২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষার মেশিনটা বদলান, প্রত্যেক শিক্ষার্থীই পাস করবে

১০-১২ বছর পড়ার পর ৭ লাখ পরীক্ষার্থীর অকৃতকার্যতা কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের অকার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার দেউলিয়াত্ব।

শিক্ষার মেশিনটা বদলান, প্রত্যেক শিক্ষার্থীই পাস করবে
সাড়ে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭ লাখেরই ঠাঁই হয়েছে অকৃতকার্যদের তালিকায়। শিক্ষার সেকেলে কাঠামোর বলি হতে হলো এসব কিশোর-কিশোরীকে, যার পুরো দায়ভার আমাদের অকার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার।

আলমগীর খান আলমগীর খান

Published : 11 Aug 2026, 07:25 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো ফি বছরের সবচেয়ে বড় জাতীয় ঘটনাগুলোর একটি। প্রতি বছরই আবার কোনো না কোনো চমকও থাকে এতে। এবারকার চমক হচ্ছে পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

সাড়ে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭ লাখই ফেল করেছে। আর ভালো রেজাল্ট বলে পরিচিত যে জিপিএ ৫ তা অর্জন করেছে এক লাখের সামান্য কিছু বেশি শিক্ষার্থী। অতএব পরীক্ষা না দেওয়া, ফেল করা ও জিপিএ ৫ না পাওয়া মিলিয়ে বলা যায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থীই হয় মোটমুটি বা খারাপ ফল করেছে। আর এর মধ্যে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন এক চরম দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছে। ইতোমধ্যে আত্মহত্যার খবর শোনা যাচ্ছে।

তিরিশ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র সাড়ে ছয়শো স্কুলে সবাই পাস করেছে আর তিনশোর বেশি স্কুলের সব শিক্ষার্থীই ফেল করেছে। বছরের পর বছর এসব দেখতে দেখতে আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই তো শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষাব্যবস্থার অভিভাবকগণ চারদিক থেকে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। বলছেন, পরীক্ষার ফল সুন্দর হয়েছে! এভাবে ঢেকুর তোলা যায়?

৭ লাখ শিক্ষার্থী কেন ফেল করল? শিক্ষাকর্মকতাদের সোজা উত্তর— পড়াশোনা না করলে এমনই হবে। মূলত ১ লাখ শিক্ষার্থীকেই বাছাই করা হয়েছে চূড়ান্ত মেধাবী হিসেবে। দশ-বারো বছর পড়ালেখার পর ৩০ ঘণ্টার পরীক্ষা দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুকিশোরদের মেধা মেপে ফেলল। যে শিক্ষাব্যবস্থা তা পারে তাকে বিশ্বসেরা খেতাব দেওয়াই যায়। জাতির ৭ লাখ কিশোর-কিশোরী পুরাই মেধাহীন? যারা এইসব মেধার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন তাদের মাথাটা যে এক অত্যাশ্চর্য পদার্থ দিয়ে ভরা তাতে সন্দেহের কারণ নেই।

প্রতিবছরই বাংলাদেশের এরকম পনের থেকে আঠারো লাখ কিশোর বয়সীদের মধ্য থেকে লাখ খানেক মেধাবী খুঁজে বের করা হয়। এই মেধাবীদের কী কী প্রতিভা দ্বারা এই দেশ ও বিশ্ব উপকৃত, আর কী কী দিয়ে অপকৃত তাও একটু খুঁজে দেখা দরকার।

পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে কি এখন এই ধরনের মেধা বাছাইয়ের তুঘলকি কাণ্ড চলে? ব্রিটিশ যে লক্কড়ঝক্কড় শিক্ষার মেশিনটা আমাদের দেশে বসিয়ে দিয়ে গেছে আমরা আজও তাই চালাচ্ছি। এর কোনো পরিবর্তনের ইচ্ছে কারো নেই। এই ৭ লাখ শিক্ষার্থীকে যদি শিশুকালে ফিনল্যান্ড কিংবা জাপান পাঠিয়ে দেওয়া হতো, তারা কেবল ভালোই করতো না, তারা ওই এক লাখ বাছাইকৃত মেধাবী ছেলেমেয়েকেও ভবিষ্যৎ জীবনে বহুগুণ ছাড়িয়ে যেত হয়তো। হয়তো কেন, যায় নিশ্চয়ই। নয়তো আমাদের মন্ত্রী, আমলারা তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েকে হয় বিদেশে পড়ালেখা করতে পাঠান অথবা দেশের মধ্যে ওইরকম শিক্ষার অনুকরণ আছে যেসব শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে সেখানে পড়ান। ফেল করার জন্য এই ৭ লাখ শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই নিজেরা দায়ী নয়, দায়ী এই ফেইলড শিক্ষাব্যবস্থা।

আমাদের এসএসসি পর্যন্ত যেসব পাঠ্যবই আছে সেখানে এমন কী আছে যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন কোনো শিশুকিশোর তা বুঝতে সক্ষম হবে না? এমন একটা বিষয়ও এতে নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তারা পারছে না, সেই ব্যর্থতা প্রায় পুরোপুরি যারা শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তাদের। এসএসসি পর্যন্ত এই প্রাথমিক-মাধ্যমিক গোছের শিক্ষা শিশুকিশোরদের সেইভাবে শেখার কথা, যেভাবে তারা কথা বলতে ও হাঁটতে শেখে। সেজন্যই উন্নত দেশগুলোতে এই পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক, আনন্দদায়কও। যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক শিশু যেমন পরিবার ও সমাজের সহায়তায় কথা বলতে ও হাঁটতে শেখে, যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক শিশু একইভাবে পরিবার, সমাজ ও স্কুল-কলেজের সহায়তায় কথা বলতে, হাঁটতে ও পড়ালেখা করতে শেখে। শিশুর কথা বলতে পারা ও হাঁটতে পারা এক পরম আনন্দের বিষয়। কিন্তু এতে কেউ বিস্মিত হয় না, বিস্মিত ও ভীত হয় যদি শিশু তা না পারে।

এসএসসি পাস করা ও ভালো রেজাল্ট করাটা বিস্ময়ের কিছু নয়, বিস্ময়ের বিষয় ফল খারাপ করা এবং আরও বিস্ময়ের ব্যাপার ফেল করা। যতক্ষণ আমাদের সকল বিস্ময় ও উল্লাস ১ লাখ শিক্ষার্থীর অত্যুজ্জ্বল সাফল্যে ডুবে থাকবে, অথচ কোনো বিস্ময়, উদ্বেগ ও ব্যর্থতার দায়বোধ থাকবে না ৭ লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্যতায় ততক্ষণ এই লক্কড়ঝক্কড় মেশিনটাই চলবে, কিছুই বদলাবে না।

যতদিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবী বাছাইয়ের খেলাটা চলবে, ততদিন ১ ও ১৭-এর  অনুপাতটা বহাল থাকবে। মেধাবী বাছাইয়ের খেলাতেই রয়েছে অমেধাবী ও অকৃতকার্য বাছাইয়ের গ্যারান্টি। সমস্যা এই মানহীন শিক্ষাদানের ফেইলড শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থী নয়। এই মেশিনের যে চোঙ দিয়ে প্রতি বছর মেধাবী বের হয় তা দিয়ে এক লাখের ওপরে কোনেদিনই বেরোবে না, আমাদের অত্যুজ্জ্বল মেধারশ্মি বিকিরণকারী কর্মকর্তাগণ এই সামান্য সত্যটাও যে বোঝেন না, সে আরেক মহাবিস্ময়।

আমাদের দেশের বিগত সরকার আবার তা ঠিক ঠিক বুঝেছিলেন, আর তাই ওই মেশিনের চোঙের মুখটাই বড় করে দিয়েছিলেন। তাতে শিক্ষার এক পয়সার উপকার না হলেও চোঙের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য সফলরূপী শিক্ষার্থী। মেশিনটা একই আছে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ওইরকম ফাঁকিবাজি চাননি বলে তিনি আবার চোঙের মুখটি আগের মত সংকীর্ণ করে দিয়েছেন, বলে দিয়েছেন মন খুলে গান গাওয়া যাবে, তবে মন খুলে নাম্বার দেওয়া যাবে না। ভালো কথা।

শিক্ষাব্যবস্থার এই মেশিনে চোঙের মুখটি যত বড় করা যাবে, তত পাসের হার বাড়বে আর যত ছোট করা যাবে তত পাসের হার কমে তত ‘খাঁটি’ মেধাবী বাছাই হবে। শিক্ষা যে লবডঙ্কা তাই থাকবে। যদি চোঙের মুখটাকে ত্রিভুজাকৃতি করা যায়, তবে ত্রিভুজাকৃতি শিক্ষার্থী বেরুবে, যদি চতুর্ভুজাকার করা যায় তবে চতুর্ভুজাকার শিক্ষার্থী বেরুবে আর যদি গোলাকার করা যায় তবে গোলাকার শিক্ষার্থীই বেরুবে। এমনটাই বিগত শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা ছিল। আর এখন এটা জিপিএ ৫ আকৃতির, তাই জিপিএ ৫ ফলছে। অন্য নল দিয়ে বাকি যারা বেরুচ্ছে তারা দ্বিতীয় বা তৃতীয় মানের। দুর্ভাগা বাকিরা চোঙের মুখে আটকে হয়েছে ’ফেল’।

দার্শনিক হেগেলের মতে ইতিহাসে অপ্রয়োজনীয় কিছু নেই। প্রত্যেকেই নাকি ইতিহাসে একটা দায়িত্ব পালন করে আর তাই বজায় থাকে। বর্তমান লুটেরা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী সস্তা শ্রমের বিরাট চাহিদা রয়েছে। আর এটি সরবরাহের একটি অন্যতম উৎস বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশ।

শ্রমের এই সস্তা বাজারে আমাদের আদর দেখে আমরা নিজেদের গর্বিত মনে করি। বিশ্বের সস্তা শ্রমের বাজারে আমাদের এই উচ্চ অবস্থানকে অক্ষুণœ রাখতে হলে এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থাই চাই যা এখন আমাদের আছে। এই বিশ্ব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাই চৌকশ আর আমাদের শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে গর্ব না করাটা অকৃতজ্ঞতার শামিল। 

স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই মেশিনের চোঙের মুখটাকে নিয়েই হাজারটা পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে— একবার বড় তো আরেকবার ছোট করার এক্সারসাইজ। কয়েক প্রজন্ম পড়েছিল চোঙের মুখ বড় করার ফাঁদে, এখন ছোট করার ধাপ।

বছর দশেক পর আবার বড় করার পর্ব চলবে। নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাসের মত চলছে এই চক্র। লক্কড়ঝক্কড় মেশিনটা আগেও যেমন ছিলো, এখনও তেমনই আছে।

শিক্ষাব্যবস্থার একটা ভালো মেশিন তৈরি করুন, না পারলে যাদের আছে তাদের থেকে আমদানি করুন— কোনো শিক্ষার্থী ফেল করবে না, ফেল করতে চাইলেও পারবে না। ফেল কথাটাই উঠে যাবে শিক্ষার অভিধান থেকে, যত দ্রুত সম্ভব তা উঠে যাওয়াই উচিত। প্রত্যেক শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করবে সেইভাবে যেভাবে তারা কথা বলতে ও হাঁটতে শিখেছে। আর যদি এই মেশিনটাই বহাল থাকে, তবে একশো বছর পরও আজকের এই লেখাটিই কেউ পড়বেন এবং সমসাময়িক মনে করে বিস্মিত হবেন। জাপানে, চীনে, দক্ষিণ কোরিয়ায় এভাবেই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমাদের জন্যও তা সম্ভব ও অবশ্যম্ভাবী। এ কোনো আকাশকুসুম আকাঙ্ক্ষা নয়, সামান্য মৌলিক অধিকারটুকু চাওয়া মাত্র।

শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে, চোঙের মুখ বড়ছোট করে, শিক্ষককে হেনস্থা করে ও শিক্ষামন্ত্রীকে ভাইরাল করে তেমন কিছু হবে না। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মকর্তাদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। ৭ লাখ শিক্ষার্থী ফেল করা যে সবার ব্যর্থতা সে দায় স্বীকার করে তা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। সবার জন্য কেবল শিক্ষা নয়, সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবার আগে শিক্ষার এই মেশিনটা বদলানো প্রয়োজন, তখন প্রত্যেক শিক্ষার্থীই পাস করবে, কেননা এটাই স্বাভাবিক।

আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com