১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মিয়ানমারে যদি রোহিঙ্গাই না থাকে, ন্যায়বিচারের মূল্য কী?

২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণহত্যার নয় বছর পরও রাখাইনে সংকট কাটেনি। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলছে হত্যা, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা। আর, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা কাটাচ্ছে অনিশ্চিত জীবন।

মিয়ানমারে যদি রোহিঙ্গাই না থাকে, ন্যায়বিচারের মূল্য কী?
২০১৭ সালে জান্তার চালানো গণহত্যার মতোই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক নির্যাতন। ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার নীল নকশা এটি। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ২৪

লেখা: তুন খিন | অনুবাদক: রাকিবুল রাকিব

Published : 07 Sep 2026, 08:13 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

অগাস্টের ১৫ তারিখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির জন্য এক মর্মান্তিক দিন। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের জান্তা তাদের ওপর গণহত্যা শুরু করে। ছোট ছোট বাচ্চাদের আগুনে ফেলে দেয়। নারীদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় অনেক পরিবার হত্যার শিকার হয়। কাউকে কাউকে বাড়ির ভেতরেই জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ফলে ওই সময় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

ইন্দো-আর্য ভাষাভাষি মুসলিম রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যেই রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের ওপর আবারও নির্যাতন শুরু হয়েছে। অনেকে দেশ ছাড়ছে; নিরাপদ জীবনের আশায় কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দিচ্ছে।

তবে, এই কঠিন সময়ে আর্জেন্টিনা ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের চলমান বিচার রোহিঙ্গাদের আশা দেখাচ্ছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো ব্যর্থ।

যে গণহত্যা কখনো থামেনি

গত দুই বছরে রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতার চিত্র বদলে গেছে। রোহিঙ্গাদের প্রধান বসতিসহ রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এতে অবশ্য রোহিঙ্গাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

আরাকান আর্মি রাখাইনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা ও বেছে বেছে হামলার অভিযোগ উঠেছে। রোহিঙ্গারাও এসব হামলার শিকার হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের জোর করে দলে নেওয়া হচ্ছে। অনেকে আটক আছেন। তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। চলাফেরার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যৌন সহিংসতাও চলছে। ২০১৭ সালের গণহত্যার সময় রোহিঙ্গারা এমন সহিংসতার শিকার হয়েছিল।

রাখাইনের রোহিঙ্গারা বলছেন, আরাকান আর্মির নির্যাতন ২০১৭ সালে জান্তার চালানো গণহত্যার মতোই ভয়াবহ। এসব ঘটনা রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া কিংবা মিয়ানমার থেকে তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার পরিকল্পনার অংশ।

মিয়ানমার জান্তা বহু বছর ধরে বর্ণবাদী মনোভাব থেকে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করছে। আরাকান আর্মির আচরণেও ওই একই মনোভাব দেখা যাচ্ছে। নির্যাতনকারী বদলেছে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের মানুষ হিসেবে না দেখার মানসিকতা বদলায়নি। তাদের পরিচয় ও অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, নিজ ভূমিতে ফিরতে বাধা দেওয়া ও জমি কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। উপরন্তু রাখাইনদের জন্য নতুন বসতি গড়ে তুলছে। এসব বসতি তৈরিতে রোহিঙ্গাদের জোর করে কাজ করানো হচ্ছে। ফলে নিজ জমিতে তাদের ফিরে যাওয়া আজ আরও কঠিন।

কোথাও নিরাপত্তা নেই

২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। অথচ এই সময়েই আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমেছে; শরণার্থী শিবিরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ কমেছে। গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা অনেক শিশু শিক্ষা ছাড়াই বেড়ে উঠছে।

শরণার্থী শিবিরেই অনেক শিশুর জন্ম হচ্ছে। বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এভাবে রোহিঙ্গা শিশুদের একটি পুরো প্রজন্ম শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের সামনে এখন নিরাপদ কোনো পথ নেই। নিজ ভূমিতে থাকলে ক্ষুধা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়। আর পালিয়ে এলে শরণার্থী শিবিরে কাটাতে হয় ভয় ও অনিশ্চয়তার জীবন। যেন এই দুটির একটিকে বেছে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।

ভিটেমাটি ছাড়লেও নিরাপদে পালানোর পথ নেই। যারা রোহিঙ্গাদের পালাতে বাধ্য করছে, তাদের কেউ কেউ আবার মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে তারা মুনাফা লুটছে।

জুলাই মাসে শিশু ও তরুণসহ পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নিয়ে রাখাইন থেকে রওনা হওয়া দুটি নৌকা ডুবে যায়। নিজ গ্রামে থাকাটা বিপজ্জনক না হলে কোনো বাবা-মা সন্তানদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাঠাতেন না।

যেসব দেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেখানেও তাদের প্রতি বিদ্বেষ বাড়ছে। সরকারগুলো তাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলছে। অথচ একই সময়ে আরও রোহিঙ্গাকে রাখাইন ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। ফিরে যেতে চাইলেও তারা নিজ জমিজমা হারাচ্ছে।

আমরা রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব চাই, সমান অধিকার চাই; নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার চাই।

নয় বছর ধরে ন্যায়বিচারের লড়াই

গত নয় বছরেও রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য দায়ী মিয়ানমারের জান্তা নেতাদের শাস্তি হয়নি; মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ একই বাহিনী মিয়ানমারের বিভিন্ন জনগোষ্ঠির ওপর নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই জবাবদিহি শুধু অতীত অপরাধের বিচার নয়; বর্তমান সহিংসতা বন্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ নৃশংসতা ঠেকানো জরুরি।

আরাকান আর্মির ক্ষেত্রেও একই ভুল করা যাবে না। আমরা আগেও এমন পরিস্থিতি দেখেছি। এর পরিণতি জানি। জান্তা ও আরাকান আর্মিকে শাস্তি ছাড়া নৃশংসতা চালিয়ে যেতে দিলে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়বে।

রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী ও বিভিন্ন সংগঠন বছরের পর বছর ধরে এসব অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করছে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে লড়াই করছে। কিন্তু সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ। তাই রোহিঙ্গারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ন্যায়বিচারের পথ খুঁজেছে।

ওই লড়াইয়ের ফল শেষমেশ পাওয়া যাচ্ছে। আমার সংগঠন ‘বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে’ আর্জেন্টিনার আদালতে ‘সর্বজনীন এখতিয়ারের’ আওতায় একটি মামলা করেছিল। এর পর মিন অং হ্লাইং ও জেনারেল সো উইনসহ ২২ সামরিক কর্মকর্তা ও তিন বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টাও আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা গণহত্যা মামলার রায় আগামী মাসগুলোতে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে রোহিঙ্গারা নিজ মাতৃভূমি থেকে আরও দূরে সরে পড়ছে। তাদের হত্যা ও জোর করে ঘরছাড়া করা হচ্ছে। নিজ ভূমি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আইনি অগ্রগতির তেমন অর্থ থাকে না। কারণ, রোহিঙ্গারা একদিন নিজ ঘরে ফিরতে চায়।

এতদূর আসতে আমরা বছরের পর বছর লড়াই করেছি। এখন বিভিন্ন সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব ধরনের চাপ দিতে হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কোনো দেশে ঢুকলে ওই দেশকে আর্জেন্টিনার জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে হবে। আর্জেন্টিনা ‘রেড নোটিশ’ চেয়ে ইন্টারপোলের কাছে যে অনুরোধ করেছে, ইন্টারপোলকে ওই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকারগুলোকে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর একসঙ্গে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। তাদের অস্ত্র, উড়োজাহাজের জ্বালানি ও আয়ের পথ বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে আরাকান আর্মির ওপর জোরালো আন্তর্জাতিক চাপ দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘে মিয়ানমারবিষয়ক কাজের দায়িত্বে থাকা যুক্তরাজ্যকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। রাখাইনে চলমান নৃশংসতা, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়া ও ধীরগতির পদক্ষেপের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকতে হবে।

বাংলাদেশ ও রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার তহবিল বাড়াতে হবে। সীমান্ত পেরিয়ে সহায়তা পৌঁছানো সহজ করতে হবে। মানবিক সহায়তার পথে থাকা বাধা দূর করতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আসন্ন রায়ের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, ওই জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

মিয়ানমারে যদি কোনো রোহিঙ্গাই আর না থাকে, তাহলে বহু বছর পর পাওয়া বিচার ও জবাবদিহির কোনো অর্থ থাকে না।

রোহিঙ্গাদের কাছে বিচার শুধু আদালতের বিষয় নয়। বিচার মানে নিজ গ্রাম ও ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারা। কেড়ে নেওয়া নাগরিকত্ব ও অধিকার ফিরে পাওয়া। সবচেয়ে বড় কথা, মিয়ানমারে আর কখনো নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার না হয়ে স্বাধীনভাবে ও সমান মর্যাদায় বেঁচে থাকা।

লেখাটি ‘আল-জাজিরা’ থেকে অনূদিত; এর লেখক তুন খিন একজন রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী। তিনি ‘বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে’র (বিআরওইউকে) সভাপতি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষা এবং গণহত্যার বিচারের জন্য কাজ করছেন।