Published : 21 Aug 2026, 11:48 PM
একবাক্যে বলে দেওয়া যায়, ‘বাংলাদেশের জনপরিসর নারীদের জন্য একটি অনিরাপদ জায়গা’। এই অনিরাপত্তার অন্যতম উৎস হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো এবং সমাজে নারীর প্রতি অযৌক্তিক ও অসহিষ্ণু মনোভাব। যে জনপরিসরে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন অগণিত নারী, সেই অনিরাপদ পরিসরে হঠাৎ করেই ১৮ অগাস্ট চালু হলো ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪টি বাস নিয়ে নারীদের জন্য এই ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালু করেছে সরকার।
ভয়ঙ্করভাবে অনিরাপদ জনপরিসরে এমন বাস সেবা নারীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘নিরাপদ যাতায়াতে নারীবান্ধব’ পরিবহন ব্যবস্থার রুট সম্প্রসারণ করে আরও বিস্তৃত সেবা দেওয়া হবে। সরকার যে ২০০ ইভি (ইলেকট্রিক গাড়ি) যুক্ত করবে, তার মধ্যে ১০০টি বাস থাকবে নারীদের জন্য এবং একই সঙ্গে অন্যান্য বিভাগেও নারীদের জন্য এই ‘বিশেষ’ বাস সার্ভিস চালু করা হবে বলে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি প্রথম এমন কোনো উদ্যোগ নয়। ২০১৯ সালে ‘ইভোলিউশনারি সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় একদল গবেষক উল্লেখ করেন যে, আশির দশকের শুরুতে প্রথম ‘উইমেন অনলি’ বাস পরিষেবা চালু করা হয়। তখন একটি রুটে মাত্র ৪টি বাস নামানো হয়েছিল। তবে এই উদ্যোগটি তখন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি এবং বিভিন্ন কারণে পরিষেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। পুনরায় ১৯৯৭ সালে বিআরটিসি ‘ছাত্রী ও কর্মজীবী’ নারীদের জন্য একই ধরণের বিশেষ বাস সেবা চালু করে। কিন্তু সেটিও দ্রুতই বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে ২০০১ সালে দেশের নবনির্বাচিত সরকার তাদের প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচির অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম হিসেবে আবার সেই একই মডেলে ‘উইমেন অনলি’ বাস চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৪ সালের অগাস্ট মাসে বিআরটিসি নারী যাত্রীদের জন্য ২২টি বাস চালু করে; তখন ১১টি রুটে এই বাস নামানো হয়। ২০২৬ সালের বাস চালুর আগে সর্বশেষ ২০০৮ সালের জুলাই মাস থেকে বিআরটিসি পুনরায় এই পরিষেবাটি চালু করে। অতীতে বারবার এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে সেটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ পুরো সমাজব্যবস্থা যেখানে নারীর চাকরি-বাকরি, বহির্গমন বা সামাজিক চলাচলের বিরুদ্ধে দেয়াল নির্মাণে ব্যস্ত, সেখানে এই ‘সিলেক্টিভ স্পেস’ টিকে থাকার কথা নয়—আর বারবার সেটিই ঘটেছে।
তবুও, নারীদের জন্য নিরাপদ জনপরিসর তৈরিতে এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্ন সামনে আসে, তা হলো—নারীদের এই অনিরাপত্তার জন্য দায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদানগুলোর সমাধান না করে শুধু নির্দিষ্ট ভিন্ন সার্ভিস চালু করা অনিরাপদ জনপরিসরের ‘পিংক ওয়াশ’ নয় কি? এই ‘পিংক ওয়াশ’ মূলত ঐতিহাসিক 'হোয়াইটওয়াশিং' তত্ত্বের মতো।
ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের ‘অপকর্ম’ বা ‘অন্যায়’ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য যে প্রচেষ্টা চালাত, তাকে ‘হোয়াইটওয়াশিং' বলা হয়। একইভাবে বাংলাদেশের সরকারগুলো নারীর জন্য নিরাপদ দেশ তৈরির ব্যর্থতা ঢাকার জন্য এমন ‘জননন্দিত’ উদ্যোগ নেয়। এই ‘পিংক বাস সার্ভিস’ও ঠিক যে তেমনি একটি উদ্যোগ, সেটি বললে অত্যুক্তি হবে না। এই প্রশ্ন সামনে আসছে কারণ নারীকে সামগ্রিকভাবে অনিরাপদ রেখে এমন ‘পরিসর ভিন্নতা’ রাজনীতির জন্য ফলদায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে নারীর জন্য যৌক্তিক কোনো নিরাপত্তা প্রদান করবে না। কারণ একজন নারীকে বাসে আসার আগ পর্যন্ত আরও দীর্ঘ নানান সামাজিক পরিসর পাড়ি দিয়ে আসতে হয়। সেখানে নারী অনিরাপদ থাকলে এই বাসের নিরাপত্তা তাদের জন্য অর্থহীন হয়ে পড়বে। পুরো সমাজব্যবস্থায় নারীর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা গেলে তখন এই ‘বিশেষ’ সেবার প্রয়োজন পড়বে না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে, গত ছয় মাসে ৮৪ জন নারী ‘বখাটেদের’ দ্বারা শারীরিকভাবে যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু দেশের উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী করা। বাংলাদেশে সামাজিকভাবে যেহেতু যৌন হেনস্তা পারিবারিক ‘লজ্জা’ বয়ে আনে বলে মনে করা হয়, সেহেতু অনুমান করা যায়, সংবাদপত্রে না আসা ঘটনা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি এবং এই পরিসংখ্যান ক্রমবর্ধমান। এমন ক্রমবর্ধমান ভয়ের পরিবেশ বজায় থাকলে সামান্য এই বিশেষ বাস সেবা আদৌ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে কি না—সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
এছাড়াও দেখা যায়, দেশে নানা পর্যায়ে ও নানা কৌশলে নারীর পরিসর ছোট করতে বয়ান নির্মাণ করা হচ্ছে; নারীকে অনলাইন ও অফলাইনে প্রতিনিয়ত হেনস্তা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এই সামান্য নিরাপত্তার ‘পদ্মপাতার জল’ কি এই অনিরাপত্তার অথৈ সায়রে কোনো পার্থক্য তৈরি করবে? কারণ নিরাপত্তা একটি সমষ্টিগত ধারণা। সমাজে নারীদের জন্য সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো উপকারে আসে না। অথচ এই ধরনের ‘পিংক ওয়াশ’-এর মতো জনপ্রিয় পদক্ষেপ না নিয়ে তার পরিবর্তে একটি কঠোর আইন হতে পারত এই সমস্যার তুলনামূলক ভালো সমাধান—যেমন উন্নত বিশ্বে দেখা যায়। সেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন থাকায় নারী-পুরুষের ভিন্ন যাতায়াত ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু আমাদের মতো দেশে তা করতে হচ্ছে, কারণ এখানকার জনপরিসর অনিরাপদ। ভারত ও পাকিস্তানসহ নানা দেশে এই ধরনের উদ্যোগ চোখে পড়ে। দেখা যায়, যেসব দেশে নারীর জন্য জনপরিসর অনিরাপদ, সেখানেই মূলত এই বিশেষ উদ্যোগ নিতে হয়; যেসব দেশে সামগ্রিকভাবে নারীর জন্য সামাজিক পরিবেশ নিরাপদ করার উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
বাংলাদেশে এটি নারীর নিরাপত্তায় ‘পিংক ওয়াশ’ কেন, তার তাৎক্ষণিক কিছু লক্ষণও সামাজিক মাধ্যমে ইতোমধ্যে দেখা গিয়েছে। কারণ নারীদের দ্বারা চালিত এই নারীদের বাস সেবাকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ গোষ্ঠি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত, সামাজিক মাধ্যমে ভিন্ন বয়ান তৈরিতে যাদের ভূমিকা অনন্য। একদিন পর প্রকাশিত ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই বাস সেবা চালুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক মাধ্যম ‘নারীবিদ্বেষী মন্তব্যে ভরে উঠেছে’। সেখানে নারীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে নানা রকম অশালীন প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এছাড়াও অনেকে ইসলামিক অনুশাসন অনুযায়ী নারী বাস চালাতে পারেন কি না—সেই ব্যাখ্যা নিয়েও হাজির হয়েছেন।
অথচ কেউ প্রশ্ন তুলছেন না, যে সমাজে নারী প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করে টিকে রয়েছে, সেখানে কেনই-বা এমন ভিন্ন সেবা চালুর প্রয়োজন? অর্থাৎ, একদল নারী গণপরিবহনে একদল পুরুষের ভিড়ে কতটা অনিরাপদ হলে তাদের জন্য ভিন্ন যাতায়াত ব্যবস্থা করতে হয়! যেখানে নারী পুরুষের মতো সমান অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে চলেছে, সেখানে একই বাসে কেন নারী-পুরুষ একসঙ্গে যাতায়াত করতে পারবে না?
এম. টি. ইসলাম শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: toriqul38@gmail.com