Published : 04 Sep 2026, 08:37 AM
আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধ চলছে পশ্চিম এশিয়ায়—কিন্তু বাস্তবে এই যুদ্ধের সীমানা মানচিত্রের রেখায় আটকে নেই। ঢাকার পেট্রোল পাম্পে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ইউরোপের বিদ্যুৎ বিল, এশিয়ার জাহাজ কোম্পানির বর্ধিত ভাড়া, আরব দেশগুলোতে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকের পরিবারের উদ্বেগ—সবকিছুর সুতো গিয়ে মিশেছে হরমুজ প্রণালির সেই সংকীর্ণ জলপথে, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস চলাচল করে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, ছয় মাস পরও তা থামেনি; উল্টো তা বহুমাত্রিক ও বহুপাক্ষিক এক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তি, ইসরায়েল-ইরানের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং হুতি ও হিজবুল্লাহর মতো অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠিগুলো একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ফলে বিষয়টি আর কেবল পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এই যুদ্ধ এখন বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তার মূল কাঠামোকে নতুন ঘূর্ণাবর্তের দিকে টেনে নিচ্ছে।
বর্তমান সংকটের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা চালানো হয়, সংকটটি তখন নতুন মাত্রা পায়। ওই হামলার পর ইসরায়েল প্রথমে গাজায় এবং পরে লেবাননে সামরিক অভিযান সম্প্রসারিত করে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে বহুবার অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু প্রতিটিই ভেঙে পড়েছে অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের চাপে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশ-দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা অক্টোবরে কার্যকর হয় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনও পায়। কিন্তু এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়—হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজার প্রশাসনিক পুনর্বগঠন—বাস্তবায়নে গিয়ে থমকে যায়। এই আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেই সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় সমন্বিত বিমান হামলা চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং একাধিক শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিহত হওয়ায় ইরানের নেতৃত্ব কাঠামোয় নজিরবিহীন শূন্যতা তৈরি হয়।
ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে হরমুজ প্রণালিকে বন্ধ ঘোষণা করে এবং জাহাজ চলাচল থামাতে আক্রমণ শুরু করে। এভাবেই একটি ‘দ্বাদশ দিনের যুদ্ধ’ হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা রূপান্তরিত হয় দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে, যার সঙ্গে যুক্ত হয় ইয়েমেনের হুতি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোও। ২০২৬ সালের অগাস্ট শেষে যুদ্ধ ষষ্ঠ মাস অতিক্রম করে সেপ্টেম্বরে গড়ালেও, এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি দৃশ্যমান নয়। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভোটে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা আপাতত ইরান সংঘাত যেন আর না বাড়ে, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে হোয়াইট হাউসের এই গোপন রাজনৈতিক কৌশলের কথা—ভোটের আগ পর্যন্ত এই থমথমে বিরতি বজায় রাখার পরিকল্পনা করা হলেও, নির্বাচন পার হওয়ামাত্রই মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ জোরদারের চিন্তাভাবনা চলছে। অর্থাৎ, নভেম্বরের ভোটের পর্দা নামার পরপর পশ্চিম এশিয়া যে আবারও পূর্ণ মাত্রার ধ্বংসাত্মক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে, সেই আশঙ্কা এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন এক দফা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন, যাকে তিনি নিজেই ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ আখ্যা দিয়েছেন—তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চাপ ইরানের প্রতিরোধকে দুর্বল করার বদলে তাকে আরও কঠোর করে তুলেছে। একই সময়ে হুতি বিদ্রোহীরা তাদের কার্যক্রম ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে সৌদি আরব পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছে, যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা তৈরি করেছে সৌদি-হুতি সম্পর্কে। লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে জুন মাসের যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে বেসামরিক প্রাণহানিও ঘটেছে। গাজায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনার আওতায় হামাস তাদের অস্ত্র ত্যাগ ও বেসামরিক শাসনের হাতে গাজা হস্তান্তরের নীতিগত সম্মতি দিলেও, ইসরায়েল একতরফাভাবে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে চলেছে এবং গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। জাতিসংঘে মার্কিন শান্তি উদ্যোগের প্রতিনিধি নিজেই সম্প্রতি ইসরায়েলের এই আচরণের সমালোচনা করে সতর্ক করেছেন যে, বিকল্প পথ আরেকটি নতুন যুদ্ধেই গিয়ে ঠেকবে।
এই সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট করে দেয়—পশ্চিম এশিয়ায় এখন একটিমাত্র যুদ্ধ নয়; একাধিক আন্তঃসংযুক্ত সংঘাত একযোগে চলছে, যেগুলো একে অপরকে জ্বালানি জোগাচ্ছে। পরাশক্তি ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সংশ্লিষ্টতা এই যুদ্ধকে পরোক্ষ বিশ্বযুদ্ধের চরিত্র দিচ্ছে; মূলত এতে জড়িত শক্তিগুলোর বিস্তৃতি ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ সামরিক পক্ষ। মার্কিন নৌবাহিনীর একাধিক বিমানবাহী রণতরী দীর্ঘ সময় ধরে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকায় সেনাসদস্যদের মানসিক চাপ ও রণসম্ভারের ঘাটতি নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয় প্রতিদিন প্রায় নয়শ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে থিংক-ট্যাংকগুলোর হিসাব বলছে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাশিয়া এই যুদ্ধে সরাসরি সেনা না পাঠালেও ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য, উপগ্রহ চিত্র ও কৌশলগত সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কৌশলগতভাবে রাশিয়া এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগীও বটে—জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রুশ রাষ্ট্রীয় বাজেটে বিপুল উদ্বৃত্ত এনে দিচ্ছে, যা ইউক্রেইন যুদ্ধে মস্কোর সামরিক ব্যয় মেটাতে সহায়ক হচ্ছে। চীন তুলনামূলকভাবে সতর্ক কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়েছে—একদিকে ইরানকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, অন্যদিকে নিজেকে ‘স্থিতিশীলতার পক্ষ’ দাবি করে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে একটি পাঁচ-দফা শান্তি প্রস্তাবও উপস্থাপন করেছে। রাশিয়া-চীন-ইরান অক্ষের এই ক্রমবর্ধমান সমন্বয়—জাতিসংঘে সমন্বিত অবস্থান, জ্বালানি ও প্রযুক্তি বিনিময়—পশ্চিমা নিরাপত্তা-বিশ্লেষকদের কাছে ‘প্রতিপক্ষ-সারিবদ্ধতা’ (adversary alignment) নামে একটি নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
উপসাগরীয় ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাসে ব্যস্ত। এর ফলে এখানে এরই মধ্যে ‘ইসলামিক নেটো’ বলে পরিচিতি পাওয়া নেটো-সদৃশ নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটছে। গত ৭ অগাস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে।
এই চুক্তির মূল ভিত্তি নেটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো—অর্থাৎ, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সবাই মিলে তা প্রতিহত করবে। এই জোটের মাধ্যমে সৌদি আরবের বিপুল অর্থ ও কৌশলগত অবস্থান, তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক শিল্প ও ড্রোন প্রযুক্তি, এবং পাকিস্তানের পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী একত্র হচ্ছে। ৩১ অগাস্ট ইস্তাম্বুলে এই জোটের প্রথম উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও কূটনৈতিক কমিটির বৈঠক হয়েছে। এখানকার দেশগুলো বুঝতে পারছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর আর পুরোপুরি ভরসা করা যাচ্ছে না। তাই তারা নিজেদের সুরক্ষায় স্বায়ত্তশাসিত সামরিক শক্তি গড়ে তুলছে।
এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তৃত হচ্ছে সর্বত্র। পশ্চিম এশিয়া বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়, এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক ট্যাংকার চলাচল কার্যত থমকে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে পুনর্বিন্যস্ত করতে হয়েছে, যাতে যাত্রার সময় ১০ থেকে ২০ দিন বেড়ে গেছে এবং জাহাজ ভাড়া বহু ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এশিয়া ও ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম কোথাও কোথাও দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, বিশেষত কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর, যার ক্ষতি পূরণে কয়েক বছর সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, আধুনিক বিশ্বে ‘স্থানীয় যুদ্ধ’ বলে প্রকৃতপক্ষে কিছু নেই। একটি প্রণালির অবরোধ যেভাবে ইউরোপের বিদ্যুৎ বিল, এশিয়ার শিল্প উৎপাদন, আফ্রিকার খাদ্যপণ্যের মূল্য এবং বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে, তা একবিংশ শতাব্দীর আন্তঃসংযুক্ত অর্থনীতি ও নিরাপত্তা-কাঠামোরই অনিবার্য পরিণতি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল একদিকে, রাশিয়া-চীন-ইরান অন্যদিকে—এই দুই মেরুর মধ্যে যে ছায়া-দ্বন্দ্ব দানা বাঁধছে, তা প্রত্যক্ষ বিশ্বযুদ্ধের রূপ না নিলেও আগামী দিনে এই যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করবে কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তই নয়, বরং মস্কো ও বেইজিংয়ের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্ব অর্থনীতির সহনশীলতাও।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি-আমদানি নির্ভর ও প্রবাসী-আয়ের ওপর ভরসাশীল অর্থনীতির জন্য এই বাস্তবতা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রতি উদাসীন থেকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করার দিন শেষ। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বিশ্ব তত বেশি উপলব্ধি করবে যে পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত আসলে কোনো একক অঞ্চলের যুদ্ধ নয়—এটি একবিংশ শতাব্দীর বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক রক্তাক্ত মহড়া।
শিপ্রা বিশ্বাস কবি ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: shipu.biswas@gmail.com