১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মিড-ডে মিল: সংখ্যায় মিল, বাস্তবে গরমিল

কাগজে-কলমে শতকোটি টাকার বরাদ্দ আর সুপরিকল্পিত পুষ্টি খাদ্য তালিকা, অথচ বাস্তবে শিক্ষার্থীদের পাতে যাচ্ছে পচা কলা, ভাঙা ডিম! পাশাপাশি রয়েছে সরবরাহ ঘাটতি! ‘মিড-ডে মিল' কর্মসূচি নিয়ে শুরুতে যত আশা ছিল, গত কয়েক মাসে তা উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

মিড-ডে মিল: সংখ্যায় মিল, বাস্তবে গরমিল
কাগজের হিসাবে বরাদ্দ সোয়া দুই লাখ ডিম, অথচ বাস্তবে পৌঁছেছে মাত্র ১৬ হাজার; স্কুলের পুষ্টিকর খাবার বিতরণে তদারকির অভাবে বাড়ছে অনিয়ম। মিলছে পচা ডিমও।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

Published : 05 Aug 2026, 10:10 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

দেশের দেড় শতাধিক উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে 'স্কুল ফিডিং' বা 'মিড-ডে মিল' কর্মসূচি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীদের সেদ্ধ ডিম, বনরুটি, দুধ, ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও ফল দেওয়ার কথা। প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক শিশুর জন্য এটাই দিনের মূল পুষ্টিকর খাবার। কিন্তু বাস্তবে সব স্কুলে নিয়মিত ও মানসম্মত খাবার পৌঁছাচ্ছে না। এমনকি কোথাও কোথাও দেওয়া খাবারের মান এতই খারাপ যে তা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি নিয়ে শুরুতে যত আশা ছিল, গত কয়েক মাসে তা উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো, উপস্থিতি বাড়ানো এবং পুষ্টি ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। এ কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন বনরুটি, সেদ্ধ ডিম, ইউএইচটি দুধ, ফর্টিফায়েড বিস্কুট এবং কলা বা মৌসুমি ফল দেওয়ার কথা। প্রায় তিন কোটি শিক্ষার্থীর জন্য এই কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

কাগজে-কলমে উদ্যোগটি সুপরিকল্পিত মনে হলেও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানহীন খাবার ও সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ আসছে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি উপজেলায় স্কুলে পৌঁছানোর আগেই ডিম ভেঙে যাওয়া, পাউরুটি শক্ত হওয়া কিংবা কলা পচে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণাঞ্চলের কিছু জেলায় আবার নির্ধারিত সময়ে খাবারই পৌঁছায়নি। একটি উপজেলায় দুই সপ্তাহে পৌনে তিন লাখ বনরুটি দেওয়ার কথা থাকলেও পৌঁছেছে মাত্র ২৯ হাজার। সোয়া দুই লাখ ডিমের জায়গায় দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার। স্থানীয় শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্যেই এমন চিত্র উঠে এসেছে।

একটি ঘটনার কথা এখানে না বললেই নয়। কয়েকদিন আগে একটি স্কুলের ফিডিং রুটিতে ব্লেড পাওয়ার দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা মুহূর্তে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। পরে অবশ্য তদন্তে বেরিয়ে আসে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি ছিল না; বরং একজন শিক্ষার্থী নিজেই শাস্তির ভয়ে ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল, আর একজন শিক্ষক তা যাচাই না করেই ছবি তুলে ছড়িয়ে দেন। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে মানুষের আস্থা এতটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে যে একটি অসত্য দাবিও মুহূর্তে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত বাজেট থাকার পরও এত বড় গাফিলতি কেন? মূল কারণ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা। খাবার সংগ্রহ ও বিতরণের কাজ হয় স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে। কিন্তু এই ধাপে কড়া নজরদারি না থাকায় নিম্নমানের খাবার কেনা, পরিবহনে অবহেলা ও আগেভাগে খাবার তৈরির মতো অনিয়ম ঘটছে। এমনকি একজন প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, তাদের স্কুলে কোন প্রতিষ্ঠান দুধ সরবরাহ করছে তা-ও তারা জানেন না। জবাবদিহির এই অভাবই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শুধু জরিমানা বা শোকজ করে কি সমাধান সম্ভব? উত্তর হলো, না। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানার অঙ্ক ঠিকাদারদের লাভের তুলনায় খুবই সামান্য। কোটি টাকার চুক্তির বিপরীতে কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকার জরিমানায় কার্যকর প্রতিরোধ হয় না। তাই মান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে কার্যাদেশ বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা বাস্তবেই কার্যকর করতে হবে।

আমরা কি তবে ধরে নেব যে এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন, নাকি এগুলো একটা বড় প্যাটার্নের অংশ? পাবনার বেড়া উপজেলায় সম্প্রতি যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই দিয়ে দেয়। সেখানে ভুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখিয়ে অতিরিক্ত খাদ্য বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, আর ওই অতিরিক্ত ডিম, বনরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। অর্থাৎ সমস্যাটা শুধু নিম্নমানের সরবরাহ নয়, কোথাও কোথাও পুরো ব্যবস্থাটাকেই ব্যক্তিগত সুবিধার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।

এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, সমস্যাটা কি শুধু নৈতিকতার, নাকি ব্যবস্থাপনার কাঠামোতেই ফাঁক রয়ে গেছে? বাস্তবতা হলো দুটোই সত্যি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা যাচাইয়ের জন্য যদি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা থাকত এবং তা সরাসরি বরাদ্দের সঙ্গে যুক্ত থাকত, তাহলে ভুয়া তালিকা তৈরির সুযোগ অনেকটাই কমে যেত। বাংলাদেশের অনেক বিদ্যালয়ে এখনো হাজিরা খাতায় হাতে লেখা হয়, যা সহজেই কারসাজির শিকার হতে পারে। উপবৃত্তি কর্মসূচিতে যেমন এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন যাচাই করে ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা হয়েছে, মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রেও একই মডেল অনুসরণ করা যায়।

উত্তর ইউরোপের কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। সেখানে স্কুলের খাবারকে শুধু একটি প্রকল্প নয়, শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়। মেন্যু নির্ধারণ হয় পুষ্টিবিদ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে। সপ্তাহজুড়ে বৈচিত্র্য বজায় রাখা হয় এবং ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব শিশু একই মানের খাবার পায়। খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কোনো গাফিলতি ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পার্থক্যটা শুধু বাজেটের নয়, দৃষ্টিভঙ্গিরও। বাংলাদেশেও এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বরাদ্দের ওপর নয়; কার্যকর তদারকি, জবাবদিহি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর।

তাহলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত সমাধান কী হতে পারে? সবচেয়ে জরুরি হলো সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা। কোন গাড়িতে কী পরিমাণ পণ্য উঠল, কখন বিদ্যালয়ে পৌঁছাল, বিদ্যালয় প্রধান তা গ্রহণের সময় ছবি বা বারকোড দিয়ে নিশ্চিত করলেন কি না এই পুরো প্রক্রিয়া একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপে রিয়েল-টাইমে নথিভুক্ত হলে সরবরাহকারী কত পাঠাল আর বিদ্যালয়ে কত পৌঁছাল তার ফারাক তাৎক্ষণিকভাবেই ধরা পড়বে, দুই সপ্তাহ পর প্রতিবেদন ঘেঁটে বের করতে হবে না।

এর পাশাপাশি গার্ডিয়ান কমিটি গঠনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা যেন কাগজে না থেকে যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিনিধি ও তিনজন অভিভাবক নিয়ে গঠিত এই কমিটির হাতে বাস্তব ক্ষমতা থাকা দরকার, যেমন নিম্নমানের চালান ফেরত পাঠানোর অধিকার এবং সরাসরি উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিলের সহজ ডিজিটাল মাধ্যম। অভিযোগ যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ফাইলবন্দি থাকে, তাহলে কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে।

সরবরাহকারীর গাড়িচালক ও পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তি একই হওয়ার নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার প্রতিটি চালানের সঙ্গে তারিখসহ গুণমান সনদ, বিশেষত ডিম বা দুধের মতো পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে। বিদ্যালয় প্রধানকে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার কীভাবে দ্রুত পণ্যের মান যাচাই করবেন, কারণ এখন পর্যন্ত এই দায়িত্ব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক ও অপ্রশিক্ষিতভাবে পালিত হচ্ছে।

শাস্তির কাঠামোতেও স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা দরকার। প্রথমবার মানভঙ্গের জন্য জরিমানা, দ্বিতীয়বার কার্যাদেশ স্থগিত, তৃতীয়বার কালো তালিকাভুক্তি। এমন স্পষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত কাঠামো থাকলে সরবরাহকারীরা ঝুঁকি নেওয়ার আগে দু-বার ভাববে। বর্তমান শাস্তি প্রক্রিয়া অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ও ঘটনাভিত্তিক, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিরোধমূলক বার্তা দেয় না। উপজেলা ও জেলা কর্মকর্তাদের আকস্মিক পরিদর্শনের প্রতিবেদনও জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত; অন্তত উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে, কারণ স্বচ্ছতা তখনই অর্থবহ হয় যখন তা স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছেও দৃশ্যমান থাকে।

এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বরাদ্দে নয়, বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির অভাবে। টাকা যথেষ্ট আছে, নীতিমালাও মন্দ নয়; কিন্তু যতক্ষণ না প্রতিটি ধাপে কে দায়ী থাকবেন তা স্পষ্ট হয় এবং ওই দায়বদ্ধতা প্রযুক্তি ও কমিউনিটি তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়, ততক্ষণ পাবনার মতো ঘটনা বারবার ফিরে আসবে।

সামনের অর্থবছরে কর্মসূচিটি আরও কয়েক শ উপজেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় বারো হাজার কোটি টাকায়। এত বড় বিনিয়োগের সুফল তখনই পুরোপুরি মিলবে, যখন প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। একটি শিশু স্কুলে গিয়ে যে খাবারটুকু পাওয়ার কথা, সেটা যদি তার হাতে না পৌঁছায়, তাহলে শুধু একবেলা খাবারের ঘাটতি হয় না, বিদ্যালয়ের প্রতি তার আস্থাতেও চিড় ধরে।

কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য মহৎ, তহবিলও যথেষ্ট। দরকার হলো প্রতিটি স্তরে নজরদারি জোরদার করা, অভিযোগ এলে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে এই প্রক্রিয়ার অংশ করা। শিশুরা যে খাবারটুকু নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে, তার মানের ওপর নির্ভর করে অনেকটাই তাদের বেড়ে ওঠা। তাই এই কর্মসূচিকে সফল করার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয় প্রতিটি অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিকেরও।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com