নতুন প্রযুক্তি কৃষকের জন্য এখন দুঃসংবাদ
এ বছর আলু চাষীরা বেশ বিপদেই পড়েছে। নতুন প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত মূল্যবান বীজ ব্যবহার, দামি সার প্রয়োগ ও উচ্চহারে মজুরি দিয়ে প্রচুর শ্রমিক নিযোগ করে উৎপাদনের পর এখন আলুর দাম প্রতি কেজি ৫ টাকা। কোল্ডস্টোরে রাখার জায়গা নেই । থাকলেও হঠাৎ করে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। কেজি প্রতি এখন ৫ টাকা। আলুচাষীদের এই দুঃসময়ে সহযোগিতার জন্য কেউ নেই। দাম বাড়লে হয়ত সরকার দাবী করতে পারত আমরা আপনাদের বন্ধু, বিশেষ নীতি তৈরি করে আলুর দাম স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে, ইত্যাদি। অতীতে এই ধরণের পরিস্থিতিতে দেখা গেছে সরকারীভাবে নানা উদ্যোগের মাধ্যমে অন্ততঃ বেশি করে আলু খেতে উদ্বুদ্ব করতে ।
এক বিঘা জমিতে আলু আবাদে খরচ গড়পরতা ১৪,০০০। শুধুমাত্র সার আর সেচ বাবদ প্রয়োজন হয় মোট খরচের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বীজ বাবদও একই পরিমাণ। সারের মূল্য বৃদ্ধি করায় আবাদি খরচ বেড়েছে। কারণ আলু আবাদে অন্যান্য ফসল আবাদের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করতে হয়। তবে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় শ্রমিকের মজুরি বাবদ। এত খরচের পর এক বিঘা জমিতে ৫০-৬০ মণ আলু উৎপাদন করা য়ায়। ফলে কেজি প্রতি ৭ টাকার উপরে হলে আলু চাষীরা লাভের মুখ দেখতে পারেন। এর কম হওয়ায় এখন তারা দিশেহারা। এইভাবেই আমাদের দেশের সব চাষীরাই কোন না কোন ভাবে বিপদে পড়েন। শুধু বাংলাদেশে নয় দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই চাষীদের এই অবস্থা। অথচ কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এ সমস্ত দেশে সরকারীভাবে নেই কোন উদ্যোগ।
নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আশানুরূপ ফলন বৃদ্ধিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিবেশি ভারতে কৃষকদের আত্মাহুতি দিতে হচ্ছে। হিন্দু পত্রিকার উদ্ধুতি দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্র্যিবিউন-এ প্রকাশিত (জানুয়ারী ২৯, ২০১০) এক তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দুই লক্ষ কৃষক আত্মহত্যা করেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় যে ১৯৯৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ১,০০,০০০ আত্মহত্যা করেছে এবং ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর আত্মহত্যার হার ছিল ১৬,০০০ অর্থাৎ প্রতিদিন ৪৩ জন। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক ফলনের জন্য বিনিয়োগ করতে হয়েছে বেশি। কিন্তু সেই অনুপাতে ফলন পাওয়া যায় নি। ঋণগ্রস্ত ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হয়েছে। সম্প্রতি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী একটি বিদেশী কোম্পানীকে 'সিরিয়াল কিলার' হিসেবে দোষারূপ করা হয়েছে। ভারতে সবুজ বিপ্লবের জনক বলে প্রায়শঃ অভিহিত এম, এস, স্বামীনাথন বলেছেন সবুজ বিপ্লব তার দেশে বিপর্যয় বয়ে এনেছে । যা হোক এখন প্রশ্ন উঠেছে যে সবুজ বিপ্লব থেকে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ না করে কেন আবার আর একটি নতুন প্রযুক্তি বরণ করে নেযা হচ্ছে। আমেরিকাতে উদ্ভাবিত জিএম (Genetically Modified বা কৌলগতভাবে পরিবর্তিত) হিসেবে পরিচিত এই প্রযুক্তিটি ইতোমধ্যে সারা বিশ্বে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি নয়া দিল্লীতে কৃষক ফেডারেশন এর দক্ষিণ এশিয়ার কনফারেন্সে জিএম বীজের অনিষ্টতা থেকে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হওযায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের সরকারসমূহকে নিন্দা করা হয়েছে।
জিএম প্রযুক্তিতে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ামের সাহায্যে কাঙ্খিত গুণাগুণ বদল করে নতুন জাতের পরিবর্তিত গাছ উদ্ভাবন করা হয়। বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এখনও নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত, বিশেষ করে প্রায় ১০০ কোটি শিশু। টেকসই খাদ্য উৎপাদন নীতির অভাবে এবং একই জমিতে একাধারে নির্দিষ্ট ফসল আবাদের ফলে কীটপতঙ্গের আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে ও মাটির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বায়োটেক (জীবপ্রযুক্তি) অনুসরণকারীরা এই সমস্যার সমাধান করতে চান দ্রুত বর্ধনশীল, ভিটামিন সমৃদ্ধ ও অধিক ফলনশীল জিএম বীজ আবাদ করে। অন্যদিকে পরিবেশবিদরা মনে করছেন এই জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। এটা হবে দূর্যোগে মোহর লাগানোর সমতুল্য (Frankensteinian disaster)। জিএম প্রযুক্তির পরিবর্তে প্রচলিত পদ্ধতিতে শস্য আবর্তন ও সেচ দিয়ে মাটিকে নিঃশেষণ থেকে রক্ষা করে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। আমেরিকায় কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জেফরি সচস-এর মতে পুরানো আমলের শংকর পদ্ধতিতে সৃষ্ট নতুন জাতের ব্যবহার করে স্থানীয় প্রকৃতি উপযোগী শস্যের জাত হতে পারে টেকসই উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উপায়। পশ্চিমা দেমসমুহে সৃষ্ট ও উপযোগী জিএম প্রযুক্তি ব্যবহারে কোন দেশকে বাধ্য না করে বরং উচিত হবে সে দেশে বায়োটেক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে উপযোগী জাত উৎপাদনে। বিদেশী ফসলের জিন থেকে সৃষ্ট জাত দেশীয় জাতকে সংক্রামিত করতে পারে। ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে কৃষকেরা বিদেশী জিএম বীজের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এ ধরণের বীজ থেকে উৎপাদিত ফসল বিষাক্ত হতে পারে, এলার্জি উদ্রেক করতে পারে ও পরিবেশ সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপে জিএম প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত খাদ্য জনপ্রিয় নয়। গত দশকের ম্যাডকাউ রোগ প্রদূর্ভাবের পরে জিএম খাদ্যের প্রতি সন্দেহ বৃদ্ধি পায়। ব্রাজিল ও চীনে অবশ্য নিজ দেশে উদ্ভাবিত জিএম প্রযুক্তিতে বীজ তৈরি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত দশকের শুরুতে আমেরিকাতে পশুখাদ্যের জন্য অনুমোদিত স্টারলিংক জিম কর্ন বা ভুট্টা মানুষের খাদ্য হিসেবে অন্য দেশে রফতানি করা হয়। এই ভুট্টায় বহিরাগত একটি প্রোটিন এলার্জি ধরণের প্রতিক্রিয়ার কারণ হিসেবে সন্দেহের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এর সত্যতা পাওয়া না গেলেও সন্দেহ থেকে যায়।
আমাদের দেশে হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিতে পারি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি ভারত থেকে বীজ আমদানীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ধান চাষীদের হাইব্রিড বীজ এর শিকলে আবদ্ধ করার চেষ্টা শুরু হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন এর মাটি ও মানূষ অনুষ্ঠান ফলন বেশি বলে হাইব্রিড ধানের বীজ ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। বীজ আমদানীকারকরা প্রদর্শণী করে বেশ খরচও করছিলেন যেহেতু লাভের পরিমাণ ছিল যথেষ্ট, প্রতি কিলোগ্রাম বীজের দাম দ্ইশত টাকা – প্রচলিত বীজ থেকে পনের গুণ বেশি। হাইব্রিড ফসল চাষে প্রতিবার নতুন করে বীজ সংগ্রহ করতে হয়। কৃষকেরা এ বীজ একবার পছন্দ করলে একচেটিয়া ব্যবসা নিশ্চিত। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতামত ছাড়াই এই বীজ আমদানী করে বাজারজাত শুরু করা হয়। বাংলাদেশ বীজ প্রত্যয়ন সংস্থা কর্তৃকও এ বীজ প্রত্যয়িত ছিল না। যে দেশ থেকে আমদানী করা হচ্ছে সে দেশের সরকার কর্তৃকও এ জাতগুলো অনুমোদিত ছিল না। এগুলোর চাষ করে আমাদের দেশে অনেক কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হন। তারা বুঝতে পারে এ ধান ঊৎপাদনে ঝুঁকি অনেক, খরচ বেশি, প্রয়োজন সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং এদেশের আবহাওয়ায় অনুপযোগী। এ নিয়ে ১৯৯৮ সালে জাতীয় সংসদে বাকবিতন্ডা হলেও সরকারী দল বিরোধী দলকে দায়ী করে দায়মুক্ত হয়। বিশিষ্ট ধান গবেষক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন মহাপরিচালক ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ডক্টর এস, এম, হাছানুজ্জামান এই বীজ আমদানিকে অসাধু ব্যবসা ও দস্যূতা (Intellectual Piracy) বলে অভিহিত করেন। তিনি উল্ল্যেখ করেন যে এই বীজ ধানচাষীদের শত্রু । সে যাত্রায় কৃষকেরা প্রতারিত হয়ে সাবধান হয়ে যায়। ওই বীজের আমদানী বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বীজ ব্যবসায়ীরা এখনও আশা ছাড়েন না। বর্তমানে চীন থেকে হাইব্রিড বীজ সরাসরি আমদানি করে এবং কিছু এ দেশে উৎপন্ন করে বাজারজাত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটও বেশ কয়েকটি হাইব্রিড জাত বের করেছে। হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদনে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। প্রতি একরে প্রায় তিন শত জন । সুতরাং হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানী করে নয় বরং বীজ ঊৎপাদন করে আবাদে লাভ বেশি। এতে প্রচুর গ্রামীণ কৃষি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতে পারে। তবে তার আগে প্রয়োজন বাংলাদেশে মোট কত এলাকায় হাইব্রিড জাতের ফসল চাষ হচ্ছে এবং হাইব্রিড চাষে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া কী তার উপর পরিসংখ্যান ও তথ্য। এ ব্যাপারে সরকারী উদ্যোগের প্রয়োজন।
কৃষকেরা কি নিজেরা উৎসাহিত হয়ে নতুন প্রযুক্তি ব্যাবহার করে? না কি বাধ্য হয়ে, প্রলুদ্ধ হয়ে, বিকল্প বা দেশীয় প্রযুক্তি বিলুপ্ত হওয়ার কারণে। অনেক কৃষককে দেখেছি হাইব্রিড বা 'ইরি' ধানের চাল পছন্দ করেন না। স্বাদ কম, পান্তা করে খাওয়া যায় না, পঁচে যায়। নিজেদের খাওয়ার জন্য আলাদাভাবে দেশী জাতের চাষ করে থাকেন। ইদানিং আবার দেশী জাতের বীজ পাওয়া দূষ্কর হয়ে পড়েছে। এদিকে কিছূ কিছূ এনজিও বা বেসরকরী প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে কৃষকদেরও আমদানি করা প্রযুক্তি বা বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করে যাচ্ছে। এ ব্যপারে মিডিয়া বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলো অগ্রণি ভুমিকা পালন করে থাকে। নতুন বা আমদানিকৃত প্রযুক্তি সম্পর্কে কোন রকম সম্যক ধারণা না নিয়ে, বিশেষজ্ঞের মতামত ছাড়াই নানা রকম প্রচার করতে থাকেন। যেমন আঙ্গুর ফলের চাষের জন্য জনৈক টিভি ব্যক্তিত্ব উঠে পড়ে লাগলেন। বুনো আঙ্গুরের মাচা দেখিয়ে উৎসাহিত করা হতে লাগলো। অনেকে চাষ শুরু করে দুর্ভোগে পড়লেন। একই ভদ্রলোক কয়েকটি হইব্রিড জাত নিয়েও উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তারপরে কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে। এগুলোর জনপ্রিয়তার চিহ্ন বা অস্তিত্ব এখন আর পাওয়া যাবেনা । কিন্তু তাদের প্রচারে উৎসাহিত হয়ে অনেক কৃষক ক্ষতিগস্ত হয়েছেন। এমনিভাবে কমলা ও বেশ কয়েকটি ফলের বিদেশী জাতের আবাদের চেষ্টা চলছে। এ সমস্ত টিভি চ্যানেলভিত্তিক কৃষি বিশেষজ্ঞদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কেন আমরা কমলা চাষ করব? দেশী একটা মরিচে দুটো কমলার সমান ভিটামিন সি আছে। অন্যান্য দেশীয় ফলের কথা না হয় বাদই দিলাম। কোন নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের আগে প্রয়োজন এর বিশদভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ। এ ব্যাপারে সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের কি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরো খাদ্য শস্য উৎপাদনের প্রয়োজন আছে? বর্তমানে উৎপাদিত খাদ্য শস্যের একটা অংশ মাছ, মুরগী, হাঁস, গরু ও ছাগলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক কেজি মাছ উৎপাদনে ৩ কেজি এবং এক কেজি মাংশ উৎপাদনে ৭ কেজি খাদ্য শস্যের প্রযোজন হয়। আমরা কি প্রতিদিন প্রতি বেলায় মাছ-মাংশ খাওয়ার জন্য হাইব্রিড বীজ, সার প্রয়োগ করে সেচ দিয়ে মাছ ও গবাদি পশুখাদ্যের জন্য ফসল আবাদ করব? নাকি আগের মত সনাতন পদ্ধতিতে ধানের সাথে মাছ চাষ করব এবং ফসলের অবশিষ্ট থেকে গবাদি পশুকে খেতে দিয়ে যতটুকু মাছ মাংশ খাওয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকব। কেন আমরা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গভীর পানিতে, প্লাবিত জমিতে ও ফসলের ক্ষেতে যে শেওলা তৈরি হয়, জলজ প্রাণী তৈরি হয় সেগুলোর প্রসারণ বাধাগ্রস্ত করে আমদানিকৃত প্রযুক্তি দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে মাছ ও গবাদি পশুর চাষ বিস্তার করছি। এগুলো পশ্চিমা দেশে হয়ত সম্ভব কারণ তাদের মাথা পিছু আবাদি জমির পরিমাণ আমাদের থেকে অনেক বেশি, আবার তাদের অন্য দেশ থেকে খাদ্য ক্রয়ের জন্য যথেষ্ট আয়ের বিকল্প পথ রয়েছে। এ সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে আমাদের দেশে কৃষি প্রযুক্তির ধরণ নির্ধারণ করতে হবে। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে এ দেশের দশ কোটি কৃষক বিপদে পড়বে। সারা দেশের মানুষের খাদ্যের ঘাটতি হবে।
বিশ্বে যখন নতুন প্রযুক্তি জিএম বীজ নিয়ে এ ধরণের বিতর্ক তখন বাংলদেশে এর অবস্থান বা ভবিষ্যৎ কী? কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে কয়েকটি বৃহত্তর এনজিও জিএম বীজ আমদানীর ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে অবশ্য বলা হয়েছিল যে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বাংলাদেশে জিএম বীজের ব্যবহার চালু করা হবে না। কয়েক বছর ধরে ভারত ও বাংলাদেশে বেগুন চাষে মাজরা বা লেপিডপটেরন পোকা প্রতিরোধে জিএম বীজ বাজারজাতকরণের প্রচেষ্টা চলছে। মৃত্তিকা বাহিত ব্যাসিললাস থুরিনজিয়েনসিস নামক ব্যাকটেরিযাম-এর জিন স্থাপন করে 'বিটি বিরিঞ্জাল' নাম দিয়ে এই বীজ তৈরি করা হয়েছে। এ বীজ থেকে আবাদি ক্ষেতের বেগুন মাজরা পোকা খেলে বিটি টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ তার পরিপাকতন্ত্র নষ্ট করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবে। ভারতে বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে যে জিএম খাদ্য দিয়ে পালিত গবাদিপশুর বৃদ্ধি, অঙ্গ বর্ধন ও রোগ প্রতিরোধে সমস্যা দেখা গেছে। বিগত ২০০২ সালে বিমুক্ত বিটি কটন বা তূলার কারণে মধ্য প্রদেশে খামার ও ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা গেছে। যেমন চুলকানী, মূখ ফুলে যাওয়া, ইত্যাদি। গ্রীনপিস বিটি বেগুন চাষের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিযেছে। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের শুরুতে ভারত সরকার বিটি বিরিঞ্জাল বা বেগুন বিমুক্ত করতে আরো সময় নেবে বলে সিন্ধান্ত নেয়। বলাবাহুল্য ভারতে জিএম শস্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে আমেরিকাভিত্তিক বহুজাতিক কৃষি বায়োটেকনলজি সংস্থা মনসাটো হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড ও মহারাষ্ট্র হাইব্রিড বীজ কোম্পানী যৌথ উদ্যোগে মহাইকো-মনসান্তো বায়োটেক প্রতিষ্টা করে । ভারতের জিনেটেক ইঞ্জিনিয়ারীং এ্যাপ্পুরুভাল কমিটি (জিইএসি) ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিটি বেগুন চাষের জন্য এগিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মতি দেয়। পরে ভারত সরকারের পরিবেশ মন্ত্রী এ ব্যাপারে জনগনের সাথে মতবিনিময় করলে কোন কোন পক্ষ আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষে বিটি বেগুণ প্রযুক্তির সমর্থনে থাকলেও অন্যরা খাদ্য শস্যে বিষাক্ত জিন স্থাপনের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন। বিশেষ করে পশ্চিম বাংলাসহ আটটি রাজ্য সরকার বিভিন্নভাবে বিটি বেগুনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি বিধায় (জিইএসি) অনুমোদনের বিপক্ষে সুপ্রীম কোর্ট অন্তবর্তীকালীন ইনজাংশন জারী করে। যাহোক বিটি বেগুন নিয়ে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে এক পর্যায়ে ভারতে এই প্রযুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এ মাসের শুরুতে নয়া দিল্লীতে কৃষক ফেডারেশনের দক্ষিণ এশিয়ার কনফারেন্স হয়। কনফারেন্সে আহব্বায়ক জিএম বীজ আমাদের সনাতন বীজের জন্য হুমকি স্বরূপ বলে উল্লেখ করেন। জিএম বীজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই কনফারেন্সে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের কৃষক নেতারা এশিয়াবাসী কৃষকদের ফসল উৎপাদনে জিএম বীজ ব্যবহার প্রতিরোধ এবং সনাতন পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য আহ্বান করা হয়েছে।
উল্লেখ্য বাংলাদেশেও বিটি বেগুন নিয়ে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও ইস্ট-ওয়েস্ট সিড নামক একটি বেসরকারী বীজ কোম্পানী এর সাথে সংশ্লিষ্ট আছে বলে প্রকাশিত হয়েছে। আরো মজার ব্যাপার যে ভারতের বীজ কোম্পানী মহাইকো এ ব্যাপারে সহায়তা করছে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট গবেষকরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার ভারত সফর করেছেন। এউ প্রযুক্তি বিমুক্ত করার লক্ষ্যে তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। অতীতে, বিশেষ করে হাইব্রিড বীজ প্রযুক্তি আমদানীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে সরকার বীজ ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়েছেন। বীজ ব্যবসায়ীরা স্থির করেছেন কোথা থেকে কোন ফসলের বীজ আনবেন। বীজের মুল্যও তারা স্থির করেছেন। এ ব্যাপারে কৃষকদের মতামত ও অভিজ্ঞতা নেয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই; কৃষকরাও বন্ধুহীন থেকে গেছেন। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ, কৃষি যন্ত্রপাতির দাম বেড়েই চলেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচে এখন দামি ও শক্তিশালী পাম্পের প্রয়োজন হচ্ছে। মাটির উর্বর ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় সার প্রয়োগের হার বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে ফসলের দাম অনিশ্চিত, আবার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্য কৃষকদের নাগালের বাইরে। কৃষকদের ক্ষতি, সমস্যা ও চাহিদার কথা বিবেচনা না করে বাংলাদেশে কি এইভাবে প্রযুক্তির ব্যবসা চলতেই থাকবে?
