দিচ্ছিল। বয়স আর হতাশায় তিনি ক্লান্ত। কারণ রাজপথের রাজনীতি করেনি বিএনপি। শুরু থেকে গদি, পাকি-প্রেম, ভারত-বিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা আর ছদ্মবেশী মুসলিম লীগের রাজনীতি ছিল তাদের সম্বল।

সে সব রাজনীতির ফসল খেয়ে খেয়ে পুষ্ট তার দলের নেতাদের এখন মুলার চেয়ে বেশি পছন্দ পটল। তাই পটল তোলার রাজনীতি করে যাচ্ছেন তারা। এই করতে করতে ক্লান্ত দলটি কেন তবে টার্গেট?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন অনেক বেশি প্রাজ্ঞ আর দূরদর্শী। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাদের মদদ রয়েছে, কারা জড়িত বা তারেক জিয়া কেন ঘনঘন ফোন করে তার মাকে নিরাপদে গোপনে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেগুলো প্রকাশ্য করলেই বরং ভালো হবে। মানুষ জানতে পারবে। তা না করে কলমের খোঁচায় অবৈধ করলে তার ভেতরে বিদ্বেষ ও দুর্ভাবনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়ার এই কাজ একদিন আবার এসে শতগুণে দংশন করবে।

আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাব না বাঙালি চিরদিন দুর্বলের প্রতি সদয়। সে ন্যায্যতা ভালোবাসে, কিন্তু দমন পছন্দ করে না। আওয়ামী লীগ নিজের দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারবে। জিয়া থেকে খালেদা জিয়া, সেনা-অভ্যুত্থান থেকে গ্রেনেড হামলা, কোনোটাই তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনি। মানুষ যদি তাদের প্রত্যাখ্যান করে তো সে সব কারণেই করেছে। আজ যদি তাদেরকে নেগেটিভ পপুলারিটি দেওয়ার কাজটা সরকার নিজে করে দেয়, সেটা বুমেরাং হতে বাধ্য।

বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল। তাদের রাজনীতি আমি পছন্দ করি না। কিন্তু এ হচ্ছে বৈরী দর্পনে নিজের মুখ দেখে আত্মশুদ্ধির পথ। খালেদা জিয়া সম্প্রতি তিরিশ লাখ শহীদের ব্যাপারে যা বললেন তা যদি না বলতেন আমরা কোনো দিন কি জানতে পারতাম তলে তলে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছে? এর আগেও তারা সরকারি প্রচারমাধ্যমে জিয়াকে ঘোষক বানিয়ে ব্যাপক সন্দেহ আর সংশয় তৈরি করেছিল। তাতে কি বঙ্গবন্ধুর আসন টলেছে?

রাজনীতিতে যে শুদ্ধাচার, বিএনপি তা মানে না। মানে না বলেই তো অগণতান্ত্রিক। তার ধ্বংস যদি আনিবার্য হয় তবে তার নিয়ামক হবে ভোটার ও জনগণ। সে দায়িত্ব আইন বা সরকার নেবে কেন? আমার মনে হয় বিএনপিকে নেগেটিভ পপুলারিটির আর্শীবাদ দেওয়ার কাজটি করা হচ্ছে। তাছাড়া প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড একদিন ঘুরে দাঁড়িয়ে উল্টোরথের সূচনা করতে পারে। সেটা প্রগতিশীলতার জন্য সুখকর হবে না।

যারা রাজনীতি বোঝেন বা করেন তাদেরই অজানা এই ফাঁকে কারা উঠে আসবে। আমরা ভারতেও দেখেছি কংগ্রেসের দুর্বলতা আর তাদের হীনবল হবার কারণে উঠে এসেছে বিজেপি। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি সুসংগঠিত আর তৃণমূলে বিস্তৃত। তাদের বড় বড় দাগী নেতারা ফাঁসিতে যাবার পর কলঙ্কমুক্ত জামায়াত যদি ঘুরে দাঁড়ায়, তাদের ভবিষ্যৎ মন্দ হবে না। সেটাকে 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স'এ রাখার জন্যও বিএনপির মতো দলের দরকার আছে।

জামায়াতিদের বড় শক্তি তাদের আদর্শবোধ। আদর্শ আছে কিনা সেটা বড় কথা নয়, বোধটা তারা লালন করে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা মানে। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার কাজটি সারাজীবন কোনো বাহিনীকে দিয়ে হবার নয়। বাহিনীর শক্তি হিটলার মুসোলিনীকেও বাঁচাতে পারেনি। জামায়াতের দুর্বলতা যেমন সহিংসতা, শক্তিও তেমনি তাদের ক্যাডার বাহিনী।

আমার মনে হয়েছে বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গে থাকলে ভোটের বাক্সে লোকসান বটে, আখেরে তাদের এই জগাখিচুড়ি মিলনে দেশ ও দশের লাভ। তাতে এটা স্পষ্ট হয় যে, কারও কোনো নীতিবোধ নাই। তাছাড়া বিএনপির যে লুটেরা স্বভাব, সেটা জামায়াতকেও প্রভাবিত করে। অন্যদিকে শরীকের প্রভাবে জামায়াতিদের মনেও সংশয় ও দুর্বলতার জন্ম হয়।

আওয়ামী লীগ যদি জেনে বুঝে বা কারও পরামর্শে জামায়াতকে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে দেখতে চায় তো ভিন্ন কথা। সেটাও আন্তর্জাতিক প্রেসক্রিপশনের দাওয়াই হতে পারে। থাকলে মাঝে মাঝে অনুরাগ বিরাগ ও সমর্ধনের পাল্লা ভারী হয়। কিন্তু বাংলাদেশের যে বাস্তবতা একবার যদি তা জেঁকে বসে তার আমেজ কাটাতে লাগবে পঞ্চাশ বছর। ততদিনে খোলনলচে পাল্টে সমাজ ও দেশ হয়ে যাবে আরেক ধরনের। সেটা কি আমাদের কাম্য?

এখনই আমরা কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত বা সমাধানে আসব না। কিন্তু বিএনপি যখন প্রায় খাদের কিনারে, যখন তার নেতা নেই নেতৃত্ব নেই, জাফরুল্লাহদের মতো মানুষরা দলটিকে প্রায় ঠেলে ফেলে দিচ্ছে, তখন শেষ ধাক্কা দিয়ে নিজেদের দুর্নাম কুড়ানোর চেষ্টা কেন?

এই সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ জবরদস্তি আর দুর্নীতির। দুর্নীতি ব্যাপারটা প্রায় জায়েজ হলেও জোর-জবরদস্তি মানুষ মানতে পারে না। আওয়ামী লীগের মতো বড় ও সর্বংসহা দলের এটা বুঝতে হবে। তাদের দায় যেমন দায়িত্বও অধিক। দায় শোধ করলেই কিন্তু সব শেষ হয়ে যায় না। আজ আইন করে অবৈধ ঘোষণা করা হলে কাল যে তা মানবে তেমন দেশ আমরা গঠন করিনি।

কে যেন লিখেছে কোথায় যাবার পথে মোহাম্মদপুরের বাড়ি বাড়ি পাকিস্তানের পতাকা দেখে তার মন খারাপ হয়েছে। এটা তো বাহ্যিক। কত কোটি মানুষের মনে সে পতাকা দুলছে, মনে মনে 'পাক সার জমিন' আছে আমরা তার হিসাব জানি না। মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস বিকৃত করে বাংলাস্তানের জন্ম দেওয়া জন্য যে দলের জন্ম, তার শিকড় অনেক দূর ছড়িয়ে আছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নব্য পথভ্রষ্ট আর রাজাকারের দল। কাঁটা দিয়ে কাঁটা না তুলে তাকে উপড়ে ফেলার কাজটিতে আর যাই থাক দূরদর্শিতা নেই। তাছাড়া এটাও মনে রাখতে হবে, আমি বা আমরা না থাকলেও যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের দিয়ে যাওয়া পতাকা বহন করতে পারে। রাজনীতি কঠিন ও দুঃসাধ্য করে দিয়ে গেলে আগামী নেতৃত্ব তার ভার বহন করতে পারবে না। তার সামনে থাকবে নতুন এজেন্ডা, নতুন জীবনের হাতছানি।

গণতন্ত্রকে তালগোল পাকিয়ে হাতে তুলে দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। তারা নিজেদের বেলায় যা মানে আমাদের বেলায় তা মানে না। আমরা তাদের অন্ধ অনুসারী হলে বিপদ বাড়বে। ফের আমরা যদি দম্ভ ও অহমবোধে ভুগে সঠিক কাজ না করি সেটাও ছেড়ে কথা বলবে না। খালেদা জিয়া ও তার দলের প্রতি বিন্দুমাত্র সমর্থন না রেখেও বলি, সময় শাসন করা অনুচিত। বিএনপিকে তার নিজের নিয়মে নিজের শেষ গন্তব্যে যেতে দেওয়া উচিত। তার পরিণতি, তার দায়ভার তার নিজের। এখানে জবরদস্তির জায়গা না থাকাই শ্রেয়।

আইন যদি তাদের বিরুদ্ধে যায় যাবে। তাকে যেন প্রভাবিত মনে না হয়। আত্মসমর্থনের জায়গাটা তারা নিজেরাই সংকুচিত করেছে। তাদের পায়ে তারাই কুড়াল মারছে। বাংলাদেশে যে জনগোষ্ঠীর মনে এখনও তাদের জন্য প্রেম ও মহব্বত আছে, সেটা দূরীভূত হবে অন্যদের বড় কাজে। মহত্তে, উদারতায়। এটা মানতে হবে, দেশে আর যেসব রাজনৈতিক দল তাদের ভিত্তি নড়বড়ে।

শোনা কথা, ঢাকায় প্রখ্যাত এক বাম নেতা রিকশা থেকে পড়ে যাবার পর নিজের বিবৃতি নিজে লিখে রিকশাওয়ালকে দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কারণ তার দলের কেউ তখন ঢাকায় নেই। সমর্থনশূন্য বাম বা দালাল ডান, কেউ কাউকে বাঁচায়নি, বাঁচাতে পারে না।

সময়ের কাজ সময় করবে। সেই বলে দেবে কে বিলুপ্ত হবে আর কে থাকবে। আওয়ামী লীগ বা ইতিহাস নির্মাতা কোনো দলের কাছেই আমরা সময়কে তালুবন্দী করার কাজ দেখতে চাই না। আমরা এটাই মনে করিয়ে দিতে চাই যে, কেউ জিতলে যেন সে একা না জেতে আর হারলে যেন আমাদের সবাইকে ডুবিয়ে না হারে।

আগামীটা খুব প্রয়োজনীয়। সেখানে শুধু সামনে যাবার ডাক। তাকে অতীতের আবর্জনা আর মোহ-পাপে বা জিঘাংসায় মলিন না করলেই সবার মঙ্গল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক