২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

মূল্যস্ফীতি কমছে, তবুও কেন বাজারে মিলছে না স্বস্তি?

সরকারি তথ্যে মূল্যস্ফীতি কমলেও কেন কাঁচাবাজারে গিয়ে ক্রেতার স্বস্তি মেলে না? এ কি স্রেফ পরিসংখ্যানগত বিভ্রম, নাকি সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অসংযত মুনাফার ফল?

মূল্যস্ফীতি কমছে, তবুও কেন বাজারে মিলছে না স্বস্তি?
সমান্তরাল বিতরণ ব্যবস্থা দিয়ে খোলা বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এম এম মুসা এম এম মুসা

Published : 09 Aug 2026, 10:20 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

গত এক বছরে বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করেছে—কখনো ৮ শতাংশের ঘরে, কখনো সাড়ে ৯ শতাংশ ছুঁয়ে। জুন মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৬ শতাংশ থেকে কমে ৮.৬০ শতাংশে নেমেছে বলে বিবিএসের তথ্য বলছে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে এই `হ্রাস’-এর অভিজ্ঞতা প্রায়শই বিপরীত—কাঁচাবাজারে গিয়ে ক্রেতা দেখেন সবজি, মাছ বা ভোজ্যতেলের দাম কমেনি; কোনো কোনো পণ্যে তা আরও বেড়েছে। এই বৈপরীত্য নিছক পরিসংখ্যানগত বিভ্রম নয়; গভীরতর কাঠামোগত সমস্যার একটি লক্ষণ, যা প্রচলিত মুদ্রানীতি-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণে প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক তত্ত্ব: ‘সেলার্স ইনফ্লেশন’ ও মূল্য-নির্ধারণ ক্ষমতা

২০২০ সাল পরবর্তী বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ইসাবেলা ওয়েবার এবং তার সহলেখকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেন, যা ‘সেলার্স ইনফ্লেশন’ নামে পরিচিতি পায়। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরবরাহ শকের (supply shock) সময়ে যেসব খাতে বাজার কাঠামো অপেক্ষাকৃত কম প্রতিযোগিতামূলক, সেসব খাতের বিক্রেতারা কেবল বর্ধিত ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন না, সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে মুনাফার হারও বাড়িয়ে নেন। এই তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য হলো, সরবরাহ শক প্রাথমিক ট্রিগার হিসেবে কাজ করলেও তার পরবর্তী তীব্রতা ও স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ধারিত হয় বাজারের কাঠামোগত প্রতিযোগিতাহীনতার দ্বারা—যেখানে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান বা মধ্যস্বত্বভোগী মূল্য-নির্ধারণে প্রাধান্য বিস্তার করে। এই কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি মিল্টন ফ্রিডম্যানের নিছক চাহিদা-সরবরাহ ভারসাম্যের প্রচলিত মডেল থেকে ভিন্ন—এটি জোর দেয় বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক গঠন ও ক্ষমতার অসমতার ওপর।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বীয় কাঠামো প্রয়োগ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—দেশের কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের কাঠামো আদৌ প্রতিযোগিতামূলক কিনা। এখানে লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) নিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বাজারদর পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও এই প্রতিবেদনগুলো মূলত মূল্যের ওঠানামা নথিভুক্ত করে—উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মূল্য-শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে কার হাতে কতটা মুনাফা যাচ্ছে তার কাঠামোগত বিশ্লেষণ এতে থাকে না।

বাংলাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খল: আড়তদার-মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামোর ভূমিকা

বাংলাদেশের কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার একটি সুপরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদক ও চূড়ান্ত ভোক্তার মধ্যে বহুস্তরীয় মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি—পাইকারি আড়তদার, কমিশন এজেন্ট, স্থানীয় ফড়িয়া এবং খুচরা বিক্রেতা। প্রতিটি স্তরে সংযোজিত মুনাফার প্রকৃত পরিমাণ নিয়মিতভাবে স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনো দুর্বল। কারওয়ান বাজারের মতো কেন্দ্রীয় পাইকারি বাজারগুলোতে সীমিতসংখ্যক আড়তদারের হাতে নির্দিষ্ট পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত থাকার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়। এই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য অর্থনীতিবিদ স্টিগলিৎজের তথ্য-অসমতা (information asymmetry) তত্ত্বের একটি বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র তৈরি করে—যেখানে বাজারের এক পক্ষ (এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা) মূল্য ও সরবরাহ সম্পর্কে অন্য পক্ষের (কৃষক ও ভোক্তা) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি তথ্য ও দর-কষাকষির ক্ষমতা রাখে, যা বাজারকে দক্ষতার পরিবর্তে ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত করে।

এই কাঠামোগত সমস্যা সরকারি হস্তক্ষেপ ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও সীমিত করে দেয়। টিসিবি কার্ডধারী পরিবারগুলোর মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে, যা বাজারদরের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কম দামে সরবরাহকৃত বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এই কর্মসূচির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা হলো—এটি খোলা বাজারের মূল্য-নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে কেবল একটি সমান্তরাল, সীমিত-পরিসরের বিকল্প বাজার তৈরি করে। ফলে খোলা বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের মূল্য-নির্ধারণ ক্ষমতা অক্ষত থেকে যায়, আর টিসিবির কর্মসূচি মূল সমস্যার সমাধান না করে কেবল তার প্রভাব আংশিকভাবে প্রশমিত করে—তাও শুধু কার্ডধারী পরিবারগুলোর জন্য, যা মোট ভোক্তা জনগোষ্ঠীর একটি সীমিত অংশ।

প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা: প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশে ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন পাস হওয়ার পর প্রতিযোগিতা কমিশন গঠিত হয়েছিল, যার মূল দায়িত্ব বাজারে অসাধু প্রতিযোগিতা-বিরোধী আচরণ, মূল্য যোগসাজশ (price collusion) ও কার্টেল কার্যক্রম তদন্ত করা। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘবদ্ধ মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ উঠলেও, এই প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির তুলনামূলকভাবে বিরল। এর বিপরীতে, ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশন (সিসিআই) বা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিতভাবে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে মূল্য-যোগসাজশ তদন্তে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে এবং জরিমানা আরোপ করে। এই তুলনা থেকে স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশে সমস্যাটি কেবল আইনি কাঠামোর অনুপস্থিতি নয়, বরং বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি।

অর্থনীতিবিদ রদ্রিকের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি সংক্রান্ত কাজ এই প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক—তার মতে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বাজার-সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করে কেবল সঠিক নীতি প্রণয়নের ওপর নয়; সেই নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরও। বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা এই দ্বিতীয় শর্তের ঘাটতিকে নির্দেশ করে—আইন থাকলেও তার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার তুলনামূলকভাবে কম। এই ঘাটতির একটি সম্ভাব্য কাঠামোগত ব্যাখ্যা হলো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও পাইকারি বাণিজ্যে যুক্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।

মজুতদারি, তথ্যের অস্বচ্ছতা ও মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধির পুনরাবৃত্তি

প্রতি বছর রমজান, দুর্গাপূজা বা শীতকালীন সবজি মৌসুমের প্রাক্কালে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ার যে পুনরাবৃত্ত প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তা কেবল চাহিদা বৃদ্ধির স্বাভাবিক ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। যদি এটি কেবল চাহিদা-সরবরাহ ভারসাম্যের প্রশ্ন হতো, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি অনুমানযোগ্য ও ধীরগতির হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যায় তা হলো আকস্মিক, খাড়া মূল্যবৃদ্ধি যা প্রায়শই সরবরাহ পরিস্থিতির প্রকৃত পরিবর্তনের চেয়ে দ্রুততর। এই প্যাটার্ন ওয়েবারের তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—পূর্বাভাসযোগ্য মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধিকে ব্যবহার করে বাজারের প্রভাবশালী অংশীজনরা মূল্য সমন্বয়ের একটি ‘সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য’ উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে, যা স্বাভাবিক সময়ে করা কঠিন হতো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল এই প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করলেও, পূর্বাভাসের ভিত্তিতে মজুত ব্যবস্থাপনা ও আমদানি সিদ্ধান্ত আগাম নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে বাণিজ্য বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে ইঙ্গিত করে আসছেন।

মুদ্রানীতির বাইরে গিয়ে বাজার-কাঠামো সংস্কার

এই বিশ্লেষণ থেকে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় তা হলো, বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্য সংকট মোকাবিলায় একমাত্র মুদ্রানীতি-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অপর্যাপ্ত। সুদহার বাড়িয়ে বা কমিয়ে সামগ্রিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, যদি সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্দিষ্ট স্তরে মূল্য-নির্ধারণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে মুদ্রানীতির সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছাবে না। এ জন্য প্রয়োজন তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। প্রথমত, প্রতিযোগিতা কমিশনকে প্রকৃত তদন্তকারী ক্ষমতা ও সম্পদ দিয়ে সক্রিয় করা, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্য-যোগসাজশের অভিযোগ নিয়মিতভাবে স্বাধীনভাবে তদন্ত করা যায়। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে মূল্য-সংযোজনের একটি স্বচ্ছ, পর্যায়ক্রমিক প্রকাশিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা, যাতে কোন স্তরে কতটা মুনাফা যুক্ত হচ্ছে তা জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, টিসিবির মতো সমান্তরাল বিতরণ ব্যবস্থার পরিবর্তে খোলাবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা—যেমন কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীর স্তর কমানোর লক্ষ্যে ডিজিটাল সরাসরি বিপণন প্ল্যাটফর্ম ও বিকল্প পাইকারি বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলা। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান নিম্নমুখী হলেও যতক্ষণ পর্যন্ত বাজারের কাঠামোগত ক্ষমতা-বৈষম্য অপরিবর্তিত থাকবে, ততক্ষণ সাধারণ ভোক্তার নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় স্বস্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা সীমিতই থেকে যাবে।

এম এম মুসা উন্নয়নকর্মী ও গবেষক। ই-মেইল: musamiah@gmail.com