Published : 03 Mar 2026, 10:20 AM
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমন জটিল গোলকধাঁধা, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, জ্বালানি অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদী উত্তরাধিকার এবং আধুনিক শক্তির রাজনীতি একসূত্রে গাঁথা। এই অঞ্চলকে বোঝার জন্য কেবল সাম্প্রতিক সংঘাতের দিকে তাকালে চলবে না; এর গভীরে রয়েছে শতাব্দীব্যাপী সাম্রাজ্যিক উত্থানপতন, কৃত্রিম সীমান্তরেখার সৃষ্টি এবং পরাশক্তির হস্তক্ষেপ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপন সমঝোতার মাধ্যমে সাইকস–পিকট চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর আরব ভূখণ্ডসমূহ—বর্তমান সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও প্যালেস্টাইন—নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। পরবর্তীতে ১৯২০ সালের সেভার্স চুক্তি এবং ১৯২৩ সালের লুসান চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় সীমানা নির্ধারিত হলেও, বাস্তবে এসব সীমারেখা ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থরক্ষার ফলাফল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্তমানের প্রতিটি সংঘাতের ভেতরে ছায়ার মতো উপস্থিত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রতীক এই মানচিত্র। ১৯১৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাইকস–পিকট গোপন চুক্তির মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর মধ্যপ্রাচ্যের আরব ভূখণ্ড নতুনভাবে ভাগ করা হয়, যার প্রভাব আজও সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দৃশ্যমান।
আরব-ইসরায়েল বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরব বিশ্বের সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ এবং ১৯৭৩ সালের রমজান যুদ্ধ বা অক্টোবর যুদ্ধ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করে। ফিলিস্তিন সমস্যা আজও অমীমাংসিত। ইরান নিজেকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও আরব বিশ্বের কিছু সরকার তা সমর্থন করে না, তবুও মুসলিম বিশ্বের বড় অংশে ব্যাপক সমর্থন পায়। অন্যদিকে, উপসাগরীয় অনেক আরব দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, যার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত অ্যাব্রাহাম চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যা ইরানের দৃষ্টিতে আঞ্চলিক ভারসাম্যে তার বিপরীতে প্রভাব ফেলে।
মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের প্রতীক হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত অ্যাব্রাহাম চুক্তি।
এমতাবস্থায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দীর্ঘ ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি কেবল একটি সামরিক অভিযানের ফল নয়; আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত। দখলদার ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যগত মিত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। অপরদিকে ইরান নিজেকে আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষের কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল ও পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার চেষ্টা করে।
১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী দেশ ত্যাগ করেছেন—এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানের তেহরানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে।
এই সংঘাতের সূত্রপাত ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্যেই নিহিত। শাহ শাসনের অবসান এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে। সেই সময় থেকে ইরান ধীরে ধীরে নিজস্ব আদর্শিক ও কৌশলগত জোট গড়ে তোলে। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের সরকার এবং ইয়েমেনে হুথি আন্দোলন।
এই প্রভাববলয় ইরানকে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষে জড়িত না হয়েও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত সুবিধা দিয়েছিল। ফলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সাম্প্রতিক হামলাগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে নয়; বরং এটি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক জোট কাঠামোর উদ্দেশ্যে প্রেরিত কৌশলগত বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বিশ্বের জ্বালানি রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পারস্য উপসাগরের এই কৌশলগত জলপথটিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে বলছে ইরান।
জ্বালানি রাজনীতির দিক থেকে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ। পারস্য উপসাগর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বৈশ্বিক বাজারে প্রবাহিত হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে, শিপিং বীমার খরচ বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭৩ সালের তেল সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়েছিল। বর্তমান অস্থিরতা সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা নতুন করে সামনে এনেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে ইরানের হামলায় আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তারের উদ্বেগ তৈরি করেছে
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলগুলোর দৃষ্টিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৫৮ সালের লেবানন সংকটের সময় প্রথমবারের মতো মার্কিন সেনা এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়। কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি, বাহরাইনের নৌঘাঁটি, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটি, পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১৯টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক হামলার পর, এসব ঘাঁটি কেবল নিরাপত্তার প্রতীক নয়; এগুলো এখন সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে আধুনিক অসম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব স্থায়ী ঘাঁটিগুলো শুধুমাত্র কৌশলগত সুবিধা দেয় না, বরং গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা এবং নতুন হুমকিও উন্মোচন করে। যদিও এসব ঘাঁটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, শক্তির ভারসাম্য সমান নয়; ফলে নীতিগত স্বাধীনতা প্রায়ই কৌশলগত নির্ভরতার দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়। পাশাপাশি, স্বাগতিক দেশগুলো নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে: বিদেশি সামরিক উপস্থিতি কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি দেশগুলোকে বৃহৎ শক্তির সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে দিচ্ছে?
আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের মধ্যস্থতায় উভয় দেশের মধ্যে পুনর্মিলনের উদ্যোগ দেখা গেছে, তবুও পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিল। অন্যদিকে, তুরস্ক তার নব্য উসমানীয় কৌশলকে সামনে রেখে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব নিরাপত্তা, প্রভাববলয় এবং কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় সচেষ্ট।
ইসরায়েল ইরান সংঘাতের আরেকটি মাত্রা হলো পারমাণবিক প্রশ্ন। ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা চুক্তি আঞ্চলিক উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমালেও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ইরান তার কর্মসূচি সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিলে ইসরায়েল তা প্রতিরোধে দৃঢ় অবস্থান নেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা কৌশলগত বার্তা বহন করে যে ইসরায়েল প্রয়োজনে একতরফা পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও এর সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল, বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং পর্যটন খাতে মন্দা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যুবসমাজ, যারা একসময় আরব বসন্তের সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তারা এখন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দ্বিধা ও সংশয়ে রয়েছে। বিভিন্ন রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ সংহতি জোরদার করতে জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের আশ্রয় নিচ্ছে; তবে দীর্ঘমেয়াদে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এই জটিল বাস্তবতায় স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে হবে বহুপাক্ষিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সমঝোতার মাধ্যমে। কূটনৈতিক উদ্যোগ, আস্থা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া স্থায়ী শান্তি কল্পনা করা কঠিন। বিদেশি সামরিক ঘাঁটি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত সমাধান। বহিরাগত শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। তাই বর্তমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত কেবল একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি এমন এক মোড়, যেখানে অঞ্চলটির রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে হবে। বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যও এই সিদ্ধান্তগুলোর ওপর নির্ভর করবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি কম্পন আজ বৈশ্বিক ব্যবস্থায় প্রতিধ্বনি তোলে।