১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি, পুরনো রাজনীতির ছায়া: পথহারা এনসিপি

বৈষম্যহীন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেও ক্ষমতা চর্চা করতে গিয়ে এনসিপি কি পুরনো রাজনীতির বৃত্তেই আটকে গেল?

পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি, পুরনো রাজনীতির ছায়া: পথহারা এনসিপি
অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির যাত্রারম্ভের দিন। ফাইল ছবি

আরিফুল ইসলাম সাব্বির আরিফুল ইসলাম সাব্বির

Published : 23 Aug 2026, 12:15 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে দেশে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল, তার অবসান ঘটেছিল মূলত তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে। কোটা সংস্কারের একটি নির্দিষ্ট ও অহিংস দাবি নিয়ে শুরু হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে সর্বস্তরের মানুষের মুক্তির সংগ্রামে পরিণত হয়। সে সময় মানুষের মনে যে গভীর আবেগ ও অভূতপূর্ব ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তা কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ছিল না। মানুষের অন্তরে কাজ করছিল একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের গভীর প্রত্যাশা—যেখানে সব ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটবে, মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, আইনের শাসন কায়েম হবে এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠিত হবে। মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক রূপান্তর ঘটাবে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী দিনগুলোতে ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তি, ক্ষমতার চর্চা এবং দল গঠনের প্রক্রিয়া সেই বিপুল আশাবাদকে জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের রূপান্তর ঘটিয়ে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। দলটির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, তারা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনআকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ দেবে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু যাত্রার শুরু থেকেই দলটি জনগণের নিরঙ্কুশ আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এর প্রধানতম কারণ ছিল ক্ষমতা ও দলীয় রাজনীতির মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা যখন অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার সরাসরি দায়িত্বে ছিলেন, ঠিক তখনই তাদের  মদতে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া গতি পায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যে সরকারের অঙ্গীকার ছিল দলনিরপেক্ষ থাকার, সেই সরকার পরিচালনার অংশ হয়ে রাজনৈতিক দল গঠনের নেপথ্যে নেতৃত্ব দেওয়া সমালোচিত হয়েছে শুরু থেকেই। বিরোধীদের অভিযোগ নতুন এই দলকে দাঁড় করাতে রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধাকে কাজে লাগানো হয়েছে। ফলে জন্মলগ্নেই বাংলাদেশের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ‘কিংস পার্টি’র তকমা তাদের গায়ে সেঁটে যায়। সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যকার এই স্বার্থের সংঘাত তরুণদের সংস্কারকামী ভাবমূর্তিকে শুরুতেই দুর্বল করে দেয়।

জুলাই আন্দোলনের প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম ছিল রাষ্ট্রীয় জুলুম, গুম, খুন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে আইনের শাসনের সংকট দূর হওয়ার পরিবর্তে মব ভায়োলেন্সের উদ্বেগজনক বিস্তার দেখা যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে মানুষকে বাছবিচারহীনভাবে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনির মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক অপমানজনকভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা, মাজার ও উপাসনালয়ে হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের ওপর আক্রমণ, থানা ও সরকারি দপ্তরে বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানোর মতো ঘটনা ঘটে। এই বিচারহীনতার শিকার হয়ে বহু মানুষ নিহত, গুরুতর আহত ও পঙ্গু হন, যাদের অনেকেই সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন বলে প্রমাণ মিলেছে। এই সব সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ নিজেদের এনসিপির নেতা-কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ তো দূরের কথা সময়মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং কোনো কোনো ঘটনাকে ‘জনরোষ’ বা ‘বিপ্লবী প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে চরমভাবে নাড়িয়ে দেয়। যে তরুণদের হাতে নতুন দিনের সূচনা হওয়ার কথা ছিল, তাদের সময়েই আইনের বিকল্প হিসেবে মব ভায়োলেন্স স্বাভাবিক রূপ পাওয়া সমাজে নতুন করে গভীর নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে।

ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশের পর সততা ও দুর্নীতির প্রশ্নে যে আপসহীন অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল, সেখানেও গুরুতর ফাটল তৈরি হয়। দল গঠনের আগে ও পরে বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জনপরিসরে আসতে শুরু করে। মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলীয় ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়া এবং এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের কাগজ ক্রয়ে মধ্যস্বত্বভোগী কমিশনের সঙ্গে নেতাদের নাম জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। একই সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সহকারী ও স্বজনদের ঘিরে তদবির বাণিজ্যের গুঞ্জন মানুষের মাঝে গভীর হতাশার জন্ম দেয়। যদিও এসব অভিযোগের অধিকাংশেরই কোনো নিরপেক্ষ বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তা অস্বীকার করেছেন, তবুও ক্ষমতাচর্চার সূচনালগ্নেই তরুণ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুরনো আমলের প্রশাসনিক দুর্নীতি ও তদবির সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি মানুষকে আশাহত করে। এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কেবল মুখের কথায় পুরনো দুর্নীতি সংস্কৃতি দূর করা যায় না; এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আন্তরিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।

রাজনৈতিক আদর্শ ও মতাদর্শিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও এক ধরনের বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল নৈতিক ভিত্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। এই সর্বজনীন বয়ানে আস্থা রেখেই সমাজের প্রগতিশীল, মধ্যপন্থি ও সাধারণ নাগরিকেরা রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু ক্ষমতা-পরবর্তী সময়ে দলটির নেতাদের পক্ষ থেকে জুলাই আন্দোলনকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করার চেষ্টা করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের জন্ম দেয়। এর পাশাপাশি নির্বাচনি লাভালাভ ও ক্ষমতার হিসাব মেলাতে জামায়াতে ইসলামীর মতো আদর্শিক বিপরীত মেরুর দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া হয়। এই কৌশলগত পদক্ষেপ মুক্তমনা, সেক্যুলার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি বিশাল জনগোষ্ঠির মধ্যে গভীর আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে। তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারমুখী দর্শনকে বিসর্জন দেওয়ার এই প্রবণতা দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় একটি দিক হলো আন্দোলনের সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক চরিত্রকে অস্বীকার করে একক দলীয় কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ৫ অগাস্টের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠির কৃতিত্ব ছিল না। অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কর্মীদের সমান্তরালে কোনো ধরনের দলীয় রাজনীতি না করা লাখ লাখ সাধারণ ছাত্র-জনতার সম্মিলিত রক্ত ও আত্মত্যাগের ফলেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর এনসিপি এই ঐতিহাসিক অর্জন ও ব্যাপক জনসমর্থনকে নিজেদের স্থায়ী এবং একক দলীয় রাজনৈতিক পুঁজি বলে ধরে নেওয়ার ভুল মূল্যায়ন করে। যৌথ অর্জনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা একক দলীয় সম্পদে রূপান্তরের এই চেষ্টার ফলে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। এর ফলে পরবর্তীকালে বিভিন্ন জেলা সফরে সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া না পাওয়ার ঘটনা দলটির মাঠপর্যায়ের বিচ্ছিন্নতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্নে। রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের বড় বড় তাত্ত্বিক বক্তব্যের চেয়ে সাধারণ নাগরিকের কাছে জরুরি ছিল বাজারে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে মুক্তি, আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক পরিবেশ এবং নিরাপদ সামাজিক জীবন। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে দেয়। মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট দূর করার ক্ষেত্রে কোনো দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন এবং বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যানে পাচার সংক্রান্ত বিতর্ক বজায় থাকা জনমনে হতাশা আরও বাড়িয়ে তোলে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত না করে কেবল ক্ষমতার পদপদবি বণ্টন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত থাকায় সাধারণ জনগণ ও তরুণ নেতৃত্বের মাঝে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের এক ঐতিহাসিক বিজয়। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন জেগেছিল, ক্ষমতার মোহ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, মব ভায়োলেন্সের বিস্তৃতি এবং আদর্শিক বিচ্যুতির কারণে তা আজ এক বিরাট সংকটের মুখে পড়েছে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি ক্ষমতার পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রভাব-বাণিজ্যেরই পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা কেবল একটি দলের ক্ষতি করে না, বরং দেশের সামগ্রিক তরুণ নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দীর্ঘকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্ষমতা-রাজনীতির সংকীর্ণ স্বার্থ ত্যাগ করে গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন—ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সাম্য এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করাই যেকোনো নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মশুদ্ধি ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র পথ।

আরিফুল ইসলাম সাব্বির সাংবাদিক। ই-মেইল: ariful.islam1952bd@gmail.com