Published : 09 Nov 2025, 12:29 AM
আবারও পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হলো বাংলাদেশে। অভিযুক্ত এবার খোদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড! ফিক্সিংয়ের যে দাগ বাংলাদেশ ক্রিকেটের গায়ে বিভিন্ন সময় লেগেছে, তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এই অভিযোগ। বলা যেতে পারে, জাতীয় পর্যায়ে ঘটা অন্যতম কলঙ্কজনক অভিযোগে অভিযুক্ত হলো বাংলাদেশের ক্রিকেট।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম যৌন নিপীড়নের ভয়ানক অভিযোগ এনেছেন। সাহস সঞ্চার করে অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি প্রকাশ্যে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাতে ফুটে উঠেছে হাহাকার ও সাহস। তার বেদনা ও হাহাকারের প্রতি সমবেদনা৷ তার সাহসের প্রতি টুপিখোলা স্যালুট। জাহানারার মতো একজন জাতীয় তারকার এই সাহস নিশ্চয়ই অগণিত ‘মুখ খুলতে না পারা’ নারীকে সাহসী করে তুলবে।
২.
জাহানারা আলমের এই সাক্ষাৎকারের জন্য স্পোর্টস কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ক্রীড়া সাংবাদিক রিয়াসাদ আজিমকে প্রতিষ্ঠিত মেইন স্ট্রিম মিডিয়া হাউজগুলোর সাংবাদিকদের অনেকেই ধন্যবাদ দিচ্ছেন৷ এখন তারা জাহানারা আলমের অভিযোগ নিয়ে সংবাদও করছেন। কিন্তু, সত্য এই যে, তারা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও, এর আগের বিচ্ছিন্ন কিছু ‘অসদাচরণ’ ছাড়া জাহানারা আলমদের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতাগুলো ‘ব্রেক’ করতে পারেননি। ভুক্তভোগীর নাম উহ্য রেখে যথাযথ আইনি নির্দেশনা অনুসরণ করে তারাও যৌন নিপীড়নের সংবাদ সামনে আনতে পারতেন।
পুরুষতন্ত্রের অন্দরে বসে পুরুষতন্ত্রের দরজা ভেঙে ফেলার অনেক ঝক্কি আছে। কোনো রকমে একটা বেঁচে থাকার চাকুরি নিয়ে টিকে থাকেন সাংবাদিকরা—সদ্যপ্রয়াত সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের জীবনের শেষ লেখাটির কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। ফলে, এরকম একটা প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্ত ভেঙে ফেলাও সহজ কথা নয়। তবে, সেটা করতে পারলে ভয়ার্ত এক ট্রমা থেকে হয়তো মুক্ত হতে পারতেন জাহানারা আলমরা। আসলে প্রতিষ্ঠানে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বাইরে যাওয়ার চর্চা হয় না বলেই, জাহানারা আলমকে ক্যামেরার সামনে বসাতে পেরেছেন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকুরি না করা রিয়াসাদ আজিম।
রিয়াসাদ আজিমের ধন্যবাদ তাই প্রাপ্য, তবে ততোধিক প্রেরণা ও সম্মান প্রাপ্য জাহানারা আলমের। সেলিব্রেটিদের জীবন সহজ নয়। কঠিনই। জাহানারারও তা-ই। দেশের একজন জনপ্রিয় নাগরিক হিসেবে এই আবদ্ধ কারাগার ভেঙে দিয়ে তিনি যে কী সাহস সঞ্চার করলেন বহু নারীর জন্য তা হয়তো এখন বোঝা যাবে না। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে তার এই সাহসকিতাকে একাডেমিয়ায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করা হবে।
এই সনাতন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভাঙতে হলে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মানসিকতার (এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট টেম্পারমেন্ট) চর্চাটা খুব জরুরি। জাহানারা যা সাহস ও আবেগের সমন্বয়ে করতে পেরেছেন, সেটা বুকিশ বা কেতাবি নয়। বুকিশ চর্চা থাকলে পারতেন না। নারী বা নানামাত্রিক নিম্নবর্গদের সবকিছু 'মেনে নেওয়ার' তালিম দেওয়ারই অপর নাম বুকিশ চর্চা। জাহানারা এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট টেম্পারমেন্টের শক্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ভাঙার সাহস করেছেন বলেই কথাগুলো তুলতে পেরেছেন।
ফলে, মিডিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকেও প্রশ্ন করা জরুরি। কেন জরুরি, তার একটি উদাহরণ থাকল এখানে।
৩.
এবারের নারী বিশ্বকাপ অতীতের যে কোনো বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি বৈশ্বিক মনোযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। অসাধারণ টুর্নামেন্ট হয়েছে৷ নারীদের পেশাদার মানসিকতার প্রশংসা করলেও কম বলা হবে৷
টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্বাগতিক ভারত। এই জয়কে ১৯৮৩ সালে ভারতের পুরুষ দলের বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে তুলনা করছে ভারতীয় মিডিয়া৷ দুটিরই একই মিল—প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছে এশিয়ার কোনো দেশ। তিরাশির সেই বিশ্বকাপ শুধু ভারত নয়, উপমহাদেশেরই ক্রিকেটীয় মানচিত্র বদলে দিয়েছিল৷ ইতিমধ্যেই তখন টেস্ট খেলা পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা আরও এগিয়ে গেল। বাংলাদেশও নতুন উদ্যমে শুরু করল এক পা, দুই পা করে।
শ্বেতাঙ্গ সাহেবের তৈরি করা নিয়মের এই খেলায় প্রাক্তন কলোনিগুলো যে দাপট দেখাতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রথম প্রমাণ ছিল ক্যারিবিয়ানরা। কিন্তু, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বিত্তশালী উপনিবেশ ভারতবর্ষ (সব দেশ মিলিয়ে) সমস্ত বঞ্চনার জবাব দেওয়ার জন্য জন্ম দিল ১৯৮৩ সালের, আজকের ভারত হলো তার প্রতিনিধি।
এরপর, ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ আসর সাহেবের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে যখন প্রথমবারের মতো দারিদ্র্যপীড়িত গরিবের কুটিরে আয়োজিত হলো, তখন বদলে গেল বিশ্ব ক্রিকেট ও তার অর্থনীতি। ক্রিকেটে একাদিক্রমে রাজত্ব শুরু করল ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা। একটা খেলা হয়ে উঠল এ অঞ্চলের জীবন-মরণের ‘সমস্যা’। ধর্মাতীত আবেগ। সেই আবেগে গা ভাসল বাংলাদেশেরও।
১৯৮৩ থেকে ২০২৫—এই ৪২ বছরে দুনিয়ার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক বদলে গেছে৷ ফলে, অপার শক্তিশালী সব দলের বিরুদ্ধে জিতে ভারতীয় মেয়েদের প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে এই বিশ্বকাপ জয় এই পুরো অঞ্চলের মেয়েদের ওপর তিরাশির মতো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রতিবেশী দেশগুলোর বর্তমান ও আগামীর রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরে। তখন সম্পর্কগুলো আজকের মতো ছিল না৷ একের প্রতি অন্যের নিষেধাজ্ঞা ছিল না৷ পেশাদার সফর বিনিময় ছিল। ছিল হৃদ্যতা। ছিল রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির উর্ধ্বে উঠতে পারার সক্ষমতা৷
এখন এসব বদলে গেছে। কোন্দল আর যুদ্ধংদেহী মানসিকতায় ন্যূনতম পেশাদার সৌজন্যবোধটুকুও আজ অস্তগামী। যদিও, সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের জেমিমা রড্রিগেজের অসামান্য ম্যাচজয়ী ইনিংসের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের মারুফা আক্তারের মন্তব্য ও সেটার প্রত্যুত্তরে জেমিমার মন্তব্য দেখে বোঝা যায়, খেলোয়াড়রা দেশ-ধর্ম-বর্ণ-রাজনীতির উর্ধ্বে গিয়ে নিজেরা নিজেদের কাছ থেকে পেশাদার অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করছেন৷ বলাবাহুল্য, জেমিমা ও মারুফার সেই উত্তর-প্রত্যুত্তরের একটা ফটোকার্ড ভাইরাল হয়েছে৷
তবে, বাংলাদেশি মিডিয়ার নারী ক্রিকেটের প্রতি আচরণ দেখে আপনাকে আঁচ করতে হবে ভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণী। বাংলাদেশের একটি পত্রিকাও পাওয়া যাবে না, যারা পুরুষদের ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের রিপোর্ট প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপায় না। বস্তুত, পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই রমরমা সাজে নামে পত্রিকা তথা মিডিয়াগুলো৷ শুধু বিশ্বকাপ কেন, ক্রিকেটের বহুজাতিক টুর্নামেন্ট হলেই কাভারেজের অন্ত থাকে না। অথচ, এত অসাধারণ একটা নারী বিশ্বকাপ হওয়ার পরও, মিডিয়ার ব্রাহ্মণ্যবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক নীতিবোধ মেয়েদের প্রথম পৃষ্ঠায় জায়গা দিতে পারেনি! এই হলো বাস্তবতা!
এই সনাতনী চিন্তাপদ্ধতির বাস্তবতার কারণে হয়তো মিডিয়া ধরতেই পারেনি, খেলাধুলায় মেয়েদের গৌরবময় অংশগ্রহণের বিপরীতে একটা নতুন স্তম্ভ তাকে নির্মাণ করতে হবে। সেটা হলো, মেয়েদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনগুলোকে লাগাতার প্রশ্নের মুখে রাখা এবং সম্ভব হলে, নারী ক্রীড়াঙ্গনের জন্য নারীদের ক্রীড়া সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ করা।
এর আগে ১৮ জন নারী ফুটবলারও কোচের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সেই অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই উল্টো ব্যবস্থা নিয়ে কোচকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করেছিল। এসব মনে রাখা দরকার আমাদের। বিসিবি-বাফুফে এবং বাকিসব ফেডারেশন—সবাই কি নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে?
দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা জাতীয় নারী তারকাদের কর্মপরিবেশের সুরক্ষা-বিধান নিয়েই তো সিরিয়াস ইনভেস্টিগেশন হওয়া উচিত। হওয়া উচিত ইনভেস্টিগেটিং জার্নালিজমও। এটা মিডিয়ার জন্য এক অনিবার্য ‘ওয়েক আপ কল’, তাকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। মিডিয়া সজাগ থাকলে, জাহানারার এই ঘটনা আরও আগে জানা যেত, হয়তো আরও অনেক নারী ক্রীড়াবিদই পুরুষতান্ত্রিক দানবদের কবল থেকে রক্ষা পেতেন।
৪.
এবার যাওয়া যাক চলমান ক্রিকেটীয় ইস্যুর আরও গভীরে। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কিন্তু বেশ ভালো খেলেছে। একটু এদিক-ওদিক হলে বাংলাদেশ একটি নয়, অন্তত আরও তিনটি ম্যাচ জিততে পারত। স্বল্পবয়সী পেসার মারুফা তো সুইংয়ের কারণে হৃদয় জিতে নিয়েছেন সবার৷ মনে হচ্ছিল, জাহানারা আলমের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু, খেলার খবর সচেতনভাবে অনুসরণ করেন, এমন মানুষজনের কাছে নিশ্চয়ই একটা ব্যাপারে খটকা লাগার কথা। আর তা হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা পেসার জাহানারা আলমের অনুপস্থিতি। জাহানারা আলম কোথায়? জাহানারা আলম বিশ্বকাপ দলে নেই কেন?
দুই সাবেক অধিনায়ক সালমা খাতুন ও জাহানারা আলম দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। সালমা অবসরে গেছেন। কিন্তু, জাহানারা আলমের বয়স মোটে ৩২। তিনি ছিলেন না কেন? পেপার-পত্রিকা বা অনলাইনে তার বিশ্বকাপ দলে না-থাকা নিয়ে তেমন মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো সংবাদ পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। সত্যি কথা বলতে, টুর্নামেন্ট চলাকালে এ বিষয়ে আর অতটা মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

গত ৪ নভেম্বর জাহানারা আলম সংবাদপত্রে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখান থেকেই জানা গেল তিনি এখন দেশেই নেই! সেই সাক্ষাৎকারে জাহানারা কিছু অভিযোগ করেছেন, দলের ভেতরের খবর প্রকাশ্যে এনেছেন, আর নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে টিজিংয়ের অভিযোগ এনেছেন। তবে, তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ৪ নভেম্বরই বিসিবি একটি 'নাকচ বিবৃতি' দিয়েছে। বিসিবির বরাতে দৈনিক সমকাল লিখেছে: “বোর্ড মনে করছে, যে সময়ে, যেভাবে এসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং অসৎ মানসিকতার। এর উদ্দেশ্য গর্বের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া দলের সাহস ও আত্মবিশ্বাস গুড়িয়ে দেওয়া। জাতীয় দলের সঙ্গে যার কোন সম্পৃক্ততা নেই, দলের পরিকল্পনায় যিনি নেই, জনসম্মুখে তার এমন বিভ্রান্ত বিবৃতি খুবই হতাশার। বোর্ড স্পষ্ট করছে যে, নারী দলের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে। বোর্ড কোনো দাবির পক্ষে প্রমাণ পায়নি। যে কারণে দৃঢ়ভাবে দল, দলের খেলোয়াড় ও স্টাফদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।”
একই কথা ক্রিকেটের জনপ্রিয় পোর্টাল ক্রিকইনফোও লিখেছে: "The Board believes that the timing and nature of these comments are deliberate, ill-intentioned and seemingly aimed at undermining the spirit and confidence of a team that continues to represent the country with pride. It is deeply disappointing that an individual who currently has no involvement or relevance in the plans of Bangladesh cricket has chosen to make such misleading statements in public."
বিসিবির অবস্থানটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তারা অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দিয়েছে। অথচ, টিজিংয়ের অভিযোগও ভয়ানক ব্যাপার। তারা ভুক্তভোগী জাহানারাকে এক অর্থে ‘আউটসাইডার’ (বহিরাগত) সাব্যস্ত করে তার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।
অথচ, বিসিবির এই অবস্থানই ভোজভাজির মতো বদলে গেল, যখন গত ৬ নভেম্বর রাতে রিয়াসাদ আজিমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক হয়ে উঠলেন জাহানারা আলম এবং কয়েকজন পুরুষের নাম ধরে এবার আরও মারাত্মক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনলেন। সেই ৬ নভেম্বর গভীর রাতেই বিসিবি উদ্ভূত ঘটনায় তাদের দ্বিতীয় বিবৃতি নিয়ে হাজির হলো বিসিবি। এবার তারা বলেছে, অভিযোগ গুরুতর, তদন্ত করা হবে এবং ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কী হতে পারে!
৫.
বিসিবির দ্বিচারিতা ও ঘটনা-পরম্পরা আমাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, জাহানারা এক ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ‘বৈমাত্রেয়’ খেলোয়াড় হয়ে পড়েছিলেন অনেক আগেই। কারণটিও ভয়ঙ্কর এবং অবশ্যই ক্রিকেটীয় নয়—তিনি পুরুষীয় আকাঙ্ক্ষায় সাড়া দেননি! তাকে যেভাবে ‘বহিরাগত’ সাব্যস্ত করা হয়েছে বিসিবির প্রথম বিবৃতিতে, তা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, জাহানারাকে পরিকল্পিতভাবেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের রাডারের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে তিন বছর আগে। ২০২২ সালে কমনওয়েলথ গেমস বাছাইপর্বের স্কোয়াড থেকে জাহানারা বাদ পড়েন। এ বিষয়ে ক্রিকেট বিষয়ক আরেক জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ক্রিকবাজের একটি সংবাদ বলছে: “জানা গেছে, জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে অসদাচারণ সংক্রান্ত শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বাংলাদেশ নারী দলের প্রাক্তন অধিনায়ককে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”
সে সময় বিসিবির নারী দলের নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, “এই টুর্নামেন্টের জন্য আমাদের দলটি বেশ ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে এবং কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড সামনে রেখে খেলোয়াড়দের নির্বাচন করা হয়েছে। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য এই টুর্নামেন্টটি নবাগতদের সুযোগ দেওয়ার একটি ভালো মঞ্চ।”
ভাবতে অবাক লাগছে, মাশরাফি-পূর্ব যুগে মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু বাংলাদেশ দলের অন্যতম প্রধান পেসার হিসেবে যথেষ্ট নাম কামালেও, ক্রিকেটীয় বুদ্ধি-বিচারে যথেষ্ট ঘাটতি আছে তার!
২০২২ সালে জাহানারার বয়স ছিল ২৯ বছর। এই বয়সে খেলোয়াড়রা সাধারণত তাদের ক্যারিয়ারে ফর্মের শীর্ষে থাকেন। আর নির্বাচক কি না ত্রিশ না-হওয়া অভিজ্ঞ একজনকে বাদ দেওয়ার পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছেন, আমাদের ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ করতে হবে। হাস্যকর কথা!
এরপরে জাহানারা জাতীয় দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। মাঝে, ২০২৩ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ছিলেন। কিন্তু, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পরে তিনি আর জাতীয় দলে নেই। মানে, ৩১ বছর বয়সেই ক্যারিয়ার শেষ!
জাহানারা এখন থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। দুই-দুই চার মিলিয়ে তার প্রকাশ্যে আসার ব্যাখ্যা অনেকটা এমন হতে পারে: (ক) বিদেশে থাকেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আছে (খ) বিশ্বকাপ শেষ, ফলে বিতর্ক হলেও সামষ্টিক ক্ষতি কম হবে।
ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক নিরাপত্তার এই চিন্তা যদি জাহানারা এভাবে করে থাকেন, তাহলে তাকে আবারও কৃতজ্ঞতা জানাই। সমবেদনাও জানাই, কেননা দেশে থেকে তিনি হয়তো আর নিরাপদবোধ করছিলেন না! জাহানারার মতো এমন ‘ব্রেইন ড্রেইন’ হরহামেশাই হয়, আমরা টের পাই না৷ আর রিভার্স ব্রেইন ড্রেইনের সেই স্বপ্নের কথা তো আর উচ্চারণ করারই প্রয়োজন নেই।
৬.
ভিডিও সাক্ষাৎকারে জাহানারা স্পষ্টতই বলেছেন যে, ২০২১ সালে তার সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা তিনি বিসিবির বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জানানোর পর প্রতিকার না পেয়ে দেড় বছর পর বিসিবির প্রধান নির্বাহী বরাবর একটি ‘অবজারভেশন লেটার’ (পর্যবেক্ষণপত্র) দিয়েছিলেন এবং তিনি খুব সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন ‘অভিযোগপত্র’ দেননি। তার মানে বিষয়গুলো নিয়ে জাহানারা অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। অভিযোগপত্র না হলেও, এই পর্যবেক্ষণপত্র পাওয়ার পরই তো বিসিবির নড়েচড়ে বসা উচিত ছিল। অথচ, বিসিবি কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। বিসিবির ভয়াবহ গাফিলতি আদতেই ক্ষমার অযোগ্য।
জাহানারা আলমের দাবির সপক্ষে আরেক সাবেক অধিনায়ক রুমানা আহমেদ যা বলেছেন, এখানে তা উদ্ধৃত করা করা দরকার। রুমানা একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “কোনটা গুড টাচ কোনটা ব্যাড টাচ, এটুকু বোঝার মতো ক্ষমতা মেয়েদের অবশ্যই আছে।” সঙ্গে তিনি এ কথাও নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২২ সালের জিম্বাবুয়ে সফরে মঞ্জুর সঙ্গে যে বড় বিরোধ হয় সেটির পরিপ্রেক্ষিতে জাহানারা বিসিবির প্রধান নির্বাহীর কাছে ৬ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণপত্র দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই পত্র তার জন্য হিতে বিপরীত হয়ে ওঠে। জাহানারার পত্রটি আমলে না নিয়ে উল্টো তাকে নানা ইস্যুতে বিপাকে ফেলা হয়৷
বিসিবি স্পষ্টতই বাংলাদেশের লিগাল ফের্মওয়ার্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। বিসিবি ২০০৯ সালের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত নীতিমালা’র নির্দেশনাই মানেনি তখন। অভিযুক্তদের তারা বরখাস্ত করেনি, কোনো তদন্তও করেনি, কমিটিও করেনি। বিসিবির নিজেরই তো দায়মুক্তির সুযোগ নেই, তাহলে তারা আবার অভিযুক্তদের প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে দায়মুক্তি দেয় কীভাবে!
জাহানারা আলম যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, হাইকোর্ট প্রদত্ত নীতিমালা অনুযায়ী তারা তো স্বীয় পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেনই, বিসিবির প্রধান নির্বাহীও সেই দোষে দুষ্টু হয়েছেন। ফলে, তাকেও সাময়িক বহিষ্কারের বিকল্প নেই। এর সবই হাইকোর্টের নীতিমালা মেনেই বিসিবিকে করতে হবে।
স্বাভাবিক প্রশ্ন আসা সমীচীন যে, বিসিবি যে তদন্ত কমিটি করেছে, তা কি হাইকোর্টের নীতিমালা মেনে করেছে? হাইকোর্টের যে নীতিমালা আছে, তার নির্দেশনা মেনে কি বিসিবি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সকল পূর্বশর্ত পূরণ করেছে? বিবৃতিতে এগুলোর কোনো কিছুই পরিষ্কার করে বলেনি বিসিবি।
বস্তুত, যে প্রতিষ্ঠান তিন বছর আগে অভিযোগ পেয়েও সেটিকে ‘গুরুতর’ মনে করে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, মাত্র একদিন আগেও গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে ভুক্তভোগী জাহানারাকে ভর্ৎসনা করেছে, সেই চরম অপেশাদার প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত করলেই যে তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবির তদন্তের ওপর ভরসা রাখার বিন্দুমাত্র আস্থা তারা নিজেরাই দেখাতে পারেনি। বরং তাদের ক্ষমা করে দিলে একটা মস্তবড় ভুল হবে। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান ঘটনার তীব্রতা অনুভব করতে না পেরে উল্টো নিজেরাই যৌন নিপীড়নের দোসর হয়ে গেছে, এটা দেখা আমাদের জন্য জাতিগত এক লজ্জা!
এই ঘটনার তীব্রতা ও প্রভাব এত বেশি যে, এর অবশ্যই বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোরও উদ্যোগী হওয়া অনিবার্য। কেননা, এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, ঘটনাটি যৌন নিপীড়নের এবং ঘটেছে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অন্দরমহলে। ফলে, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ছাড়া এই ঘটনার সত্যাসত্য যাচাইয়ের অন্য কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বন্দোবস্ত থাকতে পারে না।
৭.
আশঙ্কা করা যেতে পারে, জাহানারার এই অভিযোগ রাজনীতির খেলাও হয়ে উঠতে পারে। জাহানারা যে সময়ে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, তখন বোর্ড প্রেসিডেন্ট ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন। বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দীন চৌধুরী সুজন নিশ্চয়ই তার কাছে আসা অভিযোগ বোর্ড প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন৷ ফলে, মহাপরাক্রমশালী তৎকালীন বোর্ড প্রেসিডেন্টের এসব না জানার কোনো কারণই নেই। ঘটনা যে ২০২৫ সালে এসে বিস্ফোরণ ঘটছে, সেই দায় তাহলে তৎকালীন বোর্ড প্রেসিডেন্ট ও তার পরিষদের ওপরও বর্তায়।
বর্তমান ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেছেন, ব্যবস্থা নেবেন, ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করবেন। এই আন্তরিকতা প্রশংসনীয়। তবে, বিসিবি নিয়ে গত ১৪ মাসে যে রাজনীতি হয়েছে এবং তার আগেও হয়েছে, সেটি যেন এই ভয়ানক ঘটনাকে প্রভাবিত না করে এবং জাহানারা আলম যেন আপনাদের রাজনীতির ঘুঁটি না হন, সেই প্রত্যাশা রইল। ন্যায়বিচার পান জাহানারা, তাতে মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গনে আসার সাহস বাড়বে।
নইলে, এই ঘটনা বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইতিমধ্যেই যে ক্ষতি করে ফেলেছে, তা মেয়েদের ক্রীড়াক্ষেত্রে আসতে আরও পিছিয়ে দেবে। বিসিবি একটা ব্রহ্মাস্ত্র উঠিয়ে দিয়েছে রক্ষণশীলদের হাতে। কিন্তু, এর বিহিত হওয়া জরুরি। নইলে, এই ঘটনা বিশ্ব সংস্থার নিয়ম-কানুনে ধরা পড়ে গেলে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খোদ খেলাটারই ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। আইসিসির নিয়মে ফিক্সিংয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি 'ক্রিকেট থেকে আজীবন বহিষ্কার'। যৌন নিপীড়নের শাস্তি নিশ্চয়ই এর চেয়ে কম হওয়ার সুযোগ নেই। নাকি আছে?