হ্যাপি ‘লোডশেডিং' টু ইউ

পাবলিক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে লোডশেডিং এর সময় হলের ছাদে গান বা গালি প্রতিযোগিতার আয়োজন দেখা যেত। জুট বা টেক্সটাইলস মিলগুলোর কলোনিতে সন্ধ্যার পরে লোডশেডিংয়ের সময়ে ঘুরে বেড়ানো, গান গাওয়া কিংবা প্রেমিক জুটিদের কার্যকলাপ চোখে পড়তো। এখন লোডশেডিং নিয়ে টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টক শো হয়।

আহসান কবিরআহসান কবির
Published : 10 August 2022, 01:29 PM
Updated : 10 August 2022, 01:29 PM

অন্ধকার কখনোই অন্ধকারকে দূর করতে পারে না। একমাত্র আলোই পারে অন্ধকারকে দূর করতে

- মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র)

একালের ছেলেমেয়েরা কি পুর্ণেন্দুপত্রীর ‘কথোপকথন’ পড়ে? শুভকংর আর নন্দিনীর কথা কী মনে আছে কারো কারো? একসময় জনপ্রিয় হওয়া একটা কবিতার কয়েক লাইন তুলে দিচ্ছি..

- (শুভকংর) তোমাদের ওখানে এখন লোডশেডিং কী রকম?

- (নন্দিনী) বলো না। দিন নেই রাত নেই, জ্বালিয়ে মারছে।

- (শুভকংর) তুমি তখন কী করো?

- (নন্দিনী) দরোজা খৃুলে দেই। জানালা খুলে দেই...গায়ে জামা কাপড় রাখতে পারি না। সব খুলে দেই। চোখের চশমা, চুলের বিনুনি...

- (শুভকংর) তুমি অন্ধকারকে সর্বস্ব, সব অগ্নিস্ফূলিঙ্গ খুলে দিতে পারো কতো সহজে। আর শুভংকর মেঘের মতো একটু ঝুঁকলেই- কী হচ্ছে কী?

- (নন্দিনী) পরের জন্মে দশ দিগন্তের অন্ধকার হবো আমি!

২০২২ সালের জুলাই বা পরবর্তী দিনগুলোর সাথে বসবাস করে মনে হচ্ছে বর্তমান সরকার কবিতা ও গানপ্রেমী সরকার। তারা কবিতার অন্ধকার বা লোডশেডিংকে ভালোবাসে। এদেশের কোটি মানুষের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের ‘মাইলফলক’ কবিতা ‘বনলতা সেন’ এর সৌন্দর্য কিন্তু সেই অন্ধকারেই- ‘সব পাখি ঘরে আসে সব নদী, ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন/ থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার রনলতা সেন’...। বনলতা সেনের মতো দু-দন্ড শান্তি দিতে এদেশের ঘরে ঘরে ফিরেছে সেই পুরোনো অন্ধকার বা লোডশেডিং। আসুন নন্দিনীর মতো দরোজা জানালা খোলার পর সর্বস্ব বা সব স্ফূলিঙ্গ খুলে দেই। এই লোডশেডিং উপভোগ করার জন্য আপনি বা আপনারা আরও অনেক কিছু করতে পারেন। যেমন-

এক. অন্ধকারে প্লানচেট করতে পারেন। কেউ নন্দিনীকে হাজির করতে পারেন, কেউ চাইলে জীবনানন্দের বনলতাকেও জাদুমন্ত্র বলে ডাকতে পারেন। মনে রাখবেন নিজ স্ত্রীকে কখনো সখনো ‘অন্ধকার বা লোড’ মনে হতে পারে,গার্লফ্রেন্ড নাকি সবসময় আলো ছড়ায়!

দুই. আধ্যাত্মিক ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকতে পারেন। ভাবতে পারেন মাতৃজঠর নিয়ে। সেখানে কেমন অন্ধকার ছিল? কীভাবে সেখানে আপনি বেড়ে উঠছিলেন? ভাবতে পারেন কবরের অন্ধকারের কথা। গাইতে পারেন সেই গান-‘বাত্তি নাইরে বাত্তি নাইরে কব্বরে’...। খুব রোমান্টিক ভাবনায় থাকলেও মাতৃজঠর ও কবরের কথা অর্থাৎ জীবন শুরু ও শেষের কথা ভেবে গাইতে পারেন- ‘এ আঁধার কখনো যাবে না মুছে আমার পৃথিবী থেকে’।

তিন. রোমান্টিক ভাবনার সমান্তরাল আরেকটা দিক আছে। সেটা নিয়েও বিস্তর গবেষণা করতে পারেন লোডশেডিং চলাকালে। যেমন- এক ফাঁসির আসামি শেষ ইচ্ছে হিসেবে জানিয়েছিলেন- ফিনিক ফোটা জোসনার আলোতে আমার ফাঁসি হোক। এমন একটা নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন এদেশের জনপ্রিয়তম অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী ( নাটকের নাম চন্দ্রগ্রস্থ, নাট্যকার- হুমায়ুন ফরিদী ও আনিসুল হক, পরিচালনা-হুমায়ুন ফরিদী)। ফাঁসি হবার আগে শেষ ডায়ালগ ছিল তার-

‘আ ওয়ান্ডারফুল নাইট টু ডাই'। ফিনিক ফোটা জোছনার আরেক গুণগ্রাহী ছিলেন কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার লেখা সেই জনপ্রিয় গানটাও শুনতে পারেন- ‘চাঁদনী পশর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’।

চার. লোডশেডিং দিনের বেলা হলে রাস্তায় বা মাঠে টেস্ট বা টি-টোয়েন্টি খেলতে পারেন। এই দুই ধরনের ক্রিকেটে নাকি বাংলাদেশের ‘দুর্বল দিন’ যাচ্ছে। লোডশেডিং এর দিনে বৃষ্টি হলে খিঁচুড়ি রান্না করে রান্নার রেসিপি বা রান্না প্রণালী ভিডিও করে সেটা আপলোড করতে পারেন। লোডশেডিং থাকলেও মোবাইল চার্জ দেওয়ার পদ্ধতিটাকে ব্যবসায়ে রূপান্তর করতে পারেন। লিখতে পারেন কালজয়ী উপন্যাস- 'লোডশেডিং এর দিনগুলোতে প্রেম'।

পাঁচ. লোডশেডিংকে সৃষ্টিশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নানা সরকারি অধিদপ্তরে ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাতে পারেন যেখানে শুভেচ্ছাবার্তা হিসেবে লেখা থাকবে- ‘হ্যাপি লোডশেডিং টু ইউ’।

ছয়. প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হো.মো. এরশাদ এর সেই বক্তৃতাসমূহের কথাও ভাবতে পারেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বিভিন্ন জনসভায় শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলতেন- "খালেদাকে খাইছে সারে (খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে সার কেলেংকারি নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল, পুলিশের গুলিতে কয়েকজন কৃষক মারা গিয়েছিলেন, পরের আমলে ‘খাম্বা' কেলেংকারিও হয়েছিল) হাসিনাকে খাবে তারে (শেখ হাসিনার প্রথম আমলের লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ অব্যবস্থাপনা নিয়ে বলতেন), দেশের মানুষ চায় আমারে।"

জনগণ আসলে এক আজব চিজ। কখন যে কী চায়, কারে চায় বোঝা যায় না।

শ্রীলংকার মানুষ যে রাজাপাকসেদের একসময় মাথায় তুলে নাচতো তাদেরকে সেইসব মানুষই টেনে নামিয়েছে। শ্রীলংকা ছেড়ে পালানোর পর তারে নিয়ে ছড়াও লিখেছে- ‘রাজাপাকসে/ শ্রীলংকা ছাড়া অন্য কোথাও থেকে যাক সে/দুঃখ ভুলতে যখন তখন গাঁজা খাক সে...’

সাত. প্রাকৃতিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখতে চাষের গরু, চাষের মাছ বা সবজির মতো জোনাকি পোকার চাষ করতে পারেন। অনেকেই হয়তো জানেন না যে মানুষের আঙুলের ছাপের মতো প্রতিটা জোনাকির আলো কিন্তু আলাদা এবং তাদের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ।

এছাড়া লোডশেডিং বা অন্ধকার নিয়ে মনিষীদের বাণী মুখস্থ করতে পারেন। যেমন-অ্যালান ব্লুম বলেছেন- ‘শিক্ষা হলো অন্ধকার থেকে বের হয়ে আলোর দিকে যাত্রার শুরু’।

অন্ধকারের পজিটিভ দিক নিয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছেন, ‘অন্ধকারই কেবল তারাগুলোকে দেখাতে পারে।’

উল্টো দিকে জন রে বলেছেন 'সূর্যের আলো যখন প্রখর হয় তখন চাঁদকে দেখা যায় না’। মার্ক টোয়েন বলেছেন অসম্ভব দামি এক কথা- ‘পৃথিবীর সবাই হলো একটা চাঁদের মতো। সবারই একটা আলোকিত দিক রয়েছে এবং একটা অন্ধকার দিক রয়েছে যা সে কখনো কাউকে দেখায় না’। হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, 'যে অন্ধকার বহন করে সে কখনো আলো নিয়ে খেলতে পারে না।'

আসুন আমরা অন্ধকার বহন না করি। আমরা আলো নিয়ে খেলতে চাই। অন্ধকার দিক যদি কেউ না দেখাতে চায় তাহলে যখন সেই অন্ধকার দিক প্রকাশিত হয় তখন সেই অন্ধকারকে আরো বেশি অন্ধকার বা নিকষ কালো মনে হয়।

আসুন লোডশেডিং নিয়ে কেউ যেন মিথ্যা না বলি। কিংবা আসল বিদ্যুতের আলো নিয়েই যেন খেলি। ‘অস্ট্রেলিয়া বা ফ্রান্সে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বাঁচানোর জন্য বিদ্যুৎহীন থাকা কিংবা সাশ্রয়ের ঘটনা দেখেছি আমরা’ অথবা ‘একটা ছেলের কাছে জানতে চান হারিকেন কি সে বলতে পারবে না’- এমন কথা যেন না শুনি।

মনে করতে চাই না সে কথা- ‘লোডশেডিং এখন জাদুঘরে চলে গেছে’। আসল কথা হচ্ছে দেশে আবার ঘটা করে লোডশেডিং ফিরেছে (জুলাই ২০২২), ফিরে এসেছে সেই লোডশেডিং কালচার।

আগে পাবলিক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে লোডশেডিং এর সময় হলের ছাদে গান বা গালি প্রতিযোগিতার আয়োজন দেখা যেত। জুট বা টেক্সটাইলস মিলগুলোর কলোনিতে সন্ধ্যার পরে লোডশেডিংয়ের সময়ে ঘুরে বেড়ানো, গান গাওয়া কিংবা প্রেমিক জুটিদের কার্যকলাপ চোখে পড়তো। এখন লোডশেডিং নিয়ে টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টক শো হয়।

পত্রিকা বা টেলিভিশনের খবর শুনে যা জানা যায় তা এমন- বৃষ্টি হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমে। চাহিদার তুলনায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় গ্রাম এলাকাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখে সিনেমাকে যত ভালো মনে হয়, বাস্তবে তেমন নাও হতে পারে। তাই লোডশেডিং এর যে ঘোষণা বা রুটিন করে দেয়া হয়েছে অভিযোগ আছে, বাস্তবে তার নাকি তিনগুণ লোডশেডিং হচ্ছে।

‘বিদ্যুতের কুইক রেন্টাল সিস্টেম দিয়ে পাবলিকের গলা কাটা হয়েছে, এখন বিদ্যুৎহীন থাকলেও টাকা দিতে হবে পাবলিককে' বিরোধী দলগুলোর নেতাদের এ অভিযোগ। তারা বলছেন, 'কুইক রেন্টালের নামে ব্যাংক উজাড় হচ্ছে, একসময় বিদ্যুৎ থাকবে না কিন্তু জনগণকে ঠিকই বিল দিতে হবে', 'যারা বিদ্যুতের প্লান্ট খুলেছিলেন তারা কি সবসময় স্টেশন খোলা রাখছেন, নাকি নিজেদের মতো করে উৎপাদন করছেন' ইত্যাদি।

আসল কথা নাকি এই যে, বিদ্যুত খাতে বছরে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার! যদি তাই হয় তাহলে আবার লোডশেডিং ফিরিয়ে আনা কেন? ২০০৭-২০০৮ এ যেমন লোডশেডিং ছিল তেমনই থাকতো। একটা রুটিন বা নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে ক্রমশ কমিয়ে আনা যেত লোডশেডিং। নাকি আরও কোন ফাঁকফোকর আছে যা একদিন ভয়ের মতো অন্ধকার হয়ে নেমে আসতে পারে আমাদের জীবনে?

লেখাটা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। রম্য লেখার চরিত্র এমন না। সেখানে আনন্দটাই মুখ্য। তাই লোডশেডিং এর দুটো গল্প বলে বিদায় নেই। প্রথমটা হাসপাতালের গল্প।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একজন এসেছে হাসপাতালে। তার পায়ের অপারেশন হবে। অপারেশনের সময় লোডশেডিং হলো। সুতরাং মোমবাতিই ভরসা। রোগীর জ্ঞান ফেরার পর ডাক্তার বললেন- আপনার জন্য দুটো খবর আছে। একটা ভালো আর অন্যটা সামান্য খারাপ। রোগি বললো- ভালোটা আগে বলুন। ডাক্তার বললেন সড়ক দুর্ঘটনায় আপনি ডান পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। ওটা হাটু থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। ডায়াবেটিস থাকার পরেও অপারেশান সাকসেসফুল হয়েছে। রোগি বললো, এবার সামান্য খারাপটা বলুন। ডাক্তার জানালেন, অপারেশনের সময়ে লোডশেডিং থাকার কারণে প্রথমে ডান পায়ের জায়গায় বাম পা-টা কেটে ফেলা হয়েছিল।

জানি না বিদ্যুতের সামান্য খারাপ বা লোডশেডিং এর শেষ পরিণতি কেমন হবে। এবারে দ্বিতীয় গল্প। এক দম্পতির ঘরে শান্তি নেই। স্বামী স্ত্রীকে সন্দেহ করে। লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ী স্বামী তার মার্কেটের দোকান বন্ধ করে বাসায় চলে আসলো। বাসাতেও লোডশেডিং। এদিকে স্বামীর অবস্থা চরমে। প্রাকৃতিক ডাক এসেছে। যখন তখন হয়ে যাবে। সে একটা মোবাতি জ্বালিয়ে টয়লেটের দরজা ধাক্কা দিল। এদিকে ছোট্ট ছেলে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে বললো-'বাবা হ্যাপী বার্থ ডে।' স্বামীর অবস্থা আরও চরমে পৌঁছালো। কিন্তু টয়লেটে যেন কে ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছে। লোকটির মেজাজ খিঁচড়ে গেল। সে গালি দিয়ে জানতে চাইলো- কোন ......ভেতরে?

ভেতর থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ কান্না কাতর গলায় বললো- 'হ্যাপি লোডশেডিং টু ইউ। ভাই আমি আইপিএসের ব্যবসা করি। ফ্রি দেব সেটা দয়া করে আমারে মাফ কইরা দেওন যায় না?'

যদি কারো মোম, স্টাবিলাইজার, আইপিএস, চার্জার ফ্যান বা লাইট (লোডশেডিং এর সময়ে এসবের ব্যবসা নাকি রমরমা হয়) ব্যবসা আগের চেয়ে বাড়ে তাহলে লোডশেডিংকে মাফ করে দিয়েন। ক্ষমা ‘মহৎ ও আলোকিত’ গুণ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক