Published : 15 Jun 2025, 05:12 PM
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ মাদ্রাসা। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদ্রাসা ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী—যা দেশের মূলধারার অর্থনীতিতে তাদের অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জকে আরও প্রকট করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকসের (ব্যানবেইস) ২০২২ এবং ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৯,২৫৯ থেকে ৯,২৬৮টি, যেখানে প্রায় ২৭.৫ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা নিয়ে সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও, সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ২৯,০০০ কওমি মাদ্রাসা রয়েছে এবং এর অধীনে প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে (বণিক বার্তা, মে ২০২৫)।
এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও, তাদের কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত কম। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদ্রাসা স্নাতকদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেকারত্বের শিকার। এর প্রধান কারণ মূলধারার শ্রমবাজারের সঙ্গে তাদের শিক্ষাক্রমের অসামঞ্জস্যতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার অভাব (ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ResearchGate)।
কওমি মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও গভীর। তারা সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত এবং মূলত ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর দেয়। যদিও সরকার আধুনিক বিষয়াবলি (বিজ্ঞান, ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে, কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রশাসন প্রায়শই এর বিরোধিতা করে আসছে (ইউরেশিয়া রিভিউ, জুন ২০১১)। তারা মনে করে, এতে ধর্মীয় শিক্ষার বিশুদ্ধতা নষ্ট হতে পারে। এর ফলে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কেবল সীমিত কিছু ধর্মীয় পেশায় নিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না।
আধুনিকতার স্পষ্ট ধারণা এবং বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ‘আধুনিকতা’ শব্দটি প্রায়শই পশ্চিমা ধারণার ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত হয়, যা একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত। তবে, প্রকৃত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য জ্ঞানচর্চাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনুশীলনকে বিভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে ছড়িয়ে দেওয়া অপরিহার্য। বিশ্বের প্রতিটি ভাষা ও সংস্কৃতিই নতুন ধারণা এবং উদ্ভাবনের নিজস্ব পদ্ধতি নিয়ে আসে। যখন জ্ঞান শুধু একটি প্রভাবশালী ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তখন বহু মেধা ও সম্ভাবনা সুপ্ত থেকে যায়, যা বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত (ফিল আর্কাইভ: দ্য ফিলোসফি ই-প্রিন্ট আর্কাইভ, ডে ইন্টারপ্রেটিং)।
ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক পণ্ডিত ও মাদ্রাসার আলেমদের কাছে আরবি, ফারসি, উর্দু, তুর্কি এবং অন্যান্য ভাষার বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার রয়েছে। ইসলামের স্বর্ণযুগে গ্রিক, ফারসি ও ভারতীয় উৎস থেকে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনের অসংখ্য গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়েছিল। আল-মা'মুন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘বায়তুল হিকমাহ’ (হাউজ অব ওয়াইজডম) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান সংগ্রহ, অনুবাদ ও বিতরণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল (মাকলাত ডট কম, সিদেখাস)।
হানাইন ইবনে ইসহাক এবং আল-খোয়ারিজমির মতো পণ্ডিতরা কেবল অনুবাদই করেননি বরং প্রাপ্ত জ্ঞানের সমালোচনা ও সম্প্রসারণও করেছেন। এই অনুবাদ আন্দোলন প্রাচীন জ্ঞানকে সংরক্ষণ এবং নতুন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে সমৃদ্ধ করতে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছিল, যা ইউরোপীয় রেনেসাঁর পথ প্রশস্ত করে। মাদ্রাসার পণ্ডিতরা ওই ভাষাগত দক্ষতা ব্যবহার করে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসংখ্য গ্রন্থকে নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূলধারায় নিয়ে আসতে পারেন।
ঔপনিবেশিক শিক্ষার একটি কালো অধ্যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া ইংরেজি শিক্ষা। এই ঔপনিবেশিক প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা যারা ‘রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও, রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ইংরেজ হবে’ (মেকলে মিনিটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন, ১৮৩৫)। টমাস ব্যাবিংটন মেকলে তার ‘মিনিটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’ (১৮৩৫) এ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, একটি ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি শেলফ ভারত ও আরবের সমগ্র দেশীয় সাহিত্যের চেয়ে মূল্যবান। এই নীতি প্রাচ্যের জ্ঞানকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করে ঔপনিবেশিক শাসনকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল, যেখানে ভারতীয়দেরকে কেবল ঔপনিবেশিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কর্মী হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছিল, জ্ঞান উৎপাদনের নেতা হিসেবে নয় (টেস্টবুক, বিওয়াইজেইউএস)।
মেকলের এই ঔপনিবেশিক প্রকল্পের বিপরীতে আল-জাজারি (যাকে ‘রোবোটিক্সের জনক’ বলা হয়) এবং আল-খোয়ারিজমির (যার কাজ থেকে ‘বীজগণিত’ ও ‘অ্যালগরিদম’ শব্দ দুটি এসেছে) মতো ইসলামিক পণ্ডিতদের কাজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপনিবেশমুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আল-জাজারির রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির নকশা, যেমন পানীয় পরিবেশনকারী পরিচারিকা, হাত ধোয়ার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, বা সঙ্গীতজ্ঞ রোবট—এগুলো কেবল যান্ত্রিক উদ্ভাবন ছিল না বরং স্থানীয় মেধা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতীক।
একইভাবে, আল-খোয়ারিজমির ‘কিতাব আল-জাবর ওয়া আল-মুকাবালা’ (বীজগণিতের ওপর সংক্ষেপিত গ্রন্থ) একটি স্বতন্ত্র গাণিতিক শৃঙ্খলা হিসেবে বীজগণিতকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যা শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান ছিল না বরং দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক সমস্যার সমাধানের জন্য নির্দেশিকা প্রদান করেছিল। এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা ভাষার একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, বরং এটি বৈশ্বিক মানব সভ্যতার সম্মিলিত সম্পদ। এই ঐতিহ্য তুলে ধরার মাধ্যমে আমরা ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি একটি নিজস্ব, স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারি।
ইসলামিক সামাজিক দর্শনে জ্ঞানের সাধনা এবং আত্মিক ও শারীরিক উন্নতির মাধ্যমে সুখ লাভের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল-ফারাবির (আল-মদিনা আল-ফাদিলা বা ‘গুণী শহরের মানুষজন’) দর্শনে, মানুষের চূড়ান্ত সুখ (ফেলিসিটি) জ্ঞান ও নৈতিকতার মাধ্যমে অর্জন করা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জ্ঞান অর্জন এবং ব্যবহারিক দক্ষতার মাধ্যমে মানুষের আত্মা পূর্ণতা লাভ করে, যা চূড়ান্ত সুখের দিকে পরিচালিত করন (এসিজেওএল.ওআরজি, Scribd)। এই দর্শন অনুসারে, জ্ঞান শুধুমাত্র পরকালের জন্য নয়, বরং ইহকালের জীবনেও একটি সার্থক ও সুখী জীবন যাপনের জন্য অপরিহার্য।
কোরানের প্রথম অবতীর্ণ শব্দ ‘ইক্বরা’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘পড়ো’ বা ‘আবৃত্তি করো’, নিরক্ষর নবী মুহম্মদ (সা.)-এর প্রতি একটি গভীরতর নির্দেশ ছিল। এর অর্থ কেবল লিখিত পাঠ নয়, বরং আল্লাহতালার সৃষ্টি, নিদর্শন এবং সমগ্র অস্তিত্বকে গভীরভাবে পাঠ করা, পর্যবেক্ষণ করা ও তা থেকে জ্ঞান আহরণ করা (ইসলাম স্ট্যাক এক্সচেঞ্জ, এমএটিডব্লিউ প্রজেক্ট)। এটি জ্ঞানার্জনের প্রতি ইসলামের সর্বজনীন আহ্বান, যা ধর্মীয় এবং জাগতিক উভয় জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার এই সামাজিক পরিবর্তন কেবল সরকারের মুখ চেয়ে থাকলে হবে না। বরং, আল-জাজারি ও আল-খোয়ারিজমির মতো পণ্ডিতদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাদের পঠন-পাঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়বস্তুকে বাংলাসহ স্থানীয় ভাষায় সহজলভ্য করা এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সহজলভ্য বিজ্ঞান শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করা। এই মহৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের সমন্বিত পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়ন অত্যন্ত জরুরি।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে হলেও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের, যারা বিজ্ঞান চর্চা করতে চান, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রয়োজন। এর একটি উৎস হতে পারে বাংলাদেশী ধনী মুসলমানদের প্রদেয় জাকাত। শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে যারা আর্থিক সংকটে ভুগছেন, তারা জাকাত গ্রহণের যোগ্য হতে পারেন, যদি তারা শরিয়া নির্ধারিত নির্দিষ্ট শর্তাবলি পূরণ করেন। ইসলামিক আইনে, জাকাতের আটটি নির্দিষ্ট ব্যয়ের খাত রয়েছে, যার মধ্যে 'আল-ফুকারা' (দরিদ্র) এবং 'আল-মাসাকিন' (অভাবগ্রস্ত) অন্যতম। একজন শিক্ষার্থী যখন জ্ঞানের অন্বেষণে এতটাই নিবেদিত থাকেন যে, উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং নিজের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন না, তখন তিনি এই দরিদ্র বা অভাবগ্রস্তের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. শিক্ষার্থীকে অবশ্যই জ্ঞান অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে, ২. তার পড়াশোনার কারণে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সীমিত বা অনুপস্থিত হতে হবে, ৩. সে জ্ঞান অর্জন করছে তা উম্মাহর (মুসলিম জাতি) জন্য 'ফরজে কিফায়া' (যৌথ বাধ্যবাধকতা) পূরণ করে, যেমন ধর্মীয় জ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল বা অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় জাগতিক বিজ্ঞান, যা সমাজের উপকারে আসে, এবং ৪. জাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি ওই শিক্ষার্থীর ভরণপোষণে বাধ্য নন (যেমন সরাসরি সন্তান বা স্ত্রী)।
অনেক ইসলামিক পণ্ডিত মনে করেন, আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা শিক্ষা একটি মৌলিক প্রয়োজন এবং এর খরচ মেটাতে অক্ষম শিক্ষার্থীরা জাকাত গ্রহণের যোগ্য হতে পারে। অতএব, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা, যারা তাদের পড়াশোনার কারণে আর্থিক সংকটে আছেন, তারা জাকাত পেতে পারেন। (আল-ইফতা বিভাগ, জর্ডান; মুসলিম এইড; সিকার্সগাইডেন্স)।
জ্ঞানকে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ভাষার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে তা শুধু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভাগ্য পরিবর্তন করবে না বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।