Published : 28 Oct 2025, 06:26 PM
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে মূলত গত দুই দশকে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। নতুন সব বিভাগ, প্রোগ্রাম ও গবেষণার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা সংকট। যেগুলোর অন্যতম দক্ষ একাডেমিকের ঘাটতি এবং এই সংকট ক্রমাগত প্রকট হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত গবেষণা, উদ্ভাবন, জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলার দায়িত্ব। কিন্তু পর্যাপ্ত যোগ্য একাডেমিক না থাকলে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে; বিশেষ করে, দুনিয়াজুড়ে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা এবং কর্ম খাতের পরিবর্তন এত দ্রুত হচ্ছে যে নতুন শাখাগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব দিন দিন বাড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিকস কিংবা ডেটা সায়েন্স—এসব ক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা তার নতুন দিগন্তরেখা তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব ক্ষেত্রে আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণা খাতে অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত প্রফেসর নিয়োগ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে নতুন প্রোগ্রাম শুরু হলেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয় এবং গবেষণার ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়ে। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের এখনই বিকল্প ভাবতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল পদক্ষেপ নিয়েছে। চীনের ‘থাউজেন্ড প্রফেসর হান্টিং প্রজেক্ট’ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই প্রকল্পের আওতায় বিদেশে অবস্থানরত চীনা একাডেমিশিয়ানদের দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে এবং তাদেরকে আন্তর্জাতিক মানের বেতন, সুবিধা ও গবেষণার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা চীনের বিশ্ববিদ্যালয়- গুলোতে কাজে লাগছে, শিক্ষার্থীরা দেশেই বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, খেলাধুলার জগতেও আমরা একই কৌশলের সফল প্রয়োগ দেখতে পাই। আলজেরিয়া তাদের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব থেকে ডেকে এনে জাতীয় দলে যুক্ত করেছে। মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতার টানে অনেকে সাড়া দিয়েছেন এবং দেশের হয়ে খেলছেন। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, যোগ্য মানবসম্পদকে উৎসাহিত করে মাতৃভূমির উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সিনিয়র একাডেমিক সংকট করুণ এক বাস্তবতা। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক শিক্ষক থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতার অভাব থেকে যাচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি গবেষণা কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, তাদেরকে একই সঙ্গে ক্লাস নেওয়া, গবেষণা পরিচালনা, থিসিস তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। ফলে অনেকে গবেষণায় মনোনিবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। স্বাভাবিকভাবেই উচ্চশিক্ষার গুণগত মান কমে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। একটি ফলপ্রসূ সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস্টারিং এবং একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি অথবা যেকোনো একটি বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর থাকেন, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদানের আমন্ত্রণ করতে পারে। একইভাবে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্য কোনো বিষয়ের
একজন দক্ষ প্রফেসর থাকেন, তবে তিনিও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াতে পারেন। এভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও শিক্ষক বিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর এককভাবে চাপও পড়বে না।
এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও একটি বৃহত্তর পরিবারে পরিণত হতে পারে। শিক্ষকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগাভাগি করতে পারবেন, শিক্ষার্থীরা বহুমাত্রিক শিক্ষা লাভ করবে এবং উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি অধ্যাপকদেরও আংশিক সময়ের জন্য যুক্ত করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা দেশেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পাবে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে।
বাংলাদেশ এখন উচ্চশিক্ষার এক রূপান্তরমূলক সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক, তবে গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে অভিজ্ঞ ও যোগ্য একাডেমিকের বিকল্প নেই। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং একাডেমিকদের এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা যদি যৌথভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে। এমনকি সিনিয়র একাডেমিকের সংকটও কাটিয়ে ওঠা যাবে। উচ্চশিক্ষা পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।