মানুষের প্রতি যিনি কখনও বিশ্বাস হারাননি
মুজিব হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ প্রকাশ করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা স্বাধীনতা-বিরোধীরা। তাদের শক্ত ঘাঁটি লন্ডনে হত্যাকাণ্ডের পরের দিনই বাংলাদেশের হাই কমিশনারসহ স্বাধীনতাপন্থীদের দূতাবাস থেকে বের করে দেয় তারা।
বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে একটি মহল জোরেশোরে বলে থাকেন যে, তাঁর সাড়ে তিন বছরের ‘অপ-শাসন, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্যতা-অক্ষমতা’ই পনেরই অগাস্টকে অনিবার্য করে তুলেছিল। সতিই কী তাই? যারা আমাদের দেশের রাজনীতির ইতিহাস নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন, তারা সবাই মানবেন যে, এই কথাগুলো মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে জীবনীশক্তি যোগায়। তারাই ইতিহাস ও বাস্তবতাকে বিচ্ছিন্ন করে এমন মন্তব্য করেন।
যারা এমন কথা বলেন, তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সেই সময়ের বাস্তব পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়েই তা বলেন। তখন ভারত থেকে ফিরে আসা সোয়া এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন, দেশের অভ্যন্তরে ৩ কোটি ছিন্নমূল মানুষের জন্য খাদ্য সংস্থান, ৩ মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্যদের ফেরত পাঠানা ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে নিহত ৩০ লাখ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও ২ লাখ নির্যাতিত নারীর দায়িত্ব গ্রহণ, চিকিৎসার জন্য পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেশ প্রেরণ, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন, শিক্ষকদের, সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন, ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগসহ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা পুননির্মাণ, প্রতি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের স্থায়ী চাকরির মর্যাদা দান, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীসহ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে জাতীয় মর্যাদায় পুনর্গঠন এবং কুমিল্লায় দেশের প্রথম সামরিক একাডেমি স্থাপন, পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও বেসামরিক প্রশাসনের অবকাঠামো গড়ে তোলা, পাকিস্তানে আটক প্রায় ৪ লাখ বাঙালিকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসিত করা, ৭ লাখ পাকিস্তানিকে ফেরত পাঠানো, বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘে বাংলায় প্রথম ভাষণ দান, জাতিসংঘের সদস্যপদ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনসহ ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ, অর্থনীতি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কার্যক্রম যখন সুচারুভাবে সম্পন্ন প্রায়, কারখানায় ও ক্ষেতখামারে উৎপাদন বৃদ্ধি ও মুদ্রানীতির সংস্কারের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন দ্রুত জনগণের ক্রয়ক্ষমতায় চলে এসেছে, ঠিক তখনি দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে।
প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থতা, অযোগ্যতা বা অপশাসনের জন্য নয়, বরং দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অঙ্গীকার এবং সাহস-সফলতার জন্যই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরও নির্ভার-নির্ভয় হতে পারেনি খুনিরা কিংবা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। তাদের ভয় ছিল, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যারা চরম সঙ্কটের মাঝেও মুক্তিযুদ্ধ সফল করতে পেরেছিলেন, তাঁরা অবশ্যই বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরেও বাংলাদেশটাকে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথে’ই নিয়ে যাবেন। সুতরাং একই গ্রুপের ঘাতকের হাতেই কারাবন্দি অবস্থায় প্রাণ দিতে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চারজন জাতীয় নেতাকেও। বাঙালির স্বপ্নের বাংলাদেশ কেন বাস্তব সত্য হয়ে উঠতে পারেনি, সেটা জানতে হলে অনুসন্ধান করতে হবে এসব হত্যাকাণ্ড ও হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষক, উপকারভোগী ও সমর্থকদের পরিচয়ের কথাও।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি জানতেন না যে, তাকে হত্যা করার একটা বিরাট চক্রান্ত চলছে? তিনি কি জানতেন না যে এই চক্রান্তে বিদেশিরা যেমন আছে, তেমনি আছে তাঁর নিজের দলের মানুষও? এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য কী? শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, না, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করা?
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে সেনাবাহিনীর একটা বিক্ষুব্ধ অংশ। সেনাসদস্যদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল। অনেকের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক অভিলাষ। বঙ্গবন্ধু এসব জানতেন। তিনি এসব বিরোধ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টাও করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর হুকুমের বাইরে কেউ যাবে না। কিন্তু ক্ষমতার লোভের কাছে তারা যে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারে, হিংস্র ঘাতকে পরিণত হতে পারে, এটা বঙ্গবন্ধু ধারণা করেননি।
সে সময় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা একাট্টা হয়েছিল। লাভ ও লোভের মোহে দলের নেতাকর্মীরাও অনেকে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। দলের অনেক নেতাকর্মী আখের গোছাতে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু সব কিছু জানতেন। তাইতো ১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বললেন, “জনগণের সেবার জন্যই আমরা নির্বাচিত হয়েছি…আজ আমার কাছে আপনারা তওবা করে যান যে স্বজনপ্রীতি করবেন না। ঘুষখোরদের সাহায্য করবেন না। মাত্র কয়েকটা লোকের জন্য বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দূর করা যায় না। আমি এর প্রতিকার দেখতে চাই।….আমার কর্মী যারা আছেন, যারা আমার কথায় বন্দুক ধরে যুদ্ধ করেছিলেন,…যারা আমার কথায় সবকিছু ত্যাগ করতে পারতেন, তাঁরা আমার একটা কথা রাখুন। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করুন।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কথাটি বিশ্বাস করেছেন বঙ্গবন্ধু তিনি ভেবেছিলেন, সবাই তাঁর কথা মেনে চলবেন। কারণ তিনি ছিলেন সবার নেতা, সবার অভিভাবক। অভিভাবকের কথা কি আর কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে? কিন্তু এটা ছিল ভীষণ ভুল। লোভীচক্র ষড়যন্ত্রের জালে ঘিরে ফেলে সারা দেশ।
একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে সংবাদটি বিশ্ববাসীকে জানাতে প্রায় দুই সপ্তাহ (১০এপ্রিল) বিলম্ব করেছিল ইয়াহিয়া খানের সেনাশাসক। অথচ বঙ্গবন্ধু হত্যার তিন ঘণ্টার মধ্যেই এই মৃত্যু ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর করাচি ও লাহোরের পত্র-পত্রিকাগুলো বিশেষ বুলেটিন বের করে এবং রেডিও পাকিস্তান সকাল আটটার খবরে তা প্রচার করে। শুধু তাই নয়, ১৬ অগাস্ট উর্দু পত্রিকা ‘নওয়া-ই-ওয়াক্ত‘ দীর্ঘ সম্পাদকীয়তে মোশতাককে পাকিস্তানের সঙ্গে একত্র হয়ে দেশের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বা ‘পূর্ব পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ রাখার প্রস্তাব দেয় ‘পাকিস্তান টাইমস’। এই পরিবর্তনের ফলে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করে। উর্দু দৈনিক ‘জং’ এক সম্পাদকীয়তে (১৮ অগাস্ট) মন্তব্য করে, বাংলদেশের মানুষ পাকিস্তান ও পাকিস্তানি আদর্শের প্রতি বিদ্বেষী নয়। পত্রিকাটিতে মোশতাক সরকারকে মুজিব আমলের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে অনতিবিলম্বে সম্পর্ক স্থাপনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৭ অগাস্ট রেডিও পাকিস্তানে প্রচারিত এক খবরে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ’ নামকরণের প্রশংসা করে।
মুজিব হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ প্রকাশ করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা স্বাধীনতা-বিরোধীরা। তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লন্ডনে মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরের দিনই তারা বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ আব্দুস সুলতানসহ স্বাধীনতাপন্থীদের দূতাবাস থেকে বের করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা মুজিবের ছবি টেনে নামায় এবং তা ভেঙ্গে রাস্তায় ফেলে দেয়। গোলাম আযম জেদ্দা থেকে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দানের জন্য মোশতাক ও ভুট্টোকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি পত্র পাঠান। পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বাঙালি নেতা আহম্মদ আলী, খাজা খয়ের উদ্দিন, হামিদুল হক চৌধুরী, কামরুজ্জামান ও নসরুল্লাহ নামে একজন প্রাক্তন এমএনএ, সোহরাওয়ার্দীর কন্যা ও ভুট্টোর প্রাক্তন উপদেষ্টা আখতারি সালোয়মান ও ঢাকার নওয়াব খাজা হাসান আসকারি পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের নীতিকে সমর্থন এবং মোশতাক সরকারের সাফল্য কামনা করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যায় আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার হাত ছিল বলেও বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়। ১৯৭১ সালে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, দুনিয়ায় তাদের যে ক’জন দুশমন আছে, বাংলাদেশের শেখ মুজিব এদের অন্যতম। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের ‘বাংলাদেশ : দ্য আনফিনিশড রেভুলেশন’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসাররা বলেছেন, যে চক্রটি মুজিবকে হত্যা করে, তাদের প্রতিনিধিগণ ১৯৭৪ সালের শরৎকালে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে এসে এ ব্যাপারে সাহায্য চায়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সি.আই.এ-এর ‘স্টেশন চিফ’ ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট অর্থাৎ মুজিব-হত্যার দিন পর্যন্ত চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর লিফশুলজকে জানিয়েছে যে, মাহবুব আলম চাষী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, এ.বি.এস সফদার ছিলেন তখন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-এর মুখ্য এজেন্ট। ঢাকার সিআইএ-এর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি বলেছেন, ‘আমাদের যোগাযোগটা এতো ভালো ছিল যে, অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে আমরা খুব শিগগিরই তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে পেরেছিলাম। চেরি স্বীকার করেন যে, তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে খবর পাঠান, তখনও অভ্যুত্থান চলছিল। পররাষ্ট্র দপ্তরের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, খন্দকার মোশতাক গংদের সঙ্গে এই যোগাযোগ ছিল ১৯৭১ সালে, সেই কলকাতা থেকেই। ১৯৭১ সালে মোশতাক-চাষীদের সঙ্গে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে যোগাযো ছিল ১৯৭৫ সালেও তা অক্ষুণ্ন ছিল।
কাজেই বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্বদানকারী মেজর ফারুক-রশিদরা যতই দাবি করুক যে, মুজিব হত্যার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। ফারুক-রশিদরা ছিল মূল চক্রান্তকারীদের হাতিয়ার মাত্র।
এই হত্যাকাণ্ডের কন্ট্রোল-রুম ছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস, তার প্রমাণ হলো মুজিব-হত্যার প্রথম ঘোষণা আসে ওয়াশিংটনের ভয়েস অব আমেরিকা থেকে। অভ্যুত্থানের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই দুনিয়াময় ভয়েস অব আমেরিকা অভ্যুত্থানের খবর ছড়াতে থাকে।.ফিলিপ চেরি নিজেই স্বীকার করেছেন, শেখ মুজিব হত্যার খবর তিনিই ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ১৫ অগাস্টের কালরাতে দূতাবাসের সিনিয়র অফিসাররা অফিসে রাত কাটিয়েছেন। এই হত্যা ষড়যন্ত্রে মার্কিনিদের সঙ্গে পাকিস্তানসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ তাদের বাংলাদেশের কয়েকজন ক্রীতদাস জল্লাদদের দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটিয়েছে। নিহত হয়েছেন খেটে-খাওয়া দুঃখী মানুষের নেতা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধু তাঁর বিরুদ্ধে যাবতীয় ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন। কিন্তু কখনও তা গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। তিনি ভাবতেন, যে দেশকে তিনি স্বাধীন করেছেন, যে দেশের মানুষ তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে, সেই দেশের মানুষ কখনই তার বিরুদ্ধে বন্দুক ধরতে পারে না। তা ছাড়া তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। ভয় পেতেন না বলেই আত্মগোপন না করে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে ধরা দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। তারপরও তিনি আত্মগোপন করেননি। তিনি চেয়েছেন, নিয়মতান্ত্রিক পথে আন্দোলন পরিচালনা করতে। তাঁর কোনো আচরণ যেন হঠকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত না হয়, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন যেন বিঘ্নিত না হয়। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধু ছোটকাল থেকেই ছিলেন অত্যন্ত নির্ভীক। তিনি কখনো পালানোর রাজনীতি করেননি। ১৯৭৫-এর ১৫ অগাস্ট রাতেও ঘাতকরা পাকিস্তানিদের মতই গুলি চালাতে চালাতে যখন বাসভবনে ঢুকেছিল তখনো তিনি পেছনের দরজা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেননি, বরং সামনের দরজা খুলে একইভাবে ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট’ বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা করেছিল ওরা। পিঠ নয়, বুক চিতিয়ে তিনি ঘাতকের বুলেটকে মোকাবিলার চেষ্টা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন তাঁর জীবনের ওপর আসন্ন হুমকির কথা, কিন্তু তিনি ভীত না হয়ে ব্যক্তিগত সাহস আর আত্মবিশ্বাসের অবস্থান থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। সবকিছু জানার পরেও তিনি তাঁর জনগণের ওপর, মানুষের ওপর তিনি বিশ্বাস হারাননি।
