১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আমাদের না-পাওয়া জাকসু, আমাদের পাওয়া জাকসু

প্রার্থিতা বাতিলকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে, তা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্বাচন সুষ্ঠু করার চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে।

আমাদের না-পাওয়া জাকসু, আমাদের পাওয়া জাকসু
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন হতে যাচ্ছে ৩৩ বছর পর। বৃহস্পতিবার এক আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে আড্ডায় জিএস প্রার্থীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

সৌমিত জয়দ্বীপ সৌমিত জয়দ্বীপ

Published : 10 Sep 2025, 07:08 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:16 PM

বাংলাদেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন (ডাকসু, জাকসু ও রাকসু) আয়োজন আমাদের আশান্বিত করছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু, এই সবগুলো নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা ও সংসদ গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত শেষকথা কিছুই বলা যাচ্ছে না। কেননা, সন্দেহ করার নানা কারণ আছে যে, নির্বাচনগুলো বানচালের জন্য একটি মহল বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হলেও ওই নির্বাচনের ফল নিয়ে পরাজিতদের নানা অসন্তোষ ও অভিযোগ তৈরি হয়েছে। তবে, বাস্তবতা হলো, ডাকসুতে তারা ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেলের কাছে ভূমিধস পরাজিত হয়েছেন। 

নির্বাচন সম্পন্ন হলেও, এই নির্বাচন নিয়ে কিছুটা ঘনঘটা ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি। আইনি প্রক্রিয়ায় সেটা মোকাবিলা করা গেছে। কিন্তু, অনলাইনের একটি দুষ্টচক্র তাদের নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘায়েল করার জন্য ‘ডাকসু স্থগিতের নকশাকারী’ তকমা দিয়েছে। তবে, এই কুচক্রীরাই যে নির্বাচন আটকাতে চেয়েছিল, তা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে পরিষ্কার হয়েছে। যদিও, তাদের ওই প্রচারণার ফল নির্বাচন প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। 

.  

একই ঘটনা জাকসুর ক্ষেত্রেও। ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী অমর্ত্য রায়ের প্রার্থিতা ও ভোটাধিকার আচানক অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সেটিও সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবার পর। বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে অর্মত্য রায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু, আবেদন দাখিলের আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যম অপপ্রচার চালায় যে, জাকসু নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট করেছেন অমর্ত্য রায়। এটি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা, তা পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়। 

এসব আচরণ ও বিচরণ ইঙ্গিত দেয় যে, সত্যই একটি অদৃশ্য মহল নির্বাচন চায় না। কিন্তু, তারা নির্দিষ্ট প্যানেলের প্রার্থীদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে চাইছেন। তারা অর্মত্য রায়কে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আওয়ামী লীগ আমলেও অমর্ত্য রায়কে অন্যায্যভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলে, তাকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। আবারও হলো। তখনও আদালত তার পক্ষে রুল দিয়েছিলেন। 

এবারও, গত ৯ সেপ্টেম্বর, হাইকোর্ট তার পক্ষেই রুল দিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের প্রতি স্থগিতাদেশ দিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই বিশ্ববিদ্যালয় আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গিয়ে এই স্থগিতাদেশকে চ্যালেঞ্জ করে যুক্তি দেয় যে, ইতিমধ্যেই ব্যালট পেপার ছাপা হয়ে গেছে। আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবীর এই যুক্তি আমলে নিয়ে অমর্ত্য রায়ের পক্ষে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। যদিও, জাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার সন্ধ্যাবেলায় গণমাধ্যমকে জানান যে, ব্যালট পেপার ছাপা হবে ভোটের দিন সকালে, মানে ১১ সেপ্টেম্বর সকালে। 

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অমর্ত্য রায়কে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়েছে, যা ‘ফ্রড আপন কোর্ট’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও, সময় স্বল্পতার কারণে অমর্ত্য রায়ের আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নেই। এই চাপানউতর বাদ দিলেও, ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও তাদের সহযোগীরা নির্বাচন বানচালের একটা ষড়যন্ত্র করেছিলেন, যার দায় তারা দিতে চেয়েছিলেন ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের ওপর নানারকম গুজব ছড়িয়ে। কিন্তু, নিজেদের সঙ্গে এত বৈরী আচরণের পরও, এই প্যানেলটি নির্বাচনি লড়াই শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার যে ধনুর্ভঙ্গপণ করেছে, তা প্রশংসনীয়। 

সমস্ত মেঘ সরিয়ে দিয়ে ডাকসুর মতো জাকসু নির্বাচনও যথাদিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় খবর। 

.

শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন আদায় করে নেওয়া যেমন বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি, প্রাক্তন হিসেবে আমাদের জন্যও অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে, আজকের তারিখে দাঁড়িয়ে জাকসু-কেন্দ্রিক কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। আমরাও তো হতে পারতাম জাকসু নির্বাচনের গৌরবময় অংশীদার। কিন্তু, তা হতে হতেও হয়নি। ওই অপ্রাপ্তির বেদনা আমাদের রয়ে গেছে। আজকের প্রাপ্তি তাই আমাদের সেদিনের অপ্রাপ্তির পুরোটা লাঘব করতে না পারলেও, অনেকটাই লাঘব করেছে। 

২০২৫ সালের আগে বাংলাদেশে সর্বশেষ কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে ২০১৯ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই সময়ের হিসাবে এটি ছিল সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব শিক্ষার্থী সংসদ মিলিয়ে প্রায় ২৭ বা ২৮ বছর পর হওয়া প্রথম কোনো শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন। কিন্তু, এই গৌরবমাল্য সবার আগে পরার কথা ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের, সেটি ২০১৩ সালে। ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অথচ, এই ব্যবধান কমে যেত, যদি ২০১৩ সালে জাকসু নির্বাচনটি আয়োজন করা হতো। এই মাহেন্দ্রক্ষণে সেই না-পাওয়ার গল্পই আমি বলব। 

৪.

২০১২ সালের মাঝামাঝি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘটা জুবায়ের হত্যাকাণ্ড (৯ জানুয়ারি) ও ওই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা শিক্ষার্থী-জাগরণের রেশ রয়ে গেছে। ওই ধারাবাহিকতায় ১৭ মে পতন হয় কুখ্যাত ভিসি শরীফ এনামুল কবীর যুগের। নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ২০ মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন।

নিয়োগ পেয়েই তিনি উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের বন্দোবস্ত করেন। ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০ জুলাই। তিনজনের মধ্যে দ্বিতীয় হলেও, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য তার ওপর আস্থা রাখেন (বলাবাহুল্য ‘আস্থাটা’ মূলত সরকারের) এবং তিনি নির্বাচিত উপাচার্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

এই নির্বাচনের একটি ফাঁক রয়ে যায়। যে সিনেটররা উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সব ধরনের প্রতিনিধি থাকলেও, ছিল না শুধু পাঁচজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি। এই শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা সিনেটে নির্বাচিত হয়ে আসেন সরাসরি শিক্ষার্থী সংসদ থেকে। কিন্তু, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) তো কার্যকর নেই!

অনির্বাচিত অবস্থায় যোগ দিয়েই অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, জাহাঙ্গীরনগরকে তিনি একটি স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে চান। আমরা তার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলাম, “স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদও থাকতে হয়”। উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন আমরাও চাই, আমরাও স্বাগত জানাই। তবে, আগে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সিনেটে যেতে দিতে হবে। তাহলেই কেবল এ উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন পরিপূর্ণতা পাবে।

অতএব, আমরা জাকসুর দাবিতে আন্দোলনে নামলাম। জাকসুর দাবি সেই ১৯৯২-৯৩ সাল থেকেই চলে আসছিল। কিন্তু, সেসব দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে। কারা কোন স্বার্থে বাংলাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করেছে, তা আমরা আজ সবই জানি৷ কিন্তু, ২০১২ সালে আমাদের দাবির যৌক্তিকতাকে উপেক্ষা করা সহজ ছিল না। পূর্বজদের ধারাবাহিকতায় নতুন করে আমরা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে তাই জাকসুর দাবিতে আন্দোলন শুরু করলাম। সেই আন্দোলনের এক ও অদ্বিতীয় পোস্টারটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১২ সালের ২৭ জুন।

এরপর, ছাত্র ইউনিয়ন একটি লিফলেট প্রকাশ করে ২০১২ সালের ৩ জুলাই। যার শিরোনাম ছিল—‘জাকসু: ডুমুরের ফুল কিংবা অমাবস্যার চাঁদ’।

২০১২ সালে জাকসুর দাবিতে প্রকাশিত পোস্টার ও বিশেষ বুলেটিন।

২০১২ সালে জাকসুর দাবিতে প্রকাশিত পোস্টার ও বিশেষ বুলেটিন।

এই পোস্টার ও লিফলেট ক্যাম্পাসে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। মনে পড়ে, ছাত্র ইউনিয়নের জাকসুর পোস্টারের ওপর বহুদিন কেউ কোনো পোস্টার লাগায়নি। ক্যাম্পাসের যেখানেই যেতাম, দেখতাম, এই পোস্টার জ্বলজ্বল করছে। মনে ভালো হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার!

আমরা বুঝলাম, ক্যাম্পাস জাকসু চায়, জাকসুর জন্য প্রস্তুত এ ক্যাম্পাস। ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে লাশ পড়বে, ওই দায় কে নেবে?’—এসব বহু বছরের প্রশাসনিক গালগল্প আর কেউ শুনতে প্রস্তত ছিল না৷ জুবায়ের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে যা হয়েছে, ছাত্রলীগের যে পরিণতি হয়েছে, এরপর কেউ লাশের রাজনীতি করতে চাইলে, ক্যাম্পাসে টিকতে পারত না—এই ছিল আমাদের সহজ রাজনৈতিক সমীকরণ।

ওই রেশ থাকতে থাকতেই, মধ্য জুলাইয়ে আমরা জাবি ছাত্র ইউনিয়নের মুখপত্র ‘ইস্পাত’-এর ২ টাকা মূল্যের একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করলাম। এই বুলেটিনের সাইজ ছিল খুবই চিত্তাকর্ষক। এ-ফোর সাইজের চার পৃষ্ঠা। প্রচ্ছদপৃষ্ঠায় কোনো সংবাদ নেই। শুধু শিক্ষার্থীদের স্লোগানধর্মী বক্তব্য। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় ও ১৯৭২ সালে প্রণীত জাকসুর গঠনতন্ত্রের প্রাথমিক ধারা-উপধারা। তৃতীয় পৃষ্ঠায় বুলেটিনের মূল লেখা, লেখাটা আমি লিখেছিলাম। বলা ভালো, আমার জীবনের অন্যতম প্রিয় লেখা এটা। চতুর্থ তথা শেষপৃষ্ঠায় সেই পোস্টার ও লিফলেটের ছবি। কেউ আশ্চর্য হতে পারেন শুনলে, এই বুলেটিন আমাদের দুইবার ছাপাতে হয়েছিল। কত সংখ্যা ছাপা হয়েছিল, তা আজ আর মনে নেই৷

ক্যাম্পাসে কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলে, ছাত্র ইউনিয়ন সব সময়ই অন্যদের সাথে যুথবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে সজাগ থাকে। সকল মত ও পথ যেন এক হতে পারে, সেজন্য আমরা আমাদের গড়ে তোলা আন্দোলনের জমিনকে আরও প্রসারিত করতে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলাম। প্ল্যাটফর্মের নাম ‘জাকসুর দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর’। তখন ফেইসবুক একটা নতুন ফেনমেনন। আমরা অনলাইনেও প্রচার চালাতে একটা ফেইসবুক গ্রুপ খুললাম। কিছু আর্কাইভ ওই গ্রুপে আজও আছে।

আন্দোলন চললেও, উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন ঠিকই ঘোষিত সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হলো, শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই। উপাচার্য বললেন, তিনি জাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ (কমিটেড)। আমরা উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইনি। কিছুই না হওয়ার দেশে একজন উপাচার্য অন্তত নির্বাচিত হোক, তাহলে তার খুঁটির জোর থাকবে জাকসু নির্বাচন করার।

২০১৩ সাল চলে এলো। আন্দোলন উত্তুঙ্গ না হলেও, বিভিন্ন দফায় আমরা প্রশাসনকে জাকসু নির্বাচনের জন্য রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি, তাগাদা ও চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখলাম। অবশেষে ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য জাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। তারিখটা ৬ ডিসেম্বর।

এত বড় একটি আয়োজনের জন্য নিঃসন্দেহে সময় অত্যন্ত কম। আমরা সংশয়ী হই, আবার আশাও ধরে রাখি। অবশেষে, অন্তত একটা দিনক্ষণ তো পাওয়া গেল!

তবে, সংশয়ের আরও কিছু কারণ যোগ হচ্ছিল। ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করা হয়নি। ছাত্রদল ক্যাম্পাস ছাড়া। অন্যদিকে, খোদ ছাত্রলীগের মধ্যে জাকসুর পক্ষে-বিপক্ষে দুই গ্রুপ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে যোগ হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের তৈরি করা অদ্ভুত এক নিয়ম—এমফিল-পিএইচডির গবেষকরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এই নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়, শিক্ষার্থীরা এই নিয়ম মানতে নারাজ।

এতকিছুর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যে ব্যাপারটা ঘরে, সেটি হলো শিক্ষক সমিতির জাকসু নির্বাচন নিয়ে অনীহা। তারা উপাচার্যের কাছে সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনসহ আবারও উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দাবি করেন এই অজুহাতে যে, আগেরবারের প্যানেল নির্বাচন তাদের দৃষ্টিতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। শিক্ষক সমিতি পেছন থেকে জ্বালানি সরবরাহ করে শিক্ষকদের আন্দোলনে, যে আন্দোলনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা মিলেমিশে একাকার হয়ে যান ‘শিক্ষক ঐক্য ফোরাম’ নামক ব্যানারে৷ শিক্ষক সমিতিতে তখন রাজত্ব চলছে পতিত উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীরপন্থিদের। আগেরবার উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে এই শরীফ এনামুল কবীরকেই সিনেটররা ভোট দিয়ে প্রথম স্থান এনে দেন, অথচ কিছুদিন আগেই তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সিনেটেও শরীফপন্থিদেরই আধিপত্য চলছিল। আর মাঠে তো ‘শিক্ষক ঐক্য ফোরাম’ ছিলই।

এই শিক্ষকরা একটা পর্যায়ে উপাচার্যকে 'অবাঞ্ছিত' ঘোষণা করে তার পদত্যাগ দাবি করেন৷ এ সময় উপাচার্য নিজেও তার কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসকে অসন্তুষ্ট করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। ফলে, পরিস্থিতি দিনকে দিন জাকসু নির্বাচনের জন্য প্রতিকূল হয়ে ওঠে। মূলত, শিক্ষকদের ওই অংশটি জাকসু নির্বাচন বানচালের জন্যই একাট্টা হয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।

আমরা জাকসু নির্বাচনের আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখতে পাচ্ছিলাম। তারিখ ঘোষণার পরপরই অবশ্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরুও করেছিলাম। তফশিলও ঘোষণা করা হয়েছিল। মনোনয়ন ফরমও বিক্রি শুরু হয়েছিল। কিন্তু, ক্যাম্পাসের সার্বিক অবস্থা প্রতিকূল থাকায় প্রশাসন নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি পুনঃনির্ধারণ করে। 

আমরা যেকোনো মূল্যে ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বরই নির্বাচন আয়োজন করতে হবে মর্মে দাবি জানাতে থাকি আমাদের প্ল্যাটফর্ম ‘জাকসুর দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর’ থেকে। কিন্তু, দীর্ঘ এক বছরের শিক্ষক আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি পদত্যাগের ঘোষণা দিলে সেবার জাকসু নির্বাচনের সকল সম্ভাবনা শুধু শেষই হয়নি, এর পরে জাকসু নির্বাচনের আর কোনো সম্ভাবনাই জেগে ওঠেনি। 

ঘোষিত ৬ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখেই জাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে অনলাইনে এই পোস্টারটি প্রকাশ করে ‘জাকসুর দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর’ প্ল্যাটফর্ম। প্রকাশের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৩।

ঘোষিত ৬ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখেই জাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে অনলাইনে এই পোস্টারটি প্রকাশ করে ‘জাকসুর দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর’ প্ল্যাটফর্ম। প্রকাশের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৩।

উল্লেখ্য যে, যে সময় আমরা জাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলাম, ওই সময় (২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে হয়তো ছাত্র ইউনিয়ন সমর্থিত প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আমার ছিল। কিন্তু, সেই জাকসু তো আর কখনই হয়নি! 

এভাবে আমাদের প্রজন্মের কাছে না-পাওয়া জাকসুর স্বপ্ন ডুমুরের ফুল কিংবা অমাবস্যার চাঁদের মতো অধরাই থেকে যায়।

৫. 

আমরা যা পেতে পেতেও পাইনি, সেটা গণ-অভ্যুত্থানের এই প্রজন্ম পেয়েছেন। তারা জাকসু নির্বাচন আদায় করে নিয়েছেন। তাদের অভিনন্দন। আমি তাদের দ্বিগুণ অভিনন্দন জানাই এজন্য যে, তারা শুধু নির্বাচনই আদায় করে নেননি, তারা জাকসুর গঠনতন্ত্রও পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছেন প্রশাসনকে। তারা ‘ছাত্র সংসদ’-এর নাম পরিবর্তন করিয়ে ‘শিক্ষার্থী সংসদ’ করিয়েছেন। দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি পদ সংরক্ষিত করিয়েছেন: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী ও পুরুষ), সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী ও পুরুষ), সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (নারী ও পুরুষ) এবং ৬টি সদস্য পদের মধ্যে ৩টি পদ। 

এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্যতম বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে প্রার্থীতা হারানো অমর্ত্য রায়ের ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থী ও সমর্থনকারীরা। এই প্যানেল এত বৈচিত্র্যময় হয়েছে যে, এখানে ২৫ জনের মধ্যে ১১ জন নারী প্রার্থীসহ আদিবাসী প্রার্থী রয়েছেন মোট ৭ জন। অমর্ত্য রায়ের ওপর আসা খড়গের কারণে এই প্যানেলের ওপর এখন সবারই নজর থাকবে বেশি। কিন্তু, অন্তর্ভুক্তির যে দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন, তাতে তারা ভোটের আগেই মানুষের হৃদয় জয় করে ফেলেছেন বলে আমার বিশ্বাস। তবে, জাকসুর গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের এই মহাযজ্ঞের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অংশীদারেরই বাহবা প্রাপ্য এবং সেটি তারা বিলকুল পাবেন। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসু নির্বাচনের স্বাদ না-পাওয়া একটা লম্বা সময়ের প্রজন্মের (বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৫৩টি শিক্ষাবর্ষের মধ্যে ২৬টি ব্যাচই নির্বাচন পায়নি) তরফ থেকে এই প্রজন্মের প্রতিও বাহবা রইল। আমাদের অপ্রাপ্তি তাদের প্রাপ্তিতে আজ হাফ ছেড়ে বাঁচল! 

এখন চাওয়া একটাই, নির্বাচনটা যেন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়। সেটি নির্ভর করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছার ওপরে। ডাকসু নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হলো এবং জাকসুতে প্রার্থীতা বাতিলকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই যা হয়েছে, তা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে। আমরা বাংলাদেশের নির্বাচন-সংস্কৃতিতে পরিবর্তন দেখতে চাই, আমরা আর কোনো আওয়ামী মডেলের নির্বাচন দেখতে চাইনি এদেশে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এখন ওই গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে। জাকসু কি সেই গুরুদায়িত্ব পালনে সফল হবে?