১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জুলাইয়ের কালো পতাকা মিছিল ও জনআকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা

কারফিউ আর বুলেটের আতঙ্ক ভেঙে চব্বিশের জুলাইয়ে রাজপথ দখলের ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক বলয়ের নয়। স্বৈরাচার পতনের দুই বছর পর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংকোচন ও পার্বত্য অঞ্চলে চলমান নিপীড়নের চালচিত্র কোন বার্তা দিচ্ছে?

জুলাইয়ের কালো পতাকা মিছিল ও জনআকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা
গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সেই কালো পতাকা মিছিল–এমন সব মুহূর্তের মিলিত রূপই জুলাই অভ্যুত্থান। ফাইল ছবি

অমল ত্রিপুরা অমল ত্রিপুরা

Published : 31 Jul 2026, 06:57 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

বিন্দু বিন্দু জল যেমন মিলিত হয়ে মহাসাগরের জন্ম দেয়, তেমনি বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও ছিল অসংখ্য ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, সংস্কৃতি-কর্মী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, নারী, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষের রক্ত, ত্যাগ, সাহস ও আপসহীন সংগ্রামের সম্মিলিত বিস্ফোরণ। সেই সম্মিলিত শক্তির কাছেই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সুতরাং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক সংগঠন বা কোনো একক রাজনৈতিক বলয়ের সৃষ্টি ছিল না।

২০২৪ সালের ২৮ জুলাই ছিল সেই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন তখন চরমে। কারফিউ জারি, নির্বিচারে গুলি, গণগ্রেপ্তার, শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে যাওয়া এবং আতঙ্কের রাজত্ব—সব মিলিয়ে ঢাকা ছিল অবরুদ্ধ নগরী। সেই সময় দেশের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ ছাত্র-জনতা হত্যার দায়ে সরকারের পদত্যাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া, কারফিউ প্রত্যাহার এবং আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। আমিও ছিলাম সেই মিছিলে।

দিনটি ছিল রোববার। আমরা যখন প্রেসক্লাব থেকে মিছিল শুরু করতে যাই, তখন পুলিশ বাধা দেয়। আমাদের হ্যান্ডমাইক কেড়ে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা। তবে ইতিহাস সাক্ষী দেয়, রাষ্ট্রের লাঠি মানুষের বিবেককে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। সেদিন আমরা দমে যাইনি। পুলিশের হুমকি, মারমুখী অবস্থান উপেক্ষা করে আমরা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে মিছিল শুরু করি। পল্টনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আবারও পুলিশি বাধা ও হামলার মুখোমুখি হই। উত্তেজনাপূর্ণ সেই পরিস্থিতিতেও আমরা কোনো সংঘর্ষে না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে পল্টন মোড়ে গিয়ে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি শেষ করি। কারণ আমরা জানতাম, সেদিন রাজপথে টিকে থাকাই ছিল প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় ভাষা।

আজ সেই দিনগুলো শুধুই স্মৃতি, তবে সেই স্মৃতির প্রতিটি মুহূর্ত এখনো হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

পরবর্তী দিনগুলোতেও, ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমরা গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। শাসকগোষ্ঠির দমন-পীড়নের মুখেও ছাত্র-জনতাকে সাহস জুগিয়েছিলেন, মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের মনোবল জাগিয়ে রেখেছিলেন।

তবে শেখ হাসিনার পতনের পর সংগ্রামের ইতিহাসকে সংকুচিত করার প্রবণতা দেখা দিল। অভ্যুত্থান পরবর্তীতে অনেকের কাছে ক্ষমতা, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আলোচনাই প্রধান হয়ে উঠল। অভ্যুত্থানের দুঃসময়ে আন্দোলন টিকিয়ে রাখা বহু প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির অবদানকে ক্রমশ অস্বীকার করে আড়ালে রাখার চেষ্টা শুরু হয়, যা এখনো লক্ষ্য করছি।

যে সংগ্রামে হাজারো মানুষের পদচিহ্ন রয়েছে, সেই সংগ্রামের ইতিহাস থেকে কাউকে মুছে ফেলার চেষ্টা শুধু অন্যায় নয়, তা ইতিহাসের প্রতিও অবিচার।

গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করা। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি, অচিরেই তা থমকে গেল। মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায়নি। বৈষম্য শেষ হয়নি, নিপীড়ন থেমে যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় দুই বছরে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান, ‘মব’ সংস্কৃতির বিস্তার করে মানুষের ওপর আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। মাজার, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মী, নারী-শিশু, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ইত্যাদি লক্ষ্য করেছি এবং মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সংকুচিত করা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ৬ মাসেও লক্ষ্য করছি। অতীতের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন চলছে, ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই বললে চলে। সেখানে এখনো বাহিনীগুলোর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলমান রয়েছে, দমন-পীড়ন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।

তাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনাকে রক্ষা করতে হলে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, সামগ্রিকভাবে মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তর করা জরুরি।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই কারফিউ জারির পর রাজপথ কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। মানুষের মনে ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা এবং মৃত্যুর আতঙ্ক। চারদিকে ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। প্রতিদিন ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন চলছিল। আন্দোলনের গতি অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই সংকটময় সময়ে, ২৬ জুলাই থেকে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ছাত্র, শ্রমিক, নারী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক, ডাক্তার, লেখক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ কারফিউ ভেঙে সাহসের সঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে তারা প্রতিবাদ মিছিল করেছিলেন। আমার বিশ্বাস, সেই সাহসী কর্মসূচিগুলোই মানুষের ভয় কাটিয়ে নতুন করে রাজপথে ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।

পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের আহ্বানে ২০২৪ সালের ২ অগাস্টের ‘দ্রোহযাত্রা’ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, ছাত্র-জনতা হত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।

প্রেসক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত যে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। আন্দোলন নতুন গতি পায়, রাজপথ মানুষের দখলে ফিরে আসে। অবশেষে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

আজ, গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, ইতিহাস কি কেবল ক্ষমতাবানদের স্মৃতিচারণ করবে, নাকি রাজপথে রক্ত, ঘাম ও অশ্রু ঝরানো মানুষেরও ইতিহাস লেখা হবে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সেই দিনের স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে একটি কথাই বলতে চাই, ইতিহাসকে বিকৃত করা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। যারা রাজপথে ছিলেন, যারা কারফিউ ভেঙেছিলেন, যারা লাঠি, গুলি, গ্রেপ্তার আর মৃত্যুভয় উপেক্ষা করেছিলেন, ইতিহাস তাদেরও মনে রাখবে। কারণ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, সংগঠন বা গোষ্ঠির সম্পত্তি নয়, তা ছিল সমগ্র সংগ্রামী জনতার। বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি, নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, ধর্মীয়, লিঙ্গীয়, জাতিগত সংখ্যালঘু জনসাধারণের সম্মিলিত লড়াই। সেই লড়াইয়ের প্রতিটি পদচিহ্ন, প্রতিটি কণ্ঠস্বর এবং প্রতিটি আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অমল ত্রিপুরা সদস্য ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ই-মেইল: amoltripurakgc@gmail.com