Published : 11 Mar 2026, 03:42 PM
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে এখন একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে। টাকা যাচ্ছে কোথায়, আর আসছে কোথা থেকে? এই দুটো প্রশ্নের উত্তর যদি কেউ সৎভাবে দেন, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে হিসাবটা এখন আর মিলছে না।
চার দশকের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো কোনো সরকারকে কর্মকর্তাদের বেতন দিতে, দৈনন্দিন প্রশাসন চালাতে ঋণ করতে হয়েছে (দ্য ডেইলি স্টার)। উন্নয়নের জন্য নয়, নতুন সেতু বা হাসপাতালের জন্য নয়, শুধু রাষ্ট্রের নিত্যকার খরচ চালাতেই ঋণ নিতে হয়েছে। এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এই পরিস্থিতি সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল আশির দশকে। ওই ইতিহাস যখন আবার ফিরে আসে, তখন শুধু অর্থনীতিবিদরা নন, সাধারণ মানুষেরও একটু থামা দরকার।
রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ, অথচ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি গতিতে। এই ব্যবধানটাই সংকটের আসল জায়গা। রাষ্ট্র যা আয় করছে তা দিয়ে যা খরচ হচ্ছে তা কুলাচ্ছে না, বাকিটা আসছে ঋণ থেকে। আর ব্যাংক থেকে সরকার যত বেশি টাকা তুলে নিচ্ছে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ততটাই কম থাকছে। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্নে। মাত্র দেড় বছর আগেও যা ১০ শতাংশের ওপরে ছিল, এখন তা নেমে এসেছে ছয় শতাংশেরও নিচে। এই একটা সংখ্যাই বলে দেয় অর্থনীতির নাড়ি কতটা দুর্বল হয়ে এসেছে।
আর এই দুর্বলতার প্রভাব কেবল কাগজের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে, মানে নতুন শিল্প গড়ার কথা কেউ ভাবছে না। কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে সক্ষমতার অনেক নিচে। কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমেছে। মানুষের হাতে টাকা কম, ফলে বাজারে চাহিদাও কম। ব্যাংক খাতে মোট বকেয়া ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি। এই চাপে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়েছে, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে। এই শৃঙ্খলটা একবার তৈরি হলে ভাঙতে সময় লাগে এবং যত দেরি হয় ক্ষতি তত গভীর হয়।
তাহলে কী করা উচিত? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটা কঠিন, কিন্তু সম্পূর্ণ অজানা নয়। কারণ এই পথ আগেও হেঁটেছে অন্য দেশ। ওই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ এখনো আছে।
শ্রীলঙ্কার কথাই ধরা যাক। ২০২২ সালে দেশটি স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্যের কোঠায় নেমে গিয়েছিল, বাইরের ঋণ পরিশোধ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ওষুধ থেকে জ্বালানি, সব কিছুর সংকট তৈরি হয়েছিল। সরকার উল্টে গিয়েছিল। রাস্তায় মানুষ নেমেছিল। দেশটি মাত্র তিন বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। এক দশকের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো বাজেটে প্রাথমিক উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়েছে। (আইএমএফ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট, এপিএফ কানাডা)
শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রে ছিল একটাই বিষয়, কর সংস্কার। সংকটের গভীরতম মুহূর্তে দেশটির সরকার রাজস্বে সাহসী হাত দিয়েছিল। ভর্তুকি কমিয়েছিল, মূল্য সংযোজন করের হার ও ভিত্তি বাড়িয়েছিল এবং কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তগুলো মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল না, কিন্তু ছিল অপরিহার্য। আইএমএফ বলছে, এই সংস্কারগুলো না হলে শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধার সম্ভব হতো না। ওই অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথাই পরিষ্কার, সংকটের সময়ে সবাইকে খুশি রাখার সিদ্ধান্ত আর দেশের জন্য দরকারি সিদ্ধান্ত এক হয় না। তখন কঠিন পথটাই বেছে নিতে হয়। বেশিরভাগ সময় দুটো একসঙ্গে হয় না। যে সরকার এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার পক্ষেই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
আরেকটু দূরে তাকানো যাক। পূর্ব আফ্রিকার রুয়ান্ডা ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ গণহত্যার পর কার্যত ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসেছিল। দেশটি মাত্র দুই দশকের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আমূল বদলে গেছে। ১৯৯২ সালে দেশটির কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র আট শতাংশের কাছাকাছি। ২০২০ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশের ওপর। আর ২০২৪ সালে দেশটির অর্থনীতি সাত দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। (আইএমএফ স্টাফ কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৩, আইএমএফ নিউজ ডিসেম্বর ২০২৫)
রুয়ান্ডার সাফল্যের রহস্য কোথায়? আইএমএফের গবেষণা বলছে, দেশটি খণ্ডিত বা বিচ্ছিন্ন কর সংস্কারের পথে হাঁটেনি, বরং একটি সমন্বিত ও ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে। করজাল বিস্তার, কর প্রশাসনের ডিজিটাইজেশন, কর ফাঁকি বন্ধে কঠোরতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো কাজগুলো একসঙ্গে করা হয়েছে। রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা যে শিক্ষাটা দেয় তা হলো, রাজস্ব বাড়ানো অসম্ভব নয়, যদি রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকে এবং সংস্কারটা পরিকল্পিত হয়।
এই দুটো দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ বাংলাদেশও এখন একই ধরনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছায়নি, এটাই এখনকার সুযোগ। শ্রীলঙ্কা ওই সুযোগও হারিয়ে ফেলেছিল এবং তারপর সংকটের অতল থেকে উঠে আসতে হয়েছে অনেক বেশি কষ্ট করে। বাংলাদেশ যদি এখনই সংস্কারে হাত দেয়, তাহলে ওই কষ্টের পথে না গিয়েও একই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।
তাহলে কী করতে হবে? প্রশ্নটার উত্তর চারটি জায়গায়।
১. রাজস্ব: আয় না বাড়লে ঘাটতি থাকবেই, ঘাটতি পূরণ হবে ঋণে। করজাল বাড়ানো, ফাঁকি বন্ধ, আমদানি শুল্কনির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের দিকে যাওয়া দরকার। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কম।
২. বেসরকারি বিনিয়োগ: সুদের হার ছাড়াও অবকাঠামো (গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর) সংকট মেটাতে হবে। শ্রীলঙ্কা রপ্তানিমুখী বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বিনিয়োগ বোর্ড সংস্কার করেছে।
৩. ব্যাংক খাত: খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর না হলে, ব্যাংক খাত সুস্থ না হলে অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ ফেরার আশা কম। এই কাজ যত কঠিনই হোক, এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
৪. বৈদেশিক মুদ্রা আয়: রপ্তানি, রেমিট্যান্স, পর্যটন শক্তিশালী করতে হবে। শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
নতুন সরকারের সামনে জুনের প্রথম বাজেটের সুযোগ। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার লোভ সামলে বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পালনের চাপ আছে, কিন্তু দুর্বল ভিত্তির ওপর বড় প্রতিশ্রুতি পালন করলে ভিত্তি আরও নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে। শ্রীলঙ্কা ওই ভুলই করেছিল। জনতুষ্টির রাজনীতি করে ভর্তুকির বোঝা টেনে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল তাদের। সাহসী সিদ্ধান্ত মানে সঠিক সিদ্ধান্ত, জনপ্রিয় নয়।
এখনো ঋণের অবস্থা এমন জায়গায় যায়নি যে আর কিছু করার সুযোগ নেই। তাই এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। দেরি করলে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবে। তখন সংস্কার করার সময় থাকবে না, শুধু সংকট সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হবে। তার আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
অর্থনীতিকে গতিশীল রাখা মানে শুধু টাকার অঙ্ক মেলানো নয়। মানে হলো মানুষের কাজ থাকা, উদ্যোক্তার সাহস থাকা, রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা। শুধু এক জায়গায় হাত দিলে হবে না। রাজস্ব, ব্যাংক, বিনিয়োগ আর রপ্তানি—সব জায়গায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। না হলে পরিবর্তন আসবে না।