Published : 21 Apr 2026, 02:01 PM
একদিকে মোগল স্থাপত্যের জীর্ণ দেয়াল ঘষেমেজে তকতকে করার জন্য মার্কিন ডলারের ঝনঝনানি, আর অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে গলার ওপর চেপে বসা এক অসম বাণিজ্য চুক্তির জোয়াল—বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কূটনীতি যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের রঙ্গমঞ্চ।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’-এর একটি ভয়ংকর অংশ হলো ৪ নম্বর ধারা—অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রান্তিককরণ ধারা। এই ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি তৃতীয় কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে ‘পরিপূরক নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা’ নিতে হবে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যাকে শাস্তি দেবে, ঢাকাকেও তাকে শাস্তি দিতে হবে। স্বাধীন বৈদেশিক নীতি পরিচালনার এখানেই সমাপ্তি।
এটি আমেরিকার টাউন হলে নেলসন ম্যান্ডেলার একটি ঐতিহাসিক জবাবের কথা মনে করিয়ে দেয় (২১ জুন ১৯৯০)। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, “জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আপনার তুলে ধরা মানবাধিকারের মডেল দেখে কিছুটা হতাশ হয়েছি। আপনি গত ছয় মাসে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে তিনবার দেখা করেছেন, যার প্রশংসা আপনি করেছেন। আর আপনি ফিদেল কাস্ত্রোকে মানবাধিকারের নেতা হিসেবে প্রশংসা করেছেন... মানবাধিকারের নেতা হিসেবে এরাই কি আপনার আদর্শ? এবং যদি তাই হয়, তাহলে আপনি কি গাদ্দাফি, আরাফাত বা কাস্ত্রোর মতো কাউকে দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে চাইবেন?” জবাবে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “One of the mistakes which some political analysts make is to think that their enemies should be our enemies.” অর্থাৎ, “কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক যে ভুলগুলো করেন, তার মধ্যে একটি হলো— তারা মনে করেন যে তাদের শত্রুরাই আমাদের শত্রু হওয়া উচিত।”
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের ওপর অসম একটি চুক্তি চাপিয়ে দিয়েছে—যা দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে, ইউএসএআইডির সব প্রকল্প বন্ধ করে দিয়ে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতিক্রমী খাতে অর্থ ছাড়ছে; যার মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন ‘মুসা খান মসজিদ সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার’। এই দুই আচরণের ভেতরের রসায়নটা আলোচনার বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাগুলো পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, একটি সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থ এখানে কাজ করছে।
প্রথম অঙ্ক: অসম চুক্তি—সার্বভৌমত্ব বন্ধক
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উপরোক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। সময়টা ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অধ্যাপক সেলিম রায়হানের ভাষায়, “একটি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে এত বড় চুক্তি করার আগে অপেক্ষা করা উচিত ছিল। অন্তত এক-দুই মাস অপেক্ষা করলে নতুন নির্বাচিত সরকার এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত।”
চুক্তির অসম প্রকৃতি বোঝার জন্য একটি পরিসংখ্যান অনেক কিছু বলে দেয়: ৩২ পৃষ্ঠার চুক্তিতে অ্যানেক্স এবং ফুটনোট বাদ দিয়ে বিভিন্নভাবে ‘Bangladesh shall’ বাক্যাংশটি ব্যবহার করা হয়েছে ৭০-৯০ বার; অপরপক্ষে ‘the United States shall’ ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ৮-১৫ বার। অর্থাৎ, দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার সিংহভাগই বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৬,৭০০টি আমেরিকান পণ্যের জন্য বাজার খুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, আইসিটি সরঞ্জাম, মোটরগাড়ি, এমনকি গরু ও হাঁস-মুরগির মাংস। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ কমিয়ে এনেছে মাত্র ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশ।
জ্বালানি খাতের ওপর চাপ আরও বেশি উদ্বেগজনক। চুক্তিতে বাংলাদেশকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে ১৪টি বোয়িং বিমান কিনতে হবে এবং অন্তত ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা) আমদানি করতে হবে। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, “এই চুক্তি আমাদের জ্বালানি সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করছে। কার কাছ থেকে তেল কিনতে হবে—এমন নির্দেশনা আমাদের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।”
দ্বিতীয় অঙ্ক: মুসা খান মসজিদ— জনকূটনীতির উজ্জ্বল হাতিয়ার
মুসা খান মসজিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অবস্থিত। একটি উঁচু খিলানছাদ বিশিষ্ট ভিতের ওপর তিন গম্বুজ মসজিদ এবং এর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত মুসা খানের কবর নিয়ে মুসা খান মসজিদ কমপ্লেক্স গঠিত। বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুসারে, প্রধান প্রবেশপথের ওপরে একটি শিলালিপি ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। জনশ্রুতি রয়েছে যে, মসজিদটি বারোভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খান (মৃত্যু ১৬২৩ খ্রি.) নির্মাণ করেন। কিন্তু ইমারতের স্থাপত্যরীতি এ ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবেত্তা এ. এইচ. দানী মনে করেন, এটি শায়েস্তা খাঁর আমলে নির্মিত অথবা পরবর্তী সময়ে মুসা খানের পৌত্র মুনওয়ার খানের তৈরি এবং নির্মাতা তার পিতামহের স্মরণে মুসা খানের নাম অনুযায়ী এর নামকরণ করেন।
একই যুক্তরাষ্ট্র, যে ইউএসএআইডির সব প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে (শুধু রোহিঙ্গা ও জরুরি খাদ্য সহায়তা ব্যতীত), অথচ মুসা খান মসজিদ পুনরুদ্ধারে ২,৩৫,০০০ ডলার অর্থ ছাড়ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এতে শুধু মসজিদটি সংস্কারই নয়, স্থায়ী ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি ও তরুণ স্থপতিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র লালবাগ কেল্লার ঐতিহাসিক ‘হাম্মাম খানা’ (গোসলখানা) সংস্কারে ১,৮৫,৯৩৩ ডলার অনুদান দিয়েছে। ২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ২২ মার্চ এর উদ্বোধন হয়েছে। গত ২৫ বছরে মোট ১৩টি সাংস্কৃতিক প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগ ১০ লাখ ডলারের বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন? উত্তরটি জনকূটনীতির (Public Diplomacy) ধারণার মধ্যে লুকিয়ে। ইউএসএআইডি বন্ধের খবর যখন বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক আকারে ছড়াচ্ছে, তখন এই ধরনের সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ইতিবাচক গল্প তৈরি করে। বাংলাদেশের জনগণের মনে একটি প্রশ্ন জাগানোর জন্য এটি একটি কৌশল: ‘যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই মন্দ? ওরা তো আমাদের মোগল ঐতিহ্য রক্ষা করছে!’
মনে রাখতে হবে, এই সাংস্কৃতিক প্রকল্পগুলো ইউএসএআইডির মাধ্যমে নয়, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পরিচালিত ‘অ্যাম্বাসেডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’ (এএফসিপি) থেকে অর্থায়ন পায়; যা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোর একটি। তাই ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে ইউএসএআইডি স্থগিত হলেও এটি চলমান থাকে।
ভারতের সঙ্গে কূটনীতিতেও এ উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রকে একটা সুবিধা দেবে। ভারতের বর্তমান সরকার মোগল সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য রক্ষায় নীতি-আদর্শগত কারণে ‘শৈথিল্য’ প্রদর্শন করছে বলে সমালোচনা উঠেছে। কয়েকটি উদাহরণ: ২০২৩ সালে জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পরিষদ (এনসিইআরটি) দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের বই থেকে মোগল দরবার সম্পর্কিত অধ্যায় বাদ দেয়। প্রায় ২৫০ জন ইতিহাসবিদ খোলা চিঠিতে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটি সরকারের ‘পক্ষপাতমূলক এজেন্ডা’ এবং ইতিহাসকে ‘হিন্দু বনাম মুসলিম’ বাইনারিতে ভাগ করার চেষ্টা। আবার আগ্রায় নির্মীয়মাণ মুঘল মিউজিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ মিউজিয়াম’। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ স্পষ্ট করেই বলেন, ‘মোগলরা কীভাবে আমাদের হিরো হতে পারে?’ এলাহাবাদ (প্রয়াগরাজ) ও ঔরঙ্গাবাদ (সম্ভাজিনগর)-এর মতো শহরের নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তাজমহল নিয়ে বারবার বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। ২০২২ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করা হয় যে তাজমহলের ‘২২টি তালাবদ্ধ কক্ষ’ খুলে সেটি হিন্দু মন্দির ছিল কি না, তা তদন্ত করা হোক। যদিও আদালত ও প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (এএসআই) একে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবুও এই ধরনের বক্তব্য সরকারি ও আধা-সরকারি মহলে বারবার উত্থাপিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে আসামের একজন বিধায়ক তাজমহল ও কুতুব মিনার ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণের আহ্বান জানান। বিশ্লেষকরা এগুলোকে ‘নির্বাচিত ইতিহাস নির্মাণের প্রচেষ্টা’ বলে মনে করছেন। ভারতের এমন পরিস্থিতির বিপরীতে বাংলাদেশের মোগল ঐতিহ্য রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে আসা স্বভাবতই তাদেরকে এ দেশের মানুষের কাছে এগিয়ে রাখবে।
ভেতরের রসায়ন: দ্বিমুখী কৌশলের বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণের ভেতরে একটি সুপারিশকৃত দ্বিমুখী কৌশল কাজ করছে:
১. কঠিন হাত (Hard Power): অসম বাণিজ্য চুক্তি, এলএনজি ও অস্ত্র কেনার বাধ্যবাধকতা, নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার শর্ত— এসব হচ্ছে কঠিন শক্তির প্রয়োগ। এগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিনির্ধারণের সক্ষমতাকে সীমিত করে। চুক্তি বিশ্লেষণকারী বিশেষজ্ঞ মাহমুদ হোসেনের ভাষায়, “This is not a free trade agreement, it is a managed trade regime.” অর্থাৎ, “এটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নয়, এটি একটি ব্যবস্থাকৃত বাণিজ্য বন্দোবস্ত”।
২. নরম হাত (Soft Power): আবার অন্যদিকে, মোগল মসজিদ পুনরুদ্ধার, আর্ট ইভেন্টে রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি— এসব জনকূটনীতির অংশ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’। সাধারণ মানুষ যখন টিভিতে দেখে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রাচীন মসজিদ সংস্কারের উদ্বোধন করছেন, তখন তাদের মনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগী ও সংস্কৃতিবান অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে স্থানীয় এলিট শ্রেণি (স্থপতি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী) তথা সাধারণ সমাজের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে তোলার বার্তা দেয়।
৩. আসল লক্ষ্য: জিএসওএমআইএ এবং এসিএসএ: এই দ্বিমুখী কৌশলের আসল লক্ষ্য কিন্তু আরও গভীরে। ট্রাম্পের চিঠিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে ‘জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (জিএসওএমআইএ) ও ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসিএসএ) স্বাক্ষর করতে চায়।
এসব চুক্তি হলে কী হবে?
মুসা খান মসজিদের সংস্কার সেই বৃহত্তর লক্ষ্যের জন্য জনমনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার একটি হাতিয়ার মাত্র।
নাটকের মঞ্চে বাংলাদেশ
এই পুরো ঘটনাকে একটি নাটকের মঞ্চের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখানে দুটি ভিন্ন ভূমিকা পালন করছে: এক দৃশ্যে— কূটনীতিকদের টেবিলে— তারা কঠোর শর্তের চুক্তি চাপিয়ে দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে বেঁধে ফেলছে। অন্য দৃশ্যে— কার্জন হলের প্রাঙ্গণে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মাঝে— তারা বাংলাদেশের ঐতিহ্য রক্ষাকারী বন্ধু হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জনগণ যখন দ্বিতীয় দৃশ্যটি দেখে মুগ্ধ হয়, তখন প্রথম দৃশ্যটির ভয়াবহতা তাদের চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ প্রথম দৃশ্যটির প্রভাব স্থায়ী— এটি বাংলাদেশের আগামী দুই দশকের নীতি নির্ধারণের সক্ষমতাকে সীমিত করবে। দ্বিতীয় দৃশ্যটি ক্ষণস্থায়ী— একটি মসজিদ সংস্কার প্রকল্প শেষ হলে সেটি একটি পুরাকীর্তি হিসেবে কেবল ইতিহাসের দায়মোচন করবে।
২০২০-২০২৪ সময়কালে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে ইউএসএআইডির আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল ১.৭৩ বিলিয়ন ডলার। ‘ফিড দ্য ফিউচার’ (কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অপুষ্টি হ্রাস, গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি) বাংলাদেশে ইউএসএআইডির সবচেয়ে সফল প্রোগ্রামগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। জনস্বাস্থ্য খাতে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা উন্নয়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমানো, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (এফডিএমএন)-দের জন্য মানবিক সহায়তা (কক্সবাজারে খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা), জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে এ অর্থ ব্যয় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবটা পরিষ্কার: ইউএসএআইডি বন্ধের নেতিবাচক প্রভাবকে নিরপেক্ষ করা, জনমনে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখা এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তানীতি নিজের কক্ষপথে নিয়ে আসা— সবকিছু একসঙ্গে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জনগণ ও নতুন সরকার কি এই দ্বিমুখী নাটক চিহ্নিত করতে পারবে? নাকি মসজিদের কারুকার্যে মুগ্ধ হয়ে অসম চুক্তির ভয়ংকর শর্তগুলো উপেক্ষা করে যাবে? ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল খুব স্মার্ট,’— বলছেন বিশ্লেষকরা, ‘আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো তাদের মুচকি হাসির পেছনের হিসেবটা বোঝা।’